সিডনী সোমবার, ২১শে জুন ২০২১, ৬ই আষাঢ় ১৪২৮

হেমন্তের ঝরাপাতা ও অনান্য রবীন্দ্রনাথ: মনোমণিকার কাব্যতীর্থে অত্যুজ্জ্বল বিশ্লষণ : লিপি নাসরিন


প্রকাশিত:
৭ জুন ২০২১ ১৪:৪৪

আপডেট:
২১ জুন ২০২১ ০৩:৫৮

 

হেমন্তের ঝরা পাতা ও অনান্য রবীন্দ্রনাথ গ্রন্থটি সম্মাননীয় লেখক সালেহ মাহমুদ রিয়াদের একটি অনন্যসাধারণ ভূমিকাসহ এগারটি প্রবন্ধের সংকলন। ভূমিকাটি বইটির সম্পর্কে পাঠকের সামনে মেলে ধরেছে অনেকখানি, তাই বেশ খানিকটা পড়া এগিয়ে নিতে পারি ভূমিকাটি পড়ে।

বেশ অভিমানের সুরে লেখক লিখেছেন, ''হেমন্তের ঝরাপাতা'-কে অন্তত তিনটি জাতীয় সংবাদপত্রের সম্মানিত সম্পাদক ছাপার যোগ্যতার নিদারুণ অভাবের জন্য ফেরত পাঠিয়েছেন।" একজন প্রথিতযশা সম্পাদক 'এটা আবার কী' মন্তব্য- সহযোগে এটিকে 'অদ্ভুত' হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রসঙ্গত 'হেমন্তের ঝরাপাতা' প্রবন্ধটি যে এই বইয়ে স্থান পেয়েছে সেটি বইয়ের শিরোনাম দেখে সহজে অনুমেয়।

লেখকের অভিমান থাকতেই পারে- সে সব লেখকেরই থাকে; কারণ,লেখকমাত্রই সংবেদনশীল প্রজাতি।

এই সংকলনটিতে একমাত্র 'নৃপতির ছবি' প্রবন্ধটি ছাড়া অন্য দশটি কোথাও না কোথাও ছাপা হয়েছিল দুইযুগেরও বেশি সময় পূর্বে।

দুইযুগ সময়টি আমাকে এক অবসন্নতায় আবেশিত করেছিল তৎক্ষণাৎ। ভেবেছিলাম কেন এই আকর গ্রন্থটি পাঠসমাপ্তিকল্পে একজন গুণমুগ্ধ পাঠক বা কোন শক্তিশালী সাহিত্য সমালোচক দুটি কথা লিখলেন না ! সে কি ঈর্ষা নাকি নঞার্থে সগৌরবের মাল্যখানি লুটিয়ে যাবে ধূলিতে তাই?

বাঙালি নিপাট, নির্ঝঞ্ঝাট, মহান এ-সব ভাবতে গিয়ে বা বোধের মধ্যে ফেলে দিয়ে শেষ করেছিলাম পড়া। কোনটি ভাবাবেগমোথিত হৃদয়ে জিজ্ঞাসা রেখে যায়, নিজেকে প্রশ্ন করতে শেখায়, কোন কোনটি আবার অতিভক্তির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া নিছক মনুষ্যজীবনের  ত্রুটির দিকে উঁকি দিতে দেখায়। আর দুয়েকটি ঝিরঝিরে হাওয়ায় ভরহীন নিজেকে শূন্যতায় সাঁতরাতে শেখায়। এক ক্ষুদ্র তীক্ষ্ণ ফলা বিঁধিয়ে

মনকে দ্বন্দ্বদীর্ণ করে তুললো, ভাবতে বাধ্য করালো- সগৌরবের শীর্ষে যাঁরা বসে আছেন, যাঁদের সহস্র প্রণতির মুকুট পরিয়ে আরাধ্য দেবতা করে রাখি তাঁরাও তো ধূলিমাখা  মাটির মানুষ। তাঁরা সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন তবে সে সমালোচনা অবজ্ঞায় নয়, প্রচণ্ড ভালোবাসায়, প্রত্যাশিত সবটুকু না পাওয়ার কষ্টকিন্নরিতে ঝঙ্কৃত।

আলোচনার আলোতে যেমন তিনি নক্ষত্রের মতো জেগে থাকেন রাত-দিনকে একপাশে রেখে তেমনই, সমালোচিত হতে হতে সন্ধ্যাতারা হয়ে জেগে উঠেন দিনান্তে। তাঁর সৃষ্টিতে ডুব দেয় নি কে? লেখকের বর্ণনায় দেখেনি - " অতএব, আমি ঝুপ ক'রে ঝাঁপ দিয়েছি গুরুদেবের মহাসাগরে। খাবি খেতে খেতে অগাধ সমুদ্রের মধ্যে তলিয়ে যেতে যেতে  এক-সময় থিতু হলাম, দেখি অন্ধের হস্তিদর্শনের ন্যায় আমি কেবল অগাধ-সমুদ্রজলের উপরিভাগের  দু'একটা ফেনা দেখছি  জ্বলজ্বল করছে সূর্যের উজ্জ্বল কিরণ-সম্পাতে। ঊষার কোমল স্নিগ্ধ  আলোকধারার অসীম করুণা ঝরে পড়ছে অন্তহীন জলরাশির বুকের উপর।"

 

'শুধু বিঘে দুই রবীন্দ্রনাথের' এই প্রবন্ধে আমরা দেখতে পাই লেখক দেখাচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ পরাক্রমশালী রাজশক্তির একজন উঁচুদরের অধিনায়ক ছিলেন না ঠিকই কিন্তু গণমানুষের লাইনে দাঁড়িয়ে জনতার জয়ধ্বজা উড়িয়ে দেওয়ার প্রতি সমর্থন প্রদানেও প্রস্তুত ছিলেন না। অর্থাৎ, কোথাও একটা স্বস্তির জায়গায় আমরা নিজেদেরকে  দাঁড় করিয়ে দিই, যেন সমালোচনার উচ্চনাদে থাকা কণ্ঠটিকে ঠেলে দিলাম নিচু স্বরগ্রামে। শেষ পর্যন্ত ভিটেমাটি হারিয়ে উপেন মনোহর সন্ন্যাসী। পনের বা ষোল বছর পর গ্রামবাংলার রূপে বিমোহিত যেন হঠাৎ  বহুযুগ পর অন্ধচোখে ঊষার স্বর্ণালোকের অপার করুণাধারায় দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্যে ওজনহীন হয়ে আনন্দধারায় ভেসে চলা।

যে জমি ছিলো উপেনের শেষ সম্বল, সেই জমি তার কাছে লজ্জাহীন কুলটা। অপহরণকারী জমিদার অভিশপ্ত নন। এই প্রবন্ধে শ্রেণীবৈষম্যের আলোকে লেখক প্রভূত ব্যাখ্যা করেছেন উপেন আর জমিদারের চরিত্র টেনে। জালিয়ানবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদের ঘটনায়

লেখক লিখেছেন,'' প্রভুদের অনুরাগসিক্ত মহামূল্যবান উপাধি  শেষমেশ ত্যাগ করেছিলেন কবি। বাইশ দিনের দীর্ঘ ব্যবধানে, ততদিনে, আশা করি জালিয়ানবাগের রক্তের দাগ শুকিয়ে গিয়েছিল।" এখানেও শ্রেণীপ্রতিভূ কবির মানসপটে কি কোন সংশয় কাজ করেছিল যে প্রতিবাদের ভাষাটি বাইশ দিন অবরুদ্ধ ছিলো?

 

এই প্রবন্ধের আলোচনা রেখে আমরা এগিয়ে চলি 'কেষ্ট উপাখ্যান', 'হেমন্তের ঝরা পাতা', 'নৃপতির ছবি', 'কয়েকটি মুসলমানের গল্প' প্রভৃতি প্রবন্ধগুলিতে। প্রবন্ধের বিষয় আলোচনা সঙ্গত নয় শুধু লেখক কী বলতে চেয়েছেন, কোন ভাষা প্রক্ষেপণের মাধ্যমে আলোচনাকে হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন সেটিই মুখ্য।

শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শ্রী কৃষ্ণকান্ত মিত্র (নাকি সেন) হয়ে যায় কেষ্ট। কেষ্ট যেন এক অচল, স্থানু সর্বংসহা বৃক্ষ। একটি মুনাফাখোর পুঁজিবাদী সমাজে শোষিত, অত্যাচারিত  জনমানসের প্রতীক যে শুধু বড় মুনাফাখোর কর্তৃক শোষিত নয় বরং মাঝারি (গৃহকর্ত্রী) নিপীড়ক কর্তৃক উৎপীড়িত। লেখকের তীক্ষ্ণ অনুসন্ধান আর ভাষার অভিনব সৌকর্যে প্রতিটি প্রবন্ধ  সুখনিদ্রার ন্যায় পুলকিত সুখপাঠ্য। হ্যাঁ, তিনি চরিত্র ব্যবচ্ছেদের মাধ্যমে মহামানবিক রবীন্দ্রনাথকে দাঁড় করিয়ে দিয়ে তাঁর কবিতা, নাটক বা গল্প, উপন্যাসের ভেতর  সামাজিক চালচিত্রের দ্বন্দ্বগুলিকে তুলে ধরেছেন  নিপুণ দক্ষতায়। রবীন্দ্রনাথ কি নিজেও সচেতন ছিলেন না এ ব্যাপারে? ঐ যে ভূমিকাতেই লেখক বলেছেন অন্ধের হস্তিদর্শন। ধনতান্ত্রিক সমাজে কেষ্টদের শান্তি আসে মৃত্যুকে আদরণীয় করার মধ্যে, তাতেই তো সব জ্বালা জুড়োয়। এক অতিবাস্তব  বাক্যের ভারে লেখক জানাচ্ছেন," শূন্য হাতে মন্দিরে যায় কেবল ভিক্ষুক; পূণ্যলোভির হস্ত থাকে পূর্ণ।"

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারী আর কৃতদাস বুঝি সমার্থক হয়ে ওঠে। স্ত্রীজাতি যেন পরাধীনতার আর অবজ্ঞার শৃঙ্খল জড়িয়ে নিয়েই মাতৃগর্ভ থেকে পৃথিবীর আলোয় আসে। 'হেমন্তের ঝরাপাতা' প্রবন্ধে গৌরিশঙ্কর, রামসুন্দর এমনকি বিত্তশালী রাজাদের কন্যাগণও সে-সব অমোঘ বিধানের বলি সেসব দেখিয়েছেন মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে অদৃশ্য জীবাণু দেখানোর মতো।

আমরা বুঝতে পারি গৌরিশঙ্কর, রামসুন্দর রবীন্দ্রনাথের আয়নায় বিম্বিত এক অসহায় পিতার করুণ মুখচ্ছবি। হৈমন্তী অসহায়, নিরুপমা মরেছে,  কুসুম জলে ঝাঁপ দিয়েছে। আর গিরিবালা? যেন রবীন্দ্র নায়িকাদের মৃত্যুই একমাত্র শান্তি,  সব সমস্যার বৈধ সমাধান। লেখক প্রচণ্ড অভিমানে লিখেছেন," উগ্রভাবে সমাজদ্রোহী যে পিতাকে উল্লেখ করেছেন গল্পকার- তাঁকে  দেখি সবচেয়ে অবলম্বনহীন একজন নির্বিকার পিতৃত্ব। ভয়ানকভাবে অসহায়। কন্যাটিও অতিমাত্রায় নিষ্প্রভ। তাঁদের কথাবার্তাও অবনত, বিলাপে ও শোকে পরিপূর্ণ"। রবীন্দ্রনাথ নিজেও কি ভাঙতে চেয়েছিলেন সেই বিধান? একাধিক কন্যার বিয়েতে পিতা রবীন্দ্রনাথের অসহায়ত্ব কী প্রকটভাবে জানান দিয়ে যায়  নিদারুণ লাঞ্ছনায়!

পুরুষতান্ত্রিক সমাজে এক মহান লেখকের কাছে সমাজের নিপীড়িত, লাঞ্ছিত নারীর জন্য মহত্তম  প্রত্যাশা নিয়ে  লেখক প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন বারবার। তবে কি তিনি সময়কে অস্বীকার করে তাঁর নারীদের দ্রোহের আগুনে জ্বলে উঠতে দেননি নাকি কেবল দুঃখ, বঞ্চনার কথা তুলে ধরে ভবিষ্যতের হাতে মুক্তির নিশানাটি সমর্পণ করেছেন তা বুঝতে গিয়ে আমরা একটু ধন্ধে পড়ে যাই বৈকি। লেখক এই গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথের আরো একটি কবিতা ও দুটি নাটকের বিচারে দেখিয়েছেন সাধারণ পিতা থেকে রাজাপিতা কেউই শৃঙ্খলিত সময়ের অবমুক্তি ঘটিয়ে নারীকে প্রাণ দিতে পারেননি।

তবে মহামায়া চরিত্রকে রবীন্দ্রনাথ এক আত্মমর্যাদাশীল নারীর ছবি এঁকেছেন। চিতা থেকে ফিরে এসে প্রবল আত্মবিশ্বাসে প্রেমিকের কাছে প্রত্যাবর্তন তারপর প্রত্যাখ্যাত হয়ে মাথা উচ্চে তুলে ফিরে গেছে অসহায়ের আকুতি ঘৃণাভরে ফেলে। গিরিবালা নটীপ্রেমে মুগ্ধ স্বামী কর্তৃক অপমানের প্রতিশোধ নিতে  নাট্যমঞ্চ মাতিয়েছিল নটী সেজে। তবে  কুমুদিনীকে ফেরত যেতে হয়েছিল মাতৃত্বের ধ্বজায় মানুষের পরিচয়কে চাপা দিয়ে আর কাদম্বিনী মরেই  প্রমাণ করেছিল সে মরে নি। আশ্চর্যের ব্যাপার গিরিবালা চরিত্রের কুড়িবছর পর হৈমন্তী চরিত্র নির্বাক, অসহায়! 

লেখকের সপ্রতিভ বর্ণনায় প্রতিটি প্রবন্ধ এক একটি উজ্জ্বল আলোক কণা যা পাঠে পাঠক চমকিত হয় ক্ষণে ক্ষণে। লেখক নারীমুক্তির আলোকে রবীন্দ্র সাহিত্যে  অনুষঙ্গ খুঁজেছেন  ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে চোখ রেখে কিন্তু তিনি খুঁজে পাননি কোথায় সেই মুক্তির বিজয় তোরণ আমাদের মহান কবি তৈরি করেছেন। হয়তো তিনি পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যন্ত্রণাপীড়িত নারীর  দগ্ধচিতাকে আরো জ্বালিয়ে দিয়েছেন সমাজের মুখে চপেটাঘাত হিসাবে। তবে একটি বিষয় হয়তো চোখের আড়ালে পুরুষের অগোচরে বেড়ে ওঠে, যে পুরুষতন্ত্রের শিকারে নারী হয় ভোগ্য সেই তন্ত্রের জালে পুরুষ একসময় নিজেই জড়িয়ে বেরোনোর পথ খুঁজে পায় না। কল্পনা আর বাস্তবতার এক অসহনীয় পৃথিবীতে হয়তো পুরুষতন্ত্রের বাস।

লেখকের ভাষার," গল্পের কন্যারা যত সহজে ব্যাধি ও জলের খপ্পরে পড়ে, তাদের যত সহজে অগ্নি ও জলে নিক্ষেপ করা যায়, নিক্ষেপ- পরবর্তী অনুভূতিহীন আত্মরক্ষাও সম্ভব; বাস্তবিক কন্যাদের পক্ষে ততখানি সহজ নয়।"

 

'নৃপতির ছবি' প্রবন্ধে  লেখক সামান্য ক্ষতি কবিতা এবং রাজা ও রক্তকরবী নাটকের চরিত্র বিশ্লেষণে দেখিয়েছেন রাজা বা সম্রাট মানেই ঈশ্বরের প্রতিনিধি, পূণ্যতন্ত্রের পুরোধা।

'সামান্য ক্ষতি'-তে রাণী এক কৌতুকপ্রিয়, উন্মাদিনী , জলকেলিপ্রিয় রমণী, যার স্নানের যাত্রাপথে পথঘাট, বাড়িঘর প্রজাশূন্য হয়ে যায়(এমন পরিবেশ কি অত্যাবশ্যক ছিলো?) তারপর শীতে কাতর রাণী প্রজাদের ঘরদোর জ্বালিয়ে উষ্ণতা উপভোগ করেন। অতঃপর প্রজাকুলের নালিশ পেশ রাজদরবারে। এখানে রাণীও এক মধ্যমশ্রেণীর রাজশক্তির প্রতীক। রাণীর এই রাজশক্তির প্রদর্শন কি রাজার একেবারে অজানা ছিলো নাকি এটিও রাজার শক্তিমত্তার এক পরোক্ষ নিদারুণ আস্ফালন। শেষ পর্যন্ত রাণীর শাস্তি প্রদানের ঘটনাটিকে লেখক দেখিয়েছেন অতিপ্রাকৃত এবং পরাবাস্তবধর্মী। রাণী জীর্ণবস্ত্র পরিধান করে ভিক্ষাবৃত্তির অর্থে প্রজাকুলের সমস্ত ক্ষতি পুষিয়ে দেবেন।

রাণী উন্মত্ত হোক বা আনন্দপিয়াসিনী হোক তার এই অপকীর্তির জন্য তিনি এককভাবে দায়ী হলেও রাজা কি তার কর্তব্য ও দায় এড়াতে পারে? লেখকের ভাষায় আমরা পাই," ঊর্ধ্বালোকের অজ্ঞাত বিধানদাতাদের মর্ত্যনায়কেরা একসঙ্গে  জ্বালিয়ে দেন সম্মিলিত সাধারণতন্ত্র- সেখানে নারী বিনষ্ট হয় সবার আগে।"

রাজা এবং রক্তকরবীতে রাজারা অদৃশ্য। সেইটি রাজার মাহাত্ম্য প্রকাশের উত্তম পন্থা। রাজা নাটকে রাজার অস্তিত্ব কেবল তার মহত্ত্বপূর্ণ সমৃদ্ধ গাথায় আর রক্তকরবীতে নন্দিনীর কাছ থেকে রাজার স্বভাব-প্রকৃতি, অবস্থান সম্পর্কে আমরা জানতে পারি। রাজা আছেন অনতিক্রম্য দেয়ালের ওপাশে, নাকি নিজেই নিজের অহমিকা, শ্রেষ্ঠত্ব  আর গৌরবের কাছে দাসবন্দী !

রাজা নাটকে রবীন্দ্রনাথের রাজপিতার মুখে শুনি," নারী যখন আপন প্রতিষ্ঠা থেকে ভ্রষ্ট হয়, তখন সংসারে সে ভয়ঙ্কর বিপদ হয়ে দেখা দেয় । তুমি জান না  আমার এই কন্যাকে  আমি আজ কী রকম ভয় করছি । সে আমার ঘরের মধ্যে  শনিকে  সঙ্গে করে নিয়ে আসছে।" প্রসঙ্গত  নারীই সব নষ্টের মূল, ছলনাময়ী, সমস্ত পাপ আর ধ্বংসের নিয়ামক। নারী পদাবনত না হলে, বশ্যতা স্বীকার না করলে এই বিরাট পাতানো মঞ্চে পুরুষের পৌরুষত্বের নিদারুণ দামামা বাজানো ডঙ্কা নিনাদ ক্ষমতা প্রদর্শনের স্থানটি যে সংকুচিত হয়ে যায়। লেখকের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণে ওঠে আসে রবীন্দ্রসাহিত্যে পুরুষের বীরধর্মের অতি প্রবল প্রকাশের আয়োজন। সুদর্শনা আর নন্দিনীরা তাই মুক্তি পেতে গিয়ে আরো বেশি করে সমাজের নিগূঢ় আবরণে জড়িয়ে যায় কিংবা দগদগে চিতায় জ্বলতে থাকে। রাজাকে সকল শক্তির উৎস বানিয়ে

স্বর্ণখনিতে শোষণ, স্বর্ণ উত্তোলন সবই চলছিল ঠিকঠাক কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো নন্দিনী এসে। যেন নারী সব নষ্টের মূল। নন্দিনী প্রতিবাদের, প্রতিরোধের কণ্ঠ কিন্তু তা কখনোই প্রবল নয় বরং পাথরে ধ্বনিত হয়ে যেন তা কণ্ঠেই ফিরে আসে। দ্রোহের আগুন ছাই ফুঁড়ে বের  হতে না হতেই চন্দ্রা নাম্নী আরেক শোষিত নারীর আবির্ভাব। অতঃপর নন্দিনী দোষী সাব্যস্ত; কারণ সবগুলো পুরুষের চোখে নন্দিনী এক অপরূপ মোহনীয় রমণী- এমন মানবীর চরিত্রে বিদ্রোহ যে বড় বেমানান। আর রাজার কোন দোষ থাকতে পারে না। রাজা তো অলৌকিক গুণের পর্বতশৃঙ্গসম, কেন তিনি সামষ্টিক স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে ধূলিমগ্ন ধরণীতে গণমানুষের মিশিলে শামিল হবেন!

তাই লেখক জানাচ্ছেন," নারী নিন্দা যেন পুং অলঙ্কারের এক একটি মহার্ঘ উপাদান।"

 

মানুষ যে মানুষ যতই দেবত্বের গুণধারী হোন কেন সে কখনো দেবতা নয় 'কয়েকটি' মুসলমানি গল্প নামক প্রবন্ধে লেখক চোখ টানটান করে আমাদের দেখিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের 'কাবুলিওয়ালা' , 'মুসলমানির গল্প' এবং 'রীতিমত নভেল'- এই তিনটি গল্পের বিশ্লেষণমুখর আলোচনায় গল্পের বিষয়বস্তুর উল্লেখ এই লেখায় বাহুল্য বটে। পঠিত পাঠকমাত্রই সেসব গল্পের সাথে সম্যক পরিচিত কিন্তু লেখকের দুএকটি লাইনের উদ্ধৃতি উল্লিখিত গল্পগুলি  না-পড়া পাঠককে তা পাঠে আগ্রহী করে তুলবে সন্দেহাতীত।

" হর হর বোম বোম শব্দে তিন লক্ষ ম্লেচ্ছকণ্ঠের আল্লা হো আকবর ধ্বনি নিমগ্ন হইয়া গেল।"- বাক্যটি রবীন্দ্রনাথের। এবার লেখকের ভাষ্য আমরা দেখি - " আমাদের বিশ্বাস করতে খুব কষ্ট  হয় বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ মুকুটধারী কবি তিন লক্ষ ম্লেচ্ছ কণ্ঠ বলতে এতটুকুও কুণ্ঠিত হচ্ছেন না।" মাত্র পঁয়ত্রিশজন হিন্দুবাহিনীর হাতে তিন লক্ষ যবনসেনার বিনাশ না হলে  কিংবা খুনি, ডাকাতগুলো মুসলমান না হলে একটি অনুপম মুসলমানির গল্প মহান কবির হাত দিয়ে কীভাবে লেখা হবে? রবীন্দ্রনাথ  সাহিত্য রচনায় সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নিয়েছেন এমন নয়, তবে প্রশ্নটি আমরা করতেই পারি। লেখকের লেখা আমাদের জানাচ্ছে যে একেবারে পরিণত বয়সে  ১৯৪১ সালে মৃত্যুর দুএকমাস আগে লিখেছিলেন গল্পটি। পরাধীন ভারতবর্ষে যখন হিন্দু- মুসলিম জাগরণ অগ্রগামী  ,মুসলমানরা আলাদা আবাসভূমির দাবী জানাচ্ছে অত্যন্ত  সংহত চিত্তে তখন এই ধরনের একটি গল্প লিখলেন  যেখানে ডাকাতেরা মুসলমান।  "অতঃপর রবীন্দ্রনাথের অসাম্প্রদায়িক উদার মহৎ মানবিক  দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে  প্রশ্ন তোলার অবকাশ থেকেই যায়।"

 

'কবিতীর্থে, কবি সন্দর্শন', 'তাঁর গান তাঁর নয়', 'গৌতমের মুখ', 'কাব্যপাঠের স্বরবর্ণ', 'প্রণয়ের পলায়ন' এবং 'ভাষার শত্রু-মিত্র' প্রবন্ধগুলো পাঠককে ঐ সব সাম্প্রদায়িক মানস থেকে পাঠককে নিয়ে যায় এক সীমাহীন আনন্দ আকরে। কোন ব্যঞ্জনায় এই প্রবন্ধের আলোচনাকে উপাধেয় করে তুলবো! ঐ যে বলেছিলাম মানুষ যাকে ভালোবাসে তার পায়ের কাছে পাহাড়সম প্রত্যাশা নিয়ে বসে থাকে। 'তাঁর গান তাঁর নয়' প্রবন্ধে ভক্তির অনিঃশেষ বাণী  অনির্বাণ শিখা হয়ে ঠিকরে বের হচ্ছে যেন কালো অক্ষরগুলোর বুক চিরে। তাঁর গানের অখণ্ড অবিনাশের বাণীতে বেজে উঠেছে  লেখকের সমস্ত তন্ত্রের তাররজ্জু; নিবিড় গহন বন্দনার ঝরনা ধারায় বয়ে যায় কবির গান। লেখক জেগে উঠলেন, পুলকিত হলেন এক প্রতীক্ষারত প্রেমিকের ন্যায়। যেন বহুদিনের অব্যক্ত  ভাষাহীন ধ্বনিপুঞ্জ বাইরে এলো। এ গান তাই তাঁর নয় লেখকের পিয়াসীমর্মে লুকিয়ে থাকা এক ব্যাকুল আকাঙ্ক্ষার মূর্ত সুর মন্দ্রধ্বনি। এক অনুপম ভাষাশৈলীর লালিত্যে সাজিয়েছেন লেখক এই প্রবন্ধগুচ্ছ। পড়তে পড়তে অশ্রুগ্রন্থিতে অভিঘাত উঠে, রক্তের কণিকায় কাঁপন জাগে। কোষ থেকে কোষে প্রতিধ্বনিত হয় ঘাই হরিণীর ডাক। 'কাব্য পাঠের স্বরবর্ণ' প্রবন্ধটিতে কবিতার খোলনলচে আলোচনা করেছেন। সাহিত্যের আদি এবং শক্তিশালী মাধ্যম হয়েও কবিতা কেন পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য বা অনাদৃত, সত্যি কি বর্তমানে কবিগণ  বোধের অগম্য কবিতা লিখছেন বা পূর্বেও লিখেছেন - এসব বিষয় নিয়ে  নিজস্ব বিশ্লেষণে মাতিয়ে রেখেছেন বাক্যের বিন্যাসে। চক্ষু নাচে, প্রাণ আমোদিত হয় সেসব পড়তে গিয়ে। কীর্তিমান কবিদের কবিতা ধরে আলোচনা করেছেন কবিতার সংজ্ঞা, উপাচার আর ভেঙে ভেঙে আমাদের যেন  শিখিয়ে দেন কীভাবে কবিতা পড়তে হবে। শুধু এই একটি প্রবন্ধ পড়লেই কবিতাবিমুখ পাঠকের কাছে কবিতা বিপুল সম্ভার আর শক্তিমত্তা নিয়ে ধরা দেয়। কবিতা তো কুহকিনী, কেবল রহস্য ছড়িয়ে নেচে চলে সুদূরের টানে। লেখক সেই সুদূর থেকে কবিতাকে টান টান করে মেলে ধরেন  আমাদের সম্মুখে। সে পৃষ্ঠটানে একটা লোহার সূচও যে ভেসে থাকে! একুশ পৃষ্ঠার ব্যাপ্তায়তনে ধ্বনি আর ভাষার যে কারুকার্য লেখক দেখিয়েছেন তা কবিতা পাঠের আনন্দদাত্রী।

সংবেদনশীল পাঠকমাত্রই এই প্রবন্ধে নিজেকে ভিন্ন রূপে খুঁজে পাবেন। লেখক সালেহ মাহমুদ রিয়াদ নিজেও প্রবল ইচ্ছানুগামী কবি যিনি যৌবনে রবীন্দ্রনাথের কবিতাকে নিজের হৃদয়ের অব্যক্ত কথা বলে প্রকাশিত হতে দেখেছেন। যিনি তাঁকে  করেছেন পরম মিত্র, তাঁর  গানে মগ্ন হয়েছেন মদিরা পানের নেশায় তিনিই তো লিখবেন এমন হৃদয়হারী, অশ্রুঝরা  কবিতাপম সাহিত্যরেণু।

কবিকে কি পাঠকের সাথে বোঝাপড়া করে কবিতা লিখতে হবে কিংবা কবি কি পাঠকের বোধ চেতনার স্তর মেপে কবিতা লিখবেন? না তা নয়। সেটাই স্বস্তির কিন্তু তাই বলে পাঠকের ভূমিকা কি একেবারেই নেই?

লেখকের ভাষায়- " গড় পাঠক বলে কোন কথা নেই। আমরা যারা সাধারণ পাঠক, কবিতার জন্য ব্যাকুলতা অন্য কোথাও লুকানোর জায়গা পাইনে- তাদের কবিতা বুঝতেই হবে।"

কবিতীর্থে, কবি-সন্দর্শন প্রবন্ধে কবিতার সংজ্ঞায় লিখেছেন  একটি কবিতাজাত স্বোৎসারিত সংজ্ঞা-" অদৃশ্য আঁখির অস্তিত্ব নিয়ে কবি ভাবলেন না। তিনি চুম্বনভারে আন্দোলিত; কিন্তু কোথায় অধরখানি? কবিমাত্রেই এ-কথা মানবেন যে, অধরে অধরে বিহ্বল চুম্বন অতিশয় আটপৌরে প্রেমজনিত দেহজ অধ্যায়। প্রেমের দৃশ্যযোগ্য আলোড়ন ও আয়তনগুলি পুরোপুরি মেলে ধরলে কবিতা হয় না। কল্পলোকের অধরখানিতে কবি  যে সারা জীবনে একটি চুম্বন দিলেন- সেটিই কবিতা।" কবিতা তাই সৃষ্টি কখনো নির্মাণ নয়। সৃষ্টি আর নির্মাণের পার্থক্য যদি এভাবে টানি- সৃষ্টি হৃদয়বৃত্তিক কিন্তু নির্মাণ বুদ্ধিবৃত্তিক, সৃষ্টির মধ্যে আবেগ থাকে নির্মাণে থাকে চাতুর্য, সৃষ্টি অভ্যন্তরীণ নির্মাণ বাহ্যিক, সৃষ্টি শৈল্পিক ও নান্দনিক নির্মাণ বস্তুভিত্তিক

সৃষ্টি অতিপ্রাকৃতিক বা অলৌকিক নির্মাণ প্রাকৃতিক; তা হ'লে কবিতার অনাগ্রহী পাঠক যাদের হৃদয়ে  জলে চাঁদের ছায়া দেখলে আকুলি- বিকুলি ওঠে তাদের কবিতা বুঝতে সুবিধা হয়। কবিতার বস্তুনিচয়  নিয়ে লেখা এই দুটি প্রবন্ধে চন্দ্রালোকিত রাতে দক্ষিণের উতল হাওয়ায়  গা এলিয়ে নির্মল রাগিণীর সুরধ্বনি শোনার মতো যা হৃদয়কে ভেঙেচুরে এক অন্যরকম অনুভূতি জাগিয়ে তোলে।

আধুনিক কবিতায় চিত্রকল্প যদি জটিল বলে গণ্য হয় তাহলে বলতে হবে পাঠকের কবিতা পাঠ সঠিক ও অর্থপূর্ণ নয়। কবিতা এক নিমিষে পড়ার বিষয় নয়; তার উপমা, উৎপ্রেক্ষা কিংবা চিত্রকল্প নিবিষ্টচিত্তের দাবিদার। কবিতার চিত্রকল্পের সাথে মিশে থাকে মনের গহিনে লুকানো এক অধরা রঙের লুকোছাপ। পাঠককে তাই কবিতার শরীরের সাথে সঙ্গমের মতো জেগে থেকে পুলকিত আনন্দানুভূতি নিজের শরীরে ছড়িয়ে দিতে হয়। কবিতার তন্ত্রীতে স্তরে স্তরে ভাঁজ হয়ে থাকা রহস্যের প্রতিটি বিন্দুকে স্পর্শ না করলে কি কবিতা ধরা দেয়? কবিতা যেন নারীর মতো! তাকে বোঝা যায় না, ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ মাধুর্যের বিচলিত ভঙ্গিতে পরাস্ত হয় পুরুষের মতো পাঠক! নারীকে এই অভিধা দেবকুল থেকে সাধারণ পুরুষ পর্যন্ত দিয়েছে শুধু নারীকে বুঝতে চাওয়ার প্রবল অনীহা থেকে। কবিতাও বুঝি তাই? তাই তো লেখকের কলম লিখলো সেই কথাটি," করতলে অগুণতিবার উল্টে-পাল্টে দেখলে কবিতার অণু-পরমাণু  হয়ে ওঠে এক-একটি সর্বগামী তৃষ্ণা।"

সাধারণত লেখার মধ্যে দেখা যায় অনেক জগতখ্যাত লেখকের উদ্ধৃতি টেনে লেখাকে অর্থপূর্ণ ও মেদবহুল করে তোলা হয় কিন্তু লেখক  কবিতার কথা বলতে গিয়ে  সেই বহুল উপমায়িত কথামালা ব্যতিরেকে একেবারে নিজস্ব অর্থায়নের মতো একান্ত ভাবনার শাণিত যে কথায় সাজিয়েছেন তা যেন এক অনন্ত সাধনার সঙ্গীতের সুর- ঝরে পড়ে ভাষার গাঁধুনি বেয়ে বেয়ে।

 'গৌতমের মুখ' প্রবন্ধে বর্তমান যুদ্ধোন্মত্ত সাম্প্রদায়িক অনৈক্যের প্রেক্ষাপটে মহামতি বুদ্ধের বাণীর প্রাসঙ্গিকতা টেনেছেন আর 'প্রণয়ের পলায়ন'ও 'ভাষার শত্রু-মিত্র' প্রবন্ধ দুটিতে আমাদের মহান ভাষা আন্দোলনের অবশ্যম্ভাবিতার প্রেক্ষাপট থেকে বর্তমানে বাংলা ভাষা যে নিম্ন আর মধ্যবিত্তের ভাষায় পরিণত হচ্ছে সে সম্পর্কে নিজের নিদারুণ ক্ষোভ আর হতাশা ব্যক্ত করেছেন।

আমার আরেক প্রিয় লেখক ড. আবেদীন কাদেরের প্রবন্ধ পড়তে গিয়ে ঠিক একই রকম সঙ্গীতের মূর্চ্ছনায় জারিত হয়েছিলাম। তদ্রূপ বাংলা সাহিত্যের কীর্তিমান পুরুষ বুদ্ধদেব বসুর শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধগুলি আমাকে কোন সুদূরে এক অসীম শূন্যতার মাঝে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।

যে ক্ষীপ্রতা, যে উন্মাদনা, যে সম্মোহন সৃষ্টি করেছেন লেখক সালেহ মাহমুদ রিয়াদ তা সংবেদনশীল  পাঠকের হৃদয়ে চিরজাগরুক থাকবে।

তাই লেখকের ভাষায় বলতে হয় এই মহাযজ্ঞে তাঁর বলিদান নয়, এ এক অনুপম আত্মনিবেদন।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top