সিডনী সোমবার, ২১শে জুন ২০২১, ৬ই আষাঢ় ১৪২৮

এর নাম জ্যৈষ্ঠ, এর নাম মধুমাস : ডাঃ মালিহা পারভীন


প্রকাশিত:
৯ জুন ২০২১ ১২:২৭

আপডেট:
২১ জুন ২০২১ ০৩:০০

 

'বৈশাখ চলে গিয়ে এলো মাস জ্যৈষ্ঠ,
মধুমাস নাম যার, ফলে ভরা মিষ্ট।'

এখন চলছে জ্যৈষ্ঠ মাস। যদিও জ্যৈষ্ঠ মাসের নামকরণ হয়েছে নক্ষত্র 'জ্যৈষ্ঠার' নামে। কিন্তু সর্বত্র এ মাস মধুমাস হিসেবেই পরিচিত। এখন চারিদিকে ভেসে বেড়াচ্ছে বাহারী ফলের মৌ মৌ ঘ্রান! কত রকমের রঙিন রসালো ফল। এতোসব সমারোহের জন্য তাই জৈষ্ঠ্যমাসের সাথে 'মধুমাস' বিশেষণটি যেন ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িয়ে গেছে। 
অভিধান কিন্তু বলছে চৈত্র মাস হচ্ছে প্রকৃত মধুমাস। লেখক, গবেষক ও ইতিহাসবিদ ড. মোহাম্মদ আমীন বলেছেন, ‘মধুমাস' শব্দের অর্থ চৈত্র মাস।  মধুমাস কেবল চৈত্র মাসকে বোঝায়।
দৌলত উজির বাহরাম খান তাঁর কাব্যে বলেছেন, ‘মধুমাসে উতলা বাতাস, কুহরে পিক, যদি সে কমল শিশিরে দহল কি করিব মধুমাসে।’
তিনি এ পংক্তিতেই চৈত্র মাসের কথাই বলেছেন। কেননা জ্যৈষ্ঠ মাসে তো আর কোকিল ডাকে না।
সে যাকগে। সময়ের বিবর্তনে পালটে যেতেই পারে অনেক কিছু। ভুল শুদ্ধ  যাই হউক না কেন, বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ চৈত্র যে মাসই হউক অথবা এর আভিধানিক অর্থ যাই হউক এটা সত্য যে 'মধুমাস' বয়ে আনে অনিন্দ মধুক্ষণ, মধুর মিলন। এই মিলন রসনার সংগে, এই মিলন প্রকৃতির সংগে, এই মিলন মানুষের সংগে মানুষের আর তাদের সম্পর্কের মধ্যে ।
এই গ্রীস্ম মৌসুমে আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, লটকন, গোলাপ জাম, বেতফল, আনারস, জামরুল, তাল, আতাফল, শরীফা, গাব, তরমুজ, ডেউয়া ইত্যাদি কত কি ফলের  বাহার!  দেখতে যে কি ভাল লাগে! শুধু কি দেখতে বা ঘ্রাণ নিতে!  না এইসব দেশি ফলের পুষ্টিগুণও কিন্তু অনেক। এগুলোতে আছে প্রচুর পরিমান ভিটামিন সি ও ভিটামিন ডি যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ বা কার্যক্ষমতা বাড়ানো ছাড়াও চুল, ত্বক ও দৃষ্টিশক্তি ভাল রাখে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড.খালেদা ইসলাম  বলছেন, "এইসব মৌসুমি ফলের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এগুলো রান্না করতে হয় না। সব ফলের মধ্যেই পানির পরিমাণ বেশি থাকে বলে এই গরমে শরীরের পানিশূন্যতা পূরণে এই ফলগুলি  সহায়তা করে। এইসব ফলের মধ্যে  প্রচুর খাদ্যশক্তি থাকে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এই ফলগুলোতে খনিজ পদার্থ থাকে। রঙিন ফলে লাইকোপেট আর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে, তা শরীরের ভেতরের বিষাক্ত জিনিস দূর করে দেয় এবং ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করে”।
আর সবচেয়ে বড় কথা যে এইসব ফল আমাদের দেশের মাটিতেই জন্মায়। আর দেশে যাতায়াত ব্যবস্থা ভাল হওয়ায় খুব সহজেই তা জনগনের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়। সবার ক্রয়সীমার  মধ্যে থাকে।

এই মধুমাসে দেশি ফলে সয়লাব হয়ে যায় গ্রাম বা শহরের সমস্ত বাজার ঘাট। পথের উপর ভ্যানে স্তুপ করে বিক্রির জন্য সাজিয়ে রাখা হয় নানান রঙের রসালো মুখরোচক ফল। কোনোটা মিষ্টি, কোনোটা টক, কোনোটা তিতকুটে, কোনোটা পানি পানি। নামেরও কত বাহার!
ফলরাজ আমের প্রসংগে আসি। কত রকমের আমই না আছে! কত তাদের বাহারী নাম! ল্যাংড়া, হাড়িভাংগা, গোপালভোগ, তোফা, রুমানী, আশ্বিনী, ফজলি, সিন্দুরি, গুটি,খাসা, লক্ষ্মণভোগ, অমৃতভোগ  - 'কত নামে নাম তার, ঘাণে রসে শত সাজ --'!
ক্রেতারা আপেল কমলা না কিনে ভীড় করছে দেশীয় ফল বিক্রেতার কাছে। মধুর এ দৃশ্য! মধুর এ মধুমাস! 
বাংলার ঘরে ঘরে এখন আম কাঁঠালের গন্ধ ভাসছে। সাথে আবার দু একটা মাছির ভনভনানিও মন্দ লাগছে না। রক্তের শর্করাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আম কাঁঠাল চিপে রস বের করে দুধ ভাত, চিরা দই মাখিয়ে কবজি ডুবিয়ে খাচ্ছে বুড়ো বা মধ্যবয়সীর দল। যখন কারো হাতের কনুই অবধি রসসিক্ত হচ্ছে তারা ফিরে যাচ্ছে তাদের ছোটবেলায়। মনে পড়ছে জিহবা লাগিয়ে কনুই থেকে আমের রস চেটে খাওয়া। ঝড়ের দিনে আম কুড়ানোর সুখস্মৃতি, কে কত টপাটপ আম, লিচু, কাঁঠালের কোয়া বেশি খেতে পারে সেই ছেলেমানুষি প্রতিযোগিতার দিনগুলি! কি মধুর সেই সব! যান্ত্রিক জীবনে এই মধুমাস ছাড়া এমন সুখস্মৃতি কে আর জাগাতে পারে!
বার্গার পিজায় আসক্ত এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা পিঠা, পুলি বা কাঁঠাল খেতে না চাইলেও কেউ কেউ কিন্তু আম, লিচু বেশ পছন্দ করে! ওরা হয়তো আমাদের ছোটবেলাকার মতন পাকা আমের ছাল ছিলে, নরম আম থেঁতলে চুষে খাওয়ার মজাটা অথবা নানি দাদি বা মায়ের হাতে আমদুধ ভাত মাখানোর মজাটা কখনো পাবে না। তবুও কখনো যদি ওরা কেউ সুদৃশ্য বাটি থেকে কাঁটা চামচ দিয়ে দু এক আমের টুকরো বা লিচু কায়দা করে মুখে ভরে - মা, নানি/ দাদির মন তাতেই যে কত শান্তি পায়! 
এদিকে এই মধুমাসেই হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জামাইষষ্ঠী হয়। গ্রামের অন্যদের ঘরেও মেয়ে জামাইদের দাওয়াত দেয়া নেয়ার ধুম পরে যায়। গোমরা মুখো জামাই, শ্বশুর বাড়ির খুঁত ধরা জামাই, ঘাড় ত্যাড়া জামাই বছরে একবার হলেও শ্বশুরবাড়ির এই মৌসুমি ফল ফলান্তির দাওয়াত গ্রহন করে। শ্বাশুড়ি মহা আদরে মেয়েজামাইকে ইচ্ছেমতন আম, কাঁঠাল,লিচু ইত্যাদি খাইয়ে দেন। ঢেঁকুর তুলতে তুলতে মেয়ে জামাই প্রসন্ন চিত্তে শ্বশুরবাড়ির এই অতি আদর গ্রহন করেন। আর এভাবেই মলিন হয়ে যাওয়া সম্পর্কগুলিতে লাগে নতুন রঙ, হয়ে উঠে তা মধুর! 
আগে স্কুল কলেজে গ্রীস্মের বন্ধ মানেই আম কাঁঠাল খাওয়ার জন্য ছুটি, গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার ছুটি। তবে আজকাল আর তেমন হয় না। এখন ছুটি পেলেই মানুষ পরিবার নিয়ে দেশের বাইরে বা দেশের মধ্যেই অন্য কোথাও বেড়াতে যায়। শহরমুখি জীবনের বিবর্তনের কবলে বেশিরভাগ পূর্বপুরুষগণ বা আত্মীয়স্বজন তেমন কেউ আর গ্রামে থাকেন না। আগে আম কাঁঠাল খাওয়ার জন্যই বোধকরি গ্রীস্মকালে বন্ধ দেয়া হতো। বছরের এই সময় গ্রামে মামাবাড়ি, নানাবাড়ি বা দাদাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া ছিল অবধারিত।
শিশুবয়সে দেখা আংগিনায় গাছের গোড়া থেকে থরে থরে ঝুলে থাকা কাঁঠাল, গাছ ভরা আম, লিচু ঝুলে থাকার দৃশ্য স্মৃতির মণিকোঠায় জমা হয়ে থাকে অমূল্য সম্পদ হয়ে। গাছে উঠে  বা কোটা দিয়ে আম পেড়ে খাওয়ার আনন্দই আলাদা। 'পাকা জামের মধুর রসে রঙিন করে মুখ --'  আহা, কি মধুর যে এই মধুমাস! আর সন্ধ্যে হ'তেই ফলের গন্ধে পাখপাখালির ভীড় জমতো গাছে গাছে, বাড়ির উঠোনে ।
'টসটসে রসে ভরা, লাল লাল লিচু দল
গাছে বসে দোল খায়, তর নাহি সয় আর --'

বাবার বাড়িতে মেয়েরা নাইওরে আসে এই সময়।  শহর থেকে বেড়াতে আসা আত্মীয় পরিজনে ঘরবাড়ি  থাকে মুখর। বেড়াতে গেলে, রোগী দেখতে গেলে, পরিজন প্রতিবেশীর জন্য হাতে থাকে ফলের উপহার। এই করোনা পরিস্থিতিতে যখন মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্কগুলি নিস্প্রভ হয়ে গেছে, মানুষ একে অপরের কাছ থেকে দূরে সরে গেছে তখন এই জ্যৈষ্ঠ মাস বা মধুমাস এসেছে শুধু আনন্দ নিয়েই নয়। এসেছে ঘুণে ধরা সম্পর্কগুলোকে আবার নতুন রুপে সজীব করে তুলতে। রকমারি দেশীয় ফলের আদানপ্রদানের মাধ্যমে বেড়েছে মনের আদান প্রদান ! তাহলে এই যদি মধুমাস না হয় তো কোনটা দেই মধুমাস!!
তাইতো কবি বলেছেন --
"রুপ রসে বুদ হয়ে প্রেমে গলে দিবে ফাঁস,
এর নাম জ্যৈষ্ঠ, এর নাম মধুমাস।"

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top