সিডনী সোমবার, ২১শে জুন ২০২১, ৬ই আষাঢ় ১৪২৮

বিস্মৃত এক শ্রমণ : নবনীতা চট্টোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
৯ জুন ২০২১ ১৫:৩৩

আপডেট:
২১ জুন ২০২১ ০৪:২৭

 

রাজপরিবারে তাঁর জন্ম কিন্তু তিনি রাজার সন্তান ছিলেন না। সূর্যের মত উজ্জ্বল এক মহাপুরুষের একমাত্র সন্তান তিনি। এক ভরা পূর্ণিমায় শাক্যবংশের রাজপরিবারে তিনি  যখন জন্মগ্রহণ করলেন, তাঁর পিতা (শাক্যবংশের ভাবী রাজা হওয়ার কথা ছিল যার) পুত্রসন্তানের আগমনের সংবাদে উচ্চারণ করেছিলেন "রাহুজাত, বন্ধনম জাতম"। যার অর্থ রাহু এসেছে আমার সাধনার প্রতিবন্ধক হয়ে।  রাহুলোসুত্ত থেকে জানা যায় এই রাহু  শব্দটি থেকেই পরবর্তীকালে সদ্যজাত শিশুটির  নামকরণ তাঁর পিতামহ রাজা  শুদ্ধোধন রাহুল করেন। রাহুলভদ্র, যিনি ভগবান বুদ্ধের একমাত্র সন্তান। মাতা যশোধরা দেবি। প্রাসাদের পর প্রাসাদ জুড়ে সাজানো ঐশ্বর্যময় ভোগবিলাসের রাজকীয় জীবন। তবুও কোনো কিছুই আকর্ষন করে নি রাজপুত্র সিদ্ধার্থকে। মানব জীবনের উদ্দেশ্য কি? কেনই বা রোগ, শোক, জরা, ব্যাধি, দু:খ মানব জীবনের অঙ্গ হয়ে থাকবে? এইসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বহুদিন থেকেই তিনি সংসার পরিত্যাগ করার বাসনা পোষণ  করছিলেন।  যেদিন তাঁর পুত্র সন্তান রাহুলের জন্ম হল, তাঁর মনে হল সংসারের সব বন্ধন ছিন্ন করে সেইদিনই তিনি সংসার ত্যাগ করবেন। হয়তো নবজাত পুত্র পরবর্তীকালে তাঁকে মায়ার বন্ধনে বেঁধে ফেলতে পারে। গভীর রাত্রে সিদ্ধার্থ নিজের শয়নকক্ষে প্রবেশ করলেন। রূপালী জ্যোস্নায় ভেসে যাচ্ছে কক্ষ। দুগ্ধফেননিভ শয্যায় সদ্যজাত পুত্রকে জড়িয়ে যশোধরা সুখের নিদ্রায় মগ্ন। সিদ্ধার্থ শেষবারের মত একবার স্ত্রীর মুখের দিকে তাকালেন, তারপর নবজাতক পুত্রের দিকে। কিন্তু যশোধরার  বাহুলতায় জড়ানো শিশুটির মুখ ঢাকা ছিল। অতএব পুত্রের মুখ একপ্রকার না দেখেই চিরদিনের মত সংসার ত্যাগ করলেন সিদ্ধার্থ। তাঁর বয়স তখন মাত্র উনত্রিশ বছর। অনুচর ছন্দককে সাথে নিয়ে এবং প্রিয় অশ্ব কন্থকের সওয়ার হয়ে তিনি রাজপরিবার ছেড়ে চলে গেলেন অনেক দূর। ভোরের আলো ফুটলে তাঁর অঙ্গের সব মূল্যবান অলংকার ছন্দকের হাতে দিয়ে তাকে কপিলাবস্তুতে ফিরে যেতে নির্দেশ দিলেন। নিজেই অস্ত্র দিয়ে তাঁর কেশ মুন্ডন করলেন। পরনের দামী মসলিনের বিনিময়ে এক ব্যাধের কাছ থেকে তাঁর কাষায় বস্ত্র নিয়ে পরিধান করলেন। তাঁর সেই অনাসক্ত বৈরাগ্য রূপ দেখে কাঁদতে কাঁদতে কপিলাবস্তুতে ফিরে গেলেন ছন্দক। প্রভুভক্ত অশ্ব কন্থক আর ফিরল না। শোকে পথেই দেহত্যাগ করলো।

যার জন্মের পরেই গৃহত্যাগ করেন পিতা, সেই সন্তানের শৈশব যে খুব বেশি সুখের হবে না বলাই বাহুল্য। সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগের পর যশোধরা শোকে দু:খে মানসিক অবসাদের শিকার হয়ে পড়েন। তাই রাজবংশে জন্মগ্রহণ করেও রাহুলের শৈশব ছিল আজন্ম পিতৃসঙ্গ বজির্ত ও অসুস্থ মাতার সাহচর্যে এক বিপন্ন শৈশব। যদিও রাজকীয় স্বাচ্ছ্যন্দ ও পিতামহ শুদ্ধোধনের স্নেহ অপরিমিত ছিল। রাহুলের আট বৎসর (আনুমানিক) বয়সের সময়ে বোধিত্ব লাভ করে ভগবান বুদ্ধ বহু জায়গায় ধর্মপ্রচারের পর আবার কপিলাবস্তুতে ফিরে এলেন। সঙ্গে সারিপুত্র সহ বেশ কয়েকজন শিষ্য। প্রত্যেকের হাতে ভিক্ষাপাত্র। রাজপরিবারের সবাই মর্মাহত হলেন ভিক্ষাপাত্র হাতে বুদ্ধকে দেখে।  বুদ্ধ প্রাসাদে ফিরলেন না। রাজা শুদ্ধোধন নিজে প্রাসাদের বাইরে এসে বুদ্ধকে প্রণাম করলেন|  যশোধরা স্বয়ং রাহুলকে নিয়ে বুদ্ধের কাছে এলেন| বুদ্ধকে দেখিয়ে যশোধরা রাহুলকে তাঁর পিতৃপরিচয় দিলেন এবং রাহুলকে  বললেন "যাও তোমার পিতাকে গিয়ে বলো প্রতিটি সন্তান তাদের পিতার কাছ থেকে যে সম্পদ পায়, তিনি যেন তা তোমাকে দেন।"
ছোট্ট রাহুল মায়ের নির্দেশ মত ভক্তদের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে গৌতম বুদ্ধের সন্নিকটে গিয়ে নির্ভয়ে তাঁর মানসিক ইচ্ছা প্রকাশ করল। বুদ্ধ প্রথমে কোনো গুরুত্ব দেন নি। তিনি শিশুর কথায় কান না দিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। রাহুল তাঁর পিছু ছাড়লো না। বুদ্ধ তাঁকে আবার জিজ্ঞাসা করলেন "বৎস তুমি কি চাও?" রাহুল উত্তর দিলেন "প্রভু আমি পিতৃধন চাই যা প্রতিটি শিশু  উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়ে থাকে"। সন্তানের নিস্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে বুদ্ধের মনে হলো পিতা হিসাবে শিশুটির মানসিক ও আধ্যাত্মিক উত্তরণের দায়িত্ব তাঁর নেওয়া উচিত। বুদ্ধ বললেন "বৎস চীবর ও ভিক্ষাপাত্র ব্যতীত আমার আর কোন পার্থিব ধন নেই। কিন্তু যে ধনলাভে আমি বোধিত্ব লাভ করেছি, আমি তোমাকে সেই ধন দিতে চাই।" রাহুল তাতেই সম্মত হলেন। হয়তো তাঁর শিশুমনে পিতৃ সান্নিধ্যই সবচেয়ে আকাঙ্খিত ধন ছিল। বুদ্ধ তাঁর প্রিয় শিষ্য সারিপুত্রকে নির্দেশ দিলেন রাহুলকে প্রবজ্যা দিয়ে দিতে। সারিপুত্র ও মৌদগল্যানকে রাহুলের শিক্ষক হিসাবে তত্বাবধানের ভার দিলেন। শিষ্যরা শিশু রাহুলের মস্তক মুন্ডিত করে তাঁকে গেরুয়া পোষাক পরিয়ে দিলেন, হাতে তুলে দিলেন ভিক্ষাপাত্র। মাত্র আট বৎসর বয়সে  রাজবংশজাত এক বিখ্যাত মহাপুরুষের সন্তান কিছু না বুঝেই সন্ন্যাস ধর্মে দীক্ষিত হলেন।  রাহুলের শ্রমণ  হবার সংবাদ কপিলাবস্তুতে এসে পৌছালে তাঁর পিতামহ রাজা শুদ্ধোধন অত্যন্ত দু:খ বোধ করলেন। তিনি  বুদ্ধের কাছে অভিযোগ জানালেন যে অভিভাবকদের সম্মতি ব্যতীত অল্পবয়সী বালকদের বৌদ্ধ ভিক্ষুসঙ্ঘের শ্রমণ করা অত্যন্ত অনুচিত। সম্ভবত: এরপর থেকেই ভগবান বুদ্ধ শিশু ও কিশোরদের শ্রমণ করার আগে অভিভাবকদের সম্মতি বিধান বাধ্যতামূলক করেছিলেন।
মাত্র আট বৎসর বয়সে ভগবান বুদ্ধের কাছে পিতৃধন চাইতে এসে রাহুল শ্রমণ হন। যেহেতু তিনি নিতান্তই শিশু ছিলেন তাই তাঁকে শ্রামণেয় বলা হতো। রাহুলাবাদ সুত্ত থেকে জানা যায় শ্রমণ রাহুলের ব্রক্ষ্মচর্য পালনের দিনগুলি। ভগবান বুদ্ধের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও  বুদ্ধের কড়া নির্দেশ ছিল রাহুলকে যেন কোনো পক্ষপাত দেখানো না হয়। প্রতিটি শ্রামণেয় বালকের মত রাহুলকেও ব্রক্ষ্মচর্যের কঠোর নিয়ম পালন করতে হত। বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলি থেকে জানা যায় প্রতিদিন সকালে শ্রামণেয় রাহুল  ঘুম থেকে উঠে একমুঠো বালি  আকাশে ছুড়ে দিয়ে প্রার্থনা করতেন যেন সারাটা দিন তিনি অনেক ভালো ভালো উপদেশ ও শিক্ষালাভে সক্ষম হতে পারেন। কোনো কিছু শেখার প্রতি রাহুলের আকর্ষন ছিল অসীম। ব্রক্ষ্মচর্য পালন করার পরে প্রাপ্তবয়স্ক হলে রাহুল যাতে গৃহে না ফিরে নির্বাণ লাভে ব্রতী হন সেজন্য ভগবান বুদ্ধ নিজে তাঁকে অনেক ধর্মোপদেশ দিয়েছিলেন। রাহুলের ও ধর্মোপদেশ শোনার প্রবল আগ্রহ ছিল। প্রথমদিকে বালকোচিত স্বভাবের জন্য রাহুল কিছু দুষ্টুমি করলে বুদ্ধ নিজে  তাঁকে কঠোরভাবে সুনিয়ন্ত্রিত করতেন। অম্বালায়িকা রাহুলোবাদ সুত্তে আছে একবার এক ভক্ত ভগবান বুদ্ধের দর্শনলাভের জন্য এলে রাহুল তাকে অসত্য বলেন। বুদ্ধ এই কথা শোনার পর রাহুলকে ডেকে পাঠান।  রাহুল মহানন্দে একটি জলভরা পাত্র এনে পিতার পা ধুইয়ে দিয়ে তাঁর পদপ্রান্তে বসে  পড়লেন। জীবনে অসত্য ভাষণ কিভাবে সমাজে বিনাশমূলক প্রভাব ফেলে বোঝাতে গিয়ে ভগবানবুদ্ধ সেই জলপূর্ণ পাত্রের উদাহরণ দিলেন।  বুদ্ধ বললেন"বৎস তুমি কি লক্ষ্য করেছ যে প্রক্ষালনের পর মাটিতে সামান্য জল এখনো পড়ে রয়েছে? এইরকমই ক্ষুদ্র তুচ্ছ একজন শ্রমণ যে অসত্য বলার পরেও কোন লজ্জাবোধ করে না।"
মাটিতে পড়ে থাকা জল মুছে দেওয়ার পর বুদ্ধ আবার বললেন" এক মিথ্যাবাদী শ্রমণকে এভাবেই সমাজ সরিয়ে দেয় যেভাবে জলকণাগুলিকে মুছে দেওয়া হল| বৎস লক্ষ্য করো কিছু জলকণা নিম্নমুখে পতিত হয়েছে। একজন মিথ্যাবাদী শ্রমণের শেষ পরিণতি ও তাই "ভগবান বুদ্ধের” এই হিতোপদেশ শুনে রাহুল উপলব্ধি  করলেন অসত্যবাদীতা কোনো শ্রমণকে বিশুদ্ধ করার পথে বৃহৎ প্রতিবন্ধক। নিজের আচরণের জন্য লজ্জিত হয়ে রাহুল নিজেকে সংশোধন করার কাজে ব্রতী হলেন। রাজপ্রাসাদের স্বাচ্ছন্দ্য আরামপ্রদ স্নেহময় জীবনের পরিবর্তে শুরু হলো বালকের এক কঠোর কঠিন তপস্যার জীবন।
রাহুলের দীক্ষা হয়েছিল সারিপুত্তের কাছে কিন্তু বুদ্ধ তাঁকে  প্রায় নিয়মিত প্রচুর হিতোপদেশ, ধর্মোপদেশ ও নীতিশিক্ষা দিয়েছিলেন। তাঁর আঠারো বয়স থেকে  বুদ্ধ রাহুলকে ধ্যানপ্রক্রিয়া শেখান। ধ্যানপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে  অন্তরকে দর্পণের মতো স্বচ্ছ করা কেন না পৃথিবীর কোনোকিছুই চিরস্থায়ী নয়। এইসব কঠোর অনুশীলনের মাধ্যমে রাহুল খুব অল্প বয়সেই বোধিজ্ঞান লাভ করেন। তাঁর অস্বাভাবিক ধৈর্যের ও কঠোর ভাবে ব্রক্ষ্মচর্য পালনের জন্য রাহুল সুবিদিত ছিলেন। পালি ভাষায় রচিত বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলি থেকে জানা যায় রাহুলের কঠোর শৃঙ্খলাবদ্ধতা  সমসাময়িক শ্রমণদের কাছে উদাহরণ ছিল। রাহুল যদিও তাঁর নিজের সন্তান তবুও ভগবান বুদ্ধ তাঁর প্রতি কোনো পক্ষপাতিত্ব দেখান নি। অনান্য শিষ্যদের মতো রাহুলের সাথেও তাঁর সম্পর্ক সহজ ও শিক্ষকতার ছিল। বুদ্ধ তাঁর দশজন প্রিয় শিষ্যদের মধ্যে রাহুলকে রেখেছিলেন। মহাসংঘিকা ট্রাডিশনের সুত্র অনুযায়ী ভগবান বুদ্ধের ইচ্ছা ছিল তাঁর এইসব প্রিয়শিষ্যরা দীর্ঘজীবি হয়ে বৌদ্ধধর্মের প্রচারে ও প্রসারনে এক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন যতদিন না আরো একজন বুদ্ধ অবর্তীণ হবেন। কুড়ি বৎসর বয়সে রাহুল নির্বাণ লাভ করেন। ভগবান বুদ্ধের বাণী প্রচারের জন্য তিনি বহু মঠ পরিদর্শন করেন। বৌদ্ধ দর্শনের অন্যতম প্রচারক হিসাবে রাহুল প্রসিদ্ধি লাভ করেন। রাহুলের প্রচেষ্টাতেই পরবর্তীকালে তাঁর মাতা যশোধরা বৌদ্ধ ভিক্ষু সঙ্ঘে  সন্ন্যাসিনী হয়ে যোগ দেন।
খুব অল্প বয়সে রাহুলের মৃত্যু হয়| ভগবান বুদ্ধ, সারিপুত্ত, বুদ্ধের অনান্য প্রিয় শিষ্যরা তখনো জীবিত। তাঁর মৃত্যুর কারণ সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানা যায় না। বৌদ্ধ ধর্মসূত্র অনুযায়ী রাহুলের মহাপরিনির্বাণ যুবক বয়সেই হয়েছিল। বহুপরে মৌর্য সম্রাট মহামতি অশোক রাহুলের স্মৃতিতে একটি বৌদ্ধ স্তুপ নির্মান করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানান। রাহুলের স্বল্প জীবন সম্বন্ধে সমসাময়িক ঐতিহাসিক সূত্রগুলি থেকে বিশদ ভাবে কিছুই জানা যায় না। শুধু একটি তথ্যই বারংবার প্রতিভাসিত হয়েছে যে একটি ছোট রাজশিশু কিভাবে কঠোর অনুশীলন ও আগ্রহের মাধ্যমে ভগবান বুদ্ধের অন্যতম বিশ্বস্ত ও প্রিয় শিষ্য হয়ে বৌদ্ধধর্মের প্রচারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছিলেন। পরবর্তীকালে বৌদ্ধ সঙ্ঘগুলি শিশু শ্রমণদের শিক্ষাদানকালে রাহুলের জীবনকে আদর্শ হিসাবে তুলে ধরেছিলেন। ইতিহাসের পাতায় প্রায় হারিয়ে যাওয়া  শ্রমণ রাহুলের অনন্যতা এখানেই।

 

নবনীতা চট্টোপাধ্যায়
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top