সিডনী শনিবার, ২৪শে জুলাই ২০২১, ৯ই শ্রাবণ ১৪২৮

বাঙালির জামাই ষষ্ঠীর সেকাল- একাল : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
১৬ জুন ২০২১ ১৫:১৭

আপডেট:
১৬ জুন ২০২১ ১৫:২৪

 

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, সেই পার্বণের শুভসূচনা ১লা বৈশাখে নববর্ষের দিন- চলে বছরের শেষ দিন চৈত্র সংক্রান্তি পর্যন্ত। আর এই পার্বণের মধ্যে অন্যতম দুই বাংলার মায়েদের পালন করা জামাই ষষ্ঠী। প্রত্যেক বছর জৈষ্ঠ্য বা আষাড়ের শুরুতেই বাঙালির ঘরে ঘরে পালিত হয় জামাই ষষ্ঠী মহাধুমধামের সঙ্গে। বাংলা প্রবাদে আছে, 'যম- জামাই- ভাগনা- কেউ নয় আপনা'। কারণ যম মানুষের মৃত্যু দূত। সেই সঙ্গে জামাই ও ভাগনা অন্যের বাড়ির উত্তরাধিকারী। তাদের নিজের বলে দাবি করা যায় না। তাদের খুশি করার জন্য মাঝে মধ্যে আদর- আপ্যায়নের মাধ্যমে খাওয়াতে হয়। এর পিছনে নারী মনের একটি মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার লুকিয়ে আছে। মেয়েদের মায়েরা মনে করেন- মেয়ে যাতে সুখে- শান্তিতে দাম্পত্যজীবন কাটিয়ে দিতে পারে, তার জন্য জৈষ্ঠ্য  মাসে নতুন জামাইকে আদর করে বাড়িতে ডেকে এনে আম- দুধ-মিষ্টি খাইয়ে পরিতৃপ্ত করা হয়। 

বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি ঘটলেও মানব মনের এই গভীর বিশ্বাসে ভাঁটা পড়েনি। এই  রেওয়াজ আজও চলে আসছে। বাঙালির চিরকালীন জামাই ষষ্ঠীর মধ্যে লোকায়ত মনস্তাত্ত্বিক ভাবনা লুকিয়ে আছে বলে মনে হয়।

যে কোন পরিবারেই জামাইয়ের একটা আবেগময় আলাদা সম্মান আছে। এপার বাংলা- ওপার বাংলা জুড়ে এই লোক উৎসব আজও চলে আসছে। বাংলাদেশের ৬৪ জেলা ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় জামাইষষ্ঠী মহাধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়। বাংলা প্রবাদ থেকে শুরু করে আধুনিক সাহিত্যে অনুষঙ্গ হিসেবে জামাইষষ্ঠীর কথা বারবার এসেছে। বাঁকুড়া জেলার একটি প্রবাদে আছে, "জামাইয়ের লগে মারে হাঁস, ঘরগুষ্টি খায় মাস"। 

মনে খরাখতে হবে, এখন বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর যে রাজনৈতিক সীমারেখা— যার একদিকে বাংলাদেশ, অন্য দিকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য, অবিভক্ত বাংলায় পূর্ববঙ্গ, পশ্চিমবঙ্গের সাংস্কৃতিক বিভাজনটি কিন্তু তার চেয়ে একটু অন্য রকম ছিল। পদ্মা নদী পার হলে শুরু হতো পূর্ববঙ্গ। ও পার বাংলায় ‘পুরান ঢাকা’ এবং চট্টগ্রামে মেয়ের বিয়ে পাকা হলে পাত্র এবং পাত্রীপক্ষ দু’তরফের থেকেই একে অন্যকে নিমন্ত্রণ করে জ্যৈষ্ঠ মাসে আম-দুধ খাওয়ানোর প্রচলন রয়েছে। বারোমাসির গানে রয়েছে জ্যৈষ্ঠ মাসে জামাইকে শ্বশুরবাড়িতে নিমন্ত্রণ করে আম-দুধ এবং অন্যান্য খাবার দিয়ে আপ্যায়ন করার কথা।

জামাইষষ্ঠীর উৎস সন্ধানে গেলে, বেশ কয়েকটি প্রশ্ন উঁকি মারছে আমাদের মধ্যে যেমন- গুপী গাইন ও বাঘা বাইনের কি জামাই ষষ্ঠী হত? তেমন কোনও ইঙ্গিত কি পাওয়া যায় সত্যজিৎ ও সন্দীপ রায়ের তিনটি ছবিতে? ‘হীরক রাজার দেশে’-তে বিরাট গৌরবের সঙ্গে নিজেদের পরিচয় ‘রাজার জামাই’ হিসেবে দিলেও, জামাই ষষ্ঠীর ব্যাপারে কিছু জানায়নি ভূতের রাজার প্রসাদপ্রাপ্ত এই গায়েন-বায়েন মানিকজোড়। কিন্তু আমরা কল্পনা করতেই পারি, শুণ্ডির রাজপ্রাসাদে দুই ভায়রা ভাইয়ের জামাই ষষ্ঠী ছিল প্রতি দিনের ব্যাপার। প্রথম ছবিতে যদিও গুপী আর বাঘা যথাক্রমে শুণ্ডি ও হাল্লার রাজার জামাই ছিল, দ্বিতীয় ছবিতে তাদের শুণ্ডির জামাই হিসেবেই দেখানো হয়েছিল। সে যাই হোক, কার্যত তারা দু’জনেই ‘রাজার জামাই’। বাংলার সংস্কৃতিতে জামাতাকে ‘জামাই রাজা’, 'জামাইদা' বলে ডাকা হয় না বটে, কিন্তু গুগাবাবা-র উদাহরণে ‘রাজার জামাই’ অতি চেনা লব্জ। ষষ্ঠী হোক বা না হোক, জামাই মানেই খাতিরের একশেষ— এই সার সত্য সব বাঙালিই জানে।

বাংলা সাহিত্যে জামাই ষষ্ঠীর তেমন রমরমা দেখা না গেলেও, অস্বীকার করার উপায় নেই, বাঙালির সংস্কৃতিতে জামাই ষষ্ঠী একটা রীতিমতো জমজমাটি ব্যাপার।

মনে রাখতে হবে, চলচ্চিত্রে বাঙালির জামাইয়ের আত্মপ্রকাশ ঘটেছিল 'জামাই ষষ্ঠীরই' নামক সিনেমার কল্যাণে। ১৯৩১ সালে তোলা হয় বাংলার প্রথম সবাক কাহিনিচিত্র ‘জামাই ষষ্ঠী’। পরিচালক ছিলেন অমর চৌধুরী। সেই ছবি দেখার সৌভাগ্য না হলেও অনুমান করা যায়, সে ছবি ছিল নির্ভেজাল কমেডি। সেকালের ছায়াছবির দস্তুর মোতাবেক তা তলিয়ে ভেবে দেখলে বোঝা যায়, জামাই ষষ্ঠী এমন এক পরব, যার খাতির রয়েছে, কিন্তু মান নেই। মানে, জামাই নামক সম্পর্কটাকে ধরে খাতিরদারি দেদার এই উৎসবের, কিন্তু বাজারে কেমন যেন একটা বাঁকা  নজরে দেখা হয় জামাই ষষ্ঠীকে। জামাইয়ের আদর আছে, কিন্তু জামাই ষষ্ঠী কেমন যেন একটা টিটকিরি-মাখা অ্যাফেয়ার। কিন্তু আদতে এই অনুষ্ঠানটির পিছনে ছিল সংসারের শুভকামনা আর পরবর্তী প্রজন্মের কল্যাণের আকাঙ্ক্ষা। ষষ্ঠীদেবীর উৎস লৌকিক। শাস্ত্র-পুরাণে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। লোকজীবনে সন্তান-কামনা ও সন্তানের সার্বিক শ্রী কামনা করেই তাঁর ব্রত ধারণ করে আসছেন যুগের পর যুগ ধরে  মহিলারা। জামাই ষষ্ঠী তার ব্যতিক্রম নয়। কন্যাসন্তানের সুবাদে পরিবারে আগত জামাতাকেও সন্তান হিসেবে বরণ করে নেওয়ার অভিজ্ঞান এই আচারের পরতে পরতে। সেই অনুষঙ্গেই খাওয়াদাওয়া। আরও একটা সামাজিক ব্যাপার এই আচারের মধ্যে নিহিত। সেটা এই পালন উপলক্ষে কন্যার পিতৃগৃহে আগমন। সেকালে মেয়েদের বাপের বাড়ি যাওয়া খুব নিয়মিত ছিল না। দূরে বিয়ে হলে তো কথাই নেই! কলকাতার বনেদি বাড়িগুলোয় বিশ শতকের প্রথমার্ধেও বউ আনা হত দূর থেকে। এর পিছনে একটা পুংতান্ত্রিক কলকাঠি কাজ করত অবশ্যই। বউ যাতে সহজে বাপের বাড়ি যেতে না পারে, তার বন্দোবস্ত আর কি! কিন্তু এহেন বজ্র আঁটুনির মাঝখানেই ষষ্ঠী ঠাকরুন খাপ পাততেন। জামাই ষষ্ঠী সেই পুংতন্ত্রকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মেয়েদের নিজস্ব এক আচার, যেখানে জামাইয়ের সঙ্গে মেয়ের আগমনটাও সুনিশ্চিত। আর বছরে ক’বারই বা জামাই আসেন শ্বশুরবাড়িতে! ফলে খাতিরদারি জমজমাট।

পুরনো প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ শুরু করতেই কেমন নস্ট্যালজিক হয়ে পড়লেন বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অরবিন্দ চট্টোপাধ্যায় ও। জানালেন, জামাই ষষ্ঠী শুধু জামাইয়ের জন্য নয়। সন্তানদের জন্যও পালিত হত এই অনুষ্ঠান। ‘‘মনে আছে, পূর্ববঙ্গে তালপাতার পাখা ভিজিয়ে বা কচি বাঁশপাতার গোছায় গঙ্গাজল দিয়ে মা সন্তানদের মাথায় ছিটে দিতেন। জামাই ষষ্ঠীর দিন বাড়ির ছেলেমেয়েদের নতুন জামাকাপড়ও হত। সব মিলিয়ে এটা ছিল সন্তানদের কল্যাণ কামনা করে পালিত এক আচার।’’

সমাজ-নৃতত্ত্বের এই সরল আখ্যানের সঙ্গে কী ভাবে কৌতুক জড়িয়ে পড়ল, সেটা অবশ্য ভেবে দেখার। ভারতীয় উপমহাদেশে জামাই নামক জীবটির উপরে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিটাই খানিকটা তেঁতুল মেশানো। এহেন অম্লরসের পিছনে কি রয়েছে জামাতাদের শ্বশুরবাড়ি ‘দোহন’-এর বিপরীতে দাঁড়িয়ে একটা প্রতিশোধ গ্রহণের প্রয়াস? পণপ্রথা, বধূ নির্যাতন, বিবিধ উপলক্ষ খাড়া করে শ্বশুরবাড়ি থেকে এটা-সেটা আহরণের উল্টো পিঠে জামাইকে নিয়ে পরিহাসের অছিলায় খানিক জাতে তোলা? হিন্দু বাঙালির বিয়ের লোকাচারগুলির মধ্যেই এই মনোবৃত্তির খানিকটা আঁচ পাওয়া যায়। সেই মনোবৃত্তির বাৎসরিক রিনিউয়ালই কি জামাই ষষ্ঠীর প্রতি এই বঙ্কিম চাহনি? এমনটা হওয়ার কথা নয়। কার্যত ১৯ শতকেও জামাই ষষ্ঠী নিয়ে রসিকতার তেমন খুব চল ছিল না বাংলায়। হুতোম তাঁর নকশায় চড়ক, মাহেশের জগন্নাথদেবের স্নানযাত্রা, বারোইয়ারি ইত্যাদি নিয়ে সরব হলেও জামাই ষষ্ঠী নিয়ে একেবারেই নীরব। কারণটা কী? দীনবন্ধু মিত্র ‘জামাই বারিক’ নামের প্রহসন লিখলেও জামাই ষষ্ঠী বিষয়ে উচ্চবাচ্য করেননি। পঞ্জিকায় প্রকাশিত বিজ্ঞাপনে ‘জামাই বদল’ বা ‘সাবাস জামাই বাবু’ নামের প্রহসনের নামও পাওয়া যাচ্ছে তা অসিত পাল মশাই তাঁর বিপুল শ্রমলব্ধ গবেষণা ‘আদি পঞ্জিকা দর্পণ’-এ দেখিয়েছেন। সে দিন থেকে হাল আমলের ‘শ্বশুরবাড়ি জিন্দাবাদ’ পর্যন্ত জামাই নামক এক আর্কিটাইপের বাড়বাড়ন্ত। এই আর্কিটাইপটির ভিতরে রয়েছে শ্যালিকা-মোহন, শ্যালক-রঞ্জন, শ্বশুর-শোষক, শাশুড়ি-তোষক একটা চরিত্র। যে বাস্তবে হয়তো হয়ই না। কিন্তু বাংলার আবহমানের কালেক্টিভ ইম্যাজিনেশনে সে-ই হিরো। জামাই ষষ্ঠী কি সেই হিরোপন্থী-কেই সেলিব্রেট করার উৎসব? না কি নিজেও জামাই বলে হুতোম বা দীনবন্ধু এড়িয়ে গিয়েছেন জামাই ষষ্ঠী নিয়ে রসিকতার গলতা?

জামাইষষ্ঠীর উৎসভূমির সন্ধানে:  জামাইষষ্ঠী আসলেই একটা চিরপরিচিত চালচিত্র আমাদের সামনে হাজির হয়। সময়ের হাত ধরে পরিবর্তন এসেছে, তবু শাশ্বত চিত্র হলো- হাঁড়ি হাতে ফিনফিনে সাদা মসলিনের পাঞ্জাবি আর মালকোচা মারা ধুতিতে শ্বশুরঘর আলো করা জামাই বাবাজি। পঞ্চব্যঞ্জনে সাজনো জামাইয়ের পাত। আম-কাঁঠাল, ইলিশের পেটি কিংবা কচি পাঠাঁর মাংস সহযোগে ভুরিভোজ৷ আর তার আগে জামাইকে পাখার হাওয়া আর শান্তি জলের ছিটা দেওয়া! এমনকী মা ষষ্ঠীর আশীর্বাদ বলে জামাইয়ের হাতে হলুদ মাখানো সুতো পরিয়ে দেওয়া! ‘জামাইষষ্ঠী’ বললেই যে ছবিটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে ৷ এতো তাই-ই৷ তবে, মা ষষ্ঠীর সঙ্গে জামাইয়ের সম্পর্কটা কী এ প্রশ্ন উঠতে পারে৷ মনের মাঝে উঁকি দিতে পারে এ সম্পর্কে শাস্ত্র কী বলছে?

 শাস্ত্রীয় ভাবনায় বিচার- বিশ্লেষণ: ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একসময় সংস্কার ছিল কন্যা যতদিন না পুত্রবতী হয় ততদিন কন্যার পিতা বা মাতা কন্যাগৃহে পদার্পণ করবেন না ৷ এই ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিল— সন্তানধারণে সমস্যা বা সন্তান মৃত্যুর (শিশুমৃত্যু) ফলে কন্যার পিতামাতাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হত কন্যার বাড়ি যাওয়ার জন্য৷ সেক্ষেত্রে বিবাহিত কন্যার মুখদর্শন কীভাবে ঘটে? তাই সমাজের বিধানদাতা জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা ষষ্ঠীকে বেছে নিলেন জামাই ষষ্ঠী হিসাবে ৷  

অনেক বাড়িতে জামাইষষ্ঠী পালনের রেওয়াজ নেই। বেশ পয়সাওলা বাড়িতেও দেখেছি এটা। অথচ তারা দশটা জামাইকে ডেকে তিন দিন খাওয়াতে পারে। 'কেন নেই আপনাদের এই পর্বটি'? জিজ্ঞেস করলে কোনও সুদূর অতীতে এই বিশেষ দিনে এক জীবনহানির গল্প বলেন অনেকে। পূর্ববঙ্গীয় অনেক বাড়িতে নাকি এদিন জামাইদের নিমন্ত্রণ করা হয় না। মেয়েকেই শুধু ডাকা হয়। এটা নিয়ে চিন্তা করতে করতে বছর পনেরো আগে জামাই শব্দের কাছাকাছি কী শব্দ আছে, সেটা দেখার জন্যে অশোক মুখোপাধ্যায়ের সমার্থ শব্দকোষ ঘাঁটতে শুরু করি। 'জামি' শব্দটি তদবধি আমার অজানা ছিল। অর্থ দেখলাম সধবা বধূ, কুলবধূ বা এয়োস্ত্রী। তা হলে কি আদতে অনুষ্ঠানটি 'জামিষষ্ঠী' বা 'জাময়ষষ্ঠী' ছিল? জামির বহুবচন জাময়ঃ। মূলত সন্তানলাভের জন্য মা ষষ্ঠীর ব্রত এটি। আগে নাম ছিল অরণ্যষষ্ঠী। বনে গিয়ে পাখার হাওয়ায় মা ষষ্ঠীকে তুষ্ট করা হত। ফলমূল আহার বিধেয় ছিল। এখনকার মত জামাই বাবাজীবনদের ভূরিভোজের আয়োজন হত না। মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চাপে প্রাচীন এই লোকাচারটি নাম বদলে জামাইষষ্ঠী রূপে দেখা দিল। শ্যালিকা সমভিব্যাহারে ভালোই খানাপিনা শুরু হল বাঙালির সুখী গৃহকোণে। এরও একটা কারণ আছে। দু'তিনশো বছর আগে পরিবহন বিহীন গ্রাম্য রাস্তায় বউ তো আর একা বাচ্চাকাচ্চাদের নিয়ে পিত্রালয়ে যেতে পারে না। সঙ্গে স্বামীটিকে বগলদাবা করে নিয়ে যেতেই হয়। বেচারা স্বামী তো আর 'আমার ব্রত নয়' বলে বাড়ি চলে আসতে পারে না! তাঁর লাগি খানাপিনার ব্যবস্থা করতেই হয়। অনেক ক্রোশ হেঁটেছেন। ভদ্রলোকের ছেলে বলে কথা। এইটাই আস্তে আস্তে রেওয়াজ হল। আমূল বদলে গেল কালচার-লোকাচারের ব্যাখ্যাটি। কেন অনেক বাড়িতে জামাইয়ের কদর নেই এই বিশেষ দিনটিতে,তা বুঝতে অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। 

জামাই আপ্যায়নের পরিবেশ ও পদক্ষেপ: শ্বশুড় বাড়ীতে পা দেওয়ার সাথে সাথে শুরু হয়ে যায় জামাই অভ্যর্থণার সকল আচার-অনুষ্ঠান। পথশ্রান্ত জামাতাকে বসবার জন্য নানা রঙ-বেরঙের নক্সাখচিত সবচেয়ে সুন্দর আসনখানি মাটিতে বিছিয়ে দেন, হাতপাখা্র শীতল বাতাসে বাবাজীর ঘামে ভেজা শরীরটিকে ঠান্ডা করেন, যত্নে তুলে রাখা শ্বেত পাথরের গেলাস ভরে ডাবের ঠান্ডা জল পান করতে দেন। এরপর ষষ্ঠীদেবীর আশীর্বাদপূর্ণ দূর্বা-বাঁশের কড়ুল, ধান, ফুল, করমচা দিয়ে বাঁধা ‘মুঠা’ জামাইবাবাজীর মাথায় ছুঁইয়ে ‘ষাট ষাট, বালাই ষাট’ করে স্নেহাশীর্বাদ করেন। আশীর্বাদ শেষে বিশাল বড় কাঁসার রেকাবী নাড়ু, মোয়া, পিঠে, সন্দেশ, মিষ্টি, ফল-মূলে সাজিয়ে খেতে দেন। জামাই ভোজের জন্য বিশাল আয়োজন করা হয়। পুকুরে জাল ফেলে সবচেয়ে বড় কাতলা মাছ তোলা হয়, মাছের আস্ত মুড়ো জামাই বাবাজীর পাতে তুলে দেন শাশুড়ি মা। ষোড়শ ব্যাঞ্জনে জামাইথালা সাজান, বড় জামবাটিতে কালো গাইয়ের ঘন ক্ষীরদুধ, গাছপাকা আম, কাঁঠাল, কলা তো থাকেই। ভোজনশেষে পান-সুপুরীর বাটা, শান্তিপুরী ধুতি, ফিনফিনে পাতলা আদ্দির কাপড়ে তৈরী পাঞ্জাবী, সাথে মানানসই চিকন সূতোয় বোনা দামী উত্তরীয়, কোলাপুরী চপ্পল দিয়ে ডালি সাজিয়ে শাশুড়ীমাতা জামাইবাবাজীকে আশীর্বাদ করেন, নিজ কন্যাটিকে সুখে শান্তিতে রাখার জন্য। সময়ের হাত ধরে পরিবর্তন এসেছে অনেক। জামাইষষ্ঠীতে একটা  বড় খরচ হয়। সব পরিবারের ইচ্ছা থাকলেও অর্থনৈতিক কারণে জামাইষষ্ঠী করতে পারে না।

পেশাগত দায়িত্ব ও দূরত্বের   জন্য অনেক সদ্য জামাইগণেরা, জামাইষষ্ঠীতে যোগদান করতে পারেন না। বর্তমানে অনেক পরিবারের সদস্যদের কাছে জামাইষষ্ঠী একটা সামাজিক স্ট্যাটাস,  

জামাইষষ্ঠীর দিনে বাঙালির সুজলাসুফলা গৃহে জামাইদের যে আদরযত্ন হবে এতে আশ্চর্যের কিছু নেই। নাদাপেটা জামাইদের নান্দনিক ভুবনে আগেকার দিনে শ্বশুরমশাইরা দরাজ হাতে খরচা করতেন। তখন তো আবার একটি দুটি নয়, পাঁচ-ছটি জামাইকে সামলাতে হত শাশুড়ি মায়েদের। ছোটটি যদি অভিমানী হয়, মেজটি তবে নির্ঘাত গোঁয়ার। সব দিক সামলানো কী চাট্টিখানি কথা! শ্যালিকারা হাতপাখা নিয়ে আর কপট ভ্রুভঙ্গি দিয়ে ভাগ্যিস ম্যানেজ করত বাবাজীবনদের ! না হলে কী যে অনাসৃষ্টি কাণ্ড হত কে জানে।

জ্যৈষ্ঠ মাসের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতে প্রতি ঘরে ঘরে যেন উৎসবের আমেজ। প্রাক বর্ষার ভ্যাপসা গরমকে তুচ্ছ করে লোডশেডিংয়ের চোখরাঙানিকে থোড়াই কেয়ার করে জামাইরা বউকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাবেই। এখানে হরিপদ কেরাণি থেকে এম এন সির  সি ই ও, কেউ বাদ যান না। মাগ্গিগণ্ডার বাজারেও শ্বশুর- শাশুড়ির তরফে যে আপ্যায়নের ত্রুটি থাকবে না, তা বলাই বাহুল্য। শ্যালক-শ্যালিকারা তো জামাইবাবু তথা জিজাজিদের কোনও রকম অযত্ন হতে দেবে না। কিন্তু এই জামাইষষ্ঠী অনুষ্ঠানটি ঠিক কতটা প্রাচীন, সে নিয়ে সংশয় আছেই।  কলকাতার  ভি,আই,পি জামাইয়ের জন্য একটু আলাদা ভাবনা থাকে  শাশুড়িঠাকরুনদেরব। কলকাতার বুকে গজিয়ে ওঠা জমকালো ঝাঁচকচকে রেস্তোঁরাগুলিতে এই বিশেষ দিনটিতে টেবিল পাওয়াই সমস্যা। যাঁরা ভাগ্যবান তাঁরা জামাইকে হরেকরকম পদ থরে থরে সাজিয়ে ভূরিভোজ করান। সঙ্গে নিজেদেরটাও সারেন। এই ব্যবস্থাটার একটা ভাল দিক হল, রান্নাঘরের ভ্যাপসা গরমে কাহিল হতে হয় না, পকেটে রেস্ত থাকলেই হল। মেয়েজামাইও খুশ। তবে শ্বশুরশাশুড়ির সঙ্গে একসাথে সুরাসাকির রস উপভোগ কেউ করেন কিনা তা আমার অন্তত জানা নেই।জামাই ষষ্ঠী হলে বউমা ষষ্ঠী নয় কেন, এই নিয়ে তর্ক চলতেই থাকবে। কিন্তু তা বলে কি জামাই ষষ্ঠীর কবজি ডুবিয়ে খাওয়া দাওয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারে! সব কিছুর সঙ্গে আপোশ করা যায়। কিন্তু কখনওই পেট পুজোর সঙ্গে আপোশ করা যায় না। তাই প্রতি বছরই জামাই ষষ্ঠী নিয়ে উত্তেজনাও থাকে তুঙ্গে। 

বছরের এই একটা দিন নিয়ে সংশয়ে পড়ে যান শ্বশুর শাশুড়িরা। তাঁদের মাথায় ঘুরতে থাকে কী দিলে জামাই বাবাজীবনের মুখে হাসি ফুটবে। আধুনিক কালের তেমনই কয়েকটি উপহারে হদিশ এখানে রইল- 

১) বই- এর চেয়ে ভাল উপহার আর কিছু হয় কি! তার উপরে জামাই যদি বইপোকা হন, তা হলে তো কথাই নেই। এই উপহার দিলে কখনও তা জলে যায় না। তাই বেশি না ভেবে জামাইকে বই উপহার দিন। তবে তার আগে মেয়ের থেকে জেনে নিন জামাইয়ের কোন বিষয় পছন্দ আর তাঁর সংগ্রহে কী কী বই নেই। 

২) জামাই লেখালেখি পছন্দ করলে তাঁকে সুন্দর কলম উপহার দিন, যেটি শার্ট বা পাঞ্জাবির পকেটে রাখলেও দেখতে সুন্দর লাগবে। এছাড়া এখন বাজারে নানা রকমের রং বেরঙের নোটবুক পাওয়া যায়। তেমন একটা নোটবুকও উপহার হিসেবে দিতে পারেন জামাইকে। 

৩) জামাইয়ের কি ছবি আঁকা বা গান বাজনা করার প্রতি বিশেষ শখ রয়েছে বা কলেজ জীবনে কি জামাই এসবের মধ্যে থাকতেন! তা হলে সেই স্মৃতিকে একটু চাগাড় দিন। ছবি আঁকতে ভালবাসলে তাঁকে উপহার দিন রঙ-তুলি বা ক্যানভাস। গান বাজনায় আগ্রহ রাখলে গিটার, উকুলেলে-র মতো বাদ্যযন্ত্র উপহার দিতে পারেন। 

৪) পোশাক সব সময়েই উপহার হিসেবে দেওয়া যায়। পাঞ্জাবি, টিশার্ট, শার্ট দিতে পারেন। এছাড়াও জামাই যদি ফ্যাশন সচেতন হন, তাঁকে নিয়ে গিয়ে শপিং করতে পারেন। শাশুড়ির বুটিক থাকলে নিজে হাতে বানানো পাঞ্জাবি দিন। 
 
৫) অফিস ব্যাগ, ল্যাপটপ ব্যাগ এগুলি জামাইদের জন্য যে প্রয়োজনীয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু চাইলে ট্রলি ব্যাগ ও জিম ব্যাগও উপহার হিসেবে দিতে পারেন। কাজে লাগবে। 

৬) জামাইকে গাছের চারা উপহার দিন। জামাইয়ের যদি গাছের ব্যাপারে আগ্রহ থাকে তা হলে তো কথাই নেই! বিভিন্ন রকমের ঘর সাজানো যায় এমন গাছ উপহার দিন। 

৭) আসবাব পত্র সব সময়েই কাজের। প্রয়োজনীয় আসবাব দিন। অথবা ঘর সাজানোর ল্যাম্প ইত্যাদি  দিতে পারেন। 

৮) উপহার হিসেবে অন্যতম হল ঘড়ি। কারোকে ঘড়ি উপহার দেওয়ার অর্থই হল তাঁকে সময় উপহার দেওয়া। আর সময়ের চেয়ে মূল্যবান আর কী আছে।

৯) জামাই বাবাজীবন কি বেড়াতে ভালবাসেন! তা হলে তাঁকে ছুটি কাটানোর জন্য বিমানের টিকিট কেটে হোটেল বুক করে দিন। 

১০) শ্বশুর বা শাশুড়ি যদি সৃজনশীল হন, নিজে হাতে আঁকা পেন্টিং উপহার দিন। নিজে হাতে বানানো জিনিস সব সময়েই দামী। 

শেষকথা, বিগত বছরে করোনার আবহে বাঙালির জামাইষষ্ঠী পালনে অনেক খানি ভাঁটা পড়েছিল। ইতিমধ্যেই করোনার দ্বিতীয় ভয়ঙ্কর ঢেউ আছড়ে পড়ছে বাংলায়। ইয়াসের তাণ্ডব লীলায় লণ্ডভণ্ড বাংলা। দুর্যোগ কেটেছে কিন্তু দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে আপামর বাঙালিকে। দীর্ঘদিন ধরে চলছে লকভাউনের বাধানিষেধ। একটা টালমাটাল সময়ে জামাইষষ্ঠী পালিত হবে কিনা? এ-বছরটা ইয়াস আর করোনা তো গ্রাস করেছে গোটা বাংলাকে। তাহলে বাঙালির জামাইষষ্ঠীর কি হবে? এই প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে আমাদের মধ্যে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে জামাইষষ্ঠীর মত বিভিন্ন উৎসব ও পার্বণপালন শুধুমাত্র  নিয়মরক্ষার খাতিরে। চারদিকের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। চরম সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে আমরা। আমজনতার মনও মেজাজ ভালো নেই। আপামর বাঙালি এই মুহূর্তে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছে সব যেন আবার আগের মতো হয়ে যায়। সবাই যেন ভালো থাকেন। ছন্দে ফিরুক সাধারণ মানুষের জীবন।   

তথ্যসূত্র: বিভিন্ন পত্রিকা ও আনন্দবাজার পত্রিকার আর্কাইভ।

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
লোক গবেষক, প্রাবন্ধিক, রম্যরচনা, ফিচার, অণুগল্প ও ছোটগল্প এবং ভ্রমণকাহিনীর লেখক
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top