সিডনী বৃহঃস্পতিবার, ১৬ই সেপ্টেম্বর ২০২১, ১লা আশ্বিন ১৪২৮

জন্মতিথিতে পথের পাঁচালীর অমর স্রষ্টা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১১:৪১

আপডেট:
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৭:৫৫

ছবিঃ বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

 

বাংলা কথাসাহিত্যে তথা বিশেষ করে উপন্যাসে জনপ্রিয়তার শীর্ষবিন্দু স্পর্শকারীদের মধ্যে ঔপন্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অন্যতম। 'পথের পাঁচালী' (১৯২৯) নিয়ে উপন্যাস ভুবনে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ ঘটে। গ্রামীণ জীবনের অসামান্য রূপকার, প্রান্তিক মানুষের কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদিপ্রাণের আধুনিক বন্দনাকার। তিনি নিসর্গ চেতনার বাতিঘর। আজীবন তুচ্ছের মধ্যে অমৃতের সন্ধানে করে গেছেন। বাংলা কথাসাহিত্যে মে মানব জীবন সৃষ্টি করেছিলেন তার সারল্যে অসাধারণ। সনাতন গ্রাম বাংলার জনজীবনের চিরায়ত ছবি এঁকেছেন নিপুণ, দক্ষ শিল্প কুশলতায়। গ্রামীণ জীবনের শান্ত, সহজ, সরল, স্নিগ্ধ ও বিশ্বস্ত ছবি ফুটে ওঠে তাঁর নিরাসক্ত কথকতা ও বয়ানে। মায়া -চুম্বকের মতোটেনে নেয় পাঠককে। তার অমর সৃষ্টি 'পথের পাচালী', 'আরণ্যক', 'অপরাজিত,' ও 'ইছামতি'।সত্যজিৎ রায়ের হাতে সমগ্র বিশ্ব সাহিত্যে অমরত্ব পেয়েছে কালজয়ী উপন্যাস 'পথের পাঁচালী'। বিভূতিভূষণের অস্তিত্ব জুড়ে আমৃত্যু-- প্রথম আবির্ভাবের পর থেকে শ্রীমান অপু বিরাজিত। মানুষের মহান কথাকারের প্রয়াণ দিবসে তাঁর সৃষ্টির প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর মৃত্যু হয়েগেল ৭০ বছর। তাঁর পুত্রের তারাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের দু'পুত্র বর্তমানে জীবিত। এরা কেউ সেভাবে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে কাছে পাওয়ার সুযোগ হয়নি। বসিরহাটের বসতভিটেতে আজ আর কেউ থাকেন না। সবাই কোলকাতায়। একমাত্র দুরসম্পর্কের আত্মীয় স্বজন থাকেন বসিরহাটের ইছামতীর তীরে অবস্থিত বিভূতিভূষণের বসতভিটে পানিতর গ্রামে। শুধু স্মৃতি নিয়ে পানিতর আজো দাঁড়িয়ে আছে। বহু ইতিহাসের নীরব সাক্ষী এই পানিতর গ্রাম। ভারত -বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত এই পানিতর। এক মায়াবী পরিবেশে আগের মতোই তাঁর প্রিয় ইছামতি নদী বয়ে চলেছে। বুকে শুধুই হলুদ স্মৃতি। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবিত উত্তরসূরিদের আত্মকথনে বেশ কিছু তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলো থেকে তাঁর উত্তরসূরীদের ভাবনার একটা ইতিহাস তৈরি করা যেতে পারে। ভাবনা এই রকমের “দাদুকে তো আমরা দেখিনি। বাবাও সেভাবে পাননি তাঁকে। বাবার যখন মাত্র ৩ বছর বয়স, তখন হঠাৎই চলে গেলেন দাদু। ৩ বছরের একটা ছেলের স্মৃতিতে আর কতটুকুই বা থাকবে? তবে এই শারীরিক অনুপস্থিতিটাই একটা অন্য ধরনের উপস্থিতি হয়ে উঠেছিল। না পাওয়া থেকেই আমরা সবসময় খুঁজেছি মানুষটাকে।” বলছিলেন তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায়। আজ বিভূতিভূষণের মৃত্যুর ৭০ বছর পরেও পরিবারটা তাঁরই। তিনি থেকে গিয়েছেন গল্পে এবং স্মৃতিতে।
“ঠাকুমাকে অবশ্য আমরা অনেকদিন পর্যন্ত পেয়েছি। তাঁর স্মৃতিও দুর্বল হয়নি। দাদুর নানা স্মৃতি আঁকড়েই বেঁচে ছিলেন শেষ পর্যন্ত।” ছোটোবেলা থেকেই তৃণাঙ্কুরবাবু দেখতেন বিভূতিভূষণের কথা বলতে বলতে কেঁদে ফেলছেন রমা দেবী। তবে ছোটো থেকে এই পরিচয়টা নিয়ে খুব একটা স্বস্তি বোধ করতেন না তৃণাঙ্কুরবাবু। এটাকে বলার মতো একটা পরিচয় বলেও মনে করতেন না। “বিভূতিভূষণের নাতি শুনলেই সবাই বলত, তাহলে তো দাদুর সব লেখা তোমার পড়া। একটা ক্লাস ফাইভের ছেলেকে এমন প্রশ্ন করলে তো রাগ হবেই। আর দাদুর সব লেখা কি ছোটোদের পড়তে ভালো লাগে? নাকি ছোটোদের জন্য সেসব লেখা লিখেছিলেন তিনি? হ্যাঁ ‘চাঁদের পাহাড়’, ‘মিসমিদের কবচ’ এইসব বইগুলো নিশ্চই পড়া ছিল। কিন্তু ওই পর্যন্তই। এরপর কেউ দাদুর লেখা পড়তে বললেই না বলতাম। একটা রেসিস্টেন্স জন্ম নিয়েছিল।”
নিজের জীবনের এগিয়ে চলার পথে যেন বারবার বিভূতিভূষণের প্রভাব বুঝতে পেরেছেন তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নানা বিষয় সম্পর্কে জানার আগ্রহটা যেন পরিবারের সংস্কৃতির মধ্যে প্রোথিত হয়ে গিয়েছিল। “ঠাকুমাকে দেখতাম, স্বল্পশিক্ষিতা একজন বৃদ্ধা আশেপাশের সমস্ত গাছের নাম, বিজ্ঞানসম্মত নাম, তাদের পরিচয় সব বলে দিতে পারতেন। এখন তো ইন্টারনেটের দৌলতে কোনোকিছু জানা অতি সহজ। তখন তো তেমন ছিল না। কিন্তু আমাদের দুই ভাইয়েরই কোনোকিছু জানতে অসুবিধা হয়নি কখনও। আর জানতে জানতেই তো জানার আগ্রহও তৈরি হয়।”
বিভূতিভূষণের নাতি বলেই লিখতে হবে, এমনটা মনে হয়নি তাঁর। নিজের তাগিদেই এগিয়ে এসেছেন সাহিত্যের জগতে। তবে তাঁর আরও একটা পরিচয়, তিনি অলঙ্করণ শিল্পী। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, মহাশ্বেতা দেবীর মতো নানা সাহিত্যিকের বই অলঙ্করণ করেছেন তিনি। এমনকি বিভূতিভূষণের ‘চাঁদের পাহাড়’ উপন্যাসের একটি ইংরেজি অনুবাদও অলঙ্করণ করেছেন তিনি। নিজের ঠাকুরদার বই অলঙ্করণ করতে গিয়ে কোনো বাড়তি চাপ কি নিতে হয়নি? “অবশ্যই আলাদা চাপ পড়েছে। একে তো দাদুর বই, অলঙ্করণ খারাপ হলে লোকে বলবে কী! তার উপর আবার আসল বাংলা বইটার অলঙ্করণ করেছিলেন স্বয়ং সত্যজিৎ রায়। তাঁর মতো শিল্পীর কাজের অনুকরণ কী সম্ভব? তবে আমি তাঁর আঁকার ধরণকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলেছি। শংকরকে কাছ থেকে আঁকার চেষ্টাই করিনি। সব মিলিয়ে কাজটা খুব একটা খারাপ লাগেনি আমার। এখন আবার সুযোগ পেলে হয়তো আরও ভালোভাবে করতে পারব। কিন্তু অন্যান্য ইংরেজি অনুবাদহুলির অলঙ্করন এত খারাপ, তার তুলনায় আমারটা চলে যায়।” বললেন তিনি।
আজ এত বছর পর ঠাকুরদার সাহিত্য নিয়েই কাজ করতে চাইছেন তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায়। মানুষের কাছে তাঁর কাজকে আর্কাইভ করে তুলতে চান তিনি। “এটা কিন্তু এসেছে সাহিত্য পড়তে পড়তেই। অন্যান্য সাহিত্যিকদের লেখা পড়তে পড়তেই পড়েছি দাদুর লেখাও। আগে বিভূতিভূষণের লেখা পড়ে ফেলতে হবে, এমনটা মনে হয়নি কখনোই। তবে ওই যে, বিভূতিভূষণ শতবার্ষিকীতে বাবাকে যেমন দেখতাম নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে দাদুর কাজের প্রদর্শনী করতে, সেই দায়িত্বটা তো এখনও থেকে যায়। এখন অবশ্য আর নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্রদর্শনী করার দরকার হবে না। ইন্টারনেটের দৌলতে সবার কাছে পৌঁছনো তো অনেক সহজ।” ইতিমধ্যে সেই কাজ শুরুও করে দিয়েছেন। সেপ্টেম্বর মাসে অমর সাহিত্যিকের জন্মদিবসকে মাথায় রেখেই বেশ কিছু ওয়েবিনারের আয়োজন করেছেন। প্রতিটি অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেছেন তিনি নিজে। ভবিষ্যতে সেই কাজটাই আরও বড়ো স্তরে এগিয়ে নিয়ে যেতে চান তিনি।
বিভূতিভূষণ তো আপামর বাঙালির সম্পত্তি। হয়তো তাঁর লেখা নানান বিষয়ে ঘোরাফেরা করেনি, কিন্তু পল্লীগ্রামের যে ছবি তিনি এঁকেছেন তা আজও পাঠককে মুগ্ধ করে। বিষয়বস্তু একমুখী হওয়ার জন্য অবশ্য কথা শুনতে হয়েছিল সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকেও। কালিদাস রায় তখন বলেছিলেন, “…তুমি (বিভূতিভূষণ) দেবীর (সরস্বতীর) নাকছাবিতে যে হিরে বসিয়েছ, তা দেবীর সারা অঙ্গের গয়নার জৌলুসকে ছাপিয়ে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।” সেই উজ্জ্বলতার প্রভাটুকুর সন্ধানই দিয়ে যেতে চান তৃণাঙ্কুর বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর সমগ্র কাজের মধ্যে দিয়ে...
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর সাহিত্য কৃতির স্হায়িত্ব নিয়ে একটা সময়ে গভীর ভাবনায় পড়েছিলেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের একান্ত নিভৃতে এক আলোচনায় তা আমরা জানতে পারি। দুজনের সাক্ষাতে 'তারাশঙ্কর বললেন-- বিভূতি, তুমি কিন্তু একটা ভুল করে। তুমি তোমার গণ্ডি ছে বেরিয়ে আসতে পারেনা। দেখছ না আমাদের সমাজে কত পরিবর্তন ঘটে গেল।দাঙ্গা,মন্বন্তর অতবড় একটা যুদ্ধের আঁচ তো আমাদের গায়েও কম লাগেনি, তার ফলে রাতারাতি সমাজের চেহারাটাই পাল্টে, জীবনের মূল্যবোধ কী ভাবে বদলে যাচ্ছে তার কি তুমি বুঝতে পারছ না? যে বিশ্বাস নিয়ে আমরা বড় হয়েছি, সে --বিশ্বাস আজ কী ভাবে ভেঙে পড়েছে সে তো তুমি তোমার চারপাশে দেখতে পাচ্ছ। তোমার কি উচিৎ নয় তোমার সাহিত্যে এসব কথা তুলে ধরা? এই কথা শোনা মাত্র বিভূতিভূষণ অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তারাশঙ্কের মুখের দিকে তাকিয়ে বিভূতিভূষণ বললেন---' তুমি কী বলতে চাইছ তারাশঙ্কর। আমি মা লিখছি তা হলে সেগুলি কি কিছুই হচ্ছে না।' -উত্তরে তারাশঙ্কর বাবু বললেন আমি তো তা বলতে চাইছি না বিভূতি। আমি বলতে চাইছি তোমার সাহিত্যে তুমি এখনো সেই গ্রাম আর নদী। সাঁই--বাবলা জঙ্গল আর অরণ্য এই নিয়ে পড়ে আছে।এর থেকে তো তোমার বৃহত্তর পটভূমিকায় বেরিয়ে আসতে হবে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই ধরনের কথা বলার অধিকার ছিল,কারণ তাঁর সঙ্গে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের গভীর সম্পর্ক ছিল। তাছাড়া সেই সময় তারাশঙ্কর খ্যাতির শীর্ষে বিরাজমান।
বাংলা কথাসাহিত্যে ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। 'হাসুলী বাঁকের উপকথা', 'মন্বন্তর', 'গনদেবতা' উপন্যাতারা শঙ্করবাবু বললেন― দেখো বিভূতি, তুমি কিন্তু একটা ভুল করছ। তুমি তোমার গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারছ না। দেখছ না আমাদের সমাজে কত পরিবর্তন ঘটে গেল। দাঙ্গা, মন্বন্তর, অতবড় এক যুদ্ধের আঁচ তো আমাদের গায়েও কম লাগেনি, যার ফলে রাতারাতি সমাজের চেহারাটাই দিল পালটে, জীবনের মূল্যবোধ কীভাবে বদলে যাচ্ছে তা কি তুমি বুঝতে পারছ না? যে-বিশ্বাস নিয়ে আমরা বড় হয়েছি, সে-বিশ্বাস আজ কীভাবে ভেঙে পড়ছে সে তো তুমি তোমার চারপাশে দেখতেই পাচ্ছ। তোমার কি উচিত নয় তোমার সাহিত্যে এসব কথা তুলে ধরা।
অবাক হয়ে ফ্যালফ্যাল করে তারাশঙ্করের মুখের দিকে তাকিয়ে বিভূতিবাবু বললেন― তুমি কী বলতে চাইছ তারাশঙ্কর। আমি যা লিখেছি তা হলে সেগুলি কি কিছুই হচ্ছে না?
আমি তা বলতে চাইছি না বিভূতি। আমি বলতে চাইছি তোমার সাহিত্যে তুমি এখনো সেই গ্রাম আর নদী, সাঁই-বাবলার জঙ্গল আর অরণ্য, এই নিয়ে পড়ে আছ। এর থেকে তো তোমায় বৃহত্তর পটভূমিকায় বেরিয়ে আসতেই হবে।
তারাশঙ্করবাবুর অবশ্য এ কথা বলবার অধিকার আছে। উনি তখন খ্যাতির তুঙ্গে। হাঁসুলীবাঁকের উপকথা, মন্বন্তর, গণদেবতা বই তখন অভাবনীয় জনপ্রিয়তা লাভ করেছে, ওঁর বইয়ের কাটতি তখন যে-কোনও সাহিত্যিকের কাছে ঈর্ষার কারণ। বিভূতিবাবু কিন্তু তারাশঙ্করবাবুর যুক্তি মেনে নিতে পারলেন না। বললেন― আমি কোন বড় ঘটনায় বিশ্বাসী নই, দৈনন্দিন ছোটখাটো সুখ-দুঃখের মধ্য দিয়ে যে জীবনধারা ক্ষুদ্র গ্রাম্য নদীর মত মন্থর বেগে অথচ পরিপূর্ণ বিশ্বাসের ও আনন্দের সঙ্গে বয়ে চলেছে― আসল জিনিসটা সেখানেই। আমি আমার গ্রামের চারপাশের প্রকৃতি আর মানুষদের মধ্যে এই জীবনটাই দেখি― বুঝি। আমার কথা তাদের নিয়েই। কোনও কৃত্রিম প্লট সাজানো, কৃত্রিম সিচুয়েশন তৈরি করা― আমি জানি না। সেই জন্যেই বোধহয় আমার কিছু হল না।
তারাশঙ্করবাবু সান্ত্বনা দেবার সুরে বললেন― না বিভূতিভূষণ, তোমার মধ্যে বিরাট সম্ভাবনা আছে। শুধু যুগের সঙ্গে, কালের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে হবে। তা যদি না পারো পিছিয়ে পড়বে তুমি।
আলোচনা যখন এই খাতে অনেকদূর গড়িয়েছে হঠাৎ বিভূতিবাবুর মনে সংশয় দেখা দিল। তা হলে আমি যা লিখছি তা কি সবই ভুল? ছবি মুছে যাবে?
এই বিরাট প্রশ্নটা মনে নিয়ে তারাশঙ্করবাবুর বাড়ি থেকে তৎক্ষণাৎ বেরিয়ে পড়লেন বিভূতিবাবু। সোজা চলে গেলেন টালিগঞ্জে। চারু অ্যাভেনিউতে থাকেন কালিদাস রায়। যাঁর সাহিত্যিক বিচারবোধের উপর বিভূতিবাবুর অসীম শ্রদ্ধা।
সৌভাগ্যের বিষয় কালিদাসদা সেদিন বাড়িতেই ছিলেন। উত্তেজিত বিভূতিবাবুকে দেখেই কালিদাসবাবু বললেন― কি হে বিভূতি, আবার কী হল? হঠাৎ এ-সময়ে আমার কাছে?
তারাশঙ্করবাবুর সঙ্গে তার যে আলোচনা হয়েছে তার সবিস্তারে কালিদাসদার কাছে পেশ করার পর বললেন― আচ্ছা দাদা, আপনিই বলুন, আমি কি ভুল পথে চলেছি? আমার লেখা কি সত্যিই মুছে যাবে?
কালিদাসদা স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ চিন্তান্বিত বিভূতিভূষণের অসহায় মুখের দিকে চেয়ে রইলেন। পরে ধীরকণ্ঠে দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন― শোনো বিভূতিভূষণ, দেবী সরস্বতীকে তারাশঙ্কর গা-ভরা সোনার গয়না দিয়ে যতই সাজাক, তুমি দেবীর নাকের নাকছাবিতে যে হিরে বসিয়েছ তা দেবীর সারা অঙ্গের গয়নার জলুসকে ছাপিয়ে চিরকাল উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। তুমি যে-পথে চলেছ সেইটিই ঠিক পথ― সেইটিই তোমার ধর্ম। কখনও ধর্মচ্যুত হয়ো না।
যে প্রশ্ন এতক্ষণ বিভূতিবাবুর মনকে আলোড়িত করে চলেছিল, কালিদাসদার এই কথায় তার উত্তর পেয়ে প্রশান্তিতে মন ভরে উঠল। সহসা চেয়ার থেকে উঠে কালিদাসদার পা ছুঁয়ে প্রণাম করে বললেন― চলি দাদা, আমার প্রশ্নের উত্তর আমি পেয়ে গেছি। আসলে একজনবড় মাপের জীবন শিল্পী, প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষ কখনো নিজের জীবনদর্শনের বাইরে গিয়ে কোন রকম সমঝোতা করতে পারেন না। আজীবন তিনি সেই মূল্যবোধ নিয়ে সৃষ্টি করে চলেছিলেন বর্ণময় সাহিত্য। মনের ভাবনার বিরুদ্ধে তিনি হাঁটেন নি। এ- যেন এক সাহিত্য সাধক নীরবে-নিভৃতে প্রকৃতি আর মানুষের জীবন সাধনা করে গেছেন আমৃত্যু। তাই কালগর্ভে কোনদিন হারিয়ে যাবেনা তার সাহিত্য সৃষ্টি।সময় ও মুখের এবং মানসিকতার পরিবর্তন সত্ত্বেও এই সময়ে তিনি সমান ভাবে প্রাসঙ্গিক। তাঁর চিরায়ত সাহিত্য চিরদিন আমাদের জীবন পথের পাথেয়। মৃত্যুর৭০বছরের পরও তাঁর গল্প, উপন্যাস পাঠককে গভীর আকর্ষণ করে চলেছে। বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় শুধু নয় তাঁর সাহিত্যের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ আমাদের এক আকাশ অহংকার। তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে তাঁর দুই নাতনি তাঁর সাহিত্য কৃতিকে আর ছড়িয়ে দিতে উদ্যোগী হবেন। তিনি সমকাল দ্বারা বন্দিত এবং ভাবী কাল দ্বারা বন্দিত কথাসাহিত্যেক। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি কর্মের মধ্যে।প্রয়াণ দিবসে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি বাঙালির প্রাণের মানুষ, মনের মানুষ হয়ে থাকবেন চিরদিন।

শেষকথাঃ
তাঁর জন্মদিনে তাঁর চরণে শতকোটি প্রণাম। প্রকৃতি প্রেমিক অসাধারণ কথাশিল্পী বিভূতিভূষণ সমগ্র বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। ৫ই নভেম্বর ১৯৫০ তারিখের আনন্দবাজার পত্রিকার কলমে শ্রী কমলাকান্ত শর্মা রূপী প্রমথনাথ বিশি মহাশয় একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিখেছিলেন, যা আজও গভীর ভাবে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়েছে--- "অনেকের হৃদয়ে সদর দরজা, খিড়কি দরজা নামক দুটি দ্বার আছে। কিন্তু বিভূতিভূষণের হৃদয়ে সদর খিড়কি র ভেদ ছিল না। সকলের জন্য একটি দ্বার উন্মুক্ত ছিল। তাই তাঁহার বন্ধুর সংখ্যাও যেমন ছিল অনেক, বৈচিত্র্যও ছিল অদ্ভুত। বিভূতিভূষণের হৃদয় ছিল বন্ধুত্বের আম দরবার, সেখানে উচ্চ নিচ ভেদে আসন ছিল না, সকলের জন্যই এক প্রশস্ত ফরাস পাতা ছিল, তিনি নিজেও সেই ফরাসের একান্তে উপবিষ্ট থাকিতেন। তাঁহার হৃদয়ে প্রবেশ করা যেমন সহজ ছিল বাহির হইয়া আসা ছিল তেমন কঠিন। বিভূতিভূষণের সহিত বন্ধুত্ব ছিন্ন হইয়াছে, এমন একটিও দৃষ্টান্ত মিলিবে না।" আসলে জীবনভর যে সব মানুষের সাথে তাঁর ভাব বিনিময় আর যে ভাব বিনিময় তাঁর আখ্যান সকলের অন্যতম পাথেয় তাঁদের অবিরাম ঘোরাফেরা আমরা পাই তাঁর প্রায় প্রতি লেখার ছত্রে ছত্রে। বহু ভ্রমনের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় নিয়ে আরো ভ্ৰমনের পিপাসা অন্তরে নিয়ে দিনলিপিতে তিনি লেখেন দেশ বেড়িয়ে যদি মানুষ না দেখলুম তবে কি দেখতে বেরিয়েছি?"
জীবন ও প্রকৃতির রহস্যময় মাযাবৃত্তের কেন্দ্রে মানুষের জয় পরাজয়কে অসীম নির্লিপ্ততায় নিরীক্ষণ করাই তাঁর রচনা শৈলীর দর্শন, চরমতম পার্থিব দারিদ্র্যের মাঝেও তাঁর রচনায় প্রতিভাত হয় প্রকৃতির অপার্থিব নৈসর্গিক সৌন্দর্য এর মনিমুক্তা ভরা ভান্ডার ও জীবন পথের বাঁকে বাঁকে জীবন যুদ্ধ জয়ের এক সংগ্রামী সংকেত। তাঁর প্রতি রচনায় বলা হয়েছে অনাবিল প্রকৃতি সৌন্দর্য্যের কথা, দৈনন্দিন সুখ দুঃখ আনন্দ বেদনা আশা হতাশা নিয়ে জীবনের নান্দনিকতার আস্বাদ নিতে আগ্রহী মানুষের এগিয়ে চলার কাহিনী। তিনি আমাদের মুগ্ধ করেন বিস্মিত করেন ভাবিয়ে তোলেন আবার অভিভূত করেন। তাই সেই অপরাজেয় কথাশিল্পীকে তাঁর জন্মদিনে প্রণাম জানাতে পেরে আমরাও ধন্য হই।

তথ্যসূত্রঃ (১) হীরের নাকছাবি--সাগরময় ঘোষ, (২) বিভিন্ন পত্রিকা, (৩) বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন ও সাহিত্য।

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
লোক গবেষক, প্রাবন্ধিক, অণুগল্প ও ছোটগল্পের এবং ভ্রমণকাহিনীর লেখক।
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top