সিডনী শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর ২০২১, ৬ই কার্তিক ১৪২৮

অধিকার : শাহানারা পারভীন শিখা


প্রকাশিত:
১২ অক্টোবর ২০২১ ১৫:১২

আপডেট:
২২ অক্টোবর ২০২১ ০৫:৪৪

 

আমার মায়ের বাড়ির কাছেই আঠার উনিশ বছরের একটা ছেলে হঠাৎ করে হিজড়া হয়ে গেছে। খবর রোটে যায় ক্যানাল পাড়ায়। দলে দলে সবাই দেখতে আসে ওকে। চেহারায় মেয়েলি ধাচের ।মাহবুব থেকে ও এখন মাহবুবা। খবর পেয়ে ছুটে আসে হিজড়ার দল। নিয়ে যায় মায়ের বুক থেকে কেড়ে। নাম এবং পোশাক পাল্টে সে এখন বিভিন্ন দোকান, বাজারে ঘুরে ঘুরে তালি বাজিয়ে টাকা উঠায়ে বেড়ায়।
শারীরিক অসুস্থতার জন্য আম্মাকে প্রায় ঢাকা থাকতে হোত তখন। সেবার বেশ কয়েকমাস দেরি করে নিজের বাড়ি ফিরেছিলেন।
এক বিকেলে তিনি ক্যানাল পাড় ধরে হাঁটছিলেন। ক্যানালের ধারে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা গরীব মানুষগুলোর সাথে সখ্যতা একটু বেশি ই ছিল। আমার আম্মা তাদের কাছে দরদী মা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সবাই কে সারাবছর ধরে সাহায্য সহযোগিতা করতেন।
বহুদিন বাদে দেখা বলে উনি সবার কুশলাদি জিজ্ঞেস করতে করতে যাচ্ছিলেন। পরিচিত একটা ঘর থেকে লম্বা চওড়া একটা মেয়েকে বের হতে দেখেন। অদ্ভুত বেশ ভুষা।উৎকট সাজ। তবে মুখটা কেমন চেনা মনে হচ্ছিল উনার। মেয়েটা আম্মার কাছে এসে বেশ লজ্জা মাখা কন্ঠে বলে, নানী কেমন আছেন? আমাকে চিনছেন না? আমি মাহাবুব।
- তা মেয়েদের মতো এমন সাজছিস কেন?
-নানি! আমি এখন হিজড়া হয়ে গেছি। আমি এখানে আর থাকি না। আমার নাম এখন মাহবুবা। ওরা খবর জানার পর আমাকে এখান থেকে জোর করে নিয়ে যায়। যেদিন মা বোনরে খুব দেখতে ইচ্ছে করে সেদিন এসে দেখে যায়।
দুরে মাহবুবের মাকে আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদতে দেখেন আম্মা। জলভরা চোখে মাহবুবা ফিরে যায় ওর বর্তমান ঠিকানায়। নিজের ঘরবাড়ি বাবা মা কে ছেড়ে থাকতে মাহবুবার যে ভীষণ কষ্ট হয় সেটা ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছিল। আম্মা সহজ সরল মানুষ। প্রকৃতির জটিল খেলা এতোটা ঠিক না বুঝলেও বুঝেছিলেন ওই ছেলেটার ব্যাথা।
কিছুদিন আগেও যারা ওর কাছের বন্ধু ছিল। আজ তারাই ওকে দেখলে এড়িয়ে যায়।
ঘটনাটা আম্মার কাছে শুনে খুব খারাপ লেগেছিল তখন।
গতকাল একটা প্রয়োজনে গুলশানে যেতে হলো। মহাখালী ফ্লাইওভারের নীচ দিয়ে যাওয়া আসার পথে অনেক বেশি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ চোখে পড়লো। বিচিত্র অঙ্গ ভঙ্গি করে বিভিন্ন গাড়ির কাছে যেয়ে হাত পাতছে।
ওদের দেখে সবাই জানালার গ্লাস তুলে দিচ্ছে দেখলাম। ড্রাইভার বললো এই এলাকায় এদের নাকি ইদানীং খুব বেশি পরিমানে দেখা যাচ্ছে। গাড়ি সিগনালের কারণে বেশ আস্তে আস্তে চলছে।
আমি ওদের দিকে তাকিয়ে ওদের কে লক্ষ্য করি।
সবাই হাত পাতছে বটে। কিন্তু সেটা কিন্তু খুব বেশি প্রফুল্ল মনে না। কেন জানিনা ওদেরকে দেখে মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভিক্ষুক রা ভিক্ষা করে অভাবে পড়ে। কিন্তু এই মানুষগুলো তো বেঁচে থাকার জন্য সং সেজে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছে হাত পাতছে। ওরা তো কোন না কোন পরিবার ছেড়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। থাকতে হচ্ছে হিজড়া গোষ্ঠীবদ্ধ ভাবে। এক ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তায় কিছুদুর পরপরই দলবদ্ধ ভাবে দেখতে পেলাম। বাকি এলাকার টা বলতে পারছি না।
আমার বিষন্ন মনে নানাবিধ প্রশ্ন ঘুরতে থাকে। আচ্ছা এদের কে এখনো কেন এভাবে রাস্তায় নামতে হবে? ওদের কে তো বিভিন্নভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সাধারণ মানুষের সাথে থাকতে দিলে ওরাও ঠিক স্বাভাবিক আচরণে ফিরে আসবে হয়তো একদিন। দোকানের সেলসম্যান, অনলাইনের কত কত কাজ আছে সেগুলোতে ওদের কে কাজে লাগানো যেতে পারে। তাছাড়া যদি কোন বাবা মা সন্তানের পরিবর্তন জানার পরও যদি তার তৃতীয় লিঙ্গের সন্তানকে নিজের কাছে রাখতে চায়। তাহলে সে সুযোগ ও রাখা উচিৎ।
সমাজ বিচ্ছিন্ন এই মানুষের জন্য আমাদের স্বাভাবিক জীবন যাপনকারী মানুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। ওদেরকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য চাই সচেতনতা। চাই সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন সহযোগিতা।
একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত এই গোষ্ঠীর মানুষগুলোর সুযোগ সুবিধা পাওয়ার নাগরিক অধিকার ওদের ও কাম্য। চাই সুস্থ ও নিরাপদ জীবন। আসুন না আমরা ওদের কে নিয়ে একটু ভাবি।

 

শাহানারা পারভীন শিখা
কবি ও লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top