সিডনী বুধবার, ১৮ই মে ২০২২, ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

না ফেরার দেশে: কার্টুনিস্ট নারায়ণ দেবনাথ : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
১৯ জানুয়ারী ২০২২ ১১:৫১

আপডেট:
১৮ মে ২০২২ ১৬:০১

ছবিঃ নারায়ণ দেবনাথ

 

বাংলার শিল্পীমহলে একের পর এক ইন্দ্রপতন। সময়ের হাত ধরেই না ফেরার দেশে চলে গেলেন নাট্যকার শাওলি মিত্র, তারপর চলে গেলেন নারায়ণ দেবনাথ। নতুন বছরের শুরুতেই বাঙালির কাছে এক বড় পরিতাপের বিষয়।বয়স হয়েছিল ৯৭ বছর। গত ২৫ দিন ধরে বেলেভিউ হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন বর্ষীয়ান কার্টুনিস্ট, কিন্তু শেষরক্ষা হল না। আজ (মঙ্গলবার) বেলা ১০.১৫ মিনিট নাগাদ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নারায়ণ দেবনাথ। আমাদের শৈশব জুড়েই তিনি ছিলেন। নতুন ভুবন সৃষ্টি করেছেন শিশুদের মনে।
তাঁকে ঘিরে আট থেকে আশির বাঙালির ছোটবেলা। ‘হাঁদা ভোঁদা’, ‘বাঁটুল.. দি গ্রেট’, নন্টে-ফন্টে'র মতো বাংলা কমিক্সের স্রষ্টা তিনি। গত ২৪ ডিসেম্বর বার্ধক্যজনিত অসুস্থার জেরে এই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল প্রবীন কার্টুনিস্টকে। তবে গত তিনদিনে তাঁর অবস্থার ব্যাপক অবনতি ঘটে। দু-দিন আগেই চিকিৎসক জানিয়েছিলেন, ‘চিকিৎসায় সাড়া দিচ্ছেন না নারায়ণ দেবনাথ’। তাই ভেন্টিলেশন সাপোর্টে রাখা হয়েছিল তাঁকে, রাজ্য সরকারও কোনও খামতি রাখেননি তাঁর চিকিৎসাায়। তাঁর চিকিৎসার জন্য মাল্টিডিসিপ্লিনারি মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল, কিন্তু তবুও কাজে এল না লড়াই।

৯৭ বছর বয়সী কার্টুনিস্ট ভুগছিলেন বার্ধক্যজনিত সমস্যায়। এর আগেও একাধিক বার চিকিৎসার জন্য তিনি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন নারায়ণ দেবনাথ, ফিরেও এসেছিলেন স্বমেজাজে তবে এবার আর শেষরক্ষা হল না।
কার্টুনিস্ট নারায়ণ দেবনাথের জন্ম ১৯২৫ সালে হাওড়া শিবপুরে। গত সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে দেড় হাজারেরও বেশি সিরিয়াস ও মজার কমিকস সৃষ্টি করে বাংলার শিশু সাহিত্যে এক অসামান্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন তিনি। ১৯৬৫ সালে ‘শুকতারা’ পত্রিকায় আত্মপ্রকাশ করে বাঁটুল। বাঙালির প্রথম সুপারহিরো। তারপর একে একে তাঁর সৃষ্টি করা কমিক্স চরিত্র গুলো নজর কাড়তে থাকে।
এর মধ্যে অধিকাংশ কমিকসেরই কাহিনিও চিত্রনাট্য, সংলাপ এবং অবশ্যই আঁকা তাঁর নিজেরই। এমন নজির বিশ্বে বিরল। অনেকেই হয়তো জানেন না, কমিকস শিল্পী হিসেবে বহুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার বহু আগে থেকেই তিনি ছিলেন একজন নিখুঁত অলঙ্করণ শিল্পী। সমকালীন প্রায় সমস্ত দিকপাল সাহিত্যিকের লেখার অলংকরণ করেছিলেন তিনি। স্বপনকুমার হোক কিংবা ঠাকুমার ঝুলি, বিভিন্ন ধরনের বইয়ে তাঁর আঁকা প্রচ্ছদ দেশীয়-প্রকাশনার ক্ষেত্রে এক দুর্লভ সম্পদ বললে এতটুকুও অত্যুক্তি করা হয় না। নব্বই পেরিয়ে বয়স এবং অসুস্থতার কারণে, ছবি আঁকার সময়ে নারায়ণবাবুর হাত কিছুটা কাঁপত ঠিকই, তবু একটি দিনের জন্যেও কার্টুনের রেখায় ভুল হয়নি ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ‘হাঁদা ভোঁদা’, ‘নন্টে ফন্টে’-এর সৃষ্টিকর্তার।
তাঁর অসামান্য কীর্তির জন্য আজবীন তিনি পেয়েছেন অজস্র সম্মন আর অগুনতি মানুষের ভালোবাসা। ২০১৩ সালে সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার এবং বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারে সম্মানিত নারায়ণ দেবনাথ। আর ২০২১ সালে পান পদ্মশ্রী, সেই সম্মান গত সপ্তাহেই হাসপাতালের বেডে তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।

আজ বাঙালি হারালো তাঁর কিশোরবেলার সঙ্গীদের সৃষ্টি কর্তাকে, তবে রয়ে গেল ‘বাটুল দি গ্রেট’, ‘হাঁদা ভোঁদা’, ‘নন্টে ফন্টে’, ‘বাহাদুর বেড়াল’ তা এই সোশ্যাল মিডিয়ার বাড়বাড়ন্তের যুগেও সঙ্গে থাকবে বাঙালির।
নারায়ণ দেবনাথের অমর সৃষ্টি ‘বাটুল দি গ্রেট’, ‘হাঁদা ভোঁদা’, ‘নন্টে ফন্টে’, ‘বাহাদুর বেড়াল’ প্রভৃতি। অসাধারণ সৃষ্টির কর্মে জন্য ২০১৩-য় তাঁকে সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার এবং বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ২০২১ সালে পান পদ্মশ্রী।
বাংলা চিত্রকাহিনি বা কমিকসের প্রাণপুরুষ নারায়ণ দেবনাথের জীবনাবসান বাঙালির কাছে এক বিরাট আঘাত। বয়স হয়েছিল ৯৬ বছর। কয়েক প্রজন্মের বাঙালি কিশোরবেলার সঙ্গী তাঁর সৃষ্টি করা একের পর এক চরিত্রকে রেখে চলে গেলেন তিনি না ফেরার দেশে। হারিয়ে গেল পৃথিবী থেকে আরেকটা প্রাণ,
ছোটো থেকে যার লেখা পড়ে বাঙালির কেটেছে শৈশব।
মৃত্যু কি কঠিন সত্যি, হার মানায় সব স্বপ্ন কে, আজ থেকে হাঁদা ভোঁদা, নন্টে ফন্টে, বাটুল সবাই হলো পিতৃহীন। মৃত্যুর সাথে কঠিন লড়াই করে গেছেন বাংলা কমিকস এর স্রষ্টা নারায়ণ দেবনাথ।আজ পেলেন মুক্তি এই জীবন থেকে, তৈরী করবেন না ফেরার দেশে নিজের একটা কমিকসের জগত।
যেখানে আবার হাঁদা ভোঁদা, নন্টে ফন্টে, বাটুল এর মতো আরো আসবে নতুন কিছু। স্রষ্টা তো অমর, যার কাল্পনিক চরিত্র তৈরী করেছে আমাদের, সারাজীবন থাকবে বাঙালির বুকে অমর গাঁথা হয়ে তাঁর অমর সৃষ্টি।
‘বুকের পাটাওয়ালা লোক’ বলতে গেলেই যে ছবিটা সবচেয়ে আগে বাঙালির মানসপটে ভেসে ওঠে, সেটা বাঁটুল দি গ্রেটের। সারাজীবন হাফপ্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি পরা বাঁটুলের বয়স কত? সে যুবক না কিশোর? এ সব প্রশ্ন বাঙালি কোনও দিন মনেও আনেনি। ‘শুকতারা’ হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মলাট উলটে চলে গিয়েছে প্রথম পাতায় ফ্যাকাশে লাল আর কালো রঙে আঁকা সেই জগতে, যেখানে দুই ওস্তাদের সঙ্গে ক্রমাগত টক্কর দিয়ে চলেছে এক বিরাটবক্ষ বীর। ‘বাঁটুল দি গ্রেট’। বাঙালি কোনও দিন মনেও আনেনি, যে ওস্তাদদ্বয় ইস্কুল পালায়, তারাই আবার ব্যাঙ্ক ডাকাতি করে, তারাই কিনা মহাবলী বাঁটুলকে জব্দ করার ফন্দি আঁটে। বাঁটুলের মতো তাদেরও পরনে হাফ পেন্টুল। ১৯৬৫ সাল থেকে এখনও তারা ওই হাফপ্যান্টেই আটকে রয়েছে। সেই কারণেই বোধ হয় নিজেদের হাফপ্যান্ট পরা বয়সে ফিরতে গেলে প্রৌঢ় বা প্রায় বৃদ্ধ বাঙালি অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারেন সেই ফ্যাকাশে লাল আর কল্পকথার মায়াবী জগতে।
১৯৬০-এর দশক থেকে বাঙালিসংস্কৃতির একটা প্রত্যঙ্গই হয়ে গিয়েছে নামটি ১৯৬২ সালে হাঁদাভোঁদা’, ১৯৬৫-তে ‘বাঁটুল দি গ্রেট’, ১৯৬৯-এ ‘নন্টে-ফন্টে’ বাঙালির শৈশব এবং কৈশোরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কমিক স্ট্রিপ। সেই সঙ্গে এরাই হল দমচাপা বড়বেলা থেকে পালিয়ে যাওয়ার শুঁড়িপথ। বাঙালির সুপারহিরো ছিল না। কিন্তু কোথাও একটা বীরভাব ছাইচাপা আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলত। বাঁটুল দি গ্রেট সেটারই মূর্ত রূপ। মনে রাখতে হবে, ১৯৬২তে ঘটে গিয়েছে ভারত-চিন যুদ্ধ, ১৯৬৫-এও ভারত-পাকিস্তান যুযুধান। বাঁটুলের আগমন কি সেই যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে কোথাও জাতীয়তাবোধের জাগরণকে চিহ্নিত করে? ভারত-পাক সঙ্ঘাতের সময়ে খানসেনাদের ‘প্যাটন পেটা’ করে বাঙালির (পরে বাংলাদেশের মুক্তি যুদ্ধের সময়েও) একান্ত জাতীয়তাবাদকে তুলে ধরেছিল বাঁটুল। সে কথা ভুলতে দেননি নারায়ণ দেবনাথ। বাংলা কমিক্স সাহিত্যের প্রথম পর্বের অন্যতম দিশারী। বাঁটুল দি গ্রেটের স্ট্রিপে চোখ রাখলে বোঝা যায়, এর কুশীলবরা এক অলীক রূপকথার বাসিন্দা। সেই ভুবনে কেমন যেন একটা কাউবয় অধ্যুষিত আমেরিকান ওয়েস্টের গন্ধ। তবে সেখানে হিউমার সৃষ্টি হয় একেবারেই বাঙালি কেতায়। ভুঁইফোঁড়, লোক-ঠকানো, ফ্যাশন-সর্বস্ব পোশাকের দোকানের নাম ‘অঙ্গবাহার’ আর সাদাসিধে পোশাক বিপণির নাম ‘অঙ্গঢাকা’— এমন রসবোধে মজে যেতে সময় লাগেনি বাঙালি পাঠকদের। তবে ‘হাঁদা-ভোঁদা’র পরিমণ্ডল কিন্তু ষোল আনা বাঙালি। রোগা-পাতলা হাঁদা তার চালাকি নিয়ে নাজেহাল হবেই আর সহজ-সরল মোটাসোটা ভোঁদা জিতবে শেষমেশ— এই কাঠামো বার বার পুনরাবৃত্ত হলেও একটুও একঘেয়ে লাগেনি। কারণ একটাই— এই কমিক স্ট্রিপ খুদে দস্যিদের একাত্ম বোধ করাতে পেরেছিল। তাদের অভিভাবকদের ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অমল ভালোবাসার কৈশোরে।
তবে তুলনায় ‘নন্টেফন্টে’র দুনিয়া একেবারেই আলাদা। ছাত্রাবাসের ঘেরাটোপে সুপারিন্টেন্ডেন্ট পাতিরাম হাতি (নাকি হাতিরাম পাতি?) আর বেয়াদপ সিনিয়র কেল্টুর সঙ্গে নন্টে-ফন্টের অনিঃশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা হস্টেল জীবন কাটিয়ে আসা বঙ্গসন্তানকে এখনও স্মৃতিভারাক্রান্ত করে। যাঁরা সেই জীবনের স্বাদ পাননি, বন্ধুদের মুখ থেকে শুনেছেন সেই জীবনের নানা কাহিনি, তাঁদেরও প্রায় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার স্বাদ দিতে সমর্থ এই চিত্র-কাহিনি।
তবে এর পাশাপাশি আরও বেশ কিছু কমিক স্ট্রিপ রচনা করেছিলেন নারায়ণ দেবনাথ। ‘বাহাদুর বেড়াল’, ‘ডানপিটে খাঁদু আর তার কেমিক্যাল দাদু’, ‘ডিটেকটিভ কৌশিক রায়’ ইত্যাদি। তবে এ সবের মধ্যে উল্লেখের দাবি রাখে ‘ব্ল্যাক ডায়মন্ড ইন্দ্রজিৎ রায়’ সিরিজ। দুর্দান্ত অপরাধী ব্ল্যাক ডায়মন্ড আর গোয়েন্দা ইন্দ্রজিতের টক্করে কে শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়, তা জানা যায় না কখনওই। ১৯৮০-১৯৯০-র দশকে সেই সব চিত্রকাহিনি গোগ্রাসে গেলেনি, সেই সময়ে কৈশোর পেরোতে থাকা তেমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত কষ্টকর।
শুধু কমিক স্ট্রিপের রচয়িতা হিসেবে নয়, বাংলা গ্রন্থচিত্রণের অন্যতম প্রধান মুখ ছিলেন নারায়ণ দেবনাথই। দেব সাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত পূজাবার্ষিকীতে বিমল দাস, তুষার কান্তি চট্টোপাধ্যায়, শৈল চক্রবর্তীর পাশাপাশি বিরাজ করতেন নারায়ণ দেবনাথ। অন্যদের তুলনায় তাঁর অলঙ্করণের ক্ষেত্রটা ছিল একটু আলাদা। বিমল দাস বা শৈল চক্রবর্তী যেখানে হাসির গল্পের জন্য কার্টুনধর্মী ছবি আঁকতেন, নারায়ণ দেবনাথের ভাগে পড়ত রহস্য-রোমাঞ্চ বা ভয়ের গল্প। রিয়্যালিস্টিক ঘরানার সেই সব অলঙ্করণ কাহিনিকে একেবারে পাঠকের মগজে সেঁধিয়ে ছাড়ত। অনেক বছর পরে গল্পের নাম ভুলে গেলেও অলঙ্করণের দৌলতে তাদের এখনও মনে করতে পারেন সে দিনের বইপোকারা। হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়ের কলম থেকে নির্গত ভূতের গল্প আর তার সঙ্গে নারায়ণ দেবনাথের কালি-কলমে আঁকা সাদা-কালো ভয়ের জগৎকে কী করে ভুলবে পুজোর ছুটির দুপুরে ‘উদয়ন’, ‘তপোবন’ পড়া বাঙালি!
তার পরে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়েছে বাংলা শিশুসাহিত্য। কমিক স্ট্রিপ হিসেবে বাঙালি পাঠকের মনে জায়গা করে নিয়েছে আন্তর্জাতিক টিনটিন, অ্যাস্টারিক্স। বলীয়ান নায়ক হিসেবে দাপিয়ে বেড়িয়েছে ব্যাটম্যান, সুপারম্যান। কিন্তু তাতে বাঁটুল, হাঁদা-ভোঁদা বা নন্টে-ফন্টের কিছু এসে যায়নি। এখনও কলকাতা বইমেলায় হ্যারি পটার কেনার পর বাঁটুলের কাট-আউট লাগানো স্টলে লাইন দিতে দেখা যায় অগণিত খুদেকে। পাশাপাশি তাদের বাবা-মা’কেও। প্রফেসর ক্যালকুলাসের সঙ্গে, প্রফেসর ডাম্বলডোরের সঙ্গে কেমন সহজ সহাবস্থানে থেকে যান সুপারিন্টেন্ডেন্ট পাতিরাম হাতি। টিনটিন সহজেই বন্ধুত্ব করে নেয় নন্টে বা ভোঁদার সঙ্গে। বাঁটুলকে তার ব্যাটমোবাইলে নিয়ে ঘোরে ব্যাটম্যান। কোথাও কোনও বিরোধ নেই। সহজ একটা অবস্থান। এমনটা বোধ হয় বাংলাতেই আর তা সম্ভব হয়েছিল নারায়ণ দেবনাথের মতো এক বহুমুখী চিত্রকাহিনিকার এখানে জন্মেছিলেন বলে। সাদা-কালোয় বা দুই রঙে আঁকা সেই সব অসংখ্য ছবি আর কমিক্স এখনও বাঙালির জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। হাফপ্যান্ট পরা বয়সে ফিরে যাওয়ার জন্যই বারবার কাল হয়ে আদলে তিনি তৈরি করেন 'নন্টে ফন্টে'। 'কিশোর ভারতী' পত্রিকার জন্য সৃষ্ট এই কমিক স্ট্রিপের দুই কিশোর চরিত্র নন্টে-ফন্টে প্রথম দুই বছর হুবহু হাঁদা-ভোঁদার মতোই ছিল। কিন্তু ১৯৭২ সালে এসে অনেকটাই বৈচিত্র্য আসে তাদের চরিত্রে। এছাড়াও যোগ হয় নন্টে-ফন্টের হোস্টেল জীবন, হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট আর কেল্টুদার মতো চরিত্র। আজ তাঁর জে নারায়ণবাবু নেমে পড়েন শিল্প-সংস্কৃতির জগতে। তবে প্রথমদিকে তার চলার পথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। মনের মতো কাজ তো দূর অস্ত, আঁকাআঁকি করে যে অন্তত খেয়ে-পরে টিকে থাকবেন, তেমন কোনো রাস্তাও খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু ওই যে একবার মাথায় ঢুকে গেছে শিল্পের পোকা, তাই শত কষ্ট সত্ত্বেও হার মানেননি তিনি। বেছে নেননি বিকল্প কোনো পেশা। হাঁদা ভোঁদা' যখন শুরু করেছিলেন, তখন বাংলা ভাষায় কমিকসের আবেদন প্রায় ছিল না বললেই চলে। অনেকটা একা হাতেই একটি জয়যাত্রার জন্ম দিয়েছিলেন নারায়ণবাবু,যা অব্যাহত থাকে তার পরের প্রতিটি সৃষ্টিতেই। বিশেষত 'বাঁটুল দি গ্রেট'-এর মাধ্যমে বাংলাভাষী শিশুদের মাঝে কমিকপ্রীতির একটি অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। প্রথমদিকে কয়েকটি একই রকম চরিত্র নির্মাণের পর নারায়ণবাবু উদ্যোগী হন ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের চরিত্রদের নিয়েও পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে। যেমন- পটলচাঁদ চরিত্রটি (১৯৬৯ সালে সৃষ্ট) একজন জাদুকর, যে তার মেধা দিয়ে পাড়াতো সব সমস্যার সমাধান করে। বাহাদুর বেড়াল (১৯৮২ সালে সৃষ্ট) খুবই অদ্ভূত ও বুদ্ধিমান একটি প্রাণী,যা তার নিজের জন্যই বারবার কাল হয়ে দাঁড়ায় ......
শেষ কথা:
৯৮ বছর বয়সেও হাসপাতালের বিছানায় বসে হাতে কলম নিয়ে এঁকেছেন ছবি, একটানা ৫০ বছর ধরে বাঙালি কিশোর কিশোরীদের মাতিয়ে রেখেছিলেন কমিকসের দুনিয়ার অসামান্য সব চরিত্রদের নিয়ে। হ্যারি পটারের যুগেও বছরের পর বছর বইমেলার স্টলে বাঙালি কিশোরদের লাইন পড়েছে তাঁর সৃষ্টিতেই মুগ্ধ হয়ে। কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায় কাজ করতে গিয়ে জানতে পারলেন 'শুকতারা' পত্রিকাটি বের করে 'দেব সাহিত্য কুটির' নামের প্রকাশনা সংস্থাটি। সেটির প্রুফ রিডারের সহায়তায় অচিরে কর্ণধার সুবোধ মজুমদারের সাথে পরিচয় পর্বটিও সেরে ফেললেন তিনি। রত্ন চিনতে ভুল করলেন না সুবোধবাবু। নারায়ণবাবুর প্রতিভার প্রমাণ পেয়ে প্রথম দেখাতেই তাকে ধরিয়ে দিলেন তিনটি অলঙ্করণের কাজ। মহা উৎসাহে কাজ তিনটি করে ফেললেন নারায়ণবাবু দ্রুততম সময়ের মধ্যে। তার কাজের প্রতি যথাযথ সম্মানও দেখালেন সুবোধবাবু,তৎক্ষণাৎ ধরিয়ে দিলেন পারিশ্রমিক ....
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর ভাগ্যের খোঁজে নারায়ণবাবু নেমে পড়েন শিল্প-সংস্কৃতির জগতে। তবে প্রথমদিকে তার চলার পথ খুব একটা মসৃণ ছিল না। মনের মতো কাজ তো দূর অস্ত,আঁকাআঁকি করে যে অন্তত খেয়ে-পরে টিকে থাকবেন, তেমন কোনো রাস্তাও খুঁজে পাচ্ছিলেন না। কিন্তু ওই যে একবার মাথায় ঢুকে গেছে শিল্পের পোকা,তাই শত কষ্ট সত্ত্বেও হার মানেননি তিনি। বেছে নেননি বিকল্প কোনো পেশা। হাঁদা ভোঁদা' যখন শুরু করেছিলেন,তখন বাংলা ভাষায় কমিকসের আবেদন প্রায় ছিল না বললেই চলে। অনেকটা একা হাতেই একটি জয়যাত্রার জন্ম দিয়েছিলেন নারায়ণবাবু, যা অব্যাহত থাকে তার পরের প্রতিটি সৃষ্টিতেই। বিশেষত 'বাঁটুল দি গ্রেট'-এর মাধ্যমে বাংলাভাষী শিশুদের মাঝে কমিকপ্রীতির একটি অভূতপূর্ব জোয়ার আসে। প্রথমদিকে কয়েকটি একই রকম চরিত্র নির্মাণের পর নারায়ণবাবু উদ্যোগী হন ভিন্ন ভিন্ন স্বাদের চরিত্রদের নিয়েও পরীক্ষানিরীক্ষা চালাতে। যেমন- পটলচাঁদ চরিত্রটি (১৯৬৯ সালে সৃষ্ট) একজন জাদুকর, যে তার মেধা দিয়ে পাড়াতো সব সমস্যার সমাধান করে। বাহাদুর বেড়াল (১৯৮২ সালে সৃষ্ট) খুবই অদ্ভূত ও বুদ্ধিমান একটি প্রাণী,যা তার নিজের জন্যই বারবার কাল হয়ে দাঁড়ায় ......
১৯৬৯ সালে ঠিক তাদেরই আদলে তিনি তৈরি করেন 'নন্টে ফন্টে'। 'কিশোর ভারতী' পত্রিকার জন্য সৃষ্ট এই কমিক স্ট্রিপের দুই কিশোর চরিত্র নন্টে-ফন্টে প্রথম দুই বছর হুবহু হাঁদা-ভোঁদার মতোই ছিল। কিন্তু ১৯৭২ সালে এসে অনেকটাই বৈচিত্র্য আসে তাদের চরিত্রে। এছাড়াও যোগ হয় নন্টে-ফন্টের হোস্টেল জীবন,হোস্টেল সুপারিনটেনডেন্ট আর কেল্টুদার মতো চরিত্র। আজ তাঁর প্রয়াণে কিশোরবেলার দামাল চরিত্রেরাও বিষণ্ণ, চলে গেলেন স্রষ্টা, রয়ে গেল অজস্র ছোটবেলার মুহূর্ত।


ডঃ সুবীর মণ্ডল
লোকগবেষক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প, ফিচার ও ভ্রমণ কাহিনীর লেখক।
পশ্চিমবঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top