অমলিন শ্রদ্ধায় হৃদয় গভীরে নিত্যস্মরি : রোকেয়া ইসলাম
প্রকাশিত:
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০২:৪১
আপডেট:
১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২ ০২:৪২

প্রপা আর রুপন্তি দুই মামাতো ফুপাতো বোন, একজন একই ব্যাক্তিকে ডাকে দাদী অন্যজন আদুরে ভঙ্গিতে ডাকে নানু। ওদের ক্লাশে পড়ে হিমাদ্রি সে তার দাদীকে ডাকে ঠাম্মা আর নানুকে ডাকে দিম্মা।
প্রপা ওর বাবাকে জিজ্ঞেস করেছে ওদের কেন ঠাম্মা দিম্মা নেই।
প্রপার বাবা প্রপাকে ওর নানুর কোলে বসিয়ে দিয়ে বলেছে - এই তোমার দিম্মা তুমি বল নানু।
ওকে আরো অনেক কথা বলেছে। এখন প্রপা আর রুপন্তি বুঝতে পারে মাসি মানে খালা ফুফুই পিসিমনি, দাদা ঠাকুর্দ্দা। ওদের ভাইয়া হিমাদ্রির দাদা। ওদের পাশের ফ্ল্যাট থাকে শ্বাশত কাকু, বাবা ডাকে শ্বাশতদা। নীলা কাকীমাকে বৌদি দুটো ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেল একই বাড়ি হয়ে যায়। বড় বাড়িতে ওরা দৌড়াদৌড়ি করে খেলে, শ্বাশত কাকীমা নারকোল কোড়া আর ঘি দিয়ে মুড়ি মেখে খেতে দেয় তক্তি তিলের নাড়ু লাবড়া লুচিও থাকে কখনও।
ওদের বাড়িতে হিমাদ্রি চিলি চিকেন আর পরাটা খায়। ওদের বাসায় দাদির জুনিয়র বন্ধু কবিতা কস্তাদিও আসে, একবার বড়দিনে ওরা দল বেঁধে কবিতা কস্তাদিদের গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল, আড়াইশো বছরের গির্জা সেটা মাতা মেরীকে দেখেছে ওরা, গির্জায় একজন সুদর্শন ব্যাক্তিকে ক্রুশে ঝুলতে দেখে হামিদা বেগমের কাছে জিজ্ঞেস করতেই সে জানায় উনার নাম যিশু। তারপর বাসায় ফিরে দুজনকে দুপাশে বসিয়ে বইয়ে ছবি দেখিয়ে ওদের পড়ে শুনিয়েছেন যিশু কাহিনি।
হামিদা বেগমের এনজিওতে কাজ করেন কয়েকজন আদিবাসী, তিনি তাদের কথাও ওদের বলেছে।
রাশমনি হাজং এর বীরত্বের কথা জানে ওরা আর বড়ুয়া দাদাতো প্রায়ই আসে। কি চমৎকার কবিতা আবৃত্তি করেন, ওদের বলেছেন ওরা আর একটু বড় হলেই ওদের আবৃত্তি শেখাবেন। হামিদা বেগমের বন্ধুরা এবার বনানী পূজা মন্ডপে যাবে, তিনি প্রতিবার পূজায় নতুন শাড়ি কেনে, সেটা পরেই প্রতিমা দেখতে যায়।
সরকারি বাংলা কলেজে সরস্বতী প্রতিমা দেখতে ওদের নিয়ে যায়। পদ্মপাতায় হাতে বীণা নিয়ে এক অনিন্দ্য সুন্দর প্রতিমা।
এবার হামিদা বেগমের মনটা খুব খারাপ, কারা যেন কুমিল্লায় পূজায় বাজে একটা ঘটনা ঘটিয়েছে। বারবার ফোনে অনেককে বলেছে, অসাম্প্রদায়িক দেশটায় কেন এই হৈচে, কেন অমানবিক আচরণ, যা ধর্মে নেই কেন কারা করলো এই অসভ্য কান্ড বর্বর অমানুষ তারা। দেশের মঙ্গল চায় না তারা।
ওরা দুবোন দূরে দাঁড়িয়ে শুনেছে। শাহবাগে প্রতিবাদের আয়োজন করেছে হামিদা বেগম সেখানেও গিয়েছে।
আজ ১২ রবিউল আউয়াল, হযরত মুহাম্মদ (সঃ) জন্মদিন। ১২ রবিউল আউয়াল তিনি মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতার নাম আবদুল্লাহ মায়ের নাম আমিনা বেগম। তার জন্মের আগে তার পিতা মারা যান আর জন্মের পাঁচ বছর পর তার মা মারা যান। তার পিতামহ মোত্তালিব তার লালন পালন করেন, পিতামহের মৃত্যুর পর তার চাচা আবু তালিব তার অভিভাবক হন।
ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সত্যবাদী, কখনও মিথ্যা কথা বলেননি। তাই আরবের লোকেরা তাকে আল আমীন উপাধি দিয়েছিল। হামিদা বেগমের আাড়িতে
দিনটি বিশেষভাবে পালিত হয়, দীর্ঘকাল থেকেই। বড়রা নফল রোজা রাখে। নফল নামাজ আদায় করে, হামিদা বেগম তসবিহ দানা গুণে গুণে কয়েক হাজারবার দরুদপাঠ করেন। রুপন্তির মা সেদিন সুস্বাদু খাবার তৈরি করে, খাসির রেজালা, আলুর চপ, রোস্ট, ইলিশ মাছ ভাজা, চিংড়ির মালাইকারি সাদা সবজি, বেগুন ভাজা পোলাও। হিমশীতল কোক স্পাইট সাথে ডেজার্ট। সবশেষে পান।
প্রপা আর রুপন্তি হামিদা বেগমের দুপাশে বসে। আজ ওরা শুনবে নবীজির কথা। নবীজির কত কথাই বলেছে হামিদা বেগম, তবুও ফুরায় না। হামিদা বেগমের তসবিহ দানা গোণা শেষ হয়ে গেছে। ভক্তিভরে চুমু খেয়ে রেখে দেয়।
হামিদা বেগমের মুখখানিতে আলো ঝলমল করছে বিশ্বাস আস্থা ভক্তিতে।
- শোন আমার কলিজার টুকরা আপুমনিরা আজ তোমাদের শোনাব আমার প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এর জীবনের একটা ঘটনা, একদিন এক বেদুইন দাঁড়িয়ে মসজিদে প্রস্রাব শুরু করল। উপস্থিত লোকজন দেখে তাকে বাধা দিতে যাচ্ছিল। কিন্তু প্রিয় নবী (সা.) তাদের বললেন, ওকে ছেড়ে দাও। ওর প্রস্রাব শেষ হলে এক বালতি পানি ঢেলে দিয়ো।
এটা রাসূলের সামনে জঘন্য অপরাধ ছিলো না? রাসূল কি তার গর্দান ফেলে দিয়েছেন? না! তা করেননি বরং তিনি বলেছেন-
"নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো, তোমাদের সহজ ও বিনয়ী আচরণ করার জন্য পাঠানো হয়েছে, কঠোরতা বা উগ্রতার জন্য পাঠানো হয়নি”।
ঘটনা বর্ণনা শেষ করে হামিদা বেগম তার পুত্র কন্যার কন্যাজননীদের দুটো হাত তার বয়েসী হাতে তুলে নেন।
- দাদি আজ তোমার বন্ধুরা আসবে না আমাদের বাসায়।
- হিমাদ্রিরা আসবে তো নানু, আমি কিন্তু ওর কাছে বসে খাব।
হামিদা বেগমের বাড়িতে বিভিন্ন পরবে তার বন্ধুদের আমন্ত্রণ থাকে।
হামিদা বেগম জানে তার বধুমাতার ভান্ডার হলো অন্নপূর্ণার ভান্ডার, কম করে রাঁধতে পারে না।
আর এতো বছর শাশুড়ী বৌমা একত্রে বসবাস করছে, তাই শাশুড়ীর স্বভাব জেনে বুঝে গেছে বুদ্ধিমতী বৌমা।
সবার জন্য দ্বার খোলা ওদের বাসার।
আজ সরকারি ছুটির দিন, একটু পরে ওদের বাসা আনন্দ হাসিতে ভরে যাবে
হামিদা বেগম জানে ধর্ম যার যার উৎসব সবার।
সবার আনন্দে নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তা খুশি হবেন।
কারো সাথে ঝগড়া নেই। দিলের মোহাব্বত থাকুক সবার জন্য।
ফ্যাসাদকারীকে আল্লাহ পছন্দ করেন না।
- মা সবাইকে ফোন আসতে বলেছি, বড়ুয়া মামার জন্য ডিমের কোরমাটা আপনি করুন, তিনি আপনার হাতে এই পদ খেতে পছন্দ করেন।
মাথা হেলিয়ে সম্মতি দিয়ে হাত ইশারায় জানিয়ে দেয় "একটু পরে আসছি"
রুপন্তি আর প্রপা দেখে হামিদা বেগম একমনে দরুদপাঠ করছে।
রোকেয়া ইসলাম
কবি ও লেখক
বিষয়: রোকেয়া ইসলাম
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: