সিডনী রবিবার, ৩রা জুলাই ২০২২, ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

বাংলা সাহিত্যে মেসবাড়ি : ডঃ সুবীর মণ্ডল


প্রকাশিত:
৬ এপ্রিল ২০২২ ১৩:৫১

আপডেট:
৩ জুলাই ২০২২ ১৫:৩৯

 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষে মেসবাড়ির উদ্ভব ঘটে বলে মনে করেন বহু আধুনিক গবেষক। সময়ের হাত ধরেই শুরু হয় শহরের মেসবাড়ির কালচার। মূলত কলকাতা শহরকে কেন্দ্র  করে মেসবাড়ির কালচার শুরু হয়। মফস্বল শহরের মেধাবী ও শিক্ষিত বাঙালি সন্তানেরা চাকুরির খোঁজে জেলা থেকে আসতে শুরু করেন কলকাতায়। অবশ্য এর আগেও কেরানিগিরির সুবাদে গ্রাম থেকে কলকাতা মুখো হয়েছিলেন কিছু নব্যযুবক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর কলকাতায় মেসবাড়ির সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মাথার উপর ছাদের আর চিন্তা রইল না। এইসব মেসবাড়ি কেবল ইট-কাঠের কাঠামো কিন্তু ছিল না। ছিল কয়েক প্রজন্ম, অনেকটা ইতিহাস, গোটা একটা সংস্কৃতি নিয়ে কলকাতার বুকে গড়ে ওঠা নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। যার ছিটেফোঁটা নস্টালজিয়াও দিতে পারে না  বর্তমানের  পেয়িং গেস্ট’ বা ‘পিজি’ প্রথা। প্রধানত উত্তর কলকাতাতেই গড়ে ওঠে মেসবাড়ির কালচার। 
প্রত্যেক মেসের ছিল নিজস্ব চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য। চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে প্রধানত আমহার্স্ট স্ট্রিট, মুক্তারামবাবু স্ট্রিট, কলুটোলা স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, মানিকতলা ও শিয়ালদহ এলাকাতেই ছিল মেসের রমরমা। তার কারণ, পা বাড়ালেই ছিল স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, বিভিন্ন ধরনের অফিস, আদালত। সেকালে প্রতিটি মেসবাড়ির নিজস্ব চরিত্র ছিল। মেজাজ, খাওয়া-দাওয়া, শখ-আহ্লাদের বিচারে যতই ব্যক্তিবিশেষের তফাৎ থাকুক না কেন, মাসের পর মাস, বা হয়ত বছরের পর বছর, একই ছাদের নিচে মিলেমিশে থাকার অভ্যাসে অজান্তেই একসুরে বাঁধা পড়তেন বাসিন্দারা। নব্বই দশকে মেসবাড়ির সংখ্যা নেহাত কম ছিল না। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার  সোনারপুুর, গড়িয়া,  যাদবপুর, উত্তর চব্বিশ পরগনার  দমদম,বেলঘরিয়া, ডানলফ, সিঁথি ,বরানগরে  অসংখ্য মেসবাড়ি  গড়ে ওঠে।বিশশতকে  প্রতিটি জেলা ও মহকুমা শহরে গড়ে ওঠে মেসবাড়ির কালচার। বর্তমানে  ক্রমশ বেড়ে  চলেছে বিভিন্ন  মফস্বল শহরে। পশ্চিমবঙ্গের বেশ কয়েকটি শহরে মেসবাড়ির আধিপত্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এদের মধ্যে অগ্রগন্য- মেদিনীপুর, বর্ধধমান,বারাসত, বসিরহাট, কৃষ্ণনগর, কল্যাণী, শিলিগুড়ি, নিউটাউন, সল্টলেক, কালিকাপুর, বাঘাযতীন, বিরাটি, মধ্যমগ্রাম, সোদপুর, পুরুলিয়া, ডায়মন্ড হারবার, হাওড়া, চন্দননগর, খড়্গপুর, ঝাড়গ্রাম, মালদা, বাঁকুড়া, মূলত যে জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও  ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ গড়ে উঠছে। সময়ের হাত ধরেই মেসবাড়ির কালচার 'পিজি'তে রুপান্তরিত হয়েছে হাল আমলে। তবে একালে এর চরিত্রের পরিবর্তন ঘটেছে। হাল ফ্যাশানের আর্থিক সঙ্গতিসম্পন্ন বঙ্গসন্তানদের পছন্দ ‘পিজি’। পিজিতে নেহাতই ঘর শেয়ার করা, আর কিছু শেয়ার করা নয়। ফলস্বরূপ শুশ্রূষার অভাবে বয়সের ভারে মাথা নুইয়েছে মেসবাড়ি।     

বাংলা কথাসাহিতে জুড়েই মেসবাড়ির উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে অল্পের জন্যে ফিরতেই হবে অতীতে। কোনও এক দুপুরে হ্যারিসন স্ট্রিটের (বর্তমানে মহাত্মা গান্ধী রোড) প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে শরদিন্দুর ব্যোমকেশের সঙ্গে অজিতের আলাপ। তদন্তের প্রয়োজনে মেসের হট্টরোলেই আত্মগোপনের সুবিধা খুঁজে নিয়েছিলেন ছদ্মবেশী দুঁদে গোয়েন্দা। উত্তর কলকাতার মেসবাড়িগুলোর তখন স্বর্ণযুগ। এই প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ের জানলা দিয়ে ট্রাম দেখার নেশা ছিল জীবনানন্দ দাশের। এখানেই তো খুঁজে পেয়েছিলেন ‘বনলতা সেন’।

স্বাধীনতা সংগ্রাম বা নকশাল আন্দোলনের বহু ভাঙাগড়ার সাক্ষী একাধিক মেসবাড়ি। ঠিক তেমনই শিব্রাম চক্কোত্তি এই মেসেই খুঁজে পেয়েছিলেন আরাম। যে মেসবাড়ি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, মুক্তারামে থেকে, তক্তারামে শুয়ে, শুক্তারাম খেয়েই তিনি শিবরাম হয়েছেন। ঠনঠনিয়া কালিবাড়ির রাস্তায় এসে, যে কোনও কাউকে শিবরাম চক্রবর্তীর মেসবাড়ি জিজ্ঞেস করলেই সোৎসাহে দোতলার একটি ঘর দেখিয়ে দেবেন। ১৩৪, মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের ‘ক্ষেত্র কুঠি’। এখানেই একলা থাকতেন তিনি। ভাগ্য ভালো হলে দেওয়ালে লেখাও নজরে আসতে পারে। শোনা যায়, শিবরাম কখনও দেওয়াল রং করতে দিতেন না। সেখানে লেখা থাকত জরুরি বহু জিনিস। কারণ, খাতার মতো দেওয়ালের হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই! রাবড়ির প্রতি ছিল তাঁর তীব্র আকর্ষণ। আর একমাত্র সেই টানেই নাকি হপ্তায় দু-একদিন সাধের ‘মুক্তারামের তক্তারাম’ ছাড়তে বাধ্য হতেন তিনি।

পুরনো কলকাতা। বৃষ্টিভেজা রাস্তা। ট্রাম। কফি হাউস। রাইটার্স বিল্ডিং। শহর চষে পাঞ্জাবির পকেটে শেষ চারমিনার বাঁচিয়ে ঘরে ফেরা। নিজের ঘর না থাকলেও সে সময় বাঙালির ছিল মেসবাড়ি।বয়সের ভারে আজ নুইয়েছে মাথা। 

‘সাড়ে চুয়াত্তর’ থেকে ‘বসন্ত বিলাপ’। বাংলা সিনেমায় ব্যাচেলরদের নিয়ে ছবি বানাতে গিয়েও পরিচালকরা গল্পের মধ্যে নিয়ে এসেছেন মেসবাড়ি। সাহিত্য বা খেলাধুলো নয় কেবল, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও সেকালের শহরে মেসবাড়ির অবদান ছিল যথেষ্ট। স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু খসড়া বহু বিপ্লবীর আস্তানা ছিল কলকাতার মেসবাড়ি। চল্লিশের দশকের দিনগুলোর উত্তেজনা কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী কলকাতায় সত্তরের দশকের দিন বদলের স্বপ্ন দেখা তরুণদের দল, মেসবাড়ি সাক্ষীkolkata mess rent ছিল সব কিছুরই।

সময়টা বদলে গেছে। মেসবাড়ির সংস্কৃতি বদলে হয়েছে পিজি। অনেক জায়গায় সাবেকি মেস ভেঙে তৈরি হয়েছে আবাসন। এখন যে ক’টা টিকে আছে, সেই আন্তরিকতা নেই বললেই চলে বোর্ডারদের মধ্যে। তক্তপোষ পরিণত হয়েছে সিঙ্গল বেড-এ। তবুও এখনও কোনও এক মেসবাড়ির পাশ দিয়ে ধুঁকতে ধুঁকতে চলা ট্রামের ঘন্টির শব্দ যেন ব্যোমকেশ আর অজিতের বন্ধুত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। 

 

বাহাত্তর নম্বর বনমালী নস্কর লেন। ঠিকানাটা ঠিক কী কারণে আপামর বাঙালি হৃদয়ে চিরস্মরণীয়, তা বলার জন্য কোনও পুরস্কার নেই। চিলেকোঠাবাসী ঘনশ্যাম দাস ওরফে ঘনাদার মৌরসীপাট্টা এই মেসবাড়ির জাঁকালো আড্ডায় মধ্যমণি অবশ্যই দীর্ঘকায়, ঘোর শ্যামবর্ণ, কিছুটা স্বভাব-আয়েসী মধ্যবয়েসী ভদ্রলোক স্বয়ং, যাঁর চটকদার গল্পসম্ভারের টানে প্রতি ছুটির দুপুরে হাজির হয় শিবু, শিশির, গৌর আর সুধীর। সত্যি বলতে কি, মেসবাড়ির ইতিহাসে এমন বর্ণময় চরিত্রের জুড়ি মেলা ভার। কলকাতার বুকে মেসবাড়িকে চিরন্তন করে গিয়েছেন প্রেমেন্দ্র মিত্র সৃষ্ট যুগান্তকারী চরিত্র।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পরই শহরে মেসবাড়ির বোলবোলাও। অবশ্য তার আগেই কেরানিগিরির সুবাদে গ্রাম থেকে কলকাতায় পা ফেলতে শুরু করেছেন নব্য যুবারা। সরকারি-বেসরকারি অফিসে করণিকদের তখন চাহিদা তুঙ্গে। আবার, চাকরি জোটাতে প্রয়োজনীয় লেখাপড়া করতে গেলে কলেজে ভর্তি হওয়া জরুরী। কিন্তু প্রতিদিন গ্রাম থেকে শহরে আসার কথা পরিবহণ অপ্রতুলতার সে-যুগে দুঃস্বপ্নেও ভাবা যেত না। তাই অনিবার্য হয়ে ওঠে শহরবাস। চিলতে আস্তানার খোঁজে হন্যে হয়ে মহানগরীর অলি-গলিতে শুরু হল অনুসন্ধান। প্রথম দিকে নিকট বা দূর সম্পর্কীয় আত্মীয়ের বাড়িতে ঘাঁটি গাড়তে শুরু করলেও পরবর্তীকালে একান্নবর্তী পরিবার ক্রমশ অবলুপ্ত হওয়ায় তা অস্বস্তিকর ঠেকতে লাগল। আবার বাজারে পছন্দমতো বাড়ি মিললেও মাসোহারার টাকায় অথবা কেরানিগিরির বেতনে প্রতি মাসে তার ভাড়ার জোগান দেওয়া মামুলি ব্যাপার নয়।

অগত্যা মেস। দেখা গেল, ছটাকখানেক প্রাইভেসির সঙ্গে আপোস করতে পারলেই সুলভে শহরবাস কঠিন নয়। তবে হ্যাঁ, মেসের সদস্য হতে গেলে চোখ-কান খোলা রাখতে হত বই কি! যার-তার সঙ্গে তো আর রোজের জীবন ভাগ-বাঁটোয়ারা করা চলে না। তাই জোরালো রেফারেন্স ছাড়া মেসে ঠাঁই পাওয়া এক কথায় অসম্ভব ছিল। এর ওপর সাকিন ও ধর্ম মোতাবেক বিভাজন। এ ক্ষেত্রে মূলত প্রাদেশিকতাই প্রাধান্য পেত। যেমন, বরিশালের মেসে কস্মিনকালেও জায়গা পেতেন না বর্ধমানের যুবক। তেমনই, মেদিনীপুরের মেসবাড়িতে সেঁধোবার কথা কল্পনা করতেন না যশোরের তরুণ।

চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে প্রধানত আমহার্স্ট স্ট্রিট, মুক্তারামবাবু স্ট্রিট, কলুটোলা স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, মানিকতলা ও শেয়ালদা অঞ্চলেই মেসের রমরমা দেখা যায়। রেল স্টেশন, অফিসপাড়া এবং কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈকট্যই এসব এলাকায় মেসবাড়ি গজিয়ে ওঠার অব্যর্থ কারণ। সেকালে প্রতিটি মেসবাড়ির নিজস্ব চরিত্র ছিল। মেজাজ, খাওয়া-দাওয়া, সখ-আহ্লাদের বিচারে যতই ব্যক্তি বিশেষের তফাৎ থাকুক না কেন, মাসের পর মাস, বা হয়ত বছরের পর বছর একই ছাদের নিচে মিলেমিশে থাকার অভ্যাসে অজান্তেই একসুরে বাঁধা পড়তেন বাসিন্দারা।

তবে মেসবাড়িতে থাকলেই স্বভাব-মিশুকে হতে হবে, এমন কোনও অকাট্য আইন জারি হয়নি কখনওই। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ বোধহয় শিব্রাম চক্কোত্তি। জনপ্রিয় কৌতুক রচনাকার ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন যথেষ্ট লাজুক প্রকৃতির। গোটা জীবনটাই তিনি কাটিয়েছেন মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মেসবাড়ির তিনতলার একটেরে ঘরটিতে। স্বভাব ঘরকুনো রম্যরচনাকার ঘরের দেওয়ালজুড়ে স্বহস্তে লিখে রাখতেন দিনলিপি। অকৃতদার মানুষটি ছিলেন দস্তুরমতো ভোজনরসিক। রাবড়ির প্রতি ছিল তাঁর তীব্র আকর্ষণ। আর একমাত্র তার টানেই না কি হপ্তায় দু-একদিন সাধের “মুক্তারামের তক্তারাম” ছাড়তে বাধ্য হতেন তিনি।

শিবরাম চক্রবর্তীর অভিনব মেসবাসের বহু আগেই কিন্তু বাংলা সাহিত্যের পাতায় পাকাপাকি জায়গা করে ফেলে মধ্যবিত্তের এই সমবায় ডেরা। চোদ্দ নম্বর হাবশীবাগানের ছোট্ট, ছিমছাম মেসেই পরশুরামের ‘বিরিঞ্চিবাবা’ গল্পের সূত্রপাত। অন্য দিকে, শরদিন্দুর ব্যোমকেশের সঙ্গে অজিতের আলাপ হয় উত্তর কলকাতার এক মেসবাড়িতে। তদন্তের প্রয়োজনে মেসের হট্টরোলেই আত্মগোপনের সুবিধা খুঁজে নিয়েছিলেন ছদ্মবেশী দুঁদে গোয়েন্দা ব্যোমকেশ বক্সী। তবে এ ব্যাপারেও পথিকৃৎ হয়ত জোড়াসাঁকোর নোবেলজয়ীই। ১৯০১-০২ সালে লেখা রবীন্দ্র উপন্যাস ‘চোখের বালি’-র মহেন্দ্র স্ত্রীর ওপর বেদম চটে আশ্রয় নিয়েছিলেন এক মেসবাড়িতে। আবার, উনিশ শতকের গোড়ার প্রেক্ষাপটে কলকাতার মেসবাড়িতেই শুরু শরৎচন্দ্রের ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাসের সাবিত্রী-সতীশ উপাখ্যান। তিলোত্তমার মেসভবনে সময়ে-অসময়ে ভিন্ন প্রেক্ষিতে ঠাঁই নিয়েছেন বাংলা সাহিত্যের দিকপালরাও। তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণ-জীবনানন্দ থেকে শুরু করে সমরেশ মজুমদার-শুভ আচার্যরাও জীবনের বেশ কিছুদিন কাটিয়েছেন এ শহরের মেসে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও মেসের অবদান বড় সামান্য নয়। স্বাধীনতা সংগ্রামে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সামিল বহু বিপ্লবীরই ঘাঁটি ছিল কলকাতার মেসবাড়িগুলোয়। লাল পাগড়ির শ্যেনদৃষ্টি এড়িয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রে বসেই চলত ব্রিটিশ সিংহকে পদানত করার ছক কষা। আবার অগ্নিগর্ভ সত্তরের দিন-বদলের স্বপ্ন দেখার শুরুও এখানেই।

পূর্ব, মধ্য ও উত্তর কলকাতার সাবেক মেসগুলোর অধিকাংশই আজ স্রেফ ইতিহাস। নানা চিত্তাকর্ষক ঘটনা-দুর্ঘটনার সাক্ষী যৌথ আস্তানাগুলো কালের নিয়মে এখন বহুতল আবাসন বা শপিং মলে রূপান্তরিত। আর প্রোমোটারের নেকনজর থেকে এখনও যারা নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছে, তারাও যত্ন ও যথার্থ বাসিন্দার অভাবে শেষের সে দিনের অপেক্ষায়। বরং শহর কলকাতার চেয়ে ঢের বেশি রমরমিয়ে চলছে মহানগরী লাগোয়া ছোট শহর বা মফস্বলের মেসগুলো।

মেস ঘিরে গল্প অসংখ্য। মেসজীবনের মার্কামারা ছবি ঘুরেফিরে বেশ কিছু জনপ্রিয় বাংলা সিনেমায় দেখা গিয়েছে। এদের মধ্যে অগ্রণী অবশ্যই ১৯৫৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া বিজন ভট্টাচার্যের কাহিনি অবলম্বনে নির্মল দে-র ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। “অন্নপূর্ণা বোর্ডিং হাউজের” তরুণ বাসিন্দারা বাঙালি হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন “আমার এ যৌবন চম্পা-চামেলি বন…” গানটিতে। আর চিরভাস্মর হয়ে রয়ে গিয়েছে মেসের ম্যানেজার রজনীবাবুরূপী তুলসী চক্রবর্তী এবং তাঁর স্ত্রীর ভূমিকায় মলিনাদেবীর অভিনয়।

মেসবাড়ি নিয়ে আর একটি জনপ্রিয় বাংলা ছবি ১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া দীনেন গুপ্তর ‘বসন্ত বিলাপ’। পুরুষ ও মহিলাদের দুই মেসবাড়ির সদস্যদের নিয়ে তৈরি এ ছবিরও পরতে পরতে হাসির ফোয়ারা। অপর্ণা সেনের লিপে আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে “আমি মিস ক্যালকাটা” গানটা তো ‘অলটাইম হিট’ বলা চলে।

বাস্তবে মেসবাড়ির সদস্যদের জীবনে হাসি-হুল্লোড়ের অবকাশ তেমন নেই। কিছু কিছু রেওয়াজ বা বিক্ষিপ্ত ঘটনা ব্যতিক্রম হলেও বাসিন্দাদের মধ্যে অতীতের সেই আন্তরিকতায় ইদানীং বেশ ভাটা পড়েছে, জানালেন সাঁতরাগাছির এক মেসের বোর্ডার। তবে তাঁর কাছেই শোনা গেল মেসবাড়ির এক আজব দস্তুরের কথা।

মেসবাবুরা কেউই ধনী বা উচ্চমধ্যবিত্ত নন। তাই চাঁদা তুলে মাসে একবার একবেলা পাঁঠার মাংস খাওয়ার নিয়ম এই বাড়িতে। সাধারণত, সে দিনটা রবিবার। তবে সপ্তাহান্তে মেস ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে ফেরার অভ্যেস অনেকেরই। তাঁদের ভাগের মাংস তুলে রাখাই নিয়ম। তবে সেই নিয়মেও আছে শর্ত। পরদিন সকাল আটটা পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বোর্ডারটির জন্য অপেক্ষা করা হয়। আটটা বেজে গেলেই সে মাংস নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেন বাড়ির বাকি সদস্যরা। শোনা গেল, নির্দিষ্ট সময়ের পনেরো মিনিট বাকি থাকতেই মাংসের বাটি সামনে রেখে ঘড়ির কাঁটার দিকে মনঃসংযোগ করতে দেখা যায় অপেক্ষমান বোর্ডারদের। অনেক সময়েই না কি তাই গলির মোড় থেকে তারস্বরে নিজের উপস্থিতি জানান দিতে হয় মেস-ফেরৎ সদস্যকে। মুহূর্তের বিলম্বেই না কি হাতছাড়া হতে পারে ন্যায্য বখরা।

কালক্রমে মেসের শূন্যস্থান পূর্ণ করেছে শহরের বিভিন্ন পাড়ায় গজিয়ে ওঠা ‘পেয়িং গেস্ট’ সংস্কৃতি। বছর তিরিশেক আগেও অবশ্য কলকাতার বেশ কিছু পরিবারে মাসিক ভাড়ার বিনিময়ে খাদ্য ও আস্তানার এই সুবিধে পাওয়া যেত। তবে এখন তার পরিসর বেড়েছে নিঃসন্দেহে। বহুজাতিক ও বেসরকারি সংস্থায় কাজ করতে আসা ভিনরাজ্যের ছেলেমেয়েরা তো আছেনই, কলকাতায় পড়াশোনা করতে আসা দেশ-বিদেশের বহু ছাত্র-ছাত্রীর যৌথ ডেরাও এখন মধ্যবিত্ত পাড়ার বেশ কিছু ফ্ল্যাট।

নামের সঙ্গেই পাল্টেছে মেসবাড়ির অঙ্গসজ্জা। তক্তপোষ-তেলচিটে তোশকের আধিপত্যের অবসান ঘটেছে সিঙ্গল বেড-আধুনিক ম্যাট্রেসের বিলাসে। বারোয়ারি কলঘরের জায়গায় এসেছে অ্যাটাচড টয়লেটের সুবিধা। বিদায় নিয়েছে মেসবাড়ির আজীবন সদস্য ছারপোকারাও। তবু ভোল বদলে বহাল তবিয়তেই কলকাতার বুকে আজও বিদ্যমান মেসবাস।

 

তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার পত্রিকারআর্কাইভ ও বিভিন্ন গ্রন্থ 

 

ডঃ সুবীর মণ্ডল
বাঁকুড়া ,পশ্চিমবঙ্গ ,ভারত
লোকগবেষক,প্রাবন্ধিক, অণুগল্প ,রম্যরচনা ও ভ্রমণকাহিনীর লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top