সিডনী রবিবার, ৩রা জুলাই ২০২২, ১৯শে আষাঢ় ১৪২৯

দ্বৈধ : মিলা মাহফুজা


প্রকাশিত:
১২ এপ্রিল ২০২২ ১৫:২৭

আপডেট:
৩ জুলাই ২০২২ ১৪:০৪

ছবিঃ  : মিলা মাহফুজা

 

লম্বা ঘরটায় মেশিনের মৃদু গর্জন ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। যদিও ক’জন নার্স ও ডাক্তার নানারকম কাজ করছেন। পলা ওয়েটিং রুমে বসেছিল, সেখান থেকে ডাক্তার ডাকিয়ে এনেছেন। ডাক্তার বয়সে তরুণ কিন্তু বেশ কনফিডেন্ট চেহারা। পলাকে খুব কোমল গলায় বললেন, ‘ওনার হাতটা ধরে রাখুন।’ যা বোঝার বুঝে যায় পলা। আদতে এই মুহুর্তটা অনিবার্য তা দু’দিন আগেই জেনেছে। ও মায়ের হাতটা ধরে। হিম ঘরটার মতই মায়ের হাতটাও হিম ঠান্ডা। ঠান্ডা হাতে নিজের উষ্ণ হাত আলতো ঘষতে ঘষতে মৃদু গলায় ও ডাকল, ‘মা, ও মা।’
যন্ত্রপাতির আড়ালে পাথর মুখ, চোখের পাতা অনড়। পলার খুব ইচ্ছে করল, চলে যাবার আগে একবার মা চোখ মেলে ওকে দেখুক। শুধু একবার। ‘মা, চোখ খুলবে একবার? মা, একবার দেখো আমাকে।’ মনে মনে মিনতি করল পলা।
তরুণ ডাক্তার পলার হাত থেকে মায়ের হাতটা আলগোছে বের করে নেন। নার্স নিঃশব্দে শরীর থেকে যন্ত্রপাতি খুলছেন। পলার মনে হলো কেউ যেন তাকে বাতাস শূন্য একটা জারের মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে। সে হাঁসফাঁস করে চেঁচিয়ে উঠল, ‘মা, জানালাটা খুলে দাও।’
কিছুক্ষণ পর যখন তার জ্ঞান ফিরল সে নিজেকে দেখল হাসপাতালের বেডে। উঠে বসতেই তরুণ ডাক্তার এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলেন, ‘ঠিক আছেন?’
পলা মাথা নাড়ল। যদিও সে জানে না তার কী হয়েছিল। সে ধীরে ধীরে বেড ছেড়ে নেমে দাঁড়াল। ডাক্তার বললেন, ‘আপনার সঙ্গে আর কেউ আছেন? আমরা খুঁজে কাউকে পায়নি।’
-না কেউ নেই। কিন্তু কেন?
-ডেডবডি নেবার ব্যবস্থা করবেন কি আপনি?
-ডেডবডি মানে?
-না, মানে আপনার মাকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে যেতে হবে তো।
পলার মনে পড়ে সব, সে বলল, ‘কিছু করতে হবে?’
ডাক্তার বললেন, ‘চলেন, বাইরে গিয়ে কথা বলি।’
আইসিইউর বাইরে অপেক্ষমান উদ্বিগ্ন মুখগুলো তাদের বের হতে দেখল। তারা নীরব দেখে কেউ কেউ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ডাক্তার ফাঁকা চেয়ারে বসে পলাকেও বসতে বলল।
সদাশয় ডাক্তারের সহায়তায় ডেডবডি হিমাগারে রেখে ফিরল ফ্ল্যাটে পলা। ভিন দেশে থাকা ভাইদের খবর দিতে হবে, তারা কেউ এলে পরের কাজগুলো করা হবে। অন্তত পলা সে রকম আশা করল। অবসন্ন হাতে চাবি দিয়ে দরজা খুলতেই ঘন অন্ধকার ধাক্কা দিল তাকে। ফ্ল্যাটের সুইচগুলো কোথায় কোনটা এখনও ঠিক জানা হয়ে ওঠেনি। সিঁড়িঘরের আলোয় কতকটা হাতড়েই যেটা পেল সেটাই অন করল। খুব মৃদু নীল আলো অন্ধকার ফিকে করল। বড় আলো জ্বালানোর ইচ্ছে হলো না। পলা সোফায় গা ছেড়ে দিল। তিনদিনের চেনা এই ঘরের বাতাসটা এখন খুব ভারী লাগল। বুক চেপে আসে। পলার মনে হলো সময়ের পলগুলো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়েছে। আগামী সকাল আর আসবে না।
পলার যখন ঘুম ভাঙল, তখন বেলা অনেক। পেটে খিদের আঁচ। পলা সাওয়ার শেষে রান্নাঘরে ঢুকে কাচের বয়াম থেকে দুধ, কনফ্লেক্স নিয়ে খাওয়ার আয়োজন করল। পর পর দু’ কাপ চা খাওয়ার পর ঝাঁড়া দিয়ে শরীর চাঙ্গা করল। পরক্ষণেই মনে পড়ল, আজ করার কিছু নেই। মায়ের নোট খুঁজে বের করে আত্মীয়দের খবর দেয়া ছাড়া। সেটা করার জন্য সারাদিন পড়ে আছে। এখন বরং মায়ের গন্ধমাখা ফ্ল্যাটখানায় সে নিরিবিলি কিছু সময় কাটাতে পারে। গত তিনদিন এখানে এসেছে, থেকেছে, কিন্তু কিছুই দেখা হয়নি। দু’ বেড রুমের ফ্ল্যাটটা সর্বোতভাবে বাহুল্য বর্জিত। খুব প্রয়োজনীয় ফার্নিচার ছাড়া আর যা আছে তা হলো বই। কবিতার বই। একটা ঘর জুড়ে, যার ফ্লোরে তোষক পেতে বিছানা করা, তার চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে, গুছিয়ে গাছিয়ে রাশি রাশি কবিতার বই। মা কবিতা পড়ত? না, পলার কোনো স্মৃতি নেই মায়ের কবিতা পড়ার। মাকে পলা কতটুকুই বা পেয়েছে? স্কাইপ, ম্যাসেঞ্জারের দৌলতে রোজই মাকে সে দেখতে পেয়েছে বটে কিন্তু ছুঁতে পারা? তা তো হয়নি। তের বছর। রোজ দেখা, কথা বলা হয়েছেÑ পলা তো জানত সে মায়ের খুব কাছের। আল গ্রে চায়ের স্বাদ, রোগান জোসের রেসিপিÑ কি না নিয়ে তারা কথা বলেছে। কিন্তু কবিতা? না, কোনদিন না।
পলা একটা বই তুলে নেয় হাতে। পাতা উল্টে দেখে পেন্সিল দিয়ে কোনো কোনো শব্দের নিচে দাগ দেয়া আছে। কোথাও কোথাও মার্জিনে মন্তব্য। বেশ মনোযোগ দিয়ে পড়ত, তার চিহ্ন। মা কি ভেবেছিল বিদেশে; বিদেশি ভাষার মধ্যে বসবাস করা পলা বাংলা কবিতার প্রতি আগ্রহী হবে না?
এ কথা আর জানা হবে না কোনদিন।
এখন সত্যি আগ্রহ পেল না কবিতায়। আগে মায়ের নোটটা খুঁজে বের করতে হবে।
সে আলমারি খোলে, Ñএই তো লাল পাড় নীল সম্বলপুরি। ওই যে মিষ্টি গোলাপী কোটাটা। সোনালী রঙা চান্দেরী। হাতে গোনা ক’খানা শাড়ি। সবগুলোই মাকে পরা দেখেছে। কিছু নরম মোলায়েম রাতের জামা। আলমারির নিচ তাকে ইস্ত্রি করা বিছানার বাড়তি চাদর দু’তিনটে। সবই স্কাইপে নজরে এসেছে কোনো না কোনো সময়। কিছুটা সময় পর পলার মনে হয়, এ ঘরটায় সে বহুবার এসেছে, থেকেছে। সব কিছু হাতের তালুর মতো চেনা লাগছে।
দুপুর হয়ে এসেছে। একটু কিছু খাওয়া দরকার। রান্নাঘরে যথেষ্ট মজুদ রয়েছে। কিছু রান্না করে নেয়া যেতে পারে। কি করবে ভাবতে গিয়ে হঠাৎ মনে পড়লÑ মরা বাড়িতে রান্না করা হয় না। আত্মীয় প্রতিবেশিরা খাবার দেয়। একবার পাঠিয়েছিলÑ সেটাও মনে পড়ে। আবছাভাবে। কিন্তু এবার আত্মীয়দের সে খবরটা জানাতে পারেনি এখন পর্যন্ত। নোটবইটা পেয়েছে। কিন্তু আগে তাকে কিছু খেতে হবে। ফ্রিজে রান্না করা খাবাবের কটা বাটি আছে। তারই দুটো বের করল। আলু ভাজা। আর মুরগীর তরকারি। আলু ভাজা মা খুব পছন্দ করত। পলা আলু ভাজা তুলে রাখল। ভাত করতে হবে। ঝামেলা না করে আজও বাইরে খাবে ঠিক করল। চাবি আর ব্যাগটা তুলে নিতে চোখে পড়ল ওটা।
ছোট্ট টিপয়ে পড়ে আছে মায়ের মোবাইলটা। ওটা তুলে নিল। হাসপাতালে যাওয়ার সময় তাড়াহুড়োতে সে নিজেই এখানে রেখে গিয়েছে। তারপর আর ওটার কথা মনে আসেনি। নিশ্চয় কেউ ফোন করে থাকবে। চার্জ শেষ। চার্জে দিল। বাসার কাছেরই এক রেস্তোরা থেকে খেয়ে ফিরে এসে ফোনটা অন করল। ফোন সক্রিয় হতেই টুং টুং শব্দে মেসেজ ঢুকে পড়তে থাকল একের পর এক। বেশ অনেকগুলো। পলা মেসেজ খোলার আগে দেখে চব্বিশটা মিস কল। একটি মাত্র নম্বর থেকে। একটু ভেবে ফোন ব্যাক করল সে। মোবাইল স্ক্রিনে এক পুরুষ ব্যক্তির ছবি। ওপাশ থেকে উদ্বেগভরা গমগমে কণ্ঠে সোজাসুজি প্রশ্ন হলো, ‘তুমি ঠিক আছো তো, পরী?’
পলা কণ্ঠস্বরের গভীর আন্তরিকা টের পায়। খানিক বিহŸলতা ঘেরে তাকে। তার নীরবতায় আবার প্রশ্ন, ‘কদিন তুমি একবারও ফোন ধরলে না, মেসেজের উত্তর দিলে না, কী হয়েছিল তোমার? খারাপ কিছু নিশ্চয় নয়?’
পলা কী উত্তর দেবে ভেবে না পেয়ে চুপ করে থাকে। এবার ওপাশে অধীর আতঙ্কিত কণ্ঠ, ‘পরী, এই পরী? কী হয়েছে? পরী নাকি অন্য কেউ ধরেছেন ফোন? বলুন পরী কোথায়? কথা বলছেন না কেন? পরী, পরী...প্লিজ কথা বলো...’
আকুল এইসব প্রশ্ন শুনতে শুনতে পলা টের পায় তার ভেতরে অদ্ভুদ এক টানাপোড়েন হচ্ছে।
একদিকে মা তার কাছে কিছু গোপন করেছিল সেই অভিমান, অন্য দিকে মায়ের জন্য এতো উতলা হওয়ার একজন কেউ ছিল- এই কথা জানার আনন্দ।
হাতে ধরা ফোন থেকে আসা শব্দগুলো খুব অস্পষ্ট হয়ে যায়।

 

মিলা মাহফুজা
নিকেতন



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top