সিডনী বুধবার, ১৮ই মে ২০২২, ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

আত্রলিতা : নুজহাত ইসলাম নৌশিন


প্রকাশিত:
২৮ এপ্রিল ২০২২ ১৬:০০

আপডেট:
১৮ মে ২০২২ ১৬:১১

 

‘তুমি কি দরজাটা খুলবে?’
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। চর্যা রান্না ঘর থেকে শাড়ি একরকম কোমরে পেঁচিয়ে হন্তদন্ত করে ছুটে এলো। ত্রিশ মিনিট ধরে কলিং বেল বেজেই যাচ্ছে অথচ এলাহী সোফা ছেড়ে নড়ল না।
দরজা খুলে দিল – দুধ ওয়ালা দুধ দিয়ে গেল।
চর্যা ভ্রূ কুঁচকে এলাহীর সামনে দাঁড়াল। নাহ্, এলাহী মুখ তুলে অবধি তাকাল না। কী অসাধারণ উপেক্ষা করতে পারে – বিয়ের তিন বছরে এই প্রথম নজরে পড়ল চর্যার।
গলা ফাটিয়ে চিৎকার করলে হয়তো মেজাজ ঠান্ডা হবে কিন্তু পরক্ষণেই আস্তে আস্তে গলা ব্যথা তীব্র টনসিলের আকার নিবে। ডাক্তারের বারণ তাই চর্যা চিৎকার করল না। কিন্তু মনে মনে প্রচণ্ড চিৎকার -চেঁচামেচি চলছে।
‘পেয়েছেটা কী – মগের মুল্লুক নাকি? কী দোষ আমার সেটা তো একবার বলবে – তা না, নির্দয় পাষাণ বেদীর মতো চুপ করে থাকা। আমি কি তোমার দোষ দেখে এমন গাল ফুলিয়ে বসে থাকি? এলাহী, এবার কিন্তু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে।‘ কথা গুলো মনের ভেতরে ভেতরে বলেই শরীর রাগে কাঁপতে লাগল, স্থির দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না । এলাহীর পাশে সোফার হাতলটা ধরে বসতে গিয়ে ও বসল না। রান্না ঘর থেকে পোড়া গন্ধ আসছে, চর্যা ছুটে গেল।
এলাহী বিনোদন পাতায় বুঁদ হয়ে আছে। খেলা-ধুলার পাতাগুলো রীতিমতো পানসে হয়ে উঠছে। নবাগতা এক নায়িকার ক্লিভেজ এত স্পষ্ট করে দেওয়া বিনোদন পাতায় যে চোখ সরাতে রীতিমতো ঘাড় দুই-তিন বার নাড়াতে হলো।
একটু আগে চর্যা সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু তাতে কী – নিজের দোষ না বুঝতে পারলে কিছু করার নেই। কিন্তু উল্লেখযোগ্য কী ভুল হতে পারে তাও মনে আসছে না। এও এক যন্ত্রণা। এলাহী সব মিলিয়ে চুপ করে আছে।
ছুটির দিনগুলো ইদানীং ঘামের মতো স্যাঁতস্যাঁতে লাগে। কিছু করার নেই– এলাহী আর চর্যাকে ভালো লাগছে না। ভালো লাগছে না বলার চেয়ে বলা ভালো চর্যাকে সহ্য হচ্ছে না। এমন হওয়ার কোনো কারণ নেই কিন্তু এমনটা হচ্ছে।
নীল তিমির ডকুমেন্টারি দেখতে দেখতে চর্যার চোখে পড়ার মতো দোষ খুঁজতে লাগল এলাহী। নীল তিমি ডকুমেন্টারি এখন আর ভালো লাগছে না । চট কটে পেপারের কোণে পেন্সিল দিয়ে হিসাব শুরু করল।
‘চর্যা বিয়ের পর আরও সুন্দরী হয়েছে। ধরার মতো কোনো দোষ নেই। বরং অতিরিক্ত লক্ষ্মী টাইপ। আজ পর্যন্ত অফিসে কখনো না খেয়ে যেতে হয়নি। কিন্তু – ‘ এলাহী থতমত খেয়ে গেল। কিন্তুর পর আর কোনো কথা পেন্সিলের ডগায় আসছে না।
বিরক্তিতে পেপারে লিখা অংশ ছিঁড়ে মুঠো করে ওয়েস্ট বাক্সে ফেলে দিল। কোনো মানে হয় না।
ভালো লাগছে না এটাই বড় কথা।
যা হওয়ার কথা থাকে না তাই হয়। চর্যার বেলায় তাই হয়েছে। রীতিমতো ভালোবাসা -বাসির বিয়ে এলাহীর সাথে। ক্যাম্পাসে কাছে আসার ছলে চট করে হুটহাট চুমুর সংখ্যা কম নয়। আমরা দুজন ভাসিয়া এসেছি যুগল প্রেমের স্রোতে– চর্যা, এলাহীকে পাশাপাশি দেখলেই আড়ালে আবডালে কিছুদিন পর সবাই সরাসরিই বলতে শুরু করল মানিকজোড় অনন্ত প্রেম থেকে উঠে এসেছেরে।
এলাহীর চোখের হারাই হারাই ভাবটা আর নেই। ইচ্ছে হলে রাতে রুটিন মাফিক আদর, নয়তো পাশ ফিরে ঘুম। চর্যা প্রথম দিকে বিষয় গুলো স্বাভাবিক ভাবে নিয়েছিল। হয়তো অফিসে কত কাজ, ক্লান্ত থাকে। ঘুম দরকার, ঘুমাক।
এখন আর তা মনে হয় না। কিছু একটা গড়বড় আছে। অবশ্যই আছে। রাতে হুটহাট ফোন আসে।
আগে কখনো আসত না, এখন আসে প্রায়ই। কিছু জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘অফিসের।‘ ব্যস – এতটুকুই। আর ইদানীং তো কথা বলার দরকারই মনে করে না। সেদিন রাতে ঘুমন্ত এলাহীর গালে চুমু দিতে গিয়ে থমকে গেল, তারপর আর রুচি হয়নি। অশুচি লাগছে এলাহীকে।
এলাহীর এলার্জির সমস্যা নেই। ঘাড়ে গোটা গোটা লাল চাকার মতো দাগ ফুলে উঠেছে।
চর্যা, চর্যা –
ডাকার পরও কোনো উত্তর দিচ্ছে না। এলাহী অবাক হলো।
চর্যা বিড়াল স্বভাবের আদুরে টাইপ। একটু আদর পেলেই আইসক্রিমের মতো গলতে শুরু করে।অথচ আজ এত বার ডাকার পরও কোনো সাড়া নেই। অদ্ভুত তো।
এলাহী রান্না ঘরে উঁকি দিল। চর্যা রুটি বেলছে। আহামরি কোনো রাজকার্য না। ইচ্ছে করেই তবে শুনেও না শোনার ভান করছে। রাগ না অভিমান কোনটা?
সংশয় নিয়ে চর্যার পিছনে কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। নাহ্– চর্যা একবারের জন্যও পিছনে ফিরে তাকাল না। এলাহী নিশ্চিত ওর উপস্থিতি চর্যা টের পেয়েছে। তবুও এমন করছে।
চট করে চর্যার মুখটা ঘুরিয়ে চুমু খেল ঠোঁটে। দ্বিতীয় বার চুমু দিতে চাওয়ার আগেই চর্যা সরে গেল।
‘লজ্জা করে না তোমার? ছিহ্।‘
বসন্তের ঠিক দুপুরে বজ্রপাত হলেও এতটা ধাক্কা খেত না এলাহী। চর্যা এসব কী বলছে – নিজের প্রেম করে বিয়ে করা বউকে চুমু খেতে লজ্জা কেন করবে! আর কথাটা মজা করেও বলা না, চর্যা চোখে তীব্র আক্রোশ। হিংসুটে বিড়ালের মতো ফুঁসছে।
এলাহী ধীর পায়ে বেডরুমে চলে এলো ।

সংসার নাকি রঙ্গমঞ্চ। কথাটা কার সেটা মনে নেই। তবে যে বলেছে একদম সহী কথা বলেছে। নিজের দোষ আকাশ-পাতাল এক করে খুঁজছে এলাহী, পাচ্ছে না কিছু উল্লেখ করার মতো। হ্যাঁ, কিছুদিন আগে চর্যার কাছ থেকে একটু দূরে দূরে ছিল। সব সময় মাখামাখি ভালো লাগে না। মাঝেমধ্যে বিরতি নিতে হয়। সম্পর্কে বিরতি নিলে অনুভূতি তীব্র হয়। হাতের কাছে সব সময় পেয়ে গেলে মূল্যবান হীরাও দাঁত মাজার মফিজ কয়লা পাউডার মনে হয়।
চর্যাকে সে মফিজ কয়লা পাউডার বানাতে চায় না।
নিপাট ভদ্রলোক বলতে যা বুঝায় এলাহী তাই। বরং তারচেয়ে এক কাঠি সরেস। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এক চর্যাকে কনিষ্ঠা আঙুলে গিঁট দিয়েছিল, আজ পর্যন্ত সে ছাড়া দ্বিতীয় কোনো নারীর কথা ভাবেনি। কিন্তু ভাবার অনেক সুযোগ ছিল।
অফিসে সুন্দরী কলিগ, রিসেপশনিস্ট লাস্যময়ী। এগুলো নিয়ে কী এলাহী ভাবতে পারত না? অবশ্যই পারত। কিন্তু ভাবেনি। কাউকে যে চোখে লাগেনি এমনও তো না। মিসেস দোলা তো কেবল ইশারার জন্য অপেক্ষায় আছেন।
মোটামুটি লিজেন্ড এই মিসেস দোলা। আড়ালে আবডালে সবাই তাকে মিসেস বেড দোলা বলে ডাকে। সুপুরুষ মানুষের আহ্বান তিনি ফিরিয়ে দেন না। এলাহীর কানে এসব আসে – ঋষি তো না যে এদিক সেদিক একেবারেই দেখবে না। একটু -আধটু আর সবার মতো দেখে। ব্যস। এইটুকু তো দেখাই যায়।
অনেক হাতড়েও নিজের কোনো দোষ খুঁজে পেল না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টিশার্ট খুলতে গিয়ে প্রথমে এলাহীর ভ্রূ কুঁচকে গেল তারপর গা দিয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল।
ঘাড়ে লাল রিং চাকা, অস্পষ্ট হলেও বুঝা যাচ্ছে। কিন্তু যা বুঝা যাচ্ছে তা একশ কেন দশভাগ ও সত্যি না।
মেসবাহ সাহেব দুই দিন আগে বিয়ে পরবর্তী পার্টির আয়োজন করেছিল। অন্য সবার মতো এলাহীও গিয়েছিল। রাতে হালকা ড্রিংস এর পাশাপাশি একটু অন্য জিনিসও ছিল। নিষিদ্ধ জিনিস যা চর্যার কাছে। এইতো একদিনই তো ভেবে কয়েক পেগ বেশি খেয়ে ফেলেছিল ভদকা। তারপর যা হয় আরকি মাতালের মতো পার্টিতে মাতলামি। সে তো আর দশজন কলিগও করেছিল। কিন্তু মিসেস দোলা কখন তার কাছে এসেছিল এটাই মনে করতে পারছেনা। অন্য পার্টিতে কলিগদের মিসেস থাকে এই পার্টি ব্যতিক্রম শুধু মিসেস দোলাই ছিলেন। বেড দোলা।
ঘাড়ের লাল অংশে হাত বুলিয়ে পরখ করল।উহ্, এখনো জ্বলছে। নারী না রাক্ষসী! কে জানে?
উহ্।
বাহ্, আবার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখা হচ্ছে।
এলাহী থতমত খেয়ে গেল। চর্যা এত নিঃশব্দে পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি।বেড়াল হয়ে গেল নাকি!
এলাহী বুঝতে পারছে না কী বলা উচিত, জীবনে প্রথম এরকম অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। সামনে হবে এমন পরিস্থিতি এমন সম্ভাবনা নেই। ঘটনাটা আসলে সত্যি হয়েছে কি না তা নিয়ে ও সংশয়। পৃথিবীতে যা কিছু ঘটে সব তো বাস্তব না। কিন্তু চর্যা কে কি করে বুঝাবে – এতো একেবারে মাথা পাগলা হয়ে আছে। নিজেই যেখানে সংশয়ে ভুগছে সেখানে অন্যকে পথ দেখানো বেমানান।
চর্যার বিষ বাক্য হজম করতে থাকে এলাহী।
‘কি না দিয়েছে তোমায়, বলো? মন, শরীর যা আছে সব। তারপর ও তোমার আশ মেটেনি? এতটা নীচে কী করে নামলে এলাহী? ‘
বেশি রেগে গেলে চর্যা নাম ধরে ডাকে। মেয়েটা যে এত রাগতে পারে এলাহীর ভাবনাতেও ছিল না। কেমন জানি শীত শীত লাগছে। নারী বুদ্ধি প্রলংকরী। চর্যা যদি আরো ভয়ানক হয়ে উঠে কি করে সামলাবে কিছুই মাথায় আসছে না। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার কোনো রাস্তাও খুঁজে পাচ্ছে না। হাঁসফাঁস লাগছে, পেটের ভেতর অস্থির গুড়গুড় করছে। মনে হচ্ছে বড় বাথরুমে সারতে পারলে স্বস্তি পেতো।
‘যাচ্ছো কোথায়? সত্য কথা গুলো নাপার মতো তেতো তাই না?’ পরনারীর চুমু খুব মজা না?এই জন্য একসপ্তাহ ধরে সহজে আমার কাছে আসতে না, তাই না? টাটকা টাটকা ভাব যে তাহলে চলে যাবে। ‘
‘কি যা-তা বলছ, মাথা গেছে তোমার। সর, আমি গোসলে যাব – অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে।‘
চর্যা কিছুক্ষণ চিৎকার করে ড্রেসিং টেবিলে মাথা রেখে কাঁদতে লাগল। সব কিছু অসহনীয় লাগছে।এখন নাকি তারাতাড়ি অফিস যাওয়া লাগে। কই, আগে তো কখনো এমন করে বলেনি। ওমা গো, আমার সব শেষ। একদম সব শেষ।
ড্রেসিং টেবিলের উপর নীল নেইলপালিশটা ছুঁড়ে ফেলে দিল। টাইলসে নেইলপালিশের কাঁচের ছোট্ট কৌটা ভেঙে নীল সরল রেখা দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে। নেইলপালিশটা কিছুদিন আগে এলাহী এক হাজার টাকা খরচ করে নিয়ে এসেছে। আজ চোখের সামনে এটাই পড়ল – ভেঙে ও শান্তি হচ্ছে না।
আরো হিংস্র, কঠিন কিছু করতে ইচ্ছে করছে। কতবার মনে মনে হিসাব করেছে, এটা এলার্জির দাগ নয়তো পোকার কামড়। পরক্ষণেই মন বলেছে না, এটা মেয়ে মানুষের… ছিহ।
নাস্তার টেবিলে মুখ নিচু করে কোনরকমে লবণ ছাড়া সবজি দিয়ে রুটি একটা খেল। বাক্য ব্যয় করার সাহস হচ্ছে না। ব্যয় জিনিসটাই আসলে খারাপ।
‘খাওয়া শেষ! মাত্র একটা রুটি খেলে।‘
‘হুম।‘
‘এখন তো যত তারাতাড়ি শেষ করা যায় তত ভালো। পারো তো এই সম্পর্কটাও শেষ করে দিও।‘
কিছু বললেই বিপদ বাড়ে। চুপ থাকাই নিরাপদ। চর্যার এই রূপ কখনো চোখে পড়েনি। মেজাজ খারাপ থাকলে সেটা প্রকাশ করতে না পারলে আরো খারাপ হয়।
‘কোনো উত্তর দিচ্ছো না কেন! আমি অসহ্য হয়ে গেছি না? যখন প্রেম করতে আমার সাথে তখন খুব মধু ছিলাম – টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যেতে ফাঁকা ক্লাস রুমে চুমু খাওয়ার জন্য। আর এখন– ‘
কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে দ্রুত বাসা থেকে বের হয়ে এলো এলাহী।
অফিসে সব নরমাল। গত তিনদিনে কি একটু ফিসফাস হতো না বেড দোলা কাজটা করে থাকলে! সবার মুখের দিকে তাকায় আড়চোখে, কিছুই ধরা পড়ে না। এলাহীর অস্বস্তি বাড়ে, পেটে গুড়গুড় শব্দ হয়।
‘এই যে এলাহী সাহেব – ‘
চমকে উঠল। আতিক তালুকদার ডাকছেন পাশের ডেস্ক থেকে।
মুখ না তুলেই বলল, ‘ বলুন, তালুকদার সাহেব।‘
‘খবর শুনেছেন কিছু? ‘
‘কী খবর, কম্পিউটার স্ক্রিন থেকে মাথা না তুলেই জিজ্ঞেস করল এলাহী।‘
‘আমাদের বড় সাহেবের পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘বেড দোলা ‘ খুন হয়েছেন।
‘কিহ– ‘
‘এত জোরে কিহ টা উচ্চারণ করলেন যেন আপনার বড়সড় ক্ষতি হয়ে গেছে। হুউ, ছিল নাকি কিছু? ‘
এলাহীর মেজাজটা খারাপ হয়ে গেল । তালুকদার শুকরটা লাথি দিয়ে আট তলা থেকে ফেলে দিতে ইচ্ছে করছে।
‘এরা সমাজের নষ্টা মেয়ে। যত কমে তত ভালো। শুনছি তদন্ত হবে, অফিসে জিজ্ঞেসবাদ হবে– কতগুলো নষ্ট পুরুষ ও চিহ্নিত হবে। হা হা হা। ‘
গ্রীষ্মের গরমেও শীত লাগছে। ঘাড়ে মেয়েলি আঁচড়, কামড় – পুলিশের জিজ্ঞেসবাদ..
তারপর আর কিছু ভাবনায় আসে না। নষ্ট, সব নষ্ট।
কী হবে এখন, পেট আবার কেমন জানি মোচড় দিচ্ছে। এলাহী ওয়াশরুম বরাবর এক দৌড়ে দিল ।
তালুকদার গোঁফে তা দিয়ে হাসলেন। ‘পাপ, সব পাপ। ‘
পাপ – পূণ্য নিয়ে এলাহী কখনোই অতিরিক্ত ভাবেনি। তার মাথায় এটা সেট করে নিয়েছিল সুস্থ মস্তিষ্কে চর্যার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। আর এখন পাপ না করেও বিশ্বাস ভঙ্গের দায় ঘাড়ে নিতে হচ্ছে। মিসেস বেড দোলার সাথে মাখামাখি মাখন সম্পর্ক তার কখনো হয়নি। এত কলিগ থাকতে তার ঘাড়েই কেন বেসামাল হয়ে চুমু খেতে আসল, আর আমিই তখন কোন চুলোয় মরতে গেলাম। বেসিনে মুখ ধুতে গিয়ে সাতপাঁচ ভাবনার পর আয়নায় শার্টের কলারের কাছের বোতাম খুলে আবার দেখে – লালচে চাকা চাকা। অস্বস্তির চেয়ে একটা ভয় মাকড়সার মতো জাপটে ধরে।
চর্যা জীবনের প্রথম নারী এবং জানামতে শেষও। কিন্তু এই বেড দোলা সব নষ্ট করে দিল। একেবারে সব। এলাহী দিশেহারা বোধ করছে। জীবনে কখনো কারো সাতেপাঁচে থাকেনি আর তাকেই ফাঁসানো হলো। সজ্ঞানে থাকলে বেড দোলা কখনোই তার ঘাড়ে ড্রাকুলা টাইপ কামড় বসাতে পারত না। এদিকে বেটি আবার খুন হয়ে বসে আছে। ওহ্, আমার চর্যা… ডেস্কে বসে নিজের মাথার চুল দু’হাতে খামচে ধরে এলাহী।
ভালোবাসায় কী লাগে – কাপড়ের ব্যাগ গুছাতে গুছাতে চর্যা ভাবে। রান্না ঘর থেকে পোড়া গন্ধ আসে,তরকারি পুড়ে যাচ্ছে। যাক । এই ফ্ল্যাটের কোনো কিছুতে আর কিছু যায় আসে না। একদম সব ছেড়ে ছুঁড়ে চলে যাবে। থাকুক ও চুমু খাওয়া পরনারী নিয়ে।
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চারদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। নাহ্, আর কিছু নেই নেওয়ার মতো। ব্যাগে নিজের কাপড়, টুকটাক কয়েকটা জিনিস ছাড়া আর কিছু নেয়নি। বুক ভেঙে কান্না আসছে দেয়ালের ছবিটার দিকে তাকিয়ে।
একদম বিয়ের কিছু দিন পর তোলা। চর্যার কপালে এলাহী চুমু দিচ্ছে আর চর্যা লজ্জায় চোখ বন্ধ করে এলাহীর দুই বাহু খামচে ধরে আছে। দোটানায় পড়ে গেল – ছবিটা নিবে কি নিবে না ।
থাক, যেখানে আছে সেখানে।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়াল। বুক থেকে আঁচল সরিয়ে দেখল। বিয়ের পর একটুও মোটা হয়নি। আরো আবেদনময়ী ভাব বরং চলে এসেছে স্বাস্থ্যে। অফিসের পার্টিতে এলাহী কখনো চর্যাকে নিয়ে যায়নি। পরপুরুষ তার কোমড় ধরে নাচবে, আলটপকা চুমু খাবে সে সহ্য হবে না এলাহীর।
বুকে আঁচল জড়িয়ে মুখ তোয়ালে ভিজিয়ে মুচে নিল। এলাহী অফিস থেকে ফিরলে ওর সামনে গটগট করে চলে যাবে এইজন্য অপেক্ষা করছে।
ঘড়ির কাঁটা সাতটা ছুঁই ছুঁই। ছয়টার মধ্যে প্রতিদিন চলে আসে আজ হলোটা কী।
ঘরময় পায়চারি করতে করতে কলিং বেলের আওয়াজ কানে আসে। ধীর পায়ে দরজা খুলতেই এলাহী চর্যার গায়ে এলিয়ে পড়ে। মুখ থেকে ভদকার গন্ধ বের হচ্ছে। বাহ্, চরিত্রের তাহলে বেশ উন্নতি হয়েছে।
নেতিয়ে বিছানায় পড়ে আছে। এভাবে রেখে চলে যাওয়া যায় না। একটু আগে বমি করে ঘর ভাসিয়ে দিয়েছে। চর্যা একা হাতে সব পরিষ্কার করে, এলাহীর গা মুছিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছে।
ঘুমন্ত মানুষটাকে এত নিষ্পাপ লাগছে– বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শুরুর কথা মনে পড়ছে। একটাই কমিটমেন্ট ছিল কখনো কেউ কারো সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না। এলাহী রাখতে পারল না।
দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ওর নাকের নিচে একটা আঙুল রাখল, গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলছে। গভীর ঘুম। যাবার আগে এলাহীর কপালে একটা চুমু দিতে গিয়ে আটকে গেল চর্যা। গভীর ঘুমেই চর্যার ঠোঁট দখল করে নিল এলাহী। ‘ আত্রলিতা, তোমায় আগের মতোই গভীর থেকে গভীরতর ভালোবাসি।‘
চলেই গেলো! এগারোটায় সকাল হয় না, তখন ব্রাঞ্চ টাইম। পাঁচ মিনিট কম এগারোটায় ঘুম ভাঙার পর কম ফর্সা চর্যাকে দেখতে পেল না কোথাও। ঘুম ঘুম গলায় কিছুক্ষণ ডাকার পর বুঝতে পারল নেই। নেই মানে সত্যি সত্যি নেই।
টেবিলে এলার্ম ঘড়ি দিয়ে চাপা একটা ছোট্ট চিঠি।
এলাহী
খারাপ লাগছে। অনেক বেশি রকম খারাপ লাগছে।
এতটুকুই। আর কিছু লেখা নেই। ছয় বছরের প্রেম আর তিন বছরের সংসার– শেষ কি তবে?
কোনো মতো শুকনো বাসি বনরুটি মুখে ঠেসে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। আগে অফিসে তারপর না হয় যা করার করা যাবে।

অফিসে হালকা আমুদে পরিবেশ। সচারাচর এমন পরিবেশ থাকে না। এলাহী যেতেই সোবহান সাহেব দৌড়ে মুক্তাগাছার মণ্ডা এলাহীর মুখে ঠেলে দিল।
‘ব্যাপার কী? ‘
‘ব্যাপার অনেক কিছু। একটু আগে এলে নাটকটা দেখতে পারতেন। যা একটা রগড় হয়েছে না। হো হো হা হা। ‘
পুরোপুরি ভ্যাবচ্যাকা কাটতে না কাটতেই কাহিনিটা শুনল আগা থেকে মাথা পর্যন্ত। একবার শোনার পর আরো দুই -তিন বার শুনল, মনে হচ্ছে প্রাণ ভোমরা ফিরে পেয়েছে।
এলাহী কোনমতে হাসি চাপতে চাপতে বলল,’তারপর, তারপর কী হলো সোবহান সাহেব? ‘
‘হা হা হা, তারপর আর কী – অফিসে লেইট করে এসেও মুক্তাগাছার মণ্ডা পেলেন।‘
নিজের ডেস্কে বসে পুরো ঘটনা শুরু থেকে শেষ অবধি মনে করে আবার হাসতে লাগল আপনমনে। যতক্ষণ না চর্যাকে বলা হচ্ছে ততক্ষণ ঘটনাটা পুরনো হবে না।
উফ্, তালুকদার সাহেবের মনে এই ছিল । কি করে পারল লোকটা! তবে মিসেস বেড দোলার মৃত্যুর জন্য খারাপ লাগছে। যতটা শোনা যায় মহিলাটা আসলে ততটা খারাপ ও না। একটু ঢলে পড়া স্বভাব ছিল চরিত্রে, আর একটু লোভ কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়ার।
সপ্তাহ খানেক আগে পার্টিতে এলাহী অন্য সবার মতো বেসামাল অবস্থায় চলে গেলে মিচকে তালুকদারের মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি খেলে যায়। এলাহী বড্ড বউ ন্যাওটা, সব জায়গায় বউয়ের প্রশংসা। এদিকে তালুকদারের ঝাঁটা কপাল। উঠতে ঝাঁটা, বসতে ঝাঁটা।
তাই মোক্ষম সুযোগ খুঁজছিলেন কিভাবে পারফেকশনিস্ট এলাহী সাহেবকে অন্তত প্রিয়তমা বউয়ের কাছে নাকাল করা যায়। রিস্কি হলেও কাজটা করেই ছাড়লেন। সবাই যখন টলমল অবস্থায় ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছে তখন চুপিসারে বেহুশ এলাহীর ঘাড়ে আস্তে করে চুমু দিতে দিতে একটা লাভ বাইটই দিয়ে দেন । আর বাড়তি হিসেবে কয়েকটা নখের আঁচড়। মিসেস বেড দোলার নখ লম্বা সে তো সবাই জানে।
আর তারপর তো এলাহীর অফিসে আমসি মুখে আসা, বসের রেগুলার ঝাড়ি খাওয়া, ডেস্কে মুখ কালো করে বসে থাকা… আহা– তালুকদার সাহেব এত স্বর্গীয় সুখ কোনোদিন বোধহয় পাননি।
মিসেস বেড দোলা অকারণেই ফেঁসে গেলেন। মহিলা তো এলাহীকে আজ পর্যন্ত কোনো ইঙ্গিত দেননি,বরং উপরের তলার বুড়ো হামবড়াগুলো তার টার্গেট। তালুকদার সাহেব কিছুদিন পিছনে ঘুরেছিলেন, পাত্তা পাননি। তাই এত জ্বলুনি, লোকটা যাচ্ছে তাই রকম খারাপ।
অফিসে তালুকদার সাহেবের একটা গোপন নামকরণও হয়ে গেছে। ‘ ম্যান ইন্টারেস্টেড দার ‘। মিচকা লোক নিজের ফাঁদে নিজেই পড়েছে।
এলাহীর দুরাবস্থা দেখে নিজের কুকীর্তি গর্বের সাথে হাসতে হাসতে বলেছে কিন্তু এদিকে যে নিজের চরিত্রে কলঙ্ক লাগল সেটা টের পেল না –ম্যান ইন্টারেস্টেড দার।
খালি ফ্ল্যাটে হাঁসফাঁস লাগছে। চর্যা মহারাণীর রাগ ভাঙাতে হবে। কঠিন রাগ করে বসে আছে। এলাহী পরকীয়ায় জড়িয়ে গেছে সেটা কষ্ট না তারচেয়ে বড় কষ্ট কেন বলে কয়ে করল না। আশ্চর্য মেয়ে চর্যা, কোনোদিন কেউ শুনেছে বউয়ের কাছে বলে কয়ে কেউ পরকীয়া করে!
জানালার গ্রিলে পা দিয়ে শুয়ে থাকতে থাকতে খালি পেটে চট করে এলাহীর মাথায় একটা হালকার মধ্যে গর্জিয়াস দুষ্ট বুদ্ধি খেললো। চর্যাকে একটু ডোজ দিলে কেমন হয়! অকারণে কয়েকদিন অনেক পেইন দিয়ে এখন বাপের বাড়ি গিয়ে বসে আছে। ছোট একটা ডোজ দেওয়াই যায়।
‘আহহা…এলাহী সাহেব, নিজের বউকে এমন ডোজ দিবেন! আপনার মিসেস কিন্তু ঘাবড়ে যাবে। সাদা চোখে উনার তো কোনো দোষই নেই। এমনিতেই কত কষ্ট পাচ্ছেন না জানি এই কাজ করলে তো – না, না আমি পারব না। ‘
‘প্লিজজজ, সোবহান সাহেব। জাস্ট এই উপকারটুকু করুন।বাকিটা আমি সামলে নিব। ‘
‘বলছেন তো? ‘
‘হ্যাঁ, বললাম তো সামলে নিব। ‘
‘সত্যি, পারেন ও – মেয়ে জাতির এমনেই চোখ থাকে পানিতে টসটসে, এই কাহিনি করলে তো আপনার মিসেসের চোখের পানিতে নরসুন্দার মতো একটা নদী হয়ে যাবে।‘
‘আহহা, হোক না। আপনি শুধু কাজটা করে দিন।‘
এলাহীর বুকে হাজার ড্রামের শব্দ হচ্ছে। তিন বছর আগে যখন আগে যখন পালিয়ে বিয়ে করে তখনও এরকম লাগেনি। আজ লাগছে। লাগার যথেষ্ট কারণ এর মধ্যে এলাহী ঘটিয়ে ফেলেছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে অন্য জায়গায়। সোবহান সাহেবের কথা শুনে যেরকম রিয়েক্ট করার কথা ছিল তার কিছুই করেনি চর্যা। অধিক শোকে পাথর হয়ে গেল নাতো। রাগে নিজের হাত কামড়াতে ইচ্ছে করছে।
বিকেলের রোদ মরে এসেছে। চর্যার চোখ মুখ ফুলে চাকমা টাইপ হয়ে আছে। সকালে এলাহীর অফিস থেকে এক কলিগ ফোন করেছে। ঘটনার আগাগোড়া সবটা বলে লোকটা সারমর্ম বলল,সেই সারমর্ম হচ্ছে এলাহীর ফাইনাল ডিসিশন। ‘অকারণে এলাহীকে দোষারোপ করায় গভীর মর্মাহত হয়েছে। তবে ক্ষমা করে দিয়েছে কিন্তু সিদ্ধান্ত নিয়েছে দ্বিতীয় বিয়ে করবে।‘
এরপর চোখ হয়ে গেছে হাম হান ঝর্ণা। বাসার সবাই কত প্রশ্ন করল চর্যা পাথর হয়ে বসে আছে।আর বুক ভেঙে একটু পর পর কান্না আসছে। এলাহী দ্বিতীয় বিয়ে করছে এই দৃশ্যটাই কল্পনা করতে পারছে না। তাদের বেড রুমে অন্য একটা মেয়ে নিয়ে শোবে, আর সেই মেয়ের সাথে কপালে আবার চুমু খেয়ে আরেকটা ছবি…
কিছু একটা খেয়ে নে মা। কান্না করতেও তো এনার্জি লাগে। চর্যার মা যথেষ্ট বিরক্ত মেয়ের উপর। এত যে জিজ্ঞেস করা হলো কী হলো, ঘটনা কী – মেয়ের মুখে কোনো রা নেই। প্রেগনেন্সির দুই মাস সে খবর পর্যন্ত মেয়ের হুঁশ ছিল না। ফট করে জামাইয়ের সাথে রাগ করে চলে এলো! এই অবস্থায় রাগ – গোসা করলে বাচ্চা হবে রাগী। রাগী বাচ্চাদের মাথার চুল থাকে সজারুর মতো কাঁটা কাঁটা। বাপরে বাপ, দুনিয়ায় বিচ্ছু হয় এগুলা।
চর্যার চেয়ে গর্ভে লোডিং হওয়া নাতির চিন্তায় মন চঞ্চল হয়ে উঠছে।

কলিং বেল বাজিয়েই যাচ্ছে । এলাহীর শার্ট ঘামে একাকার হয়ে গেছে এই নভেম্বর মাসেও। যাবতীয় সব দুর্ঘটনার কথা চিন্তা করে হার্টবিট বেড়েই যাচ্ছে। আর দুই মিনিটের মধ্যে দরজা না খুললে হয়তো দমবন্ধ হয়ে মরে পড়ে থাকবে রান্নাঘরের তেলাপোকার মতো।
ফোলা চোখ মুখ নিয়ে দরজা খুলল চর্যা। শ্বশুর বাড়ি বলে জাপটে ধরে চুমু খেতে পারছেনা চর্যাকে।
মাথা নিচু করে চর্যা বলল, ‘নতুন বউ খুব সুন্দর না? আমি তো কিছু দিতে –‘
পেছন থেকে শাশুড়ি মা চিল চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘ কি মেয়েরে তুই, জামাইকে কেউ দরজায় দাঁড় করিয়ে রাখে – এক বাচ্চার মা হতে যাচ্ছে তাও যদি আক্কেল হয়। ‘
শাশুড়ি মা চলে যাওয়ার সাথে সাথে এলাহী চর্যাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। নাহ্, আশেপাশে কেউ নেই এখন। ঠোঁটে গভীর চুমু দিয়ে বলল, ‘ আত্রলিতা গভীরতর ভালোবাসি। ‘
চর্যা অভিমান গাল ফুলিয়ে বলল, ‘ চুমু খাচ্ছ ভালো কথা, নতুন বউয়ের নাম ধরে আমায় ডাকছ কেন? ‘
এলাহী হাসল, ‘চর্যাই আমার আত্রলিতা, নামটা এবারের পঁচিশতম জন্মদিনে তোমার উপহার। ‘
কিছুটা সংশয় নিয়ে এলাহী জিজ্ঞেস করল ,’শাশুড়ি মা কি বলছিল এক বাচ্চার মা না কি যেন – ‘
আবার একটা চিল চিৎকার, ‘ চর্যা তোর কি আক্কেল হবে না! এখনো জামাইকে দরজার কাছে দাঁড় করিয়ে রাখলি – এ্যাঁ, এক বাচ্চার মা হতে যাচ্ছিস। কবে আর বুদ্ধি শুদ্ধি হবে! সবই আমার কপাল’।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top