সিডনী বুধবার, ১৮ই মে ২০২২, ৪ঠা জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯

অমলার যুদ্ধ : হাসান আলী


প্রকাশিত:
২৮ এপ্রিল ২০২২ ১৭:২১

আপডেট:
২৮ এপ্রিল ২০২২ ১৭:২৪

 

শরীয়তপুরে মনোহর বাজারে একদিনে পাক হানাদার বাহিনী ৩৬০জন নিরীহ মানুষ কে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করে। মৃত্যু আতংকে, জীবন বাঁচাতে মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে।বাবা মা ছয় মাস বয়সী অসুস্থ অমলাকে নিয়ে ভারতে যাবার কথা ভাবতে পারছেনা। অবশেষে প্রতিবেশী এক মুসলিম পরিবারে অমলা এবং সত্তুর বছর বয়সী ঠাকুরমাকে রেখে অমলার বাবা মা ভাই বোন ভারতে আশ্রয় নেন।
রাহেলা বেগমের কোলে তিন মাস বয়সী আজিজ।অমলা আর আজিজ দুই জন রাহেলার বুকের দুধ ভাগাভাগি করে খেত।
চিকিৎসা সেবা যত্নে অসুস্থ অমলা সুস্থ হয়ে উঠলো। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীন দেশের মাটিতে অমলার বাবা মা, ভাই বোন, আত্মীয়-স্বজন ফিরে এলো।
অমলাকে রাহেলার কোল থেকে কেউ নিতে চাইলে চিৎকার করে কেঁদে উঠতো। অমলা নিজের মায়ের কোলে ও যেতে চাচ্ছে না। একবার জোর করে অমলাকে বাড়ি নিয়ে গেলে
জ্বর উঠে,বমি করে অবস্থা খারাপ হয়ে যায়।
বাধ্য হয়ে অমলাকে আজিজের মায়ের কাছে রেখে আসে। আজিজের মা বাবা দুজনেই অমলার জন্য পাগল।দুই বাড়ির আদর যত্নে অমলা বড় হয়ে উঠে। পাঁচ বছর বয়সে অমলা আপন মায়ের কাছে ফিরে যায়।
একই স্কুলে একেই ক্লাসে অমলা আর আজিজ দুই ভাই বোন ভর্তি হলো। স্কুলের পাশেই আজিজদের বাড়ি।অমলা দের বাড়ি কিছু টা দূরে। স্কুল ছুটি হলেই অমলা আজিজদের বাড়ি যায়। আজিজের মাকে অমলা মা বলেই ডাকে।
কোন কোন দিন অমলার বাবা কিংবা ভাই আসে অমলাকে নিতে।অমলা কোন দিন যায় কোন দিন যায় না।
ক্লাসের ছেলেমেয়েরা অমলাকে বলে,তোর অনেক ভাগ্য, দুইটা মা!
দূর্গা পূজার সময় আজিজের বাবা অমলার জন্য নতুন জামা কাপড় কিনে দেন আবার অমলার বাবা ঈদের সময় আজিজের জন্য নতুন জামা কাপড় কিনে দেন।
বড় ক্লাসে পড়ার সময় সহপাঠীরা মাঝে মধ্যে অমলা কে বলতো,তুই কি হিন্দু নাকি মুসলমান?

অমলা হাসতে হাসতে বলতো, জানি না! তবে আমি আর আজিজ একই মায়ের দুধ ভাগাভাগি করে খেয়েছি!
এসব কথা আর বাড়ে না,হাসি ঠাট্টা করে শেষ হয়ে যায়। বাবা মারা যাবার পর আজিজ লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে সংসারের হাল ধরেছে।
অমলা উচ্চ শিক্ষা শেষে ভালো বেতনে চাকরি করে।
প্রতিবার ভাই ফোঁটার দিন আজিজ অমলার জন্য একটা শাড়ি কিনে নিয়ে যায়। অমলা আজিজের পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন জামা কাপড় উপহার দেয়। কাছে বসে ভাইকে নানা পদের খাবার খেতে দেয়। মায়ের জন্য ও আলাদা করে খাবার পাঠিয়ে দেয়। আজিজ কে মনে মনে ভাই ফোঁটা দেয় এবং ঠাকুরের কাছে ভাইয়ের দীর্ঘায়ু কামনা করে প্রার্থনা করে। ্
বিদায় বেলায় অমলা ভাইয়ের পিছন পিছন রাস্তা পর্যন্ত আসে।ভাইকে বার বার মনে করিয়ে দেয় যেন মায়ের খোঁজ খবর ঠিক মত রাখে।
আজিজের সংসারে অভাব অনটন দিন দিন বাড়ছে। জমিতে ফসল বুনে তেমন একটা লাভ হয় না। ফসল উৎপাদনের খরচ বাড়ছে আবার ফসল বিক্রি সময় দামও পাওয়া যায় না। ঋণের জালে আটকা পড়েছে আজিজ। দায় মুক্ত করতে অমলা বেশ কয়েকবার টাকা পয়সা দিয়েছিল আজিজ কে কিন্তু কোন ফল হয়নি।
অমলা নিজের মাকে প্রতি মাসে ভরণ পোষণের জন্য টাকা পয়সা দেন আবার আজিজের মাকে ও দেন।যে টাকা এই দুই মায়ের জন্য দেন সেগুলো ওষুধ কিনতেই শেষ হয়ে যায়। দুই মায়ের শরীর দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। অসুখ একটার পর একটা লেগেই আছে।
প্রতিবেশী দের কয়েক জন আজিজের মাকে বলেছেন, হিন্দু মেয়ের সাহায্য নিলে আপনার ইবাদত বন্দেগী হবে না।
আজিজের মা এসব কথা কানে তোলেন না।কারণ তিনি একাত্তর সালে তীব্র সমালোচনার মুখে অমলাকে বুকের দুধ দিয়েছেন এবং অসুস্থ ঠাকুর মাকে নিজ হাতে সেবা শুশ্রূষা করেছেন। তিনি আজিজ অমলার মধ্যে প্রার্থক্য খুঁজে দেখতে চাননি,দেখেছেন সন্তান হিসেবে।
একদিন রাত দশটার দিকে অমলা ফোন পেল আজিজের মা গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। স্বামী অনিলকে নিয়ে অমলা ছুটে গেলেন আজিজদের বাড়িতে। মাকে সদর হাসপাতালে এনে ভর্তি করে দিলেন। সপ্তাহ খানেক পর কিছু টা সুস্থ হলে মাকে নিজের বাসায় নিয়ে আসলেন। এদিকে অমলার আপন মা ও মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকেও বাসায় নিয়ে আসলেন।দুই দিকে ছুটোছুটি করা ৫২বছর বয়সী অমলার জন্য অনেক কষ্টকর।
অমলার ছেলে মেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লেখা পড়া শেষে কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। তাঁরা এসেছে দুই দিদিমার অসুস্থতার সংবাদ শুনে।
আজিজের মায়ের নামে চল্লিশ শতক ধানের জমি আছে।এটা তিনি তাঁর পিতার কাছ থেকে পেয়েছেন। সেই জমিটুকু অমলাকে দানপত্র করে দিতে চান। অমলা কিছুতেই নিতে রাজি হচ্ছে না।
কদিন ধরে অমলা কে আজিজ সুপারিশ ধরেছে মাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে। অমলা বলছে,মা তো যেতে চায় না। তুমি বুঝিয়ে নিতে পারলে নিয়ে যাও।
আজিজ মায়ের হাত ধরে পাশে বসে বললেন,মা তুমি বাড়ি চলো।পরের বাড়ীতে আর কতদিন থাকবে!
আজিজের মা শান্ত কন্ঠে বললেন, আমি অমলার হাতে মরবো।
অমলা আড়ালে দাঁড়িয়ে মায়ের কথা শুনে অঝোরে কাঁদছেন।

 

হাসান আলী
সভাপতি, এজিং সাপোর্ট ফোরাম
ট্রেজারার, বাংলাদেশ জেরাটলজিক্যাল (বিজিএ) অ্যাসোসিয়েশন

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top