সিডনী রবিবার, ৭ই আগস্ট ২০২২, ২৩শে শ্রাবণ ১৪২৯

শরণার্থীর সুবর্ণরেখা (পর্ব- ৬) : সেলিনা হোসেন


প্রকাশিত:
২৬ জুলাই ২০২২ ২০:৩০

আপডেট:
২ আগস্ট ২০২২ ১৫:০১

 

তারা দ্রুতপায়ে হেঁটে মেয়েটির কাছে এসে দাঁড়ায়। দেখতে পায় মেয়েটি নড়াচনা করে না। তাহলে কি ও অসুস্থ? নাকি মরে গেছে?
মারুফ পাশে বসে কপালে হাত রাখে। একদম ঠান্ডা হয়ে আছে শরীর।
- আব্বা মনে হয় মেয়েটি মরে গেছে।
- বলো কি? ওর সঙ্গে কেউ নেই? বাপ-মা-আত্মীয়স্বজন?
- নিশ্চয়ই আছে। মেয়েটিতো একা সীমান্ত পাড়ি দেবে না।
- চলো, আমরা সরে যাই। ওকে খুঁজতে কেউ এখানে এলে আমাদেরকে দেখে সন্দেহ করবে। কিভাবে মেয়েটি মারা গেল। কে জানে?
রবিউল ও মারুফ আবার সেই গাছতলায় গিয়ে বসে। তখন দেখতে পায় পূর্ণিমা এদিক-ওদিক তাকাতে তাকাতে হাঁটছে। একসময় মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ছুটে যায়। কাছে গিয়ে হুমড়ি খেয়ে ওর ওপর গড়িয়ে পড়ে। চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। চারদিক থেকে নানা লোক এগিয়ে আসে। রবিউল আর মারুফও যায়। সবাই দাঁড়িয়ে থাকে। পূর্ণিমা চিৎকার করে বলে, আমার মেয়েটাকে কে মেরে ফেলল?
কারো মুখে কোনো কথা নেই।
- আপনি ওকে আপনার সঙ্গে রাখেননি কেন?
- রেখেছিলামতো। কেউ একজন ডাকলে ও তার পিছে পিছে যায়। লোকটি বলে, কিছুক্ষণ পরে ওকে আমি দিয়ে যাব।
- ওই লোকের সঙ্গে ওকে যেতে দিলেন কেন?
- ওতো আমাদের সঙ্গেই গ্রাম থেকে এসেছে।
- মেয়ের বাবা কোথায়?
- পথে মরে গেছে। অসুখ ছিল। হাঁটতে পারছিলনা। পূর্ণিমা আবার চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে। কাঁদতে কাঁদতে মেয়ের মাথা কোলে উঠিয়ে নেয়।
- আপনার মেয়ে কি একটাই?
- দুটো ছেলে আছে। মেয়ে একটাই।
- ওরা রাস্তার ধারে বাবাকে মাটির নিচে শুইয়ে দেয়ার জন্য রয়ে গেছে। শেষ করে আসবে। এখানে দাহ করা যাবে না। নাহলে তো বনের জন্তুরা খেয়ে শেষ করবে।
- আপনি কি করছেন?
- আমি রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করছি।
- মেয়েকে মাটি চাপা দেয়ার ব্যবস্থা করবেন?
- কেমন করে করব? আমি জানিনা।
- আমরা এখানে একটা গর্ত খুঁড়ে দেব?
- না, দরকার নাই। আমি নদীতে নেমে মেয়েকে ডুবিয়ে দেব। ও নদীর তলে গিয়ে শুয়ে থাকবে। ওকে তো দাহ করা যাবেনা।
- নদীতে আপনার নামতে হবেনা। ওকে নদীতে ভাসিয়ে দিলেই হবে। ডুবে যাবে।
- হায় ভগবান, স্বামী গেল মাটির নিচে। মেয়ে যাবে জলের নিচে। যুদ্ধ, যুদ্ধ। যুদ্ধ আমাদের স্বাধীনতা। দিলাম স্বামীকে, দিলাম মেয়েকে। কারো জন্য শ্মশান নাই।
মারুফ পাশে বসে বলে, আমার ছেলেটিকেও মাটি চাপা দিয়েছি। ওটাকে কবর দেয়া বলেনা। এই সময়ে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবারই একই অবস্থা হবে। বিশেষ করে আমাদের মতো শরণার্থীদের।
- তুমি মেয়েটার পা ধর। আমি মাথা ধরি। চলো নদীতে নামাই। আমার মেয়ের নাম মালতী।
মারুফ ওর পা বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে। পূর্ণিমা মাথা জড়িয়ে ধরে নদীতে নেমে যায়। মারুফ ছেড়ে দিলে পূর্ণিমা ওকে জড়িয়ে ধরে। দুজনে ভেসে চলে যায়। একটু পরে আর কাউকে দেখা যায়না। তলিয়ে গেছে নদীতে।
রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা লোকেরা দুহাত উপরে তুলে বলে, জয় বাংলা। শরণার্থী শিবির মুখরিত হয় জয় বাংলা ধ্বনিতে।
জয় বাংলা ধ্বনি থামলে মারুফ বলে, মেয়েটিকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে। একটা বদমাইশ। ওর বুকের ভেতর দেশের স্বাধীনতা নাই। যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে শয়তানি করা ওর চিন্তা। আমরা চিনলে ওকে লাত্থি দিয়ে মেরে ফেলতাম। শত মানুষের লাত্থির নিচে ওর উঠে দাঁড়াবার শক্তি থাকতনা।
আর একজন বলে, একজন মা স্বাধীনতার জন্য নিজের জীবন দিয়ে দিল।
সবাই মিলে আবার চিৎকার করে জয় বাংলা ধ্বনি বলে। জয় বাংলা শব্দে মুখরিত হয়ে যায় যশোর রোড। ওরা দূর থেকে দেখতে পায় শরণার্থীরা ঢুকছে। তাদেরকে জয় বাংলা বলে স্বাগত জানায় সীমান্তে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন ভারতীয়। চারদিকের জয় বাংলার ধ্বনিতে আঁকা হয় স্বাধীনতার সুবর্ণরেখা। মারুফ প্রবলভাবে অভিভূত হয়। শ^শুরের হাত ধরে টেনে বলে, চলেন, মায়ের কাছে যাই। জয় বাংলা ধ্বনির এই আনন্দ মায়ের সামনে ছড়াতে চাই। আমাদের ভারতীয় বন্ধুরা শরণার্থী শিবিরকে আকাশ-সমান উঁচু করে দিল। আমাদের কষ্টে থাকার দিনগুলো থেকে কষ্ট মুছে দিল।
জয় বাংলা - জয় বঙ্গবন্ধু।
মারুফ গুনগুন করে বলতে বলতে শ^শুরের হাত ধরে এগিয়ে যায়। অন্যরা যে যার মতো চলে যায়।


বীথিকা এখন কলেজের ছাত্রী। নিজের গ্রামের সৌন্দর্য দুচোখ ভরে উপভোগ করে। শৈশব থেকে গ্রামের পথঘাটে অনেক ঘুরেছে। এখন খুলনার সরকারি কলেজে পড়ে। ছুটিতে বাড়িতে এলে প্রাণভরে তাকিয়ে থাকে গ্রামের চারদিকে। দাকোপ মহকুমার শ্রীনগর গ্রামে তাদের বাড়ি। বাবা হরেন্দ্রনাথ মা মায়ারাণী আর তিন ভাই কৃষ্ণপদ, নিরঞ্জন, অমল সবার সঙ্গে বেশ দিন কাটে বীথিকার। সুন্দরবনের খুব কাছে বলে গ্রামটি ওর ভীষণ প্রিয়। গ্রামটির চারদিকে নদী আছে। দূর থেকে সুন্দরবনের দিকে তাকিয়ে থাকলে মা বলে, তুই কি ভবিষ্যতে গিয়ে থাকবি ওখানে?
- বাঘের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে পারলে গিয়ে থাকব। গাছপালা নিয়ে ঘুমাব। বাঘ আমাকে পাহারা দেবে। পাখিদের কূজন শুনব ভোরের আলো ফোটার আগে।
- ভালোইতো, কত সুন্দর করে বললি যে আমার মন ভরে গেল।
- মাগো, আমরা একদিন নৌকায় করে সুন্দরবনের ধারে বেড়াতে যাব।
- এখন আর হবে না রে।
- কেন মা?
- রেডিওতে শুনলিনা বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। ওই রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করেছে।
- এখন যুদ্ধ শুরু হবে মা। আমার তিনটি ভাই এতই ছোট যে যুদ্ধ করতে পারবেনা।
হরেন্দ্রনাথ মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলে, মাগো এত ভাবিসনা।
- আমাদের এলাকায় পাকবাহিনী আসতে পারবেনা বাবা?
- কেন রে মা?
- এই যে চারদিকে নদী। ওদের বড় বড় গাড়ি কীভাবে আসবে?
- ওরা কি আর পথে আসবে? আমাদের এদিকে আসতে হলে গানবোটে আসবে।
- ঠিক বলেছ বাবা। আমাদেরকে সতর্ক হয়ে থাকতে হবে।
- তুই আর বেশি গ্রামে ঘুরিসনা। বাড়িতে থাকিস।
- হ্যাঁ বাবা থাকব। মায়ের কাছে যাই।
মায়ারাণী রান্না করছে। বীথিকা পেছনে বসে মাকে জড়িয়ে ধরে।
- মাগো এই যুদ্ধের সময় তোমার একটা বাচ্চা হবে। আমার তিন ভাই আছে। আমি এবার একটা বোন চাই।
মায়ারাণী মৃদু হেসে বলে, ভগবান যা দেবে আমি তাকেই বুকে আঁকড়ে ধরব। ভগবান তোর ইচ্ছা পূরণ করলে আমি খুশি হব।
বীথিকা মাকে গভীরভাবে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দেয়।
- ভগবান ভাই বা বোন যা দেবেন আমি তাকেই কোলে তুলে নিয়ে আদর করব মাগো। অমি যাই এখন দেখি ছোট ভাইগুলো কোথায় কি করছে।
- ওদেরকে বেশি দূরে যেতে দিসনা। ঘরে ডেকে নিয়ে আয়।
বীথিকা বাইরে বেরিয়ে চারদিকে তাকায়। কোথাও ওদেরকে দেখা যাচ্ছেনা। ও সামনে আগায়। দেখতে পায় ভদ্রা নদীর ধারে ওর তিন ভাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। ওকে দেখে হাত নাড়ায়। কাছে যেতে ডাকে। বীথিকা ছুটে যায় ওদের কাছে।
কৃষ্ণপদ বলে, দিদি দেখ একটা কেমন নৌকা। এর আগে এই নদীতে কখনো দেখিনি।
- কই রে?
- ওই যে দূরে, এখান দিয়েই ওদিকে গেল।
বীথিকা গানবোট দেখে আঁতকে ওঠে।
(চলবে)...........

 

 

শরণার্থীর সুবর্ণরেখা (পর্ব- ১)
শরণার্থীর সুবর্ণরেখা (পর্ব- ২)
শরণার্থীর সুবর্ণরেখা (পর্ব- ৩)
শরণার্থীর সুবর্ণরেখা (পর্ব- ৪)
শরণার্থীর সুবর্ণরেখা (পর্ব- ৫)
শরণার্থীর সুবর্ণরেখা (পর্ব- ৬)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top