সিডনী মঙ্গলবার, ২৮শে মে ২০২৪, ১৪ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

ব্যতিক্রমী এক জমিদার : নবনীতা চট্টোপাধ্যায়


প্রকাশিত:
১৭ জুন ২০২৩ ১৪:৫৪

আপডেট:
২৮ মে ২০২৪ ১০:৩৫

 


তখন সবে ভোর হয়েছে। উদীয়মান সূর্যের নরম আলো ছড়িয়ে পড়েছে পদ্মানদীর ঢেউয়ের উপর। আম, জাম, বট,অশ্বথ, ঝাউ গাছের শিশিরসিক্ত পাতার ফাঁক দিয়ে গলে গলে পড়ছে সেই নরম রোদ। ভোরের স্নিগ্ধতা নিয়ে সুন্দর হাওয়া বয়ে যাচ্ছে চারপাশে। বহু দূর দূর দিয়ে নদীতে ভেসে যাচ্ছে জেলেদের নৌক। সেই নির্জন ভোরে পদ্মার জনমানবহীন চর দ্রুতপায়ে পার হচ্ছিলো মেছো সর্দার। এই এলাকার নামকরা ডাকাত সর্দার সে। শুধু তাই নয়, তার নামে এলাকার সবাই এমনকি ব্রিটিশ সরকার ও ত্রাসে কাঁপে। সে খবর পেয়েছে পদ্মার এই নির্জন চরে বাঁধা আছে নতুন জমিদারের পদ্মা বোট। সরেজমিনে তদন্ত করতে সে এই প্রায়ান্ধকার ভোরে বেরিয়ে পড়েছে পদ্মার চরে। ঝোপঝাড়ের ভিতর দিয়ে এগোতে এগোতে সে হঠাৎ দেখলো এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। সবুজ ঘাসে ঢাকা পদ্মার জনহীন চরে উদীয়মান সূর্যের দিকে একমনে তাকিয়ে দীর্ঘদেহী দাড়িওলা এক অলৌকিক পুরুষ তাঁর গায়ে আলখাল্লা, পায়ে জরির জুতো। ইনি কি ঈশ্বর, আল্লা, কোনো ফকির, দরবেশ? তার মতো পাপীকে কি কৃপা করে দর্শন দিলেন তিনি? দুচোখ ছাপিয়ে অশ্রু নেমে এলো দোর্দন্ডপ্রতাপ ডাকাত সর্দারের। কালমাত্র বিলম্ব না করে সে লুটিয়ে পড়লো সেই অলৌকিক পুরুষের পায়ে। সহসা চমকে উঠলেন নতুন জমিদার। জমিদারির ভার নিয়ে তিনি কিছুদিন হলো এসেছেন। থাকছেন জমিদারের প্রাসাদে নয়, পদ্মানদীর চরে বাঁধা 'পদ্মা বোটে। তাঁর পায়ের সামনে উবু হয়ে বসে থাকা খালি গা, মালকোঁচা ধুতি পরা, ঝাঁকড়া এলোমেলো চুলের ভয়ংকর দর্শন মানুষটিকে নরম গলায় শুধোলেন, " তুমি কে? তোমার নাম কি? আমার পায়ের কাছে বসলে কেন? "
"হুজুর আমি ডাকাত মেছো সর্দার| আমি বড় দু:খী হুজুর"
"এই পৃথিবীতে সবাই দু:খী। তোমার কিসের দু:খ?" "আমি ডাকাত হুজুর, সারাদিন বনেজঙ্গলে লুকিয়ে থাকি। রাত্রে বেরোই লুঠ করতে। কিন্তু আমি ডাকাত হতে চাইনি। পোড়া পেট আমায় এই পথে নিয়ে গেছে। আমায় এই পাপা থেকে মুক্তি দিন"
নতুন জমিদার বললেন "আমার কাছে তুমি কি চাও সর্দার? "
"হুজুর আমায় অন্য কোনো কাজ দিন। যে কোনো কাজ। আমার গায়ে অনেক শক্তি হুজুর, আমি হাত দিয়ে ইঁট ভাঙ্গতে পারি"
জমিদারবাবু একমূর্হত ভাবলেন। তারপর পদ্মার তীরে বাঁধা বোটের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বললেন, "ঐ যে নদীর চরে বাঁধা 'পদ্মা'বোট ওখানে আমি আছি। ঐ বোটে অনেক মাঝি মাল্লা আছে| তুমিও ওদের সাথে কাজ করো"
"কিন্তু হুজুর আমি তো ডাকাত... মন্দ লোক... আমাকে আপনি আপনার বোটে কাজ দেবেন? "
তিনি নরম করে হাসলেন" সেইজন্যই তো তোমায় কাজ দিলাম। দেখি তুমি কেমন পাহারা দিতে পারো? "
আরো একবার পায়ে লুটিয়ে পড়লো মেছো সর্দার|সজল চক্ষে বললো "হুজুর, আপনি আমার বিশ্বাস করে কাজ দিলেন, আমি যতদিন বাঁচবো আপনার গায়ে এতটুকু আঁচ লাগতে দেবোনা"
১৮৯৬ সালের ৮ ই অগাস্ট 'পাওয়ার অফ আটর্নি'করে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর চারখানি বিশাল জমিদারির ভার দিলেন পুত্র রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে। এই চারখানি জমিদারি হলো শিলাইদহ, সাজাদপুর, উড়িষ্যার কটক জেলায় অবস্থিত জমিদারি এবং রাজশাহী জেলায় অবস্থিত কালীগ্রাম পরগণার জমিদারি। কবি প্রথমেই এই দায়িত্ব লাভ করেন নি। তার আগে পুরো পাঁচ বছর শিক্ষানবিশি পর্যবেক্ষক হিসাবে জমিদারির কাজে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। যিনি লিখেছেন 'এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভূরি ভূরি - রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি।' জমিদার হিসাবে তিনি কেমন ছিলেন? আদৌ কি এই জমিদারিত্ব তাঁর পছন্দের ছিলো? এই প্রসঙ্গে কবি নিজেই পরবর্তী কালে লিখে গেছেন, "আমার জন্মগত পেশা জমিদারি, কিন্তু আমার স্বভাবগত পেশা আসমানদারি। এই কারণেই জনিদারির জমি আঁকড়ে থাকতে আমার অন্তরের প্রবৃত্তি নেই। এই জিনিষটার 'পরে আমার শ্রদ্ধার একান্ত অভাব। আমি জানি, জমিদারি জমির জোঁক, সে প্যারাসাইট, পরাশ্রিত জীব। আমরা পরিশ্রম না করে, উপার্জন না করে, কোনো যথার্থ দায়িত্ব গ্রহণ না করে ঐশ্বর্য ভোগের দ্বারা দেহকে অপটু ও চিত্তকে অলস করে তুলি। প্রজারা আমাদের অন্ন যোগায় আর আমলারা আমাদের মুখে অন্ন তুলে দেতা এরমধ্যে পৌরুষ ও নেই গৌরব ও নেই।" যিনি এই মানসিকতার অধিকারী তিনি যে ব্যতিক্রমী হবেন, ভিন্ন পথে হাঁটবেন বলাই বাহুল্য। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথের এই ভিন্ন মানসিকতা আবহমানকাল ধরে প্রচলিত জমিদারীর ধারণাটাই পরিবর্তন করে দিয়েছিলো। সেকালে অসহায় প্রজাদের অন্যায়ভাবে শোষণ করে গড়ে তোলা বিপুল অর্থভান্ডার ব্যয় হতো জমিদারদের যথেচ্ছাচার বিলাসিতায়। সাতমহলা প্রাসাদ, অগুনতি দাসদাসী. কর্মচারী, অহেতুক শৌখিনতায় উড়ে যেত অর্থের পর অর্থ। রক্ষিতা বাঈজীদের জন্য লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করতেন সেকালের জমিদারেরা। বাড়ীর পোষা কুকুর বিড়ালের বিয়ে দিতেন লক্ষাধিক অর্থব্যয়ে। জমিদারদের এতো টাকা ছিল, গোণার সময় ছিলো না। কেউ কেউ একশ টাকার নোট পুড়িয়ে সিগারেট ধরাতেন। এছাড়াও বিভিন্ন পূজা পার্বণীতে, ঘুড়ি, পায়রা উড়িয়ে, বুলবুলি মুনিয়ার লড়াই, বাঈজী নাচে জলের মতো অর্থব্যয় হতো। প্রজাদের দুর্দশায় রেখে বিলাসে ডূবে থাকতেন জমিদারেরা আর জমিদারদের অন্ধকারে রেখে উচ্চপদস্থ নায়েব আমলারা প্রজাদের অহেতুক পীড়ন করে অত্যধিক অর্থ আদায় করে বাবুগিরি করে বেড়াতো। বাংলার সাধারণ কৃষিজীবি মানুষের কাছে জমিদারি শাসন ছিল এক ভয়াবহ অধ্যায়।
জমিদারিত্ব পাওয়ার পর রবীন্দ্রনাথ প্রথম এলেন শিলাইদহতে| সেখানে ঠাকুরবাড়ির বিশাল প্রাসাদোপম অট্টালিকা, সুসজ্জিত উদ্যান, অগুণতি দাসদাসী, কর্মচারী মজুত নূতন জমিদারের অভ্যর্থনার জন্য| কিন্তু নূতন জমিদার মশায় এই বিলাস ব্যসনকে উপেক্ষা করে স্থির করলেন তিনি পদ্মানদীর হানিফের চরে বাঁধা 'পদ্মা' বোটে থাকবেন| বিস্তৃণ সবুজ ঘাসে ঢাকা নির্জন হানিফের চরে বাঁধা 'পদ্মা'বোটে কবি উপলব্ধি করলেন জীবনের এক অন্য দিগন্ত| হাওয়ায় ভেসে যাওয়া ছোটো ছোটো ঢেউয়ের দল, দিগন্তবিস্তৃত নীল আকাশ, নদীতীরের টুকরো টুকরো জনজীবন কবির চোখে ধরা দিলো এক অসামান্য রূপে| সকালে বিকালে নদীতীরে ভ্রমণে এই নূতন জমিদারকে গ্রামবাসীরা সমীহ ও শ্রদ্ধার চোখে দেখতে লাগলো| রবীন্দ্রনাথের নাম হয়ে গেল 'দাড়িওয়ালা কবি জমিদার বাবু'| শিলাইদহে এইসময় শুরু হলো 'পূণ্যাহ'উৎসব| এই উৎসবের মূল কারন ছিল প্রজাদের কাছ থেকে নতুনবছরের খাজনা আদায়ের সূচনা| এইদিনে কাছারিবাড়িতে ফুলের পাপড়ি ছড়ানো মলমলের গদিতে হাতে আলবোলার নল নিয়ে বসে থাকেন জমিদারবাবু|একটুদূরে কাঠের বাক্সো নিয়ে বসতেন নায়েব ও অনান্য কর্মচারীরা| লাল জাবদা খাতায় লেখা থাকতো প্রজাদের জমির নাড়ি নক্ষত্র| নীচে জাত, ধর্ম, বর্ন অনুযায়ী প্রজাদের বসার ব্যবস্থা থাকতো| হিন্দুরা সতরঞ্চির উপর চাদর ঢাকা আসনে বসতেন, অন্যদিকে মুসলমানদের বসার ব্যবস্থা শুধু সতরঞ্চি, চাদরের ব্যবস্থা নেই| আবার ব্রাহ্মণদের বসার স্থান আলাদা| ঠাকুর পরিবারের জমিদারদের বসার ব্যবস্থা ছিল মখমলের সিংহাসনে| রবীন্দ্রনাথ কাছারিতে এসেই নায়েবকে জানালেন তিনি সিংহাসনে বসবেন না| আর সব প্রজাদের জন্য একরকম বসার ব্যবস্থা করতে হবে| কারণ 'পূন্যাহ' হলো মিলন উৎসব| এখানে কোনো ভেদাভেদ করা যায় না| নায়েব যখন জানালেন এই ব্যবস্থা আবহমানকাল ধরে চলে আসছে| এই নীতি পরিবর্তন করার অধিকার কারো নেই| রবীন্দ্রনাথ দৃঢ়ভাবে জানালেন আসনের ব্যবস্থা পরিবর্তন না করলে তিনি পূন্যাহে যোগদান করবেন না| তিনি সমস্ত প্রজাদের আসনের বিভেদ তুলে দিয়ে একসাথে বসার আহ্বান জানালেন| উচ্ছ্বসিত প্রজারা সব চাদর তুলে দিয়ে সতরঞ্চিতে এক আসনে সবাই বসে পড়লো| রবীন্দ্রনাথ বসলেন তাদের মাঝখানে| নায়েব, গোমস্তারা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো| মানুষের মাঝে কোনো বিভেদ নেই এই সমীকরণে প্রথম দিনেই নূতন জমিদার জয় করে নিলেন মানুষের হৃদয়|
শিলাইদহ থেকে পতিসর, কালীগ্রাম থেকে শাজাদপুর, স্বরূপনগর, জগদীশপুর, মন্ডলঘাট, মহম্মদশাহী ইত্যাদি প্রতিটি জমিদারি পরগণায় বোটে করে চড়কির মতো ঘুরে ঘুরে জমিদারী পরিদর্শন করে কবি বুঝলেন ভূমিপুত্র বাংলার কৃষক প্রজাদের দুর্দশা|
সেইসাথে খাজাঞ্চি, গোমস্তা, নায়েব, ম্যানেজার, জমিদারির আমলাদের দুর্নীতিপরায়ণতা ও বাবুগিরি| এইসব অসৎ, ধান্দাবাজ আমলাদের জমিদারীর কাজ থেকে বরখাস্ত করে কবি জগদানন্দ রায়, জানকী রায়, বিপিনবিহারী বিশ্বাস, দূর্গানাথ গুহ,বামাচরণ ভট্টাচার্য ইত্যাদি বেশ কিছু শিক্ষিত, সৎ, ন্যায়পরায়ণ তরুণদের তদারকির কাজে নিয়োগ করলেন| এদের মধ্যে বিপিনবিহারী বিশ্বাস ছিলেন উচ্চশিক্ষিত আইন পাশ| তার পরামর্শে রবীন্দ্রনাথ জমিদারির পুরানো আইন বাতিল করে 'মণ্ডলী প্রাথা চালু করেন| এই মণ্ডলী প্রথায় প্রথমেই হ্রাস করা হল জমিদারী আমলাদের যাবতীয় প্রভাব প্রতিপত্তি| প্রজারা যাতে এইসব আমলাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ নিয়ে জমিদারবাবুর কাছে যেতে পারে তার ব্যবস্থা করা হলো| মহাজনদের নির্মম সুদের হাত থেকে প্রজাদের বাঁচানোর জন্য কবি ১৯০৫ সালে পতিসরে একটি সমবায় কৃষি ব্যাংক স্থাপন করেছিলেন| পতিসর কৃষি ব্যাংক ছিলো ভারতবর্ষের প্রথম কৃষি ব্যাংক| চাষীরা যাতে সঠিক মূল্যে ধান ও পাট বেচতে পারে কবি সেই জন্য ১৮৯৫ সালে 'ট্যাগোর এন্ড লং স্থাপন করেন| এর ফলে চাষীরা ফসলের ন্যায্য দাম পেতে সমর্থ হলো| কৃষকদের আয়ের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলো
প্রজাদের উন্নতকল্পে জমিদার হিসাবে রবীন্দ্রনাথ বহু দৃষ্টান্তমূলক কাজ করে গেছেন| পল্লী সংগঠনের জন্য তিনি প্রবর্তন করেন হিতৈষী বৃত্তি ও কল্যাণ বৃত্তি| প্রজাদের বকেয়া খাজনার উপর টাকায় তিন পয়সা অতিরিক্ত সেস বসিয়ে এই তহবিল গঠন করা হয়| এই তহবিলে যত টাকা উঠতো তার সমপরিমাণ টাকা দিতেন জমিদার| সেই টাকায় প্রজাদের জলকষ্ট দূরীকরণের জন্য কুপ, পুস্করিণী, জলাশয় খনন, জঙ্গল সাফাই, রাস্তাঘাট নির্মাণ, শিক্ষার প্রসারে বিদ্যালয় স্থাপন, দূর্ভিক্ষের মোকাবিলায় লঙ্গরখানা তৈরী ইত্যাদি সমাজ কল্যানমূলক কাজ করা হতো| শিলাইদহ ও পতিসরে তিনি সেইসময়ে অধিক ফলনের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন কৃষি ল্যাবরেটরি| শুধু কৃষি নয়, কুটীর শিল্পের উন্নতির জন্য ও তিনি সচেষ্ঠ ছিলেন| বয়ন শিল্প, তাঁতের স্কুল খলা, শিলাইদহতে পটারি খুলে মাটির জিনিষ তৈরী, ছাতা তৈরীর কল বসানো ইত্যাদির মাধ্যমে সাধারণ প্রজাদের কুটীর শিল্পে উৎসাহিত করেছেন| কবি চেয়েছিলেন মন্ডলীর মাধ্যমে প্রজা ও জমিদারের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠুক এবং প্রজা ও জমিদারের সমবায়ে নবজাগরণ হোক বলিষ্ঠ এক শক্তির| উন্নত,আধুনিক কৃষিব্যবস্থার মাধ্যমে কবি যেমন প্রজাদের নিজেদের শক্তিবৃদ্ধি করতে পেরেছিলেন, তেমনি এক সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করায় জমিদারীর আয় ও বৃদ্ধি করেছিলেন| শিলাইদহে তিনি একটি দাতব্য চিকিৎসালয় স্থাপন করেন| এঞ্চাড়াও পতিসরে হাসপাতাল ও কালিগ্রাম পরগণায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন| প্রজাদের মধ্যে বিবাদের মীমাংসা করার জন্য কবি সালিশির ব্যবস্থা করেন| প্রতিটি গ্রামের লোকেরা তাদের গ্রাম থেকে একজনকে প্রধান নির্বাচন করতেন| পরগণার সব প্রধানদের থেকে গ্রাম প্রধানরা পঞ্চপ্রধান নির্বাচিত করতেন| এরাই গ্রামবাসীদের বিবাদ মিটিয়ে দিতেন| কোনো কারনে এদের বিচারে সন্তুষ্ট না হলে প্রজারা কবির কাছে আসত সমাধানের জন্য| কবি ও ধৈর্য ধরে তাদের সমস্যা শুনে সমাধানের রায় দিতেন| ফলে আইন আদালতের খরচা, ঝামেলা ছিলোনা| এভাবেই কবি তাঁর আমলে জমিদারী এস্টেটকে এক ওয়েলফেয়ার এস্টেটে পরিণত করেছিলেন|
কবি শেষবারের মতো জমিদারী পরিদর্শনে যান পতিসরে ১৯৩৭ সালে| সেখানকার সমস্ত প্রজারা মহামান্য দেশবরেণ্য দেবতুল্য জমিদার শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সম্বর্ধনা দেন এই বলে" প্রভুরূপে হেথা আসো নাই তুমি/দেবরূপে এসে দিলে দেখা/দেবতার দান অক্ষয় হউক/ হৃদিপটে থাক স্মৃতিরেখা|" রবীন্দ্রনাথ তাঁর ভাষণে বলেন " তোমাদের কাছে অনেক পেয়েছি কিন্তু কিছু দিতে পেরেছি বলে মনে হয়না|..... তোমরা আমার বড় আপনজন, তোমরা সুখে থাকো|........... তোমাদের সবার উন্নতি হউক এই কামনা নিয়ে আমি পরলোকে চলে যাব|" উপস্থিত প্রজারা অশ্রুসিক্ত নয়নে বিদায় জানিয়েছিল তাদের প্রিয় ঈশ্বরতূল্য জমিদারবাবুকে| জমিদার ও প্রজা---শোষক ও শাসিত এই চিরকালীন সম্পর্কের ধারাকে কবি মানবিকতা দিয়ে নিয়ে গেছিলেন অন্য এক মাত্রায়| ঠাকুরিবাড়ির জমিদারীত্ব ছিল যৌথ জমিদারীত্ব| রবীন্দ্রনাথের পক্ষে স্বাধীনভাবে সব সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না| বিশেষত: জমিদারির আয়ের দিকটা সুগম রাখার আবশ্যক ছিলো| কিন্তু রবীন্দ্রনাথ অসহায় প্রজাদের কষ্ট, দুর্দশা, অসুবিধাগুলিকে মানবিক দৃষ্টিতে দেখে তাদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের ঈশ্বরসম হয়ে গেছিলেন| এখানেই জমিদার হিসাবে তিনি অনন্য এক পুরুষ| শুধু তাই নয়, বোটে করে দূর দূরান্ত পল্লিগ্রামে ঘুরে ঘুরে তিনি কেবল সবুজ শ্যামল পল্লির রূপেই মোহিত ছিলেন না, প্রত্যক্ষ করেছেন এইসব সবুজ শ্যামল পল্লীর জনজীবনের ছোটোখাটো সুখ দু:খ, আলো আঁধারের মায়াজালের পৃথিবী| সেইসব অভিজ্ঞতা কুচি কুচি হীরের দানা হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর সাহিত্যে... কাব্যে,,, গল্পে... | একজন জমিদার হিসাবে এখানেই তিনি ব্যতিক্রম।

 

নবনীতা চট্টোপাধ্যায়
পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by
Top