মানবপাচার ক্রমশ চরম আকার ধারণ করেছে


প্রকাশিত:
৩০ জুন ২০১৯ ০৬:৩১

আপডেট:
৪ এপ্রিল ২০২৫ ১৯:৫০

মানবপাচার ক্রমশ চরম আকার ধারণ করেছে

তিনিয়ত ইউরোপ ও মালয়েশিয়ায় সাগরপথে মানবপাচার চলছে। পাচার চক্রের প্রলোভনে প্রতিবছরই নৌকায় করে ভূমধ্যসাগর ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন অভিবাসনপ্রত্যাশীরা। এ যেন সোনার হরিণ। এমন হরিণের পেছনে ছুটে দেদার যাচ্ছে প্রাণও। এর মাঝে পাচারের জন্য আরেকটি উপসর্গ তৈরি হয়েছে। এটা হচ্ছে শ্রম অধিদপ্তরের নামে মানবপাচার। এতে পাচারের বৈধতা দেওয়া হচ্ছে বলে মত সংশ্লিষ্টদের।



গত ৯ মে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীবাহী একটি নৌকা ডুবে ৮৫ থেকে ৯০ জন নিখোঁজ হন। এর মধ্যে ৩৯ জনই বাংলাদেশি। লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার পথে তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছে নৌকাটি ডুবে যায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, লিবিয়ায় জনশক্তি পাঠানো বন্ধ রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ হয়ে লিবিয়া উপকূল থেকে নৌকাযোগে ইউরোপে প্রবেশ করছেন অনেক বাংলাদেশি। আদম ব্যবসায়ীরা তাদের নিয়ে যাচ্ছেন।



এদিকে মালয়েশিয়ায় আবারও সাগরপথে শুরু হয়েছে মানবপাচার। পাচারকারী চক্রের টার্গেট গ্রুপ এবার রোহিঙ্গা। পাশাপাশি কিছু বাংলাদেশি নাগরিককেও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মাছ ধরার নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়া নিয়ে যাচ্ছে। পাচারকারী চক্রের প্রলোভনে বহু মানুষ বড় অঙ্কের টাকা দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি দিচ্ছেন উত্তাল সাগর।



২০১৫ সালে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে সাগরে ডুবে কয়েক হাজার মানুষ মারা যায়। এ ছাড়া থাইল্যান্ডে কয়েকটি বড় গণকবর পাওয়া যায়। এরপর সরকারের পক্ষ থেকে মানবপাচার বন্ধ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিছুদিন মানবপাচার বন্ধ থাকার পর আবার এটি শুরু হয়েছে।



প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০১২ সালে মানবপাচার আইন হওয়ার পর থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত ৫ হাজার ৭১৬টি মামলা হয়েছে। কিন্তু এই মামলাগুলোর নিষ্পত্তির হার খুবই সামান্য। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব মামলার অধিকাংশেরই এখন পর্যন্ত বিচার হয়নি। পাচার রোধে যথেষ্ট পদক্ষেপ না নেওয়ায় কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মানবপাচার প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে ‘টায়ার-২ ওয়াচ লিস্টে’ রাখা হয়েছে। মানবপাচারের দিক থেকে বাংলাদেশের স্থান অনেক ওপরে। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগ এ তথ্য জানিয়েছে।



যদিও সরকার মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (এনপিএ ২০১৮-২০২২) গ্রহণ করে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানবপাচার বিষয়ক মামলাগুলোর নিষ্পত্তি করতে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।



সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, বাংলাদেশের মানবপাচার নিয়ে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা উচিত। পাচারকারীদের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। বাংলাদেশ থেকে যত মানবপাচার হচ্ছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে থেকে হয় না বলেও মত তাদের। 



ন্যাশনাল লেভেল শেয়ারিং ফর এডাপশন অব কমপ্রিহেনসিভ ল’ এগেইনস্ট ট্রাফিকিং ও রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু) জানিয়েছে, বেশিরভাগ মানবপাচার হয় মালয়েশিয়া, ভারত, পাকিস্তানসহ ইউরোপের কয়েকটি দেশে।



অন্যদিকে পাচার ও অবৈধ অভিবাসন নিয়ে মানুষের ধারণা স্পষ্ট না হওয়ার কারণে সীমান্তবর্তী এলাকায় ভিকটিমরা উদ্ধার হলেও পুলিশ পাচারের মামলা রুজু না করে পাসপোর্ট আইনে মামলা করেন। মানবপাচার প্রতিরোধে সচেতনতার পাশাপাশি সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সময়োপযোগী ও সর্বজনীন আইন প্রণয়ন করা জরুরি। প্রতিটি জেলায় পাচারের মামলা মনিটরিংসংক্রান্ত কমিটি থাকলেও এর বেশিরভাগের কোনো কার্যক্রম নেই। এ ছাড়া দায়েরকৃত মামলার ক্ষেত্রে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া হয় না। আদালতের স্বল্পতা ও দীর্ঘসূত্রতা, ভিকটিম ও সাক্ষীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যবস্থা না থাকাসহ বিভিন্ন কারণে পাচারের মামলাগুলোর বিচার কার্যক্রম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে যায়। এ কারণেই পাচারকারীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। কিছু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হলে পাচারকারীরা মানবপাচারে সাহস পেত না। সংশ্লিষ্টরা এমন কথাই বলছেন।



এ মাঝেই জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার (ইউএনএইচসিআর) তথ্য বলছে, ভূমধ্যসাগর দিয়ে যত মানুষ প্রবেশ করেছেন, সেই তালিকার শীর্ষ দশ দেশের নাগরিকদের মধ্যে প্রায়ই বাংলাদেশও থাকছে। ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দপ্তর ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। বছর দুয়েক আগেও সাগরপথ দিয়ে হাজারো মানুষের মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বজুড়ে খবর হয়েছিল।



প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যানুযায়ী, গত চার দশকে এক কোটি বাংলাদেশি চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। আর এদের ৭৫ শতাংশই গেছেন মধ্যপ্রাচ্যে। কিন্তু অবৈধভাবে কত লোক বিদেশে যান তার কোনো হিসাব বাংলাদেশের কোনো দপ্তরে নেই।



ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রধান শরীফুল হাসান বলেন, ভালো চাকরির আশায় দালাল চক্র বাংলাদেশ থেকে লোক সংগ্রহ করে লিবিয়ার উপকূল দিয়ে ইউরোপে পাচার করে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। অভিবাসনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রামরুর সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. সি আর আবরার বলেন, ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশে চেষ্টাকারীদের প্রতি তিনজনের একজন ধরা পড়েন অথবা ডুবে মারা যান। বাকি দুজন প্রবেশ করতে পারেন। তাদের দেখে আরো অনেকে উৎসাহিত হন। তাই উৎসমুখেই ইউরোপ যেতে মরিয়া তরুণদের থামাতে হবে। এ জন্য তাদের জন্য নিরাপদ অভিবাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে। তাদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। যেন বৈধভাবেই বিদেশে কাজের সুযোগ পায়। দেশেও কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। কাজ দিতে না পারলে তরুণরা অবৈধ পথে পা বাড়াবেই।


বিষয়:


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top