পর্ব ছয়: গ্রাফিক নভেল
প্রকাশিত:
২৯ মে ২০১৯ ০৬:৩৫
আপডেট:
৫ এপ্রিল ২০২০ ১৯:৫৮
-2020-04-05-13-58-02.jpeg)
দুদিন ধরে এখানকার আবহাওয়া খারাপ, হালকা পাতলা বৃষ্টি হচ্ছে, বেশ একটা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব। ঘরেই বসে আছি। কার্টুনিস্ট মেহেদী হক আমাকে একটা বড় ড্রইং খাতা আর আঁকার কিছু বিশেষ ধরনের কলম দিয়ে গিয়েছিল, বলেছিল আমি যেন একটা গ্রাফিক নভেল এঁকে নিয়ে ফিরি। মেহেদী এই মুহুর্তে বাংলাদেশের একজন অলরাউন্ডার কার্টুনিস্ট। তার কথা ফেলি কি করে? সেই গ্রাফিক নভেলই আঁকা শুরু করলাম। প্রেক্ষাপট সেই টুয়েলভ মাইল লেক। আট পাতার মত এঁকে ফেলেছি।
তো ভাবলাম আচ্ছা, অ্যামাজনে অর্ডার দিয়ে কয়েকটা গ্রাফিক নভেল আনালে কেমন হয়। এষাকে বলায় সে আর আমি মিলে ছটা গ্রাফিক নভেল অর্ডার করলাম। এদের অনলাইন ডেলিভারীর সিসটেমটাও আমার একটু দেখার শখ। অর্ডার করার পাঁচ মিনিটের মধ্যে মেসেজ চলে আসল-
- ‘ তোমার অর্ডার গ্রহন করা হয়েছে।’
আরো দশ মিনিট পর মেসেজ আসল-
- ‘ তোমার অর্ডার করা ছটা গ্রাফিক নভেলের মধ্যে চারটা প্যাকিং হয়ে গেছে তারা আগামী পরশু সকালে তোমার ঠিকানায় সময়মত পৌঁছে যাবে।’
আরো দশ মিনিট পর মেসেজ-
- ‘ বাকি দুটাও অন দা ওয়ে, আগামী পরশু দুপুরের পর পৌঁছে যাবে।’
আবার মেসেজ-
- ‘ দুঃখিত পরের দুইটা পার্সেল সকালে হয়ত পৌঁছানো যাবে না আবহাওয়ার কারণে, তবে সন্ধ্যার আগেই পৌঁছে যাবে।’
এবং সত্যি সত্যি সেদিন দুপুরের আগেই একটা গাড়ি এসে থামল এষার বাসার সামনে। আমি দরজা খুলে ডেলিভারী নেওয়ার জন্য রেডি হচ্ছি। হঠাৎ দরজায় তিনবার নক হল, তারপর নিঃশব্দ। ব্যাপার কি? দরজা খুলে দেখি দরজার কাছে একটা ভারী প্যাকেট, অ্যামাজনের গাড়ি চলে গেছে। এষা বলল এভাবেই ডেলিভারী করে ওরা। দরজার কাছে রেখে চলে যায়।
প্যাকেট নিয়ে ঘরে ঢুকতে না ঢুকতেই আবার মেসেজ-
- ‘তোমার বাকি দুটো গ্রাফিক নভেল আগামী কাল সকালে পৌঁছে যাবে, দেরীর জন্য দুঃখিত।’
এদের মেসেজের অত্যাচারে খুশী হব না বিরক্ত হব ঠিক বুঝতে পারছিলাম না।
এই গৃহবন্দি দুদিনে আমেরিকায় বসবাসকারী অনেক লেখক–সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ হল। যেমন মোস্তফা তানিম, সেজান মাহমুদ, আশিফ এন্তাজ রবি, হোসেন তৌহিদ জুয়েল, ... সাদ ইকবাল শাহরিয়ার। এরা সাবাই তাদের তারুণ্যের বাল্যকালে আমার অনেক-ই ঘনিষ্ঠ ছিল। তারপর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। তারা সম্ভবত সবাই এখন আমেরিকায় সেটেল্ড, সবাই যার যার জায়গায় এখন স্বনামধন্য। সবাই আমাকে তাদের এলাকায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। সত্যি সবার সঙ্গে দেখা করতে পারলে কি আনন্দই না লাগতো! তবে ভার্জিনিয়া, যেখানে সায়েন্স ফিকশন লেখক মোস্তফা তানিম থাকে, রবিও থাকে, সেখানে হয়ত যাব (মোস্তফা তানিম তিনটা টিকিট পাঠিয়েছে!)। তানিম অনেক জায়গা ঘুরিয়ে দেখাবে আমাদের, তার মধ্যে একটা হচ্ছে ল্যূরে কেভার্ন! মনে আছে আমার মেঝো ভাই একবার আমার মাকে আমেরিকা নিয়ে গিয়েছিল, একরকম জোর করেই। এই ল্যূরে কেভার্নেও মাকে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে মার একটা ছবি আছে, প্রকৃতির অপার বিস্ময়ের জায়গায় মা বিষন্ন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। পরে দেশে এলে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমরা, এত সুন্দর জায়গায় আপনি এত বিষন্ন কেন? মা বলেছিলেন,
- পৃথিবীতে কত সুন্দর জায়গা আছে, তোদের বাবাতো কিছু দেখে যেতে পারল না। তাই কোথাও গিয়ে আমি আনন্দ পাই না।
ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হচ্ছে আমার বাবা ১৯৭০ সালে একজন ভালো পুলিশ অফিসার হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় একটা বিশেষ ট্রেনিংয়ে যাওয়ার জন্য একমাত্র অফিসার হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পেপারে তার ছবি পর্যন্ত ছাপা হয়েছিল। আমরা ভাই বোনরা তখন ভীষণ উত্তেজিত! বাবা অস্ট্রেলিয়া থেকে আমাদের জন্য কি কি আনবেন তার লিস্ট পর্যন্ত তৈরী হয়ে গিয়েছিল। মনে আছে আমার লিস্টের এক নম্বরে ছিল একটা সত্যিকারের পিস্তল! আহা কি সব দিন গেছে... তারপরতো মহান মুক্তিযুদ্ধই শুরু হয়ে গেল!
শুরুতেই বলেছি মেহেদী হক আমাকে একটা বড় ড্রইং খাতা দিয়েছে গ্রাফিক নভেল আঁকার জন্য। কার্টুনিস্ট হাসিব কামালও আমাকে একটা ছোট স্কেচ বুক দিয়েছে জেশ্চার ড্রইং করার জন্য। তরুণ কার্টুনিস্টরা এই প্র্যাকটিসটা করে। আমার কখনো করা হয় নি। তবে এখানে মাঝে মধ্যে করার চেষ্টা করছি। এষার ক্যাম্পাসের আশে পাশে একটা বেঞ্চে আমি আর রীতা বসে আছি। এষা ল্যাব শেষ করে বের হয়ে আসবে তারপর আমরা কোথাও ঘুরতে যাব। দেখি এক বৃদ্ধা মহিলা আমাদের সামনে একটা বেঞ্চে বসে আছে (গ্রাজুয়েশনের কারণে ক্যাম্পাসে অনেক বৃদ্ধ বাবা মা)। আমি তার জেশ্চার ড্রইং করার চেষ্টা করছি। মাঝে মাঝে মহিলার দিকে তাকচ্ছি, মহিলাকে বুঝতে না দিয়ে। একসময় মহিলা উঠে দাঁড়ালো, টুক টুক করে আমার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় থামল, বলল ‘বয়স কালে আমাকে যদি আঁকতে... তখন ছিলাম আমি পরীর মত...!’ আহা আমার ভীষণ মায়া হল। মনে মনে বললাম ‘ তুমি এখনও পরীর মতই আছ..
বিষয়: আহসান হাবীব
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: