সিডনী বুধবার, ১২ই আগস্ট ২০২০, ২৮শে শ্রাবণ ১৪২৭

সম্প্রীতি, সমন্বয় ও সহিষ্ণুতা : আরিফুল ইসলাম সাহাজি


প্রকাশিত:
২৮ জুলাই ২০২০ ১৮:৪৬

আপডেট:
২৮ জুলাই ২০২০ ১৯:২০

 

“আর কিছুরই দরকার নেই। দরকার শুধু প্রেম, ভালোবাসা ও সহিষ্ণুতা। জীবনের অর্থ বিস্তার আর বিস্তার ও প্রেম একই কথা। সুতরাং প্রেমই জীবন, এটাই জীবনের একমাত্র গতি”

- স্বামী বিবেকানন্দ । 

ভালোবাসা আর সহিষ্ণুতা শাশ্বত ভারতবর্ষের মূল ঐতিহ্য । ভালবাসার এই মহান আদর্শ স্থাপন করে গেছেন স্বামী বিবেকানন্দ, রাজা রামমোহন, গুরু নানক, চৈতন্য, কবির সহ খাজা মঈনউদ্দিন চিশতী, নিজামুদ্দিন আউলিয়া প্রমুখ সুফি সাধকগণ । ভালবাসা মুক্তির পথ, সাধারণ জীবন থেকে মহাজীবনের পথে উত্তরণের অঙ্গীকার । সহিষ্ণুতা ও সম্প্রতি পাশাপাশি অবস্থানরত ভিন্ন ভাষা, ধর্ম ও বর্ণের মানুষের ঐক্যবদ্ধতার মূল পথকে বিনির্মাণ করে ঋজুভাবে । এই ঐক্যবদ্ধতা সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রগতির পথকে প্রশস্ত করতে সদা সর্বদায় সহায়তা করে । দুর্ভাগ্য , বারে বারে আমাদের রাষ্ট্রকাশে ঘনীভূত হয়ে উঠেছে বিভেদের ঘন কালো মেঘ । স্বাধীনতা পূর্ববর্তীতেও যেমন তেমনি উত্তর স্বাধীনতা কালেও তা অব্যহত রয়েছে । বিভেদকামি শক্তি ঐক্যবদ্ধ জনজাগরণকে সব সময় ভয় পায়, বিষয়খানি সূর্যপুরুষের পশ্চিমে অস্ত যাওয়ার মতই সত্য । ইতিহাস সাক্ষ্য, লর্ড কার্জন বাংলাভূমির গণ আন্দোলনের পরিআবহের গৌরবকে চূর্ণ করবার মন্দ অভিলাষে সাল ১৯০৫ এ বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করে দেন । ইংরেজ অপশক্তি বুঝতে সক্ষম হয়েছিল, ভারতভূমির ব্রিটিশ অসন্তোষের মূল সূতিকাগার হল এই অবিভক্ত বাংলা । সেদিন গর্জন তর্জনে মুখরিত হয়ে উঠেছিল রবীন্দ্র নজরুলের জাতি । ইংরেজ প্রশাসনের অপউদ্দেশ্য ব্যর্থ হয় বাংলা ভূমির মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তির পরাক্রমের জন্য । অপ্রিয় হলেও সত্য ঐক্যবদ্ধ যে আদল ছিল আমাদের জাতিগত অহংকার, সেই আদলের মাঝে কিছুটা বদল লক্ষ্য করা যাচ্ছে এই চলমান সময়ে । 

একটা মানবিক সংকটময় সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছে কালের গাড়ি । শুধুমাত্র আমাদের দেশীয় প্রেক্ষিতে বিষয়টা জীবন্ত এমন কিন্তু নয়, পুরো বিশ্বময় অন্যায় আদর্শ সমূহ প্রকট ও ভয়ঙ্কর রুপ ধারণ করেছে । বিভেদের প্রাচীর বিবেককে অন্ধ করে তুলছে । হঠাৎ করেই এই পরিবর্তনটা দৃশ্যগোচর হলো, অন্ততঃ কিছু বছর পূর্ব পর্যন্ত বিষয়টা এতটা খারাপ ছিল না । ঘৃণা ও বিদ্বেষের পোস্টার বয় ট্রাম্পের অভাবিত জয়লাভ বিভেদের রাজনীতিতে শান দিয়েছে একথা বললে খুব একটা ভূল বলা হবে না  ।  সন্ত্রাস দমনের নামে পূর্বেই  বিদ্বেষপূর্ন উদ্দেশ্যে  আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র বহু দুর্বল রাষ্ট্রের বিরাট ক্ষতিসাধন করেছেন । ট্রাম্পে ক্ষমতাসীন হওয়ায় ঘৃণার নীতি বিশ্বময় বিস্ময়কর জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ।  আরও এক শক্তিশালী রাষ্ট্র চীনও বিশ্বে ঘৃণার বাতাবরণ সৃষ্টি করছে । রোহিঙ্গা গণহত্যায় ক্ষুদ্র রাষ্ট্র বার্মার কুখ্যাত নৃশংস সরকারকে যেভাবে আড়াল করলো, তা অত্যন্ত নিন্দনীয় । এছাড়াও নিজ দেশে উইঘুর মুসলিমদের উপর তাদের ভয়ঙ্কর দমন পীড়ন সহ একাধিক  মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন তাঁরা । 

 

ভারসাম্য ও মানবিকতা রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় অস্তিত্বও বিপন্ন হয়েছে বার বার। রাজনীতিক কর্তাব্যক্তিরা শুধুমাত্র ক্ষমতায় আসীন হওয়ার অপউদ্দেশ্য নিয়েই সম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পবিত্র বন্ধনের উপর ধ্বংশের পেরেক পুঁতবার চেষ্টা করেন । সফলও হন, অন্ততঃ গত কয়েকবছরে আমাদের দেশে ধর্ম - বর্ণ - সমাজগত যে ঐক্য থাকা কাম্য, তা বার বার বিপন্ন হয়েছে । বিভেদকামি আদর্শে বিশ্বাসী রাজনীতিক নেতাদের উস্কানিমূলক কথাবার্তাতে প্রভাবিত হয়েছেন অনেকেই, ফলত একটা ইউনিটি অব ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে গেছে দেশটা । এই ঐক্যগত ফাটল ধরবার মূল কারণ বোধহয় প্রতিবেশী সম্যক ভাবে না জানবার অক্ষমতা । একই ভূখন্ডের হয়েও অনেকেই জানেন না সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবন আচার, ধর্মীয় কৃষ্টিকালচার । বিষয়টা আলোর নিচে আঁধারের সদৃশ । 

ঘৃণা, নিগ্রহ করবার মধ্য কোনরুপ মাহাত্ম্য নেই। একটি সুসভ্য রাষ্ট্রের জন্য কাম্যও নয়। বিভেদ রাষ্ট্রকে গৃহযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে । এক সম্প্রদায় ও ধর্ম,  অন্যর পথচলার প্রতিবন্ধক হয়ে উঠবে। তাতে রাষ্ট্রের কোন উপকার সাধন ঘটবে না, বরং দুর্বল ও ক্ষমতাহীন হয়ে পড়বে দেশ। বাল্যকালে পড়া সেই গল্পটি অনেকেরই মনে আছে বোধহয়, এক বৃদ্ধের তিনছেলে । ঝগড়া লেগে ছিল সব সময়। বৃদ্ধ পড়লেন মহাবিপদে, তাঁর মৃত্যুর পর ছেলেরা একে অপরের রক্তপিপাসু হয়ে উঠবে, এই ভেবেই তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন। তাছাড়া, ভাই ভাইয়ের এই অনৈক্যর সুযোগ অন্য যে কেউ নিতে পারে। বৃদ্ধ তিন ছেলেকে ডাকলেন এবং তাদের হাতে একটা করে বাঁশের লাঠি  দিলেন। অতঃপর বললেন, দুই টুকরো করো। সকলেই দুই টুকরো করে ফেললেন নিমেষেই। তখন বৃদ্ধ সকলকে তিনটি লাঠি একসঙ্গে দিলেন এবং দুই টুকরো করতে বললেন। উভয়ের কাছেই বিষয়টি কষ্টকর হয়ে উঠল। বৃদ্ধ বললেন, ঐক্যবদ্ধতাই তোমাদের সকল বিপদ আপদ থেকে রক্ষা যেমন করবে, তেমনি শক্তিশালীও  করবে। বিষয়টি চর্বিত চর্বন, তবুও বলবার উদ্দেশ্য হল, তিনটি 'স' সম্প্রীতি, সমন্বয় ও সহিষ্ণুতার সুষ্ঠ ও স্বাস্থ্যকর বিকাশ না হলে একটি দেশের, বিশেষ করে আমাদের মত বহু সংস্কৃতি ও বহু ধর্ম -  ভাষার দেশের মুক্তি সম্ভব নয়। 

আমাদের দেশ  এক বিশাল ভূখন্ড জুড়ে রয়েছে। একাধিক জাতি গোষ্টি সমাজ,  ধর্ম ও ভাষার ভিন্ন সংস্কৃতিই এ দেশের প্রাণ। সংস্কৃতি শব্দটি একটি বহুমাত্রিক শব্দবন্ধ। বৈচিত্রবহুল জটিল ধারণা। মানুষের রুচি, আচার বিচার, বিশ্বাস সবই সংস্কৃতির অংশ। সহজভাবে বললে মানুষের জীবনের গল্প মুখরিত হতে যে পথ ও পন্থা অবলম্বিত হয়, তাই সংস্কৃতি। গণ মানুষ যেহেতু স্বতন্ত্র, সুতরাং বিচার রুচি বিশ্বাসও ভিন্ন হবে, সেটায় স্বাভাবিক। সংস্কৃতিক সম্প্রীতির  পূর্ণঅবয়বই বরাবরই ভারতবর্ষকে  গৌরবময় উপস্থিতি দিয়েছে বিশ্বইতিহাসে। বলতে বাধা নেই, পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া সম্প্রীতির পূর্ণঅবয়বের যে আদল ছিল আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির ঐতিহ্য, তার কোথাও যেন কিছুটা বদল এসেছে। ঐক্যবদ্ধ ভারতবর্ষে  হঠাৎ করেই একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেল, সম্প্রীতিহীন ঘৃণার ভারত। 

শরীরের কোন অংশই অক্ষম হওয়া কাম্য নয়, তেমনি একটি দেশের সকল অংশের উন্নয়ন কাম্য হওয়া উচিৎ। একটা সমন্বয় দরকার। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের গণমানুষের জীবনযাত্রার যে চিত্র আমাদের দেশে দেখতে পাওয়া যায়, তা বেশ হতাশাব্যঞ্জক, লজ্জারও বটে। বিশেষ করে মুসলিম অবস্থা বেশ করুণ। শিক্ষা নেই, চাকরি নেই, চেতনার বিরাট অভাব রয়েছে সংখ্যালঘু মুসলিমদের মধ্যে। জীবনধারণের মানও বেশ নিম্নমানের। দলিতদের অবস্থানও সন্তোষজনক নয়। সকলের জন্য শিক্ষা ও কর্মের ব্যবস্থার সমন্বয়সাধন করা প্রয়োজন। দেহের একটি অংশের অপুষ্টি যেমন পুরো দেহব্যবস্থার জন্য ক্ষতি, তেমনি সমাজের একটি দুটি অংশের যাচ্ছেতাই রকম অবস্থান, রাষ্ট্রের অগ্রগতির পথে প্রতিবন্ধক হয়ে উঠবে, একথা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই।  

 

তিনটি  'স' এর অন্য একটি গুরুত্মপূর্ণ অংশ হলো সহনশীলতা বা সহিষ্ণুতা। সকলের মত পথকে শ্রদ্ধা করাই হল সহিষ্ণুতা। 'অসহিষ্ণু ভারত', এই শব্দবন্ধটি গত কয়েকবছরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। হঠাৎ একটা অসহিষ্ণু পরিবেশ তৈরি হয়েছে আমাদের দেশে। নিজের মত পথকে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার একটা বিরাট প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। যদিও এই অসহিষ্ণু সংস্কৃতি আমাদের দেশীয় কৃষ্টিকালচারের পরিপন্থী। এ দেশ বরাবরই সহিষ্ণু। সকলের নিজস্ব মত ও ধর্মপালনের পূর্ণঅধিকার স্বীকৃত। তবে ফেলে আসা কয়েকবছরে সহিষ্ণু পরিবেশ খুব একটা ছিল না। 

তিন 'স' (সম্প্রীতি, সমন্বয় ও সহিষ্ণুতা) এর সঠিক সুষ্ঠ এবং স্বাস্থ্যকর রুপায়নই রাষ্ট্রের উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করবে। তিন 'স' এর পূর্ণ মিলন তখনই সম্ভব যখন আমরা প্রতিবেশীকে জানার চেষ্টা করবো, বুঝতে চাইবো। একটা উন্নাসিক মানসিকতা অন্তরালে কাজ করে এই না জানার কাঁটাতারের মাঝখানে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে মিশ্রসংস্কৃতির মানুষের বসতি যে জনপদ সমূহে রয়েছে, সেই অঞ্চল সমূহ ধর্মীয় হানাহানির শিকার খুবই কম হয়। বরং যেকোন ধর্মীয় বর্ণগত সংকটের বিপক্ষে তাঁরাই সর্বপ্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। কেননা, তাঁরা প্রতিবেশীকে চেনেন। বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ান। অসহিষ্ণু আবহে  এক টুকরো  সহিষ্ণু বাতাবরণ তৈরি করেন। যেখানে শান্তিতে শ্বাস নেন রাম রহিম এক সাথে।

 

আরিফুল ইসলাম সাহাজি 
অধ্যাপক, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ 

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top