সিডনী রবিবার, ২০শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ৫ই আশ্বিন ১৪২৭

বদলে যাও, বদলে দাও -এই মতাদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে : ড. গোলসান আরা বেগম


প্রকাশিত:
৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:২৬

আপডেট:
৩ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৭:৩০

 

আদি কালে শিক্ষা গ্রহন করতে পারতো  উচ্চ বংশীয় ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সন্তানরা। গৃহ শিক্ষক বাড়ীতে রেখে শিশু শিক্ষারব্যবস্থার আয়োজন করা হতো। শিক্ষা গুরু তার নিজের বাড়ীতেও শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিতেন। এরপর শুরু হয় টোল, মক্তব ধর্মীয় উপসানালয়ে শিক্ষাদান পদ্ধতি।

ইংরেজরা ভারতীয় উপমহাদেশে বানিজ্য করতে এসে নানা বিষয়ে আধিপত্য বিস্তার করতে শুরু করে। তখন ব্রাহ্মণরা শিক্ষাকে পাঠ্যসুচি ভুক্ত করে প্রাতিষ্ঠানিক রুপ দিতে থাকে । শিক্ষায় অংশগ্রহনকারির সংখ্যা  দিন দিন বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। তখন খোলা মাঠে বা গাছের নীচে শিক্ষা কার্যক্রম চলতো।

অনেক গবেষনার পর ও নানা পথ পরিক্রমার রাস্তা পাড়ি দিয়ে বিশ্বের সঙ্গে তাল রেখে আজকের অবস্থানে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ওঠে এসেছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে করা হয় সার্বজনিন ও বাধ্যতা মূলক। উন্নত ধ্যান ধারনা যুক্ত করে, জনগণকে আগ্রহী করে, দৈনন্দিন জীবনে শিক্ষাকে প্রয়োজনীয় উপাদানে পরিনত করা হয়।

সময়ের প্রয়োজনে শিক্ষাকে কুসংস্কার মুক্ত করে উন্নত  বিধি বিধান, প্রযুক্তি, কলাকৌশল আমদানি করা হয়েছে শিক্ষায়। অবলিলায় স্বীকার করতে হবে শিক্ষা জাতীয় উন্নয়নের মেরুদন্ড। একারনে দক্ষ মানব সম্পদ তৈরীর উদ্দেশ্যে সর্ব ক্ষেত্রেই শিক্ষার উন্নয়নকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। তথ্য প্রযুক্তি শিক্ষার সফল প্রয়োগে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট--১  উৎক্ষেপণের মাধ্যমে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জগতে অংশ গ্রহন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ।

এই চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে সফল করতে হলে অনলাইন শিক্ষা পদ্ধতির প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। ইতিমধ্যেই দেশে সফটওয়ার শিল্প গড়ে ওঠেছে। দেশের  বিভিন্ন প্রান্তে  ডিজিটাল হাই টেক পার্ক গড়ে তোলার কাজ চলছে। এখন যত কঠিন, ব্যয়বহুল বা দুঃসাধ্য মনে হউক না কেন, এমন একদিন আসবে, যখন তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া দৈনন্দিন কোন কাজ কর্মই চলবে না।

আজ থেকে দশ বছর পুর্বে ২০১০ এ একটা জাতীয় শিক্ষানীতি প্রনয়ন করা হয়েছে। সে নীতি অনুসারেই বাংলাদেশর বর্তমান শিক্ষাব্যস্থা চলমান রয়েছে। শিক্ষায় এসেছে যুগান্তকারি সফলতা। সার্বিক বিবেচনায এটি একটি মাইল ফলক হয়ে থাকবে। তারপরও বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হল-- এই শিক্ষানীতি সংশোধন করা দরকার বলে বর্তমান সকল শিক্ষা কর্মীই মনে করে।

শিক্ষা শিক্ষা শিক্ষা তিনবার উচ্চারন করে বলছি- শিক্ষাই পারে জাতীয় উন্নয়নকে তরান্বিত করে উন্নত মর্যাদাশীল জাতিতে পরিনত করতে।  শিক্ষা তার সফলতা দ্বারা মিলিনিয়াম  ডেভালপমেন্ট গোল্ড এর লক্ষ্য অর্জন করার পর, বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিনত হয়েছে।

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা  জাতীয় উন্নয়নে একটি বিরাট শিল্প মাধ্যম।সময়ের ব্যবধানে ও জাতীয় প্রয়োজনে শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা প্রকারের সংস্কার, উন্নত ধারা সংযুক্ত বা দুর্বল পদ্ধতিকে  বিমুক্ত করতে হয়েছে। তারপরও বিধি বিধানের জটিলা কোন না কোন স্তরে রয়ে গেছে। যার দুর্ভোগে পড়ে শিক্ষা তার কাম্য লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারছে না।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমপিও ভুক্তির বিধি বিধান প্রনয়ন করা হয় ২০১৮ তে। শিক্ষা আইন ২০২০ রয়েছে অনুমোদনের অপেক্ষায়। বর্তমান বিশ্বে বইছে -বদলে যাও, বদলে দাও দিন বদলের হাওয়া। গ্লোবাল ভিলেজে পরিনত হয়েছে বিশ্ব নামক সৌরমন্ডলের পৃথিবী নামক গ্রহটি। পরিবর্তনের হাওয়া বইছে দৈনন্দিন জীবনের চাওয়া পাওয়া, প্রতিদিনের কার্যক্রমে অর্থাৎ যত্রতত্র। আমাদেরও সেই দিন বদলে তাল মিলাতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাও সেই পরবর্তনের ধারাবাহিকতার বাইরে নয়।

বাংলাদেশের বেসরকারী পর্যায়ের শিক্ষকরা এমপিও নীতিমালা ২০১৮ সংশোধনের জন্য নানাভাবে যুক্তি উপস্থাপন করে যাচ্ছে। সংশোধন পূর্বক যা করা দরকার -- প্রভাষকদের ৮ বছর পুর্তিতে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেয়া, অতঃপর সহযোগি অধ্যাপক, অধ্যাপক পদ সৃষ্টি করা। পদোন্নতির ক্ষেত্রে ৩:১ রেশিও প্রথা বাতিল করা। বেসরকারি শিক্ষকদের বদলি প্রথা চালু করা। পাবলিক বিশ্বিবদ্যালয়ের শিক্ষকদের ন্যায় অবসরের সময় সীমা ৬৫ বছরে উন্নীত করা। অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও তৎসংশ্লিষ্ট সকল নিয়োগ এনটিআরসি এর অধীনে নিয়ে যাওয়া। অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের শিক্ষকদের একই প্যার্টাণভুক্ত করা। বেসরকারি কলেজে কর্মরত অনার্স পর্যায়ের শিক্ষকদেরকে এমপিওভুক্ত করা। সরকারী শিক্ষকদের ন্যায় বেসরকারি শিক্ষকদেরকে শিক্ষামন্ত্রণালয়, মাউশি, শিক্ষা বোর্ড, অবসরসুবিধা বোর্ড এ পদায়ন ও উচ্চতর প্রশিক্ষণে অন্তর্ভুক্ত করা।

তা ছাড়া বিজ্ঞান, বানিজ্যিক বিষয়গুলোর সিলেবাসের দিকে নজর দেয়া প্রয়োজন। কেননা আজকাল এই সমস্ত বিষয়ে শিক্ষার্থীরা পড়তে আগ্রহী হয় না। কেন হয়না, তা গবেষণার মাধ্যমে নিরুপন ও প্রযোজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করা দরকার। অন্যথায় শিক্ষাব্যাবস্থার উচ্চস্তরে নানা জটিলতা তৈরী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। কোচিং বানিজ্যকে কঠোর হস্তে দমন ও নিরুৎসাহিত করা সময়ের দাবি।

সহজ সরল ভাষায় বলবো- ঘন জন বসতি পূর্ণ বাংলাদেশের  ষোল কোটি মানুষকে দক্ষ জনশক্তিতে, জনসম্পদে পরিনত করতে হবে। সততা, নৈতিকতা, বৈজ্ঞানিক বোধ সম্পন্ন, বুদ্ধিবৃত্তিক, দেশ সেবক, প্রকৃত আদর্শবান অসম্প্রদায়িক  চেতনার মানুষ তৈরী করাই হতে হবে শিক্ষার মূল আদর্শ ও লক্ষ্য। বর্তমান পদ্ধিতে অর্জিত জ্ঞান  চতুর্থ বিপ্লবের ক্ষেত্রে কাজে আসবে না। তখন আমরা উন্নত জাতি গঠনের দৌড়ে পিছিয়ে পড়বো। সে প্রয়োজনেই ডিজিটাল বিপ্লবের যুগে টিকে থাকার মত ডিজিটাল শিক্ষায় দক্ষ জনশক্তির জন্ম দিতে হবে।

২৬ আগস্ট ২০২০ এ এডুকেশান টেকনোলজি এ্যান্ড এগ্রীকালচার ট্রান্সর্ফমেশন শীর্ষক এক অনলাইন  আলোচনায় বর্তমান মিক্ষান্ত্রী ডাঃ দীপুমনি বলেন -শিক্ষার গুনগতমান, ও মানসন্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকার নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ব্যাপাবে শিক্ষক, অভিবাবক, শিক্ষার্থী সকলকেই হতে হবে আন্তরিক।

মার্চ ২০২০ এর প্রথম সপ্তাহে মরনঘাতি করোনা মহামারী আমাদের দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত রয়েছে সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্টানের শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ। সরকারের নির্দেশে অনলাইন প্রত্রিয়ায় সরকারী বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্টানগুলো শ্রেনী শিক্ষা, পরীক্ষা গ্রহন ও ফলাফল প্রকাশ করছে। তবে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চালু রাখার মত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কাম্য সংখ্যক নয়। গ্রাম্য অঞ্চলে বসবাসকারী ৮৫% জনগনের সস্তান নানা সমস্যার কারনে অনলাইন শিক্ষার  আওতায় আসতে পরছে না।

করোনাকালিন সময়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ টিভির মাধ্যমে শ্রেনী শিক্ষাদান কর্মসুচি চালু রাখার নির্দেশ দেন। তা ছাড়া সরকার বিকল্প শিক্ষা পদ্ধতিও খুঁজছে। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত "আমার ঘরে আমার ক্লাশ " এই শিরোনামে সংসদ টিভির মাধ্যমে মধ্য পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকবে। এই ক্লাশ কার্যক্রমের রুটিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছ।

আমরা জানি ২৯ মার্চ থকে একই পদ্ধতিতে  ৬ষ্ট-দশম শ্রেণীর শিক্ষা কার্যক্রম চালু রয়েছে। ঘরবন্দী জীবনে শিক্ষার্থীরা ঘরে বসেই তাদের শিক্ষা গ্রহণের স্বাদ ভোগ করছে। কমছে কায়িক পরিশ্রম ও অর্থের ক্ষয়। কিন্তু প্রকৃত শিক্ষা অর্জিত হওয়ার ব্যাপারে রয়েছে নানা সংশয়। বরং জন্ম দিচ্ছে বৈষম্যময় জাতি গঠনের শিক্ষা পদ্ধতি। যা একটা সুস্থ্য ও উন্নত জাতি গঠনে কখনও কাম্য নয়।

এদিকে লক্ষ লক্ষ বানভাসি মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করছে। তাদের সন্তান খেয়ে পরে বাঁচবে, না অনলাইন শিক্ষায় অংশ গ্রহন করবে। সর্ব বিষয়েই লেজে গোবরে অবস্থা বিরাজ করছে জন জীবনে। জানি না এ অবস্থা থেকে কি ভাবে মুক্তি পাবো। আবার কবে আমাদের আগামী প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার সুস্থ পরিবেশে ফিরে যেতে পারবে। তবে সময়ের প্রয়োজনে বদলে যাও, বদলে দাও -- এই মতাদর্শকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে ।



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top