নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পৃথিবীর দিকে ছুটে আসছে ২১ টন ওজনের চীনা রকেটের অংশ : মু: মাহবুবুর রহমান 


প্রকাশিত:
৫ মে ২০২১ ১৯:৩২

আপডেট:
৫ মে ২০২১ ১৯:৫৬

 

নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পৃথিবীর দিকে দ্রুত গতিতে ছুতে আসছে চীনা মহাকাশ প্রকল্প ‘তিয়ানহে স্পেস স্টেশন’ এর জন্য পাঠানো একটি রকেটের ১০০ ফুট লম্বা, প্রায় ২১ টন ওজনের মূল অভ্যন্তরীণ অংশ (‘কোর’)। কয়েকদিনের মধ্যে পৃথিবীর যেকোনো স্থানে সেটি আছড়ে পড়তে পারে বলে জানিয়েছে মহাকাশ গবেষণা সংক্রান্ত নিউজপোর্টাল ‘স্পেসনি‌উজ’। 

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানায়, চীনের বানানো এই বৃহত্তম রকেটটির নাম ‘লং মার্চ ৫বি রকেট’। হুনান থেকে গত ২৯ এপ্রিল এটি উৎপেক্ষণ করা হয়। চীনা মহাকাশ প্রকল্প ‘তিয়ানহে স্পেস স্টেশন’ এর জন্য পাঠানো রকেটটি সফলভাবে মহাকাশ স্টেশনের অংশটিকে কক্ষপথে স্থাপন করতে পারলেও নিজেকে আর গ্রাউন্ড স্টেশনের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি। 

রকেটটির ১০০ ফুট (৩০ মিটার ) লম্বা মূল অভ্যন্তরীণ অংশ (কোর) নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অনিয়ন্ত্রিত গতিতে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। ২১ টন ওজনের রকেটের এ অংশটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে দিন-কয়েকের মধ্যেই ঢুকে পড়তে চলছে। রাডারে তা ধরাও পড়েছে । ‘লং মার্চ ৫বি রকেট’ এর অংশটি এখন ভূপৃষ্ঠের ১৭০ কিলোমিটার (১০৬ মাইল) থেকে ৩৭১ কিলোমিটার (২৩১ মাইল) উচ্চতার মধ্যে ওঠা-নামা করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকার পর যেকোনো মুহূর্তে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে এটা ভেঙে পড়তে পারে। 

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর কাছাকাছি আসার পরে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে এই রকেটের একটি বড় অংশ পুড়ে যাবে, তবে তখনও যথেষ্ট ধ্বংসাবশেষ থাকবে যা মারাত্মক হতে পারে। স্পেসনিউজ জানিয়েছে, রকেটের ওই অংশটি আর কারো নিয়ন্ত্রণে নেই। ‘লং মার্চ ৫বি রকেট’ এর অংশটি প্রতি সেকেন্ডে ৭ কিলোমিটার (৪ মাইল) গতিতে পৃথিবীর দিকে এগিয়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রকেটের অংশটি বিশ্বের জনবসতিপূর্ণ কোথাও আছড়ে পড়লে মারাত্মক ক্ষয়ক্ষতি ঘটতে পারে। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ভেদ করে এটি ঠিক কোথায় অবতরণ করবে তা এখনই অনুমান করা সম্ভব নয়।  

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, ‘লং মার্চ ৫বি রকেট’ এখন পৃথিবীর কক্ষপথে ঘণ্টায় ২৭ হাজার ৬০০ কিলোমিটার বেগে ছুটছে। কখনো ১৭০ আবার কখনো ১৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত নিচে নেমে আসছে এটি। তবে দিনে দিনে এটি আরও নামবে। আপাতত এর গতিপথের মধ্যে পড়েছে নিউ ইয়র্ক, মাদ্রিদ, বেইজিং, দক্ষিণ চিলি, নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটনসহ আরও কিছু স্থান। তবে তার এই চলার পথে সামান্য এদিক ওদিক হলেই এর ল্যান্ডিং স্পট বদলে যেতে পারে। 

১৯৯০ সাল থেকে পৃথিবীতে যতগুলো রকেটের অনিয়ন্ত্রিত রি-এন্ট্রি ছিল তাদের প্রত্যেকের ওজন ছিল ১০ টনের কম। তবে এবার লাইনচ্যুত হওয়া ‘লং মার্চ ৫বি রকেট’ এর অংশটির ওজন প্রায় ২১ টন এবং সেক্ষেত্রে পরিস্থিতি খুব একটা সুবিধাজনক নয় বলেই আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।  

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোফিজিক্স সেন্টারের বিশেষজ্ঞ জনাথন ম্যাকডোয়েল বলেছেন, ‘‘পরিস্থিতি খুব একটা সুবিধাজনক নয়। চীন এর আগেরবার যখন ‘লং মার্চ ৫বি রকেট’ উৎক্ষেপণ করেছিল তখনও কিছু বড় লম্বা ধাতব অংশ পড়ে আইভরি কোস্টে বেশ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যদিও বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সংঘর্ষে এর বেশিরভাগ অংশই জ্বলে গিয়েছিল। তবুও প্রচুর ধাতব টুকরো পৃথিবীতে এসে পড়েছিল। আমরা খুব ভাগ্যবান যে তখন কেউ হতাহত হয়নি।’’ 

ম্যাকডোয়েলের অনুমান, এবারের লং মার্চ ৫বি রকেট এর অংশটি সম্ভবত সমুদ্রে পড়তে পারে। রকেটের কিছু টুকরো হয়তো পৃথিবীতে এসে পড়বে। তাতে করে এটি ১০০ মাইল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়া একটি ছোট বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার মতো হবে বলে ধারণা তাঁর। 

আগামী ১০ মে এর দুই দিন আগে বা পরে ‘লং মার্চ ৫বি রকেট’ এর অংশটি পৃথিবীতে আঘাত হানতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ম্যাকডোয়েল জানান, এক বার পৃথিবীতে ফিরে আসার দিনটি স্পষ্ট হয়ে গেলে ঠিক কখন এটি পৃথিবীতে অবতরণ করবে তা ছয় ঘণ্টা আগে অনুমান করা যাবে। 

 

মু: মাহবুবুর রহমান   
নিউজিল্যান্ডের মেসি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক 

  

 


আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top