সিডনী রবিবার, ৩১শে মে ২০২০, ১৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

কষ্ট : আহসান হাবীব


প্রকাশিত:
২১ মে ২০২০ ১৪:৪২

আপডেট:
৩১ মে ২০২০ ২৩:১০


বাসর ঘরে ঢুকে রানুর মনে হল চিৎকার করে কাঁদে। তার জীবনটাই কেন এমন হল? কেন এই অচেনা অজানা লোকটাকেই বিয়ে করতে হল? কেন রন্জুকে বিয়ে করতে পারল না; তার ভালবাসার মানুষটা হারিয়ে যাবে তার জীবন থেকে? রানুর ইচ্ছে হচ্ছে এই পাঁচতলা থেকে নিচে লাফিয়ে পড়তে।
- আপা চা খান
চা বিস্কিট নিয়ে ঢুকলো মরিয়ম। সে মনে হয় এই বাসার কাজের লোক। তবে লোকটা, মানে তার বর ঢুকলো না। উফ যতক্ষন না ঢুকে ততই মঙ্গল। রাতেতো নিশ্চয়ই ঢুুকবে তারপর ঝাপিয়ে পড়বে তার উপর। চিন্তা করতেই শিউরে উঠছে রানু। একটা বিভিষিকাময় রাত যাবে তার!

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, তেমনটা ঘটল না। রাতের খাবার নিয়ে মরিয়ম তার ঘরেই এল। এবারও লোকটা এল না। বা ডাইনিংয়েও ডাকল না। সবচে আশ্চর্যের ব্যাপার রাতেও লোকটা তার ঘরে এল না। বাইরের ঘরের সোফায় ঘুমালো। তবে বাসর ঘরে রানুর ঘুমটা ভালো হল, একটা স্বপ্নও দেখে ফেলল... যেন সে আর রনজু ঘুরে বেড়াচ্ছে পাহারে তাদের বিয়ে হয়েছে তারা গিয়েছে হানিমুনে। পাহাড়ের উপর দিয়ে মেঘ উড়ে যাচ্ছে; মেঘগুলো তাদের স্পর্শ করছে কখনো কখনো। কেমন একটা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব।
ঘুম ভাঙলো সকাল নটায়। দেখে হাসি মুখে দাড়িয়ে আছে মরিয়ম।
- আপা নাস্তা খাইবেন না?
বিষ দাও বিষ খাব মনে মনে কথাটা বলল রানু। ঘুম থেকে উঠেই ফের মনটা বিষিয়ে গেল। এক সঙ্গে সব মনে পড়ে গেল। তাও ভাল লোকটা রাতে ঘরে এসে ঝাপিয়ে পরেনি। একটু খটকা লাগছে অবশ্য লোকটার আচরনে!
- স্যারে বাইরে গেছে আপনেরে একটা চিঠি দিয়া গেছে।
- চিঠি? আশ্চর্য হল রানু। ‘ নিয়ে এস চিঠিটা ’
- এই যে দুইটা চিঠি। দুইটা আলাদা আলাদা খাম। একটা মোটাসোটা খাম। একটা পাতলা খাম। পাতলা খামটা খুললো রানু-
রানু,
রনজুর সাথে তোমার সম্পর্কের কথা যখন জেনেছি তখন আর পিছানো সম্ভব ছিল না। তাই বিয়েটা করতে হল। সামাজিকতার একটা ব্যাপার আছে। সেটাও তোমাদের দিক থেকেই। তুমিতো জেনেছ আমার দিকে আত্নিয় স্বজন কিছু নেই।
যাহোক কাজের কথায় আসি। আমি রনজুর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ও এখানে আসবে চারটার দিকে। তোমাকে নিয়ে যাবে। যাকে ভালবাস তার সঙ্গেই জীবন শুরু কর। আমাদের ডিভোর্সের কাগজপত্র সই করে দিয়েছি। সেটাও রনজুর কাছেই আছে। আমার দিক থেকে কোনো সমস্যা হবে না। তোমরা সুখী হও।
পূণ: আরেকটা ব্যাপার কিছু টাকা রেখে গেলাম তোমার জন্য, হয়ত কাজে লাগবে। আর তোমার গয়নাগুলো নিয়ে যাও এগুলো দিয়ে আমিই বা কি করব?
কবীর।
স্তব্ধ হয়ে বসে রইল রানু! দ্বিতীয় মোটা খামটায় এক গাদা ১০০০ টাকার নোট!

বহু বছর পর; কবীরের সাথে দেখা হয়েছিল রানুর। রানু আর রঞ্জু গিয়েছিল অস্ট্রিয়ায়। তাদের ছেলের কাছে বেড়াতে। ছেলে এক জার্মান মেয়েকে বিয়ে করে থাকে অস্ট্রিয়ায়, মিস্টি মেয়েটার নাম পলিন। চমৎকার বাংলা বলে। মাস খানেক ছিল ওরা ছেলের বাসায়। একদিন উইকেন্ডে তারা বেড়াতে গিয়েছিল মাউন্ট অফ সেইন্টস এ।
- জান মা এই পাহাড়ে দেশ বিদেশের অনেক সাধু থাকে। একজন বাঙালী সাধুও আছে। বলে পলিন
- তাই নাকি?
- হ্যাঁ , নিঃসঙ্গ এই সাধুদের কাছে গেলে ওরা টুরিস্টদের আর্শিবাদ করে।
- তাই নাকি? চল আর্শিবাদ নিয়ে আসি সাধুর। রানু বলে।
বাঙালী সাধুটাকে খুঁজে পেতে একটু ঝামেলা হল। সাধুকে দূর থেকে দেখে রানুর বুকটা ধ্বক করে উঠল, সেই লোকটা লম্বা দাড়ি চুল কিন্তু ঠিক চেনা যায়।
- চল ফিরে যাই, ফ্যাকাশে গলায় বলে রানু।
- কেন আর্শিবাদ নিবে না? পলিন বলে।
- না, দরকার নেই। ওর আর্শিবাদ আমি পেয়েছি ফিস ফিস করে বলে রানু
- কি বললে মা?
- কিছু না। রানুর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। অসম্ভব একটা কষ্ট বুকের ভিতর দলা পাকিয়ে উঠে। কষ্টটা এই এত বছর পর ঠিক কার জন্যে রানু জানে না।

 

লেখক: আহসান হাবীব
কার্টুনিস্ট/ সম্পাদক
উম্মাদ, স্যাটায়ার কার্টুন পত্রিকা
 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top