সিডনী রবিবার, ৩১শে মে ২০২০, ১৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

তিন পায়া টেবিল : মোঃ ইয়াকুব আলী


প্রকাশিত:
২২ মে ২০২০ ০৯:০২

আপডেট:
২২ মে ২০২০ ০৯:০৪

 

উত্তরাধিকার সূত্রে আমরা তিন ভাই একটা টেবিল পেয়েছিলাম, যার ছিল তিনটা পায়া। কালের আবর্তে চতুর্থ পায়াটা কোথায় হারিয়ে গেছে সেটা আমাদের জানা নেই। টেবিলটাকে দাঁড় করিয়ে দিলে সেটা একদিকে কাত হয়ে অদ্ভুত একটা ভঙ্গি করে দাঁড়িয়ে থাকত। আমাদের তিন ভাইয়ের পড়াশোনার দুটি অনুষঙ্গের একটা ছিল এই তিন পায়া টেবিল। আমরা সেটাকে ঘরের বেড়ার সঙ্গে হেলান দিয়ে ভারসাম্য ঠিক রাখার ব্যবস্থা করেছিলাম। আর বাজার থেকে আব্বা সস্তার তিনটা চেয়ার কিনে এনেছিলেন। এ্‌ই চেয়ার ও টেবিলেই আমাদের নিয়মিত পাঠাভ্যাস চলত। আমাদের পড়াশোনার দ্বিতীয় অনুষঙ্গ ছিল একটা পুরোনো হ্যারিকেন। সেটাও উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া। হ্যারিকেনটার অবস্থাও ছিল খুবই জীর্ণ। তবে কাচ বদল করে দিলে সেটা ভালোই আলো দিত। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই মা কুপি বাতি আর হারিকেনটা নিয়ে বসতেন। দুটোতেই তেল আছে কি না পরীক্ষা করে নিতেন আর সঙ্গে সঙ্গেই চলত পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান। কুপি বাতিটা আব্বা ও মায়ের ঘরের জন্য আর হারিকেনটা ছিল আমাদের ঘরের জন্য।

পরবর্তীতে অবশ্য আব্বা বাজার থেকে আরও একটা সস্তার টেবিল কিনে এনে দিয়েছিলেন যখন আমাদের ছোট ভাইটা টেবিলে পড়াশোনা শুরু করল। মাগরিবের আজান দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা তিন ভাইসহ আব্বা মসজিদে চলে যেতাম। নামাজ শেষ করেই বাড়িতে ফিরে আসতাম। তারপর টেবিলের সামনে আমরা তিন ভাই চেয়ার নিয়ে বসে যেতাম। সমস্যা ছিল একটা হ্যারিকেনের আলোয় তিনজন পড়াশোনা করা। তাই আমরা হ্যারিকেনের তলায় একপাশে একটা বই দিয়ে সেটাকে আমরা আমাদের দিকে কাত করে দিতাম। এতে করে একটু বেশি আলো পাওয়া যেত ও আলোর পরিধিটাও বেড়ে যেত।

এভাবেই চলত আমাদের পড়াশোনা। প্রাথমিকের পর আমাদের বই ছিল অন্যের পুরোনো বই। আগের বছরের। আমাদের স্কুলেরই কারও কাছ থেকে অর্ধেক দামে আমরা সেই বই কিনে নিতাম। সেই বইগুলোর বেশির ভাগই ছেঁড়াফাড়া থাকত। আমরা সযতনে সেই বইগুলোতেই মলাট লাগিয়ে এবং সেলাই করে নতুন বানিয়ে ফেলতাম। এতে করে বইটার আয়ু আরও বেশ কয়েক বছর বেড়ে যেত। তবে মুশকিল হতো বাড়তি বইগুলো নিয়ে। যেমন দ্রুত পঠন, ইংরেজি গ্রামার আর ব্যাকরণ। প্রতি বছর বছর এই বইগুলো বদলে যেত। তাই যার কাছ থেকে কিনতাম তার এই বইগুলো আমাদের কোনো কাজে আসত না। তখন নতুন করে আমাদের এই বইগুলো কেনার সামর্থ্য না থাকাতে আমাকে এই ক্লাসগুলোতে অবধারিতভাবেই শাস্তি পেতে হতো। শুধুমাত্র ইংরেজি গ্রামার পড়া না পারার কারণে এক জীবনে যত বেতের বাড়ি খেয়েছি তত শাস্তি অন্য সব বিষয় মিলিয়ে পাইনি।

আমাদের পড়ালেখার খরচ বলতে গেলে ছিল বছরে একটি মাত্র স্কুল ড্রেস বানানো। ঈদের সময় সবাই যখন নতুন পোশাক নিত আমাদের বানিয়ে দেওয়া হতো নতুন স্কুল ড্রেস। সেটা পেয়েই আমরা অনেক খুশি থাকতাম। নতুন কাপড়ের এক ধরনের গন্ধ থাকে। আমরা বারবার সেটা নাকের কাছে ধরে সেই গন্ধ নিতাম। আর খাতা বলতে ছিল নিউজপ্রিন্টের অঙ্ক খাতা মাত্র দুই টাকা দিস্তা। বন্ধুবান্ধবের মধ্যে অনেকেই সাদা খাতা ব্যবহার করত। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য না থাকায় আমরা নিউজপ্রিন্টের খাতা ব্যবহার করতাম। তবে একবার আব্বা কার কাছ থেকে খবর পেয়ে কুষ্টিয়া কোর্ট স্টেশনের পাশের পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে পুরোনো সাদা খাতা কেজি দরে কিনে আনলেন। বোর্ড পরীক্ষায় আমরা যে সাদা খাতগুলোতে পরীক্ষা দিই তার অব্যবহৃত পাতাগুলো ছিঁড়ে নিয়ে এখানে বিক্রি করা হতো। আমরা সেগুলো হাতে পেয়েই মহাখুশি। হাজার হলেও সাদা খাতা বলে কথা। সেই আলাদা আলাদা পাতাগুলোই আমরা দুই পাশে দুটো শক্ত মলাট দিয়ে খাতার মতো করে সেলাই করে ব্যবহার করতাম।

তবে এই সামান্য খরচও আব্বার পক্ষে জোগান দেওয়া সম্ভবপর ছিল না। তাই আমরা পাড়ার ঠাকুর বাড়ি থেকে কাগজ এনে সেটা দিয়ে ঠোঙা বানাতাম। সবকিছুই তাদের আমরা শুধু শ্রম দিয়ে বানিয়ে দিতাম। বিভিন্ন আকৃতির ঠোঙা বানানোর পর কেজি প্রতি মজুরি দেওয়া হতো। তবে সবচেয়ে বেশি দেওয়া হতো এক টাকা পঞ্চাশ পয়সা দরে। তারা কাগজ দিতেন এবং তাদের দেওয়া ময়দা দিয়ে আঠা বানিয়ে সেগুলোকে শুকিয়ে কেজি দরে ওজন করে তাদের বুঝিয়ে দিয়ে আমরা পয়সা পেতাম। অনেকেই ঠোঙার তলায় ভারী ওজনের কাগজ দিয়ে ওজন বাড়িয়ে দিত। কিন্তু মা আমাদের বলতেন এমন করো না। তাহলে তারা কিন্তু আর আমাদের কাছে বানাতে দেবেন না। তখন এই সামান্য উপার্জনের রাস্তাও বন্ধ হয়ে যাবে।

স্কুলে যাওয়া-আসার জন্য ছিল বাটার হাওয়াই চপ্পল। সেগুলো কোনো কারণে ছিঁড়ে গেলে আব্বা নিড়ানি বা কাস্তে চুলার আগুনে গরম করে সেটাকে দুই পায়ের মাঝে ধরে তারপর চপ্পলের ছেঁড়া দুইটা টুকরোকে গরম কাস্তের বা নিড়ানির দুপাশে ঠেসে ধরতেন। এতে করে দুপাশেরই কিছু অংশ কাস্তের গরমে গলে একটু তরল হয়ে যেত। তখন দ্রুতই সেই দুটো অংশকে একে অপরের সঙ্গে ঠেসে ধরলে জোড়া লেগে যেত। এভাবে প্রথমে কয়েকবার জোড়া দেওয়ার পর যখন সেগুলো আর জোড়া দেওয়ার কোনো উপায় থাকত না, তখন বাজার থেকে ফিতা কিনে এনে চপ্পলে লাগিয়ে দেওয়া হতো। এভাবেই বছর চলে যেত। ঈদের নতুন স্কুল ড্রেসের সঙ্গে মাঝেমধ্যে নতুন চপ্পলও জুটে যেত। তখন আমাদের খুশি দেখে কে?

স্কুলের কোনো ক্লাসের বেতন দেওয়ার স্মৃতি তেমন একটা মনে পড়ে না। ফিসও দেওয়া হতো না। তবুও স্যারেরা দয়া পরবশ হয়ে আমাকে পরীক্ষা দিতে দিতেন। বলতেন পরে দিয়ে দিয়ো কিন্তু। আমাকে নিয়ে প্রায়ই স্যারদের দেখতাম মিটিং করতে। কীভাবে এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়। কিন্তু শত আলোচনার পরেও কোনো সমাধান পাওয়া যেত না এবং আমাদেরও পড়ালেখা যথারীতি আমার তেপায়া টেবিলের মতো জোড়াতালি দিয়ে চলতে থাকল। প্রত্যেক ক্লাসে আমার রোল নম্বর প্রথম তিনজনের মধ্যে থাকাতে স্যারেরা তেমন কোনো পদক্ষেপও নিতেন না।

আমাদের স্কুলে দুটি বিল্ডিং ছিল। একটা ছিল ছাপড়া মানে ওপরের টিনগুলো শোয়ানো অবস্থায় ছিল আর অন্যটা ছিল দোচালা। তবে দেয়ালগুলো ছিল ইটের। বৃষ্টি হলেই দুটো বিল্ডিংয়ের চাল দিয়েই পানি পড়ত। তখন আমাদের সরে বসতে হতো। পুরো স্কুলটা ছিল ইংরেজি এল অক্ষর আকৃতির। রাস্তার সঙ্গেই একটা মাঠ। মাঠের এক প্রান্তে রাস্তার সঙ্গে লাগোয়া এক কক্ষের একটা ইটের দেয়াল ও ছাদ দেওয়া ঘর। সেটাই অফিস তার পরেই ছাপড়া ঘর। ছাপড়া ঘরের শেষ প্রান্তেই সমকোণে দোচালা বিল্ডিংটা। এই দুটির সংযোগস্থলের কোনাটার মধ্যে ছিল টয়লেট। এই দুটি বিল্ডিংয়ের মাঝে কোনো দেয়াল ছিল না। মাঝে কাঠের ভ্রাম্যমাণ দেয়াল দিয়ে একটা ক্লাসকে অন্য ক্লাস থেকে আলাদা করা ছিল।

দোচালা বিল্ডিংটা বড় হওয়াতে ফলাফলের সময় আমাদের সেখানে নিয়ে বসানো হতো মাঝের কাঠের ভ্রাম্যমাণ দেয়ালগুলো সরিয়ে দিয়ে। ছোট ক্লাস থেকে শুরু করে আগে তৃতীয় তারপর দ্বিতীয় সবার শেষে প্রথম স্থান অধিকারীর নাম ঘোষণা করা হতো। অষ্টম শ্রেণি থেকে নবম শ্রেণিতে উঠতে যাচ্ছি আমরা। একে একে তৃতীয় ও দ্বিতীয় স্থান অধিকারীর নাম ঘোষণা করা হলো। তারা সামনে এগিয়ে গিয়ে স্যারদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের নম্বরপত্র নিয়ে আসল। কিন্তু প্রথম স্থান অধিকারীর নামের বেলায় বলা হলো যেহেতু তার বেতন ও ফিস বাকি আছে সেহেতু তার নাম ঘোষণা করা হচ্ছে না।

এদিকে যে সব সময় ক্লাসে প্রথম হয় সে গিয়ে দ্বিতীয় স্থান অধিকারী হিসেবে নম্বরপত্র নিয়ে এসেছে। আর তৃতীয় যে সেও তার আগেই গিয়ে নম্বরপত্র নিয়ে এসেছে। বাকি আছি শুধু আমি। তখন আমি বুঝলাম আমার বেতন বাকি থাকাতে আমার নাম ঘোষণা করা হচ্ছে না। দুই চোখে সাগরের জোয়ার নেমে আসল। আমি পুরো অনুষ্ঠান শেষ না করেই ক্লাস থেকে বের হয়ে এলাম। বের হয়ে কিছু দূর এসেছি, তখন ক্লাসে আমার নাম ঘোষণা করা হলো আর স্কুলের দপ্তরি দৌড়াতে দৌড়াতে এসে পারলে কোলে করে আমাকে নিয়ে গেল। আমি জোর করছিলাম না যাওয়ার জন্য।

এভাবে স্কুলের পাঠ একসময় চুকিয়ে ফেললাম। সামনেই এসএসসি পরীক্ষার রেজিস্ট্রেশনের ফিস জমা দেওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। স্যারেরা সবাই মিলে হিসাব করে বের করে ফেললেন, আমাকে ন্যূনতম কত টাকা দিতে হবে। আমি বাড়ি ফিরে মাকে পরিমাণটা বলার পর মা শুরুতে একটু দমে গেলেন। তারপর হঠাৎ কী যেন মনে পড়েছে ভেবে আমাকে বললেন, তুমি এসব নিয়ে ভেবো না। তুমি মনযোগ দিয়ে পড়াশোনা করতে থাক। আমি বললাম কিন্তু পরীক্ষার ফিস জোগাড় হবে কীভাবে? মা বললেন, শোন যার কেউ নাই, তার আল্লাহ আছেন। উনিই ব্যবস্থা করে দেবেন। মার কথায় কেমন জানি আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলাম। কারণ আমি জানি, মা যখন একবার বলেছেন তখন ঠিকই ফিসের টাকা জোগাড় করে থামবেন।

আব্বার কাজের পাশাপাশি বাড়িতে আমরা ঠোঙা বানিয়ে সামান্য কিছু রোজগার করতাম। এর বাইরে মা বাড়িতে গরু-ছাগল আর হাঁস-মুরগিও পুষতেন এবং তারাও আমাদের মতোই মায়ের সন্তানের আদরে বেড়ে উঠত। বিশেষ করে ছাগলের বাচ্চার আদরের কথা আলাদাভাবে বলা দরকার। ছাগলের বাচ্চা হওয়ার পর তারা মায়ের সঙ্গে একই বিছানায় ঘুমাত। তাদের পায়খানা, প্রস্রাব বা খিদে লাগলে নাকি মুখ দিয়ে এক ধরনের শব্দ করে মাকে জানান দিত। মা তখন তাদের গোয়ালে নিয়ে খাইয়ে প্রস্রাব, পায়খানা করিয়ে আবার কোলের মধ্যে নিয়ে শুয়ে পড়তেন। তাই আমাদের বাড়ির ছাগলের বাচ্চার বিশেষ কদর ছিল আমাদের পাড়ায়। এমনও হয়েছে আমাদের ছাগলটা সন্তান সম্ভবা হয়েছে আর মানুষ এসে মাকে অগ্রিম টাকা দিয়ে গেছে। বাচ্চা হয়ে দুধ খাওয়া ছাড়ার পর নিয়ে যাবেন। যখন কেউ ছাগলের বাচ্চাটা নিয়ে যেতেন, মা আঁচলে মুখ লুকিয়ে কাঁদতেন আর প্রতিদিন একবার করে হলেও গিয়ে বাচ্চাটাকে দেখে আসতেন আর বলে আসতেন বাচ্চাটা কী কী খেতে পছন্দ করে।

সেবার একটা ছাগলের বাচ্চা মা রেখে দিয়েছিলেন। সেটাই আদরে বাঁদর হয়ে বেড়ে উঠেছিল। সে রাস্তায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকত আর রাস্তা দিয়ে যত মানুষ যেত তাদেরকে শিং দিয়ে গুতো দিত। সেটা বেশ বড় হয়ে গিয়েছিল তত দিনে। ছাগলের বাচ্চাটার একটা নামও ছিল, যেটা এখন আর মনে নেই। পরদিন মা ছাগলের বাচ্চাটার নাম ধরে বললেন, তুমি ওকে স্কুলে নিয়ে যাও। স্যারদের বল এটার যা দাম হয় সেটাকেই ফিস হিসেবে নিতে। আমার এখনো মনে আছে, আমি আর মেজো কাঁদছি আর ছাগলের বাচ্চাটাকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছি। কারণ সেতো আমাদেরও ভাই ছিল। স্যারেরা মনে হয় এমন কিছুর জন্য তৈরি ছিলেন না। তাই একটু দ্বিধায় পড়ে গেলেন। তখন আমাদের ক্রীড়া শিক্ষক এসে বললেন, আমি ছাগলের বাচ্চাটা রেখে দিচ্ছি আর ওর ফিসটা আমি দিয়ে দিচ্ছি। এই একজন মানুষের অবদান আমার জীবনে অপরিসীম। আমি জীবনে ফেরেশতা দেখিনি, কিন্তু এই মানুষটাকে আমি ফেরেশতা মানি। সেই গল্প অন্য কোনো দিন।

আমাদের টেবিলটার ছিল তিনটা পায়া। আর চতুর্থ পায়াটা ছিলেন আমাদের মা। তিনিই আমাদের পড়াশোনার সকল বিষয় দেখভাল করতেন। টেবিলটা একটা পায়ার অভাবে যাতে হেলে না পড়ে, সে জন্য আমরা সেটাকে ঘরের বেড়ার সঙ্গে ঠেস দিয়ে রাখতাম। এই বেড়া টেবিলটার চতুর্থ পায়া হিসেবে কাজ করত। ঠিক তেমনি লেখাপড়া নিয়ে যখনই আমরা কোনো বিপদে পড়তাম আমাদের পাশে এসে দাঁড়াতেন আমাদের মা।

 

মো: ইয়াকুব আলী

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top