সিডনী রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ই আশ্বিন ১৪২৭

মাস্টার প্ল্যান (রম্য গল্প) : সত্যজিৎ বিশ্বাস


প্রকাশিত:
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:৩৪

আপডেট:
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:৪১

ছবিঃ সত্যজিৎ বিশ্বাস

 

(এক)
‘নারে দোস্ত, এ চাকরীটাও হলো না’ দীর্ঘশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে মেসের চকিতে বসে পড়লো জুয়েল। বুক পকেটে স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে রাজধানীতে এসেছে চাকরীর খোঁজে। এসে উঠেছে বন্ধু এমদাদের মেসে।

জুয়েলের কথা শুনে আম কাঠের নড়বড়ে চকি কাঁপিয়ে ঝপ করে পাশে এসে নিজেই ইন্টারভিউ নেয়া শুরু করলো এমদাদ।
- হলো না কেন? ইন্টারভিউ কি খুব খারাপ হয়েছে?
- খুব।
- তুই তো নামেও জুয়েল, ছাত্র হিসেবেও জুয়েল। সারাদিন বই, পেপার, ম্যাগাজিন পড়ার উপরই আছিস। তোর তো কোন প্রশ্নে আটকে যাবার কথা না। কী প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছিল?
- আরে ধূর, জিজ্ঞাসা করে, আপনি প্রেম করেন?
- কী জবাব দিলি?
- সত্যি কথাই বললাম।
- শুনে নিশ্চয়ই খুশি হলো?
- ঘোড়ার ডিম হলো। বলে, এতদিনে একটা মেয়েকেই কনভেন্স করতে পারলেন না, আমাদের প্রোডাক্ট কি করে কাস্টমারদের কনভেন্স করে বিক্রি করবেন?
- দারুণ বলেছে তো ব্যাটা!
- তুইও বললি?
- কেউ দারুণ বললে তাঁকে প্রশংসা করতে পারব না? শোন রে গাধা, শুধু লেখাপড়ায় জুয়েল হলে হবে? এসব ব্যাপারেও জুয়েল হতে হবে। আচ্ছা বল তো, বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত কোথায় হয়?
- কেন, শ্রীমঙ্গলে।
- নাহ্, তোকে দিয়ে হবে না। স্পেশাল ট্রেনিং লাগবে।
- স্পেশাল ট্রেনিং লাগবে কেন? ভুল কিছু বলেছি?
- অবশ্যই ভুল বলেছিস। সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় প্রেমে পড়া বঙ্গ ললনার চোখে। আয় তোকে মেয়েদের কনভেন্স করা শিখাই। কিন্তু শর্ত আছে, স্পেশাল ট্রেনিং শেষ হয়ে যাওয়ার পর স্পেশাল ট্রিট দিতে হবে।
- তা না হয় খাওয়ালাম। কিন্তু আমি যে মেয়েদের সাথে ভালো করে কথাই বলতে পারিনা। তাছাড়া শুনেছি ঢাকা শহরের মেয়েরা খুব ফাস্ট।
- আরে ধূর, আমার কাছে যে প্ল্যান আছে, তোকে কোন কথাই বলতে হবে না। কথা বলা ছাড়াই তুই যাকে পছন্দ করবি, সেই মেয়ে তোর প্রেমে হাবুডুবু খাবে।
- আজ চেহারা খারাপ বলে এত মজা নিচ্ছিস?
- আরে না, সিরিয়াসলি বলছি। হাবুডুবু খাবে না মানে? আলবৎ খাবে। শোন, যে কোন কাজে সফলতা পেতে হলে মাইক্রো প্ল্যান লাগে।
- মাইক্রো বাসের কথা শুনেছি, মাইক্রো প্লেনও আছে নাকি? আর থাকলেও আমার এত টাকা নেই প্লেন ভাড়া করার।
- হায়রে খ্যাত রে। বলি কী, বোঝে কি? মাইক্রো ‘প্লেন’ না ‘প্ল্যান’। মানে, পরিকল্পনা লাগে। আমার মাথায় সম্পূর্ন ঝুঁকিহীন পরিকল্পনা আছে, যা চারটা ধাপে কাজ করে। এতে কাজ হবেই হবে।
- সত্যি?
- মিথ্যে হবে কেন? মন দিয়ে শোন। এই কাজের প্রথম ধাপ হলো, যাকে দেখে বুকের ভেতরটা উথাল-পাথাল করে এমন একজন সুন্দরী, তন্বী মেয়ে খুঁজে বের করা।
- তারপর?
- তারপর দ্বিতীয় ধাপ। দ্বিতীয় ধাপ হলো, এক সপ্তাহ ধরে তাকে ফলো করে যেতে হবে। অপলক তাঁকিয়ে থাকতে হবে। তবে তার সামনে যাওয়া যাবে না, কথা বলা যাবে না। শুধু দূর থেকে ফলো করতে হবে।
- এক সপ্তাহ ধরে শুধু ফলো করবো! সেই মেয়ে যদি দেখে ফেলে? যদি আমার দিকে তাকায়, তখন কী করব?
- সেটাই তো তৃতীয় ধাপ। যখন দেখবি, তোর দিকে তার নজর পড়ে গেছে, একটা গোলাপ ফুল হাতে নিয়ে বসে থাকবি। কিন্তু খবরদার, সামনে যাবি না। খালি খেয়াল করবি, তোর হাতে গোলাপ দেখে সে কী করে?
- এগুলো ধাপ নাকি চাপ? কেমন কেমন জানি লাগছে রে দোস্ত...
- কেমন, কেমন মানে?
- মনে হচ্ছে যুদ্ধে যাবার প্রস্তুতি।
- যুদ্ধই তো। কথা কম বলে পুরো প্ল্যান শোন। শেষ ধাপ মানে চতুর্থ ধাপে এসে যখন দেখবি মেয়েটা তোকে দেখে মিটিমিটি হাসে আর তাঁকায়, তখন সামনে গিয়ে তার হাতে গোলাপটা দিয়ে আসবি। ব্যস, আর কিচ্ছু বলতেও হবে না, করতেও হবে না। ভালবাসা অটোমেটিক হয়ে যাবে।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে শুনতে জুয়েল পুরো ব্যাপারটা যেন চোখের সামনে দেখতে পেল। এমদাদ ধাক্কা দিয়ে ঘোর ভাঙাতেই জুয়েল তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, আই লাভ ইউ দোস্ত। তুই আসলেই একটা জিনিষ। আগামীকাল থেকেই কাজে নেমে পড়ি, কী বলিস?

(দুই)
তিনদিন পর দুপুর তিনটার দিকে অপরিচিত এক নাম্বার থেকে কল এলো এমদাদের ফোনে। ফোনটা রিসিভ করতেই এক কিন্নরী কন্ঠ ভেসে এলো, আপনি কি এমদাদ বলছেন?
এমন ভালবাসা মাখানো কন্ঠে কেউ কখনও কথা বলতে পারে, এই ফোনটা না আসলে জানাই হতো না এমদাদের। হাতের ফাইল ফেলে, চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়িয়ে গেল।
- জ্বি বলছি। কে বলছেন প্লিজ?
- আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি কিন্তু আপনাকে চিনি।
- ওমা, তাই?
- জ্বি। না চিনলে আপনার মোবাইল নাম্বার পেলাম কী করে? আপনি কি ধানমন্ডি বত্রিশ নাম্বারের মোড়ে আসতে পারবেন এখন?
- ইয়ে, এখন?
- জ্বি, প্লিজ আসুন না। কথা আছে।
- কিন্তু এখন যে অফিসে।
- তাতে কী হয়েছে? অফিস থেকে পার্সোনাল কাজের কথা বলে বের হননি কখনো?
- তা হয়েছি। কিছু মনে করবেন না, খুব কী জরুরি ব্যাপার?
- জীবনে এর চেয়ে জরুরি ব্যাপার আর হয় না। খুব দরকার আপনাকে। খুউউব।
- আচ্ছা ঠিক আছে, আসছি এখুনি।

জীবনে সময় আর সুযোগ একসাথে হাতে গোণা দু’একবারের বেশি আসে না। ভীতুরা সে সুযোগ হাতছাড়া করে, সাহসীরা এগিয়ে যায়। কে না জানে, সাহসীদের হাতের মুঠোতেই ধরা দেয় সৌভাগ্য। হাত মুঠি করে সেই সৌভাগ্যের সন্ধানে জরুরি কাজের কথা বলে অফিস থেকে বের হয়ে পড়ল এমদাদ।

লোকাল বাসে ঝুলতে ঝুলতে ভাবতে লাগল, আচ্ছা কে হতে পারে এই ললনা? কোন এক্স গার্লফ্রেন্ড প্যাঁদানি দেবার জন্য ডেকে নিচ্ছে না তো আবার? কলি, পলি, মলি কারো সাথেই তো বলার মত টাকা পয়সার লেনদেন ছিল না। দু, চারটাকা প্রেমিকার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে খসায় না, এমন কোন প্রেমিক আছে নাকি? তাছাড়া, সে তো কারো কাছ থেকে কেটে পরেনি, বরং তার সাথে সম্পর্ক হবার পর মানে মানে ওরাই কেটে পড়েছে স্বভাব চরিত্রের পরিচয় পেয়ে। অনেক ভেবে কূল করতে না পারলেও বাস এসে ঠিকই কূলে ভীড়ে গেল।

বাস থেকে শুক্রাবাদ মোড়ে নেমে শার্টের ইন ঠিক করল প্রথমে। তারপর হাতের আঙুলকে চিরুনী বানিয়ে চুল আঁচড়িয়ে টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বত্রিশ নাম্বারের মোড়ে এসে দাঁড়ালো এমদাদ। এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে চোখ চলে গেল একটু দূরে দাঁড়ানো পুলিশের পিকআপটার দিকে।
আরে, পুলিশ পিকআপের পেছনের সীটে বসা ও কে? জুয়েল না! জুয়েলই তো। গাধাটা এখানে কী করে?
জুয়েলও ঠিক সে মূহূর্তে এমদাদকে দেখতে পেয়ে হাত বাঁড়িয়ে ডাকল, এ-ম-দা-দ এদিকে আমি। বিপদের গন্ধ পেয়ে অন্যদিকে ঘুরে যাবার আগেই দুইজন ইউনিফর্ম পড়া পুলিশ সামনে এসে দাঁড়ালো, এই নাম কি তোর, এমদাদ না? গাড়িতে ওঠ।

(তিন)
ঘটনা অতি সামান্য। জুয়েলের চোখে বিশ্ব সুন্দরী মনে হয়েছিল এক লাবন্যময়ী পুলিশ কনস্টেবলকে। সেই মমতাময়ী পুলিশ কন্যা প্রথম দুইদিন জুয়েলের চোর চোর ভাবের চোরা চাহনি দেখেও কিছু বলেনি। তৃতীয় দিনও যখন একই দৃশ্য দেখল, জুয়েলকে দিয়েছে এক চড়। সেই চড় খেয়ে প্রেম করার পুরো মাস্টার প্ল্যানটা, প্ল্যানারের নামসহ বলে দিয়েছে জুয়েল।

(শেষ কথা)
দুই বন্ধুকে নিয়ে পুলিশ পিকআপ রওনা দিয়েছে থানার দিকে।
পৃথিবী হলো বিরাট নাট্যমঞ্চ। নাটকের শেষ দৃশ্য রোমান্টিক না ট্র্যাজেডিক হবে তাঁর কতটুকুই বা আমরা আঁচ করতে পারি? লাবন্যময়ী পুলিশ কনস্টেবল থানায় নিয়ে কাকে, কী ট্রিট দেয়, কে জানে?
---

সত্যজিৎ বিশ্বাস
রম্য লেখক ও শিশু সাহিত্যিক
* রম্য বিভাগীয় সম্পাদক- কিশোর বাংলা
* নির্বাহী সম্পাদক- কিশোরকাল
* কন্ট্রিবিউটার – মাসিক স্যাটায়ার কার্টুন ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’, জাতীয় দৈনিক যুগান্তর ‘বিচ্ছু’, দৈনিক ইত্তেফাক ‘ঠাট্টা’।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top