সিডনী শুক্রবার, ২৭শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

বধির নিরবধি (পর্ব নয়) : আসিফ মেহ্‌দী


প্রকাশিত:
২৬ অক্টোবর ২০২০ ১৫:৫৯

আপডেট:
২৭ নভেম্বর ২০২০ ০১:১৪

 

(দেশসেরা দুই ফান ম্যাগাজিন ‘উন্মাদ’ ও ‘রস+আলো’তে লেখার সুবাদে আসিফ মেহ্‌দী রম্যলেখক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন আগেই। ‘বেতাল রম্য’ নামের প্রথম বইয়েই তিনি লাভ করেন তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। তারপর একে একে প্রকাশিত তাঁর প্রতিটি বইয়ে ব্যঙ্গ আর হাসির সঙ্গে গভীর জীবনবোধের প্রতিফলন ঘটিয়ে তিনি শুধু পাঠকপ্রিয়তাই লাভ করেননি, তাঁর বইগুলো উঠে এসেছে বেস্ট সেলার বইয়ের তালিকায়। সেগুলোর মধ্যে 'বধির নিরবধি', ‘মায়া’, ‘অপ্সরা’, ‘তরু-নৃ’ অন্যতম। এছাড়া এনটিভিতে প্রচারিত তাঁর লেখা নাটক ‘অ্যানালগ ভালোবাসা’-র বিষয়বস্তুর জীবনঘনিষ্ঠতা দর্শকদের হৃদয় ছুঁয়েছে। ‘ন্যানো কাব্য’ নামে একটি বিশেষ কাব্যধারার প্রবর্তক আসিফ মেহ্‌দী কবিতা প্রেমীদের কাছে ন্যানো কবি হিসেবে পরিচিত। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা পঁচিশ।)

 

পর্ব নয়ঃ

রাতভর হাসপাতালে ছিল রুহান। শওকত সাহেবের জ্ঞান আর ফেরেনি; বরং অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। মুমূর্ষু অবস্থা থেকে ফিরে আসার আশা ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হচ্ছে। বড়ভাই সুহান বা ভাবী হাসপাতালে এলে বাসার দিকে পা বাড়াবে রুহান। অফিসে যাবে না আজ। বাবার মুমূর্ষু অবস্থার কথা জানিয়ে ছুটি নিয়েছে। যে বাবা একসময় আদরে-সোহাগে বড় করেছেন, ছেলেদের মানুষ করার জন্য কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তার জন্য কিছুই করতে না পারার কষ্ট রুহানকে রাতভর পুড়িয়েছে। তাই বলে জীবন তো আর থেমে থাকে না! রাতে হাসপাতালে বসেই রুহান তার ব্যক্তিগত সমস্যা সমাধানের জন্য কাজ করেছে। ইনো ভাইয়ের বাতলে দেওয়া কৌশল প্রয়োগের ব্যবস্থা করেছে। সকাল দশটাতে তার বাসায় হাজির হবে একজন। তারপরই বোঝা যাবে, এই কৌশল কতটা উপকারী। তবে এতে তাৎক্ষণিক একটি উপকার হয়েছে। কিছুক্ষণের জন্য হলেও বাবার মুমূর্ষু অবস্থাকে ভুলে থাকতে পেরেছে রুহান।

গত সপ্তাহের সোমবারের একটি ঘটনা রুহান কিছুতেই ভুলতে পারছে না। অফিসে যাওয়ার মাঝপথে তার মন কামড়ে ধরার পাশাপাশি পেট কামড়ে ধরল। তাই সে অফিসে না গিয়ে বাসার দিকে রওনা দিল। বাসায় পৌঁছে কলিংবেল বাজাল-একবার, দুবার, বহুবার! অজানা আশঙ্কায় তার মন ভীষণ অস্থির হয়ে উঠল। সেদিন অপেক্ষা বড়জোর এক মিনিটের ছিল কিন্তু রুহানের কাছে মনে হয়েছিল ‘অনন্ত সময়’। বাসায় ঢুকে নয়নকে ড্রইংরুমে দেখমাত্র তার প্রাণের মাঝে ধাক্কা লাগল! প্রীতি নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘পড়াশুনা বোঝাতে নয়নকে ডেকেছি’। প্রীতি ও নয়নের অতিরিক্ত বিন্দাস ও উদাস ভঙ্গি রুহানকে ভেতরে ভেতরে আরও অসহিষ্ণু করে তুলল। অতিরিক্ত চাঞ্চল্য ঢাকতে কি তাদের এই স্থিরতার অভিনয়? রুহানের ভেতরটা ঘুরপাক খেতে লাগল। চাপা স্বভাবের হওয়ায় রুহানের অন্তর্নিহিত দুশ্চিন্তা-অস্থিরতাগুলো ঘুরেঘুরে টর্নেডোর শুঁড় হয়ে বেরিয়ে যায় না; সেসব আটকা পড়ে মনের গহীনের চোরাবালিতে।

রুহান বুঝতে পারছিল যে সমস্যাটির গোড়া অনেক গভীরে। আগুন থাকলে কীট আসতে চাইবেই। তাই এর মূলোৎপাটন করতে গিয়ে নিজের সংসারের শেকড়টাই না শেষ পর্যন্ত উপড়ে যায়! আধুনিকতার নামে আদিমতা চলছে তার চোখে সামনে, তার পরিবারের মধ্যে, তার সাজানো ঘরের ভেতর। রুহানের আহত মন গুমড়ে কুণ্ডলি পাকিয়ে যেন হাঁসফাঁস করে চলল। ভেতরে ওলটপালট হয়ে গেলেও বাইরে সেই ছায়ামূর্তি ধারণ করতে পারে না রুহান। মেজাজ ভীষণভাবে বিগড়ে গেলেও তার পক্ষে তা প্রকাশ করা সম্ভব হয় না। তাই আজীবন ঝগড়ায়-তর্কে অন্যপক্ষ সুবিধা লুফে নিয়েছে। সেদিন রুহান শুধু ভীরুর মতো মনেমনে বলেছে, ‘হারামজাদা পোলাটার এ কেমন আক্কেল-যে মেয়ের সংসার আছে, তার সংসারে বারাবার আসে!’     

 

দাদাজানের কথা বলে ছুটি নিলেও বাসায় নিজের রুমে ঘাপটি মেরে পড়ে আছে রনি। প্রচণ্ড খারাপ লাগা উদ্বায়ী পদার্থের মতো আকস্মিকভাবে উবে গেছে। জীবন নিয়ে বেশি ভাবলে বোধহয় এমনই হয়। ইনো ভাইয়ের মতো জীবনকে উল্টে-পাল্টে নানাভাবে বিশ্লেষণ করে চলেছে রনি। মজার ব্যাপার হলো-তার কাছে এতদিন জীবনের নানা অর্থ যেমন মনে হতো, আজ তেমন মনে হচ্ছে না! জীবনের অর্থগুচ্ছ হয়তো বহুস্তরবিশিষ্ট পেঁয়াজের খোসার মতো। মানুষ তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অনুযায়ী সেগুলোকে বুঝতে বা ব্যাখ্যা করতে শেখে।

এ মুহূর্তে রনির মধ্যে বিরহব্যথা একদমই কাজ করছে না। বরং যার জীবনসঙ্গিনী, নূপুর তার কাছে চলে যাওয়ায় অসহ্যকর পরিস্থিতিতে আর পড়তে হবে না ভেবে সে স্বস্তিই পাচ্ছে। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবা শুরু করেছে রনি। আসলে কি সে ঠিক পথে এগোচ্ছে? কাজগুলো কি মনের আনন্দ নিয়ে করছে? জীবন শেষে নিজেকে কোথায় দেখতে চায় সে?-এমন নানা প্রশ্ন তার মাথার মধ্যে ঘুরছে। প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো সে খুঁজে পায়নি; তবে বুঝতে পারছে যে একটা সময় এসব প্রশ্নের উত্তর তার জানা হয়ে যাবে। নিজের মন কী চায়, তা উপলব্ধি করতে পারবে। হাজির হবে উপযুক্ত পরিস্থিতি। সেই পরিস্থিতি কাজে লাগাতে পিছপা হবে না রনি।  

 

সকাল দশটার দিকে কলিংবেল বেজেই চলেছে। রুহান বাসায় ফিরে ঘুমাচ্ছে। দরজা খোলার জন্য গেল প্রীতি। ভীষণ বিরক্ত হয়ে সে ভাবছে-শওকত সাহেবের কোনো দুঃসংবাদ থাকলে মোবাইলেই জানাতে পারত। এমন অসভ্যের মতো কলিংবেল বাজায় কেউ? তবে দরজা খুলতেই বিরক্তির সঙ্গে প্রীতির মনে যুক্ত হলো বিস্ময়। এক অপরিচিত তরুণী দাঁড়িয়ে আছে! প্রীতি জিজ্ঞেস করল, ‘কে আপনি? কাকে চান?’

মেয়েটি জবাব দিল, ‘আমাকে আপনি চিনবেন না। আমি রুহান ভাইয়ের কলিগ। উনি কি বাসায় আছেন? অফিসের একটা জরুরী বিষয় নিয়ে ডিসকাস করার দরকার ছিল।’

অপরিচিতা মেয়েটির কথা শুনে প্রীতির মেজাজ বিগড়ে গেল। বলল, ‘অফিশিয়াল কাজ অফিসে করবেন। বাসায় কেন? আর আজকে তো রুহান ছুটি নিয়েছে। সারারাত হাসপাতালে জেগেছিল। আপনি কি জানেন, ওর বাবা আইসিইউতে?’

ক্লান্তকণ্ঠে মেয়েটি বলল, ‘একটু আর্জেন্ট ছিল, আপু। আপনি কিছু মনে করবেন না।’

মেয়েটির সঙ্গে কথা বলার আর কোনো রুচি হলো না প্রীতির। গটগট করে সে ভেতরে ঢুকে গেল। খানিক পর চোখ কচলাতে কচলাতে রুহান এল ড্রইংরুমে। সোফায় বসেই দুজন অফিসের কাজ নিয়ে আলোচনা করতে থাকল। এক ফাঁকে উঠে গিয়ে রুহান চা-নাশতার ব্যবস্থা করল। রুহানের কলিগ গেল ঘণ্টা দুয়েক পর। তাকে বিদায় দিয়ে বেডরুমে এসে রুহান দেখল, প্রীতি চোখমুখে রাগ ও বিরক্তি নিয়ে বসে আছে। কড়াগলায় প্রীতি প্রশ্ন করল, ‘ওই মহিলার সঙ্গে তোমার কতদিনের সম্পর্ক?’

আমতা আমতা করে রুহান বলল, ‘এসব কী বলছ! সে আমার কলিগ। আর অরুনিমা আমার বোনের মতো।’

‘আমি বুঝি না, বাসা পর্যন্ত আসার সাহস পায় কীভাবে!’

‘দেখলেই তো, জরুরি একটা কাজ ছিল। বস-এর অর্ডার। মেয়েটারও তো এত সকালে আসতে কষ্ট হয়েছে, তাই না?’

‘ওই মহিলার আসতে কষ্ট হয়েছে কিনা, সেই ফিরিস্তি তোমাকে দিতে হবে না। খবরদার বলে দিচ্ছি, ওই মহিলাকে আর এই বাসায় যেন আসতে না দেখি! ওইসব বোন-কলিগ বাসায় অ্যালাউড না। তোমার বসকে জানিয়ে দেবে, অফিসের কাজ বাসায় করা তোমার পক্ষে সম্ভব না।’

‘ওকে। তুমি যা বলবে, তা-ই হবে।’

 রুহানের অনেক কথা বলার ছিল। কিন্তু সেগুলো তার মুখ দিয়ে বেরোল না। সে বলতে পারল না যে ‘এই বাড়িতে অমন প্রকৃতির ভাইদেরও আসা চলবে না।’ রুহান তার অস্থিরতা প্রীতির মতো প্রকাশ করতে জানে না। যে মানুষগুলো তাদের ভালো লাগা ও মন্দ লাগাগুলো পূর্ণভাবে প্রকাশ করতে পারে না, তারা কত অসহায়! অন্যরা তাদের বেকায়দা অবস্থার ফায়দা নেয় শুধু।

 

বাস পৌঁছে গেছে ভোর সাড়ে পাঁচটায়। বাসে ইনা ও তাহমিদ-দুজনই শেষের কয়েক ঘণ্টা ঘুমিয়েছে। ঘুম ভাঙার পর ইনার বেশ লজ্জা লেগেছে। ঘুমের ঘোরে কি সে তাহমিদের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়েছিল? তাহমিদেরও কিছুটা অস্বস্তি লেগেছে। আজব ও কুৎসিৎ এক স্বপ্ন দেখেছে সে। স্বপ্নের ঘোরে থাকা তাহমিদ ঠিকঠাক ছিল তো? যাহোক, তাহমিদ ইনিয়েবিনিয়ে ইনাকে রাজি করাল আগ্রাবাদের এক হোটেলে ওঠার জন্য। দুজন মিলে বাসস্ট্যান্ড থেকে সিএনজিতে চলে গেল সেখানে। যে যার রুমে যাওয়ার আগে কথা দিল, বারোটায় লবিতে উপস্থিত হবে।

হোটেল রুমে ঢুকে ইনার আর ঘুম এল না। ব্যাগ খুলে দেখল, ছুরিটা ঠিকমতো আছে কিনা! এই ছুরি দিয়ে সে কচকচ করে সবজি কাটে। ধারাল ছুরি হাতে নিয়ে কীসব ভাবল সে। তারপর আবার চামড়ার শক্ত থলেতে ভরে সেটি হাতব্যাগে রাখল। অন্যদিকে, তাহমিদের চোখেও ঘুম নেই। লেখালেখির জন্য সে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। রুমের মধ্যে সুন্দর চেয়ার-টেবিলের ব্যবস্থা আছে। হোটেলরুমে টেলিভিশন, ফ্রিজ, এসি সবই থাকে কিন্তু তাহমিদের লাগে চেয়ার-টেবিল। দেশে-বিদেশে যে হোটেলেই থাকুক না কেন, এটি সে আগে নিশ্চিত করে। লেখকরা খাতা-কলম নিয়ে লিখতে বসেন আর তাহমিদ লিখতে বসে ল্যাপটপ নিয়ে। এত আগ্রহ থাকার পরও লেখালেখির তেমন একটা সময় পায় না।

ঠিক বারোটায় ইনা হাজির হলো হোটেলের লবিতে। পৌঁছে দেখল, তাহমিদ আগেই এসে বসে আছে। ইনাকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। দুজনে কথা বলতে বলতে হোটেলের বাইরে বেরিয়ে এল। শ্রাবণমেঘ অঝোরে কেঁদে চলেছে। হ্যান্ডব্যাগ থেকে ছাতা বের করল ইনা। তাহমিদ দাঁত দিয়ে জিভ কেটে বলল, ‘আহা, ছাতা আনতে ভুলে গেছি!’

‘আচ্ছা, সমস্যা নেই। এক ছাতাতেই হবে।’ ইনা ছাতা খুলে তাহমিদের হাতে দিল।

একই ছাতার নিচে দুজন। প্রকৃতির আঙিনায় বৃষ্টি পড়ার শব্দ; অন্যদিকে দুজনের হৃদয় আঙিনায় যেন ভালোলাগার অনুভূতি আছড়ে পড়ার শব্দ! তাহমিদ কোনো তরুণীর সঙ্গে এক ছাতার তলায় কখনো দাঁড়ায়নি বলে তার কিছুটা অস্বস্তি লাগছে। সে বলল, ‘চলুন, আগে লাঞ্চটা সেরে নিই।’

‘হোটেলেই লাঞ্চ খেয়ে গেলে ভালো হতো না? এসব জায়গা তো অচেনা।’

‘হালিশহরে যাইনি কিন্তু আগ্রাবাদ আমার চেনা। এর আগে বেশ কবার চিটাগাং এসেছি। চলুন, সামনেই একটা হোটেল আছে। সেখানে ঐতিহ্যবাহী মেজবানি খাবার পাওয়া যায়। বৃষ্টির দিনে গরম ভাতের সঙ্গে গোশত আর ডাল খেতে অসাধারণ লাগবে।’

ইনা মৃদু হেসে বলল, ‘আপনার কথা শুনেই বুঝতে পারছি যে মেন্যুটা অসাধারণ!’

তাহমিদ বলল, ‘এই বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে যাওয়া অবশ্য বেশ কঠিন হবে। রিকশা কি নেব?’

ইনা এবার একটু সময় নিল। এক রিকশায় যাওয়া মানে অনেক কিছু। বাসে তাহমিদের পাশের সিটে বসে তার কম অস্বস্তি লাগেনি। বৃষ্টির দিনে হুড আর পর্দার নিচে একসঙ্গে বসার কথা চিন্তা করে ইনার অস্বস্তি লাগছে। তবে অস্বস্তির মালা পরার বিকল্প এখন সে আর দেখছে না।

রিকশায় দুজনই চুপ হয়ে আছে। ইনার ঘ্রাণশক্তি ও শ্রবণশক্তি প্রখর। তাহমিদের শরীর থেকে পাঁঠাপাঁঠা গন্ধ আসছে! শোভনের শরীর থেকেও এমন গন্ধ আসে। অন্যদিকে, তাহমিদও গন্ধ পাচ্ছে-ইনার চুলে দেওয়া কোনো তেল বা শ্যাম্পুর। তবে তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে ইনার শরীরের কোমল স্পর্শ। বাসে দুজনের মাঝে ফাঁকাস্থান ছিল; রিকশায় সেই শূন্যস্থান পূর্ণ হয়ে গেছে। শ্রাবণস্নাত শহরের দৃশ্য তাহমিদকে আজ উদ্বেলিত করছে না। নিজের মধ্যে সে মুখিয়ে বা লুকিয়ে রয়েছে বলা যেতে পারে। তাহমিদের মনের মাঝে কোনো অসদুদ্দেশ্য না থাকা সত্ত্বেও ইনার শরীরের উপর্যুপরি কোমল স্পর্শ তার ভেতরের নির্জীব চিতাবাঘটিকে জাগিয়ে তুলেছে। এ কারণে অন্তর্যুদ্ধরত তাহমিদ আপাতত অন্তর্মুখী।

রিকশা এসে থামল একটি হোটেলের সামনে। ভাড়া মিটিয়ে রিকশা থেকে নেমে ছাতা ধরল তাহমিদ। বেশ অপ্রস্তুত অবস্থাতেই ছাতা হাতে দাঁড়াল। পলিথিনে জড়ানো ও কাগজে মোড়ানো পেইন্টিংটি সামনে ধরে দাঁড়িয়ে রইল। এটিই আজ তার ইজ্জত রক্ষা করছে।

হোটেলের ভেতর লোকে লোকারণ্য। বৃষ্টিধারা দুপুরের ভিড় কমাতে পারেনি। ইনা ও তাহমিদ গরমগরম মেজবানি খাবার খেল তৃপ্তি নিয়ে। খাওয়া শেষে দইয়ের অর্ডার দিল। এভাবে একা অন্য শহরে কখনো আসেনি ইনা। জীবনকে অচেনা ও অন্যরকম লাগছে। তার মনে হচ্ছে, এমন ঠিকানাবিহীন যাযাবরের মতো জীবনও তো আকর্ষণীয়! পর্যটক হতে পারলে দারুণ হতো। একেক দিন একেক শহর, একেক জনপদ, একেক ভাষা, একেক সংস্কৃতি, একেক ভালোলাগা! মনেমনে ইনা নিজের সঙ্গে অনেক কথা বললেও মুখে তাহমিদের সঙ্গে কথা হলো সেই তুলনায় খুব কম।

খাওয়া শেষে দুজন সিএনজি নিল। গন্তব্যস্থল সাজিদ হকের গুণমুগ্ধ ভক্তের বাসা। হালিশহরে বাসাটি খুঁজে পেতে কোনো সমস্যাই হলো না। তাহমিদ ভক্তের হাতে তুলে দিল সৈয়দ সাজিদ হকের পেইন্টিং। মেয়েটিকে দেখে ইনার খানিক ঈর্ষাই হলো। মানুষ দেখতে এত সুন্দর হয়! ছবি হাতে পেয়ে উচ্ছ্বাস মুখে প্রকাশ না করলেও মেয়েটি যে দারুণ খুশি হয়েছে, তা তার চোখেমুখে ফুটে উঠেছে। সেখান থেকে বিদায় নিয়ে তাহমিদ ও ইনা শুরু করল তাদের কাঙ্ক্ষিত যাত্রা। দাদাজানের দেওয়া ঠিকানা ধরে এগোলো। দ্বিতীয়বারের মতো রিকশায় চড়ল দুজন। রাস্তায় কিছুটা পানি জমে যাওয়ায় যানজট তৈরি হয়েছে কয়েক জায়গায়। ঘণ্টাখানেক সময় লেগে গেল ঠিকানায় পৌঁছতে।

(চলবে)

 

বধির নিরবধি (পর্ব এক)
বধির নিরবধি (পর্ব দুই)
বধির নিরবধি (পর্ব তিন)
বধির নিরবধি (পর্ব চার)
বধির নিরবধি (পর্ব পাঁচ)
বধির নিরবধি (পর্ব ছয়)
বধির নিরবধি (পর্ব সাত)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top