সিডনী শুক্রবার, ২৭শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি ও মুমূর্ষু ভোলা সংক্রান্তি : রফিকুল নাজিম 


প্রকাশিত:
২১ নভেম্বর ২০২০ ১৫:৫৯

আপডেট:
২৭ নভেম্বর ২০২০ ০১:১৫

 

সংস্কৃতি মানেই একটি জাতি বা গোষ্ঠীর যাপিত জীবনাচরণ। প্রবাহমান কালের চলচ্চিত্রের মতোই- সংস্কৃতি। গৌরবান্বিত ইতিহাস। জাতির দর্পণ। বাঙালি জাতির সংস্কৃতির মূল হাজারো বছরের গভীরে প্রোথিত। যদিও আমি নৃতাত্ত্বিক নই, তবুও বলতেই পারি- বাঙালি সংস্কৃতির প্রামাণিক বয়স প্রায় দুই হাজার বছর হবে! ভৌগোলিক অবস্থান, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, উপনিবেশবাদ, মানুষের সহজিয়া জীবনবোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং ভাষা- বাঙালি সংস্কৃতিকে নিয়ে গেছে এক অনন্য উচ্চতায়। এখানকার মানুষের হৃদয়ের গভীরে শিকড় গজিয়ে বৃক্ষের মতো মহীরূহ হয়ে আছে বাঙালি সংস্কৃতি। নানান ধর্মের মানুষের সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থান এখানকার সংস্কৃতিকে দিয়ে বৈচিত্র্যময় এক মোড়ক। যদিও এই ভারতীয় উপমহাদেশের ঐশ্বর্য একসময় সংস্কৃতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শতশত বছর ক্ষমতার খঞ্জর চালিয়ে শাসন ও শোষণ করেছে বর্গীরা। বারবার লুন্ঠিত হয়েছে বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। বারোয়ারি সঙ্গমে মুমূর্ষু হয়েছিল বাঙালির হাজার বছরের তন্বীবালা- সংস্কৃতি। আজো ধর্ষিত হচ্ছে অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে। আমাদের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আজ আইসিইউ তে লাইফ সাপোর্টে আছে। হারিয়ে যেতে বসেছে বাঙালি সংস্কৃতির নানান আচার-অনুষ্ঠান ও উৎসব। তেমনি একটি উৎসব হলো ভোলাভুলি উৎসব।

ভোলাভুলি সংক্রান্তি বাঙালির ঐতিহ্যবাহী একটি উৎসবের নাম। আপনাদের হয়ত অনেকেরই মনে আছে কার্তিক মাসের শেষ দিন গ্রামাঞ্চলে সন্ধ্যার দিকে ভোলাভুলির নামে একটি অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু এর বিস্তৃতি এখন কমে এসেছে অনেক বেশি, বাংলার বিশাল জনগোষ্ঠীর একটি অংশ এই ভোলাভুলি অনুষ্ঠান পালন করে থাকেন।

সনাতন ধর্মালম্বীদের কাছে এটি ধর্মীয় একটি অনুষ্ঠান মনে করা হলেও এটি হিন্দু-মুসলিম সবাই সমানভাবে পালন করে থাকেন। যদিও ভোলাভুলি নিয়ে সনাতন ধর্মালম্বীদের মধ্যে মাসব্যাপী চলে আয়োজন। এ সময় প্রতিদিন সকালে দেবতাকে ভোগ দেয়া হয়। আর মাসব্যাপী এই সংযমের শেষদিন 'ভোলা সংক্রান্তি' হিসেবে এই ভোলাভুলি পালন করা হয়।

বাঁশ ও খড় দিয়ে তৈরি করা হত ভোলার প্রতিকৃতি। সন্ধ্যায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা একত্রিত হয়ে ঐ ভোলার প্রতিকৃতিতে আগুন ধরাতো। তারপর কলা গাছের পাতা নিয়ে এবাড়ির ওবাড়ির খেয়ালিদেরকে ( সম্পর্কে দাদা, দাদি, নানা, নানী, ভাবী) বাড়ি দিয়ে ভোলাভুলি ছাড়াতেন। ভোলাভুলি সম্পর্কে বিশিষ্ট লোক গবেষক কামিনী কুমার রায়ের উদ্বৃতি দিয়ে ড. ওয়াকিল আহমদ লিখেছেন- “কার্তিক সংক্রান্তির সন্ধ্যায় খড়কুটা দিয়ে মানুষের মত একটা মূর্তি তৈয়ার করিয়া উহার মাথায় ধূপ, সরিষা, শুকনা পাটপাতা ও কয়েকটা মশা-মাছি রাখিয়া আগুন ধরাইয়া দেওয়া হয়। তার পর একজন সেই জ্বলন্ত মূর্তিটিকে লইয়া চতুর্দিকে দৌঁড়ায়, আর চিৎকার করিয়া বলে- 

'ভালা আইয়ে- বুরা যায়, 
মশা-মাছির মুখ পোড়া যায়। 
দো! দো! দো!'

ঐ সময় আরও কয়েকজন কুলা পিটাইতে পিটাইতে তাহার পিছনে পিছনে ছুটে এবং দো দো বলিয়া থাকে। ঐরূপে পথে প্রান্তরে আনাচে কানাচে অনেকক্ষণ ছুটিয়া দগ্ধপ্রায় মূর্তি মাঠে দাঁড় করিয়া রাখা হয়।”

কার্তিক মাসের শেষ দিনে ভোলাভুলির অনুষ্ঠান করা হয়। সন্ধ্যায় বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরিকৃত প্রতিকৃতিতে মালা পড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয় এবং কীর্তন পরিবেশনের মাধ্যমে ঐ প্রতিকৃতি পুড়ানো হয়। মানুষের ধারনা ছিল যে, ঘরের যাবতীয় খারাপ বা মন্দ জিনিস পুড়িয়ে দেয়া হয়। সন্ধ্যায় অনেক শিশুরা পাট শোলার কাটিতে বা কাপড়ে কেরোসিন দিয়ে এ'বাড়ি সে বাড়ি দৌঁড়ে বিভিন্ন ধরনের ছড়া কাটতো। ছড়ার মধ্যে ছিল-

'ভালা আয়, বুরা যায়, 
মশা মাছি পোড়া যায়।'

মুসলমান সমাজের ছেলে মেয়েরাও অনুরূপভাবে খেয়ালিদের সাথে আমোদ ফূর্তি করে এ বাড়ি সে বাড়ি ঘুরে ভোলা ছাড় ভুলি ছাড় ছড়া বলে মানুষকে কলার ডাটা দিয়ে সারা শরীরে বাড়ি দিতো। গরু-বাছুরদেরকে ও এই অনুরূপ ভাবে ভোলা ছাড়ানো হতো। গরুর কপালে মেহেদি দেওয়া হতো। ঐদিন এড়ালিয়া মাঠে, আমবাগান মাঠে, বন বথুরা মাঠে ষাঁড়ের লড়াই হতো। অনেকেই পিঠা তৈরি করতো। যার ষাঁড় জয়লাভ করত সে এলাকার মানুষকে উৎসব করে খাওয়াত। ভোলাভুলিতে প্রতিটি গ্রামে গ্রামে অনেক আনন্দ উৎসব হতো। অনেকে মাইক দিয়া গানবাজনা করতেন। ভোলাভুলির দিন গ্রামের বউঝিয়েরা মিলে টুপাটুপিতে ভাত রান্না করতো ও মাঝরাতে সবাই মিলে একসাথে আনন্দ করে খাওয়া দাওয়া করতো। ভোলা পোড়া আগুনে জলপাই বা কাঁচা তেঁতুল পুড়ে খাওয়া হতো। ভোলা পোড়ার পর ঘরের দরজায় লাঠি টোকা দিয়ে সমবেতভাবে ছড়া বলা হতো :

 

'মশা মাছি বাইরও
টাকা পয়সা ঘর ল
সংসারের জঞ্জাল দূর-হ'

মানুষকে ভোল ছাড়ানোর সময় বলা হতো।

'ভোলা ছাড় ভুলি ছাড়
বার মাইয়া পিছা ছাড়।
ভাত খাইয়া লড়চড়
পানি খাইয়া পেঠ ভর।
খাইয়া না খাইয়া ফুল
হাজার টাকার মূল।'

ঐদিন (কার্তিক মাসের শেষ দিন) সনাতন ধর্মালম্বীরা বাড়ি বাড়ি কার্তিক পূজা পালন করা হয়ে থাকে। অনেক বাড়িতে বাড়ি ঘর সাজানো ও ভাল খাবারের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। যদিও আজ এ উৎসব গ্রাম বাংলা থেকে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। এ প্রজন্মের অনেকেই ভোলাভুলি সম্পর্কে জানেই না। অথচ একটা সময় কার্তিকের মোলায়েম কুয়াশার সন্ধ্যায় আমন ধানের মিষ্টি গন্ধ নিতে নিতে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা ভোলা পোড়াতো। কত্তো মজা করতো সবাই; হিন্দু-মুসলমান। আজ এসব কেবলই স্মৃতিবিস্মৃতির দোলাচালে দুলছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে বাংলার সংস্কৃতির অন্যতম এই উৎসবটি চিরতরে হারিয়ে যাবে। এই শূন্যস্থানে জায়গা করে নিবে নতুন কোনো আকাশ সংস্কৃতি; বুর্জোয়া-সংস্কৃতি।

 

রফিকুল নাজিম 
নরসিংদী, বাংলাদেশ 

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top