সিডনী শনিবার, ২৪শে জুলাই ২০২১, ৯ই শ্রাবণ ১৪২৮

গোয়েন্দা অপ্সরা ও রিসোর্ট কাণ্ড : আসিফ মেহ্‌দী


প্রকাশিত:
১৯ জুলাই ২০২১ ১৪:৫১

আপডেট:
১৯ জুলাই ২০২১ ১৫:৪৩

 

এক.

অপ্সরা তার মিরপুরস্থ অফিসে সকাল নয়টার আগেই চলে আসে। কমপক্ষে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত থাকে। চাইলে নিজের প্রতিষ্ঠানে অপ্সরা দেরি করেও আসতে পারত। কিন্তু প্যাশন আর প্রফেশন মিলে গেলে কাজের আনন্দ হয় অন্য লেভেলের, এ ব্যাপারটি ইতিমধ্যেই অপ্সরা অনুভব করতে পেরেছে। গত কদিন আলিম সাহেবের ধাঁধাল চিঠি নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অফিশিয়াল মোবাইল সেটটি বন্ধ রেখেছিল। সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই তাতে একটির পর একটি কল আসছিল। প্রথম কলটি ছিল আলিম সাহেবের। তার সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে মোবাইল সেট অফ রাখতে হয়েছিল।

আজকেও অপ্সরা নয়টার আগে অফিসে পৌঁছে গেছে। বেগুনি ব্যাগ থেকে অফিশিয়াল মোবাইল সেটটি বের করে অন করতে যাবে, ঠিক তখনই তার নিজস্ব মোবাইল সেটে কল এল। গতদিন ধ্রুবতারা ফাস্ট ফুডশপে চপল নামে যার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সে কল দিয়েছে। ধাঁধাল চিঠি তৈরির মাধ্যমে সে ধারাল বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। সেজন্য অপ্সরা তাকে মোবাইল নম্বর ও অফিসের ঠিকানা দিয়ে একদিন দেখা করতে বলেছিল। সেই চপল কল দিয়েছে। অপ্সরা ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে শোনা গেল, ‘আপু, আমি আপনার অফিসের বাইরে। দরজা খোলা যাবে?’

অপ্সরা অবাক হলো। যেকোনো একদিন দেখা করার কথা গতকাল বলেছিল; পরদিনই যে ছেলেটি অফিসে হাজির হবে, এটি অপ্সরা কল্পনা করেনি। অপ্সরার অফিসরুমে কোনো কলিং বেল নেই। ছেলেটি চাইলে দরজায় ধাক্কা দিতে পারত; তা না করে অপ্সরাকে কল দিয়েছে। অপ্সরা অফিসের মূল দরজা খুলে দেখল চপল দাঁড়িয়ে আছে। বলল, ‘আপু, দেখা করতে বলেছেন, তাই চলে এলাম।’

‘কিন্তু এখন তো সবে নয়টা বাজে।’

‘জি আপু, অনেক দেরি হয়ে গেল!’

‘না, না, দেরি হয়নি; বরং আপনি অনেক সকালে চলে এসেছেন!’

‘তাহলে কি আমি চলে যাব?’

‘চলে যাবেন কেন? ভেতরে আসুন।’

চপল অফিসের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, ‘আপু, কাইন্ডলি আমাকে আপনি করে বললেন না। আমি আপনার অনেক জুনিয়র। তুমি করে বললে খুশি হব।’

টেবিলের ওপাশে নিজের চেয়ারে বসতে বসতে অপ্সরা বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। বোসো চপল।’

চপল টেবিলের অপরপাশে রাখা একটি প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে বলল, ‘আপনার বিজ্ঞাপনটা আমি খুঁজে বের করেছি। শখের গোয়েন্দা-দারুণ আইডিয়া!’

অপ্সরা বলল, ‘ধন্যবাদ। তোমাকে আরও একবার ধন্যবাদ চিঠির সুন্দর ধাঁধাগুলো তৈরির জন্য। ধাঁধাগুলো চমৎকার ছিল! যদিও সেগুলোর অর্থ উদ্ধার করতে গিয়ে আমাদের বেশ কষ্ট হয়েছে। বিভিন্ন গোয়েন্দা বই পড়েছ নিশ্চয়ই।’

চপল উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘সব পড়া শেষ আপু। শার্লক হোমস, ব্যোমকেশ, ফেলুদা, মাসুদ রানা, তিন গোয়েন্দা, কাকাবাবু, কিরীটি…’

চপলকে থামিয়ে দিয়ে অপ্সরা বলল, ‘ব্যস, ব্যস… আর বলতে হবে না। গতকাল তোমার সম্পর্কে বেশি কিছু জানার সুযোগ হয়নি। কোথায় পড়াশুনা করছ?’

‘বুয়েটে পড়ছি, আপু। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং-এ।’

চপলের কথা শুনে অপ্সরার মুখ একদম চুপসে গেল। ব্যাপারটা ধরতে পেরে চপল বলল, ‘আপু, কী হলো!’

অপ্সরা যেন সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলল, ‘আসলে আমার ছোট ভাই অজি বুয়েটে তোমাদের ডিপার্টমেন্টেই পড়ত।’

‘পড়তেন এটা তো ভালো খবর কিন্তু আপনার মুখ দেখে মনে হচ্ছে উনি…’

‘ঠিকই ধরেছ। অজি বেঁচে নেই। কয়েক বছর আগে বুয়েটে পড়াকালীন ব্লাড ক্যান্সারে মারা গেছে।’

‘দুঃখিত, আপু।’

‘ইটস ওকে। খুব ভালো লাগল তোমাকে পেয়ে। তোমার যদি কোনো আপত্তি না থাকে, আমার গোয়েন্দা দলে যোগ দিতে পারো। মূলত এজন্যই তোমাকে অফিসে আসতে বলেছিলাম।’

চপল খুশিমনে বলল, ‘অবশ্যই, আপু। ভালো লাগল আপনার প্রথম সহযোগী হতে পেরে!’

অপ্সরা চপলকে সংশোধন করে দিয়ে বলল, ‘তুমি অবশ্য প্রথম সহযোগী না। আরেকজন আছে। ওর নাম জ্যাকলিন। মেডিকেলে পড়ছে। সব রহস্যের সমাধান আমরা তিনজন মিলে করব। নতুন শুরু করেছি; তাই আপাতত প্রতি মাসে সম্মানী হিসেবে দশ হাজার টাকা পাবে।’

চপল বলল, ‘টাকার প্রয়োজন নেই, আপু। রহস্যের সমাধান করতে পারলেই আমার ভালো লাগবে।’

অপ্সরা আপত্তি তুলল, ‘প্রতিটি কাজের পারিশ্রমিক থাকা উচিত। আমার টিমে কাজ করতে হলে অবশ্যই সম্মানী নিতে হবে।’

‘ঠিক আছে, আপু। আপনি যখন বলছেন, নেব। সত্যি বলতে, এতে আমারই সুবিধা হবে। টিউশনিটা বাদ দিয়ে আমি গোয়েন্দাগিরিতে পুরো মনোযোগ দিতে পারব।’

‘গুড।’

অপ্সরা অফিশিয়াল মোবাইল সেট চপলের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘অফিসের মোবাইল সেটটা তোমার কাছে রাখো। এটা সার্বক্ষণিক অন রাখবে। আমি একা সামাল দিতে পারছিলাম না বলে অফ রেখেছিলাম।’

‘ইয়েস, আপু।’ বলে চপল মোবাইল সেটটি নিল। পাওয়ার বাটন প্রেস করে কিছুক্ষণ ধরে রেখে অন করল।

অপ্সরা চপলের হাতে এক শ টাকার একটি নোট দিয়ে বলল, ‘বাইরে একটা হোটেল আছে। সেখানে আলুপুরি, জিলাপি আর দুধ চা পাওয়া যায়। কষ্ট করে নিয়ে এসো। তোমাকে পাঠাচ্ছি যাতে একটু দেখেশুনে আসতে পারো।’

‘ওকে, আপু।’

কিছুক্ষণ পর চপল আলুপুরি আর দুধ চা নিয়ে এল। বাসি জিলাপি ছিল; সেগুলো আনেনি। টাটকা মুচমুচে জিলাপি এখনো ভাজা হয়নি। অপ্সরা এবং চপল চা আর পুরি খাচ্ছে, এমন সময় অপ্সরার মোবাইলে কল এল। অপ্সরা মোবাইলের দিকে তাকিয়ে স্তম্ভিত হয়ে পড়ল। চপল বলল, ‘আপু, কোনো সমস্যা?’

অপ্সরা মাথা নেড়ে বলল, ‘না, সব ঠিক আছে। আলিম ভাইয়ের নম্বর থেকে কল এসেছে। গতকালই তিনি মিথি আপুর মৃত্যুসংবাদ শুনেছেন। এত সকালে কোনো দুঃসংবাদ নয় তো!’

চপল বলল, ‘আমার মনে হয় না দুঃসংবাদ, আপু। আর আপনি সাড়ে নয়টাকে অনেক সকাল ভাবছেন; অথচ আমার কাছে প্রায় দুপুর!’

‘ঠিকই বলেছ। আলিম ভাই তার চিঠির ধাঁধা সমাধানের জন্যও সাতসকালে ফোন দিয়েছিলেন।’

অপ্সরা কল রিসিভ করল। ওপাশ থেকে আলিম সাহেব বললেন, ‘অপ্সরা, কেমন আছ?’

‘জি ভাইয়া, ভালো আছি আমরা।’

‘আমরা! তার মানে, তোমার সঙ্গে জ্যাকলিনও আছে? ভালোই হলো!’

‘না, ভাইয়া। আমার সঙ্গে আছে চপল। গতকাল যার সঙ্গে দেখা হলো। মিথি আপু যাকে ছেলের মতো ভালোবাসতেন।’

‘তাই নাকি, চপলও কি তোমার টিমে জয়েন করল তাহলে?’

‘জি।’

আলিম চৌধুরী বললেন, ‘খুব ভালো লাগল শুনে। তবে তোমাকে যে কারণে ফোন করেছি, তা হলো-আমার বন্ধু ভীষণ বিপদে পড়েছে। কিছুক্ষণ আগে কল দিয়ে জানাল, ওর রিসোর্টে হুমকিসহ একটা উড়ো চিঠি এসেছে। তোমার কাছে অনুরোধ থাকবে, তুমি তোমার টিম নিয়ে ব্যাপারটার একটা সুরাহা করবে।’

অপ্সরা বলল, ‘এভাবে বলবেন না, ভাইয়া। আপনি বলা মানে, তা আমার জন্য আদেশের মতো।’

‘ধন্যবাদ, অপ্সরা। আর তোমরা পুরো টিম যেও। জ্যাকলিনকেও সঙ্গে নিও।’

‘ঠিক আছে, ভাইয়া। ওকে কল দিয়ে দেখি। ক্লাস বা পরীক্ষা না থাকলে নিশ্চয়ই আমাদের সঙ্গে জয়েন করবে।’

আলিম সাহেব বললেন, ‘তাহলে আমার ম্যানেজারকে বলে দিচ্ছি তোমাদের জন্য প্লেনের তিনটা টিকিট কাটতে। তোমাকে কল দেওয়ার আগে ফ্লাইটের শিডিউল দেখছিলাম। দুপুর বারোটায় একটা ফ্লাইট যাচ্ছে। টিকিট প্রিন্ট করে ড্রাইভারের হাতে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছি তোমার অফিসে। ড্রাইভার তোমাদেরকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করে দেবে।’

অপ্সরা এতক্ষণ হাঁ করে আলিম সাহেবের কথা শুনে গেল। তিনি থামতেই অবাক কণ্ঠে বলল, ‘আমরা কি ঢাকার বাইরে যাচ্ছি, ভাইয়া? আমাকে বিস্তারিত বলুন। মোবাইল লাউডস্পিকারে দিচ্ছি। তাহলে চপলও শুনতে পাবে।’

অপ্সরা মোবাইল সেট লাউডস্পিকারে দিল। আলিম সাহেব বলা শুরু করলেন, ‘আমার বন্ধু নকুল চন্দ্র সাহা কক্সবাজারে তরঙ্গ ইকো রিসোর্ট গড়ে তুলেছে। নকুলের কাছে আজ সকালে একটা খাম এসেছে। খাম খুলে দেখে, তাতে একটা চিঠি এবং পেনড্রাইভ। চিঠিতে ওকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। পেনড্রাইভে আছে রিসোর্টে থাকা এক দম্পতির অন্তরঙ্গ মুহূর্তের ভিডিও। গোপন ক্যামেরায় দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছে। চিঠিতে লেখা, নকুল যদি আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে দশ লক্ষ টাকা না দেয়, তাহলে ইকো রিসোর্টে গোপনে ধারণকৃত ব্যক্তিগত ভিডিওটি ফেসবুকে ভাইরাল করে দেওয়া হবে। বুঝতেই পারছ, এর পেছনে ইন্টার্নাল কর্মচারীরা জড়িত। কালপ্রিটদের ধরতে হবে। এ ধরনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গেলে কেউই আর ওই রিসোর্টে যাবে না। কেলেংকারি তো হবেই; রিসোর্টও ডুববে। নকুল ভীষণ ভালো ছেলে। নকুলকে তোমাদের কথা বললাম আর নিশ্চিন্তে থাকতে বললাম! তোমরা গেলে সে খুব খুশি হবে। একটু দেখো, ওকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করা যায় কিনা।’

অপ্সরা বলল, ‘এ তো বড় ধরনের বিপদ, ভাইয়া! তবে এটুকু নিশ্চিত থাকুন, আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব।’

আলিম সাহেব বললেন, ‘ঠিক আছে, অপ্সরা। তোমাদের জন্য শুভকামনা থাকবে। ড্রাইভারকে প্লেনের টিকিটসহ এক ঘণ্টার মধ্যে তোমাদের কাছে পাঠাচ্ছি।’

‘ওকে ভাইয়া, ধন্যবাদ।’

চলবে

 

আসিফ মেহ্‌দী
কথাসাহিত্যিক ও প্রকৌশলী

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top