সিডনী শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর ২০২১, ৭ই কার্তিক ১৪২৮

নিরুপমা : শাহানারা পারভীন শিখা


প্রকাশিত:
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৩:৫৩

আপডেট:
১৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৫:২৭


সেই দুপুর বারোটা থেকে নিরুপমা অপেক্ষায় আছে অরুণের। প্রচন্ড রোদ।একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় ক্লান্ত হয়ে বসে পরে সে। পাশে হাতব্যাগটা রাখে।ব্যাগটা হাত দিয়ে ধরে রাখে। ওর কিছু পোশাক, গয়না আর বেশ কিছু টাকা রাখা আছে।
অরুণ বলেছিল একটু ম্যানেজ করে এগুলো আনতে। বেকার মানুষ। ঠিক একটা চাকরি জুটিয়ে নেবে।
নিরু পাশে থাকলে পৃথিবীটা ওদের হবে। অরুণ ভালোবেসে ওকে নিরু বলে ডাকে। চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে। মোবাইলটা বের করে সময় দেখে। দুপুর তিনটা। স্টেশনে এখন লোকজনের তেমন একটা ভীড় নেই।

অরুণের নাম্বারে ফোন দেয় আবার। বন্ধ। সেই সকাল থেকে ই  ওর ফোনটা বন্ধ। গতকাল রাতেও তো কথা হলো। নিরু এভাবে ঘর ছাড়তে চায়নি। কিন্তু উপায় ছিল না ওদের।পাঁচ বছরের সম্পর্ক। অরুণের বাবা মা বড়লোক ঘরের এক মেয়ের সাথে টাকা আর চাকরির লোভে অরুণের বিয়ে ঠিক করে। আজ সন্ধ্যায় বিয়ে হবার কথা। কিন্তু অরুণ নিরুকে ছাড়া অন্য কাউকে ভাবতেই পারে না। এটাই তো বলেছিল কাল। অরুণ কথা দিয়েও কেন আসলো না? কোন বিপদ হয়নি তো! এসবই ভাবতে ভাবতেই টুং করে একটা শব্দ হয়।ত্রস্ত হাতে মোবাইলটা বের করে। দেখে অরুনের ম্যাসেজ। ওর দুচোখে খুশিতে নেচে ওঠে। ম্যাসেজ সিন হতেই ওর দুনিয়াটা দুলে ওঠে।
I am sorry Niru. অরুণ লিখেছে।

একটু দুরের সিগন্যাসটা নীচে নামানো। তারমানে ট্রেন আসবে। শেষবারের মতো আর একবার ফোন দেয় অরুণের নাম্বারে। ফোন বন্ধ।
নিরু উঠে দাঁড়ায়। হাঁটতে থাকে ট্রেনলাইনের পাশ দিয়ে। ক্লান্ত পায়ে হাঁটতে থাকে। ওর ব্যাগটা ওখানেই পরে থাকে।
প্রচন্ড গরমে  হাঁপিয়ে ওঠে নিরু।
একটা চাপকল থেকে আঁজলা ভরে পানি খায়। ঠান্ডায় ওর প্রান জুড়িয়ে যায়।
এদিক ওদিক তাকিয়ে এগিয়ে যায় নিঃশব্দে। আনমনে।
নিরু!  নিরু! তুমি কি করতে যাচ্ছো? অরুণ তোমার সাথে প্রতারণা করেছে।  তাহলে শুধু শুধু তুমি কেন কষ্ট  পাচ্ছ।ভুলে যাও তুমি ওর নাম।
মেয়েলি কণ্ঠ শুনে এদিক ওদিক তাকায় সে। কাউকে দেখে না।
কান্না ভেজা চোখে নিরু মনে মনে বলে,  অরুণ আমার সাথে প্রতারণা করেছে। ওর জন্য আমি ঘর ছেড়েছি।
এতক্ষণে মা-বাবা ঠিক জেনে গেছে। আমি মাকে চিঠিতে জানিয়ে এসেছি।

-তুমি অরুণের মতো প্রতারকের জন্য নিজের জীবন নষ্ট করবে?
আমি যে খুব ভালোবাসি ওকে।
-তোমার এই চব্বিশ বছরের জীবনে ভালোবাসা শুধু এতোটুকুই?
তোমার বাবা মা ভাই বোন এমনকি তোমার নিজের জন্য যে ভালোবাসা আছে সেগুলোর ওজনের কাছে এক অরুণের সামান্য ভালোবাসা যখন তোমার কাছে বেশি তাহলে তোমার মৃত্যুই শ্রেয়।
চারিদিকে তাকিয়ে দেখো নিরু পৃথিবীটা কতো সুন্দর।
যদি পারো নিজের জন্য বাঁচো। নিজেকে ভালোবাসো।

নিরু আশেপাশে তাকিয়ে দেখে। কেউ নেই আশেপাশে। তাহলে সে এতোক্ষণ কার সাথে কথা বলছিল! 

নিজের ভেতরের আমি কে চিনতে পারে নিরু।
দুরে ট্রানটা দেখা যাচ্ছে। তীব্র বেগে ছুটে আসছে। দ্বিধা জড়ানো পায়ে এগোতে থাকে নিরু।

"আফা আপনার ব্যাগ" ছোট হাতে কেউ ওর হাতটা ধরে।  হঠাৎ কারো হাতের ছোঁয়ায় ঘোর কেটে যায় নিরুর। 
জোড়ে হুইসেল বাজিয়ে ট্রেনটা চলে যায়। চমকে উঠে নিরু। দেখে দশ বার বছরের একটা মেয়ে ওর হাত ধরে আছে। হাতে ওর ছোট ব্যাগটা। চেহারাটা কেমন মায়াকাড়া।
"আফা আপনি আর একটু হলেই তো ট্রেনের তলে যাইতেন।
আব্বা দ্যাখছে আপনার ব্যাগটা। আপনে ভুলে রাইখা আসছেন মনে কইরা আব্বা আমারে কইলো আপনারে এইটা দিয়ে আসতে। অন্য কারো নজরে পড়লে আর পাইতেন না। স্টেশনের আশেপাশে চোর ছ্যাচ্চোরে ভরা।"
মেয়েটার দিকে চোখ পড়ে নিরুর। কি নিশ্পাপ একটা চেহারা। রোদে ঘেমে গেছে। তখনও হাঁপাচ্ছে। দৌড়ে আসছে বোঝাই যাচ্ছে।আব্বা হাঁটতে পারে না। এই ট্রেনের তলে পইরা আব্বার একটা পা কাইটা গেছে।
একজায়গায় বইসা আব্বা বাদাম বিক্রি করে। আমি আব্বার জন্য দুপুরে খাবার নিয়ে আসছি।
আব্বা তো আমার মতো দৌড়াইতে পারবো না। তাই আমার হাতে ব্যাগ দিয়া কইলো, মনি তুই এইখান নিয়া দৌড়ে ঐ মাইয়াডারে ব্যাগখান দিয়াই।

মনির হাতটা তখনও নিরুর হাতে ধরা। নিরু ওর ব্যাগ থেকে দুহাজার টাকা বের করে মেয়েটার হাতে দিয়ে বলে,এটা তোমার আব্বাকে দিবা। বলবা ভালোবেসে এটা তোমাকে দিয়েছি। ছোট্ট মেয়েটা একটু অবাক হলেও পরক্ষনেই ওর চোখে খুশির ঝিলিক দেখতে পাই নিরু।

ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে চলতে থাকে নিরুপমা। মৃত্যু নয়, জীবনের পথে।

শাহানারা পারভীন শিখা
কবি ও লেখক

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top