সিডনী শুক্রবার, ২২শে অক্টোবর ২০২১, ৭ই কার্তিক ১৪২৮

জলে না যাইও : সাইফুর রহমান কায়েস


প্রকাশিত:
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১ ১৪:২৮

আপডেট:
২২ অক্টোবর ২০২১ ০৬:৫২

 

ইউটিউব চ্যানেলে নানান ঢংগে বেজে চলছে রাধারমণ দত্তের ধামাইল গান ও মাই তুই জলে না যাইও...গানটি বিভিন্নভাবে মুমিতকে অনুপ্রাণিত করে। নতুন করে ফেসবুকের বন্ধু তালিকায় ক্রমান্বয়ে যুক্ত হতে থাকা কেউ একজন গভীর রাতে লাইভে এসে কিন্নরীকণ্ঠে গানটি শুনিয়ে যায়। যতো শুনে ততোই মুগ্ধতা বেড়ে যায়।অনন্যা নামের মেয়েটির গান শুনতে শুনতে কখন যে তার প্রেমে মুমিত গলায় গামছা বাঁধে কিছুটা সচেতনভাবে কিংবা পুরোটাই মুগ্ধতার বশে অচেতন মনে সেটি সে টেরই পায় নি।
প্রতিদিন নিয়মকরে অনন্যা সকাল-দুপুর-রাতে মুঠোফোনে কল দিতো। তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মিসড কল। কারণ তার বান্ধবীটি ছিলো ছাত্রী। এমবিএ (মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) ফাইনাল সেমিষ্টারের। আর মুমিত একটি বহুজাতিক কোম্পানীর মার্কেটিং কন্সালটেন্ট।বিদেশে ঘুরাঘুরির অভ্যাস আছে। পেশাগত কাজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছে। মালয়েশিয়া, সিংগাপুর, থাইল্যান্ড, দুবাই, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ ঘুরে এসেছে। সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও বেশ নাম ডাক আছে। খুব সযতনে ফিরিয়ে দেয়ার মতো বিনয় ও সৎসাহস মুমিতের আছে। মুমিতের রয়েছে খ্যাতির মোহ, মানুষের জন্য কাজ করতে আগ্রহ। ভালো কিছু করার জন্য সবসময়ই নিষ্ঠাবানদের চেয়ে কোনোভাবেই পিছিয়ে নয়।
হঠাৎ ফোন আসে মুমিতের কাছে।ওপার থেকে ভেসে আসছে বন্ধু অপরাজিত সেনের কণ্ঠ। মুমিতের নিজের প্রতিষ্টান কন্সেপ্ট মেডিকোতে লোক নিয়োগের বিষয়টি বিডিজবসের মাধ্যমে জানতে পেরে নিকটাত্মীয় কারো জন্য তদবির করতে অপরাজিত ফোন করলো। তার এক কাজিনের চাকুরী প্রয়োজন।মুমিত বললে সেটা হয়।
অপরাজিত যেদিন ফোন করলো ঠিক ঐদিন রাতেই অনন্যার ফোন পেলো। মেয়েটির কণ্ঠ শুনে মুমিতের মনে খচখচানি শুরু হয়ে গেলো।মেয়েটি সাক্ষাতের জন্য এপয়েন্টমেন্ট চাইলো। মুমিত নয়াসড়কের পেপার রেষ্টুরেন্টে আসতে বললো সন্ধ্যার পর। অনন্যা যথারীতি সন্ধ্যার সময় এসে হাজির। হোটেল ক্রু মেনু এনে দিলো স্পেশাল নান আর চিকেন কড়াইয়ের আদেশ দিলো। এরপর ফালুদা আনতে বললো। অনন্যা বেশ খুশীমনেই আপ্যায়ন গ্রহণ করলো। হালকা আলোর সাথে চিরকুট আর ভূমি ব্যান্ডের গান মৃদু আওয়াজে বেজে যাচ্ছিলো বলে সন্ধ্যাটি দুজনের কাজেই উপভোগ্য হয়ে উঠেছিলো। আপনি থেকে তুমিতে নেমে আসতে কারোই তখন আর কোনো সংকোচ কাজ করলো না। দুজনেই দুজনের কাছে আসতে পারলো সহজেই। মায়াবী সন্ধ্যার গুণ-সংকীর্তনের মধ্য দিয়ে কখন যে একজন আরেকজনের গায়ে গা এলিয়ে দিলো তা কেউ টেরই পেলো না। যেনো বা একজোড়া রাজহাঁস অথবা এই জনমেই আমরা হংসমিথুন হয়ে একের অন্যের জীবনে লেপ্টে থাকবো। কোনো আপাট্টুয়া বাতাস তাদেরকে আলাদা করতে পারবে না।
আসার সময় বয়ে নিয়ে আসা সিভিটা মুমিতকে দিতে ভুল করলো না অনন্যা। অনন্যা খুব সহজেই মিশে যেতে পারে অথবা খোলা মনের অধিকারী অথবা দুটোই। মুমিতও কম কিসে।ভরাট কণ্ঠের মাদকতা যাকে একবার পেয়ে বসেছে সে তার প্রেমের বানে না ভেসে পারে নি। তুরস্কের ইস্তানবুলে এরকম ঘটনা তাকে এখনো অবাক করে।
বিপণণ পরিচালক আসবেন শুক্রবার। তিনি এনকামবেন্টদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চূড়ান্ত করতে আসবেন। যেখানে অনন্যা নিজেকে দেখতে চায়। মুমিত এখানে দড়ি, সাঁকো, সেতু অথবা এর যেকোনো একটা অথবা সবটাই। অনন্যা প্রকিউরমেন্ট স্পেশালিষ্ট হিসেবে জয়েন করতে চায়।
দশজন প্রার্থী থেকে দু’জনকে সিলেক্ট করলেও অনন্যা প্রথম হতে পারে নি। কিন্তু চাকুরীর বাজারে ব্যক্তিগত যোগাযোগটা উন্নতির অন্যতম অবলম্বন।তাই প্রথমজনকে সুপারসিডেড হলেন আর অনন্যা নিয়োগ পেলো। এর পর থেকেই শুরু হলো দুজনেই যুগল পদচারণা। ছুটির দিনগুলোতে সিলেটের বিভিন্ন দর্শনিয় স্থানসমূহে বেড়াতে লাগলো। একবার অনন্যা বললো চলো আমরা জৈন্তাহিল রিসোর্টে ঘুরে আসি। বাংলাদেশের শেষ বাড়িটাতে বসে মেঘের উড়াউড়ি দেখবো। বৃষ্টিতে ভিজে কাক হবো এই জনমে।অখান থেকে দেখা যায় শিলং পাহাড়।মেঘালয় রাজ্য। মেঘের রাজ্য।এখানে এলে সবার মন ভালো হয়ে যায়। খুব মন খারাপ ছিলো অনন্যার। কেননা,অনন্যার নিয়োগের একমাস পর মুমিতের পদোন্নতি হলো সিনিয়র মার্কেটিং কন্সালটেন্ট। পোষ্টিং হলো ঢাকা।আনন্দ সংবাদের সাথে বিচ্ছিন্নতার বাজনাও বেজে উঠে। দুজনার পথ দুদিকে ছিটকে যাচ্ছে। একটা শংকা,ভয় অনন্যা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিলো।এখন থেকে নয়াসড়কের পেপার রেষ্টুরেন্টে আর সন্ধ্যাবেলা বসে রাত ১০টা বাজানো যাবে না। তাই ছুটির দিনগুলিই ভরসা একমাত্র। সব ছুটির দিনে আসা যাবে না। মুমিতের ভাইবোনেরা অষ্ট্রেলিয়ায় বসবাস করেন। মা থাকেন বারহাট্টায় একা। গৃহভৃত্য আর জনা দুয়েক নিকটাত্মীয় পরিবেষ্টিত হয়ে। তাই মাতৃ আজ্ঞা পালনটাও তার কাছে ভাইটাল ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকবার ভেবেছে মাকে ঢাকায় নিজের কাছে নিয়ে যাবে। কিন্তু মা কিছুতেই স্বামীর ভিটা ছেড়ে যাবেন না। স্মৃতি কাতর মাকে বিস্মৃতির অতলে হারাতে চায় না বলেই মায়ের মনের উপর জোর খাটায় নি কখনো। মুমিত এখন একের ভিতর তিন। জীবন যে তার এমনি কঠিন। যেনোবা নিজের কাছেই থেকে যায় অচিন। তাই তাকে সিলেট-ঢাকা-বারহাট্টায় শাটল করতে হয়। আপাতঃত কোনো সুরাহা নেই। এভাবেই চালিয়ে নিতে হবে।
রাত বারোটার পর যখন নির্জনতা তাকে আপন করে নেয় তখন ক্ষুদেবার্তায় অনন্যাকে ফেসবুক লাইভে আসতে বলে। খুব ঘনিষ্ঠ হতে হতে দুজন দুজনের হৃদয়ের চোরাবালিতে আটকে যায়। কখন যে ভোর হয়ে যায় তা তারা টেরই পায় না।বছর খানেক এভাবেই চলে যায়।
একছুটিতে বিছনাকান্দিতে যায় এরা দুজন।সিমান্ত লাগোয়া এক আদিবাসীর বাড়িতে রাত্রিযাপন করার মধুর স্মৃতি নিয়ে যখন সিলেট ফিরে তখন মুমিত তার চাচার মৃত্যুসংবাদের শোকে বিহ্ল্ত। কে জানতো একটু আগেও এরা বিছনাকান্দির নীল স্বচ্ছ জলে আনন্দতরীতে ভ্রমণ করে এসেছে। দুজন দুজনকে আঁকড়ে ধরেছিলো নতুন জীবনের বীজ বপনের মন্ত্রে উজ্জীবিত হতে। একটি বিয়োগান্তক ডিলেমা একজনের হাতকে অন্যজনের হাত থেকে মুক্ত করে দিলো কিছু সময়ের জন্য।
অনন্যাকে ওর মেসে পৌঁছে দিয়ে সোজা নেত্রকোণার বাসে উঠলো। চাচার জানাযা পড়ে রাতটা কোনোমতে কাটিয়ে আবার ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় সকালে। আবার নতুন করে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে পেতে। হুয়াটস আপে নতুন ছবি পাঠিয়েছে অনন্যা।ভালোবাসার দ্বিধাহীন রসায়নে ভরপুর ক্ষুদেবার্তাগুলি পড়ে মুমিতের মন ভালো হয়ে যায়। অনন্যার হাস্যোজ্জ্বল ছবিটি মুঠোফোনের ডিস্প্লেতে আঙ্গুল দিয়ে বড়ছোট করে দেখে। চাকুরীর বিনিময়ে প্রেমে পড়া এই যুবক বয়সে। রেলমন্ত্রীর জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে কিছুটা স্বস্থি বোধ করে। অনন্যাকে হনুফা বলে ডাকতে ইচ্ছে করছে তার। মুঠোফোনে এই নামটি সাতসকালে শোনার জন্য প্রস্তুত ছিলো না অনন্যা। কিন্তু মুমিতের কণ্ঠে শুনে মোটেও বিব্রত হয় নি। ভালোবেসে যাচ্ছে তাই নামে ডাকা যায়। ভালোবাসার তরী যখন তাদের মানে আমাদের রেলমন্ত্রীর কুঞ্জে গিয়ে ঠেকলো তখন মুমিত আর অনন্যা কি বন বাদাড়ে ঘুরে বেড়াবে?অপরাজিত তার আরেক বন্ধু আজিজুলের মারফতে জানতে পারলো কোনো এক আষাঢ়ী পূর্ণিমার রাতে মুমিত আর অনন্যারা চাঁদকে স্বাক্ষী রেখে নোটারী পাবলিকের সামনে হলফনামা দিয়ে নতুন জীবন গড়ার শপথ নিয়েছে।


সাইফুর রহমান কায়েস
প্রধান সম্পাদক
শব্দকথা টোয়েন্টিফোর ডটকম

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top