সিডনী সোমবার, ২৭শে জুন ২০২২, ১২ই আষাঢ় ১৪২৯

প্রবাসে বাংলাদেশী অভিবাসনের ইতিবৃত্ত : মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার


প্রকাশিত:
১৪ জুন ২০২২ ০৯:১৭

আপডেট:
২৭ জুন ২০২২ ০১:৪৯

  ছবিঃ মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার

 

প্রাচীনকাল থেকে মানুষ ভাগ্যান্বেষণ, রাজনৈতিক বাস্তবতা কিংবা অন্যবিদ কারণে দেশ হতে দেশান্তরে পাড়ি জমিয়েছে। অনিবার্য বাস্তবতায় যারা নিজ দেশের মায়া ত্যাগ করে পরদেশে বসবাস করেন তারই প্রবাসী। অতীতে এক দেশ থেকে অন্য দেশ কিংবা এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে গেলেও কোনো পাসপোর্ট-ভিসার প্রয়োজন পড়তো না। সেকালে বাংলা থেকে অন্য দেশে বসবাসের প্রবণতা না থাকলেও অন্যান্য দেশ থেকে বাংলায় এসে বসবাস করার উপযোগিতা ও প্রচুর প্রমাণ বিদ্যমান। ১৭৫৭ সালে শেতাঙ্গ ইংরেজ বেনিয়ারা বনিক ও সৈনিক বেশে এদেশে এসে তাদের প্রবাস জীবন শুরু করে। বস্তুত তখন থেকে এ দেশের মানুষের গতানগতিক কাজের ক্ষেত্রও প্রসারিত হয়। ইংরেজদের অধীনে এবং সুবিধার্থে এ দেশের মানুষ ঘর ছেড়ে প্রথমে কলকাতা ও পরে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলে সীমিত আকারে অভিবাসন শুরু করে।
তখন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি এবং মৎস্য ছাড়া কাজের ক্ষেত্র তেমন ছিল না। ইংরেজরা নদী ও সমুদ্রগামী জাহাজে করে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করতো। সেসব জাহাজে তখন প্রচুর শ্রমিকের প্রয়োজন পড়তো। এসব জাহাজের শ্রমিক হিসেবে এ অঞ্চলের মানুষ ভাগ্যান্বেষণ করেন। ইংরেজরা বাংলায় তাদের প্রধান বন্দর হিসেবে কলকাতাকে বেছে নেয়। সে সুবাদে পূর্ব বাংলার সিলেট, চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের লোকেরা জাহাজের শ্রমিক হিসেবে জীবিকা অন্বেষণের চেষ্টা করেন। এসব শ্রমিকেরা কলকাতায় থেকে জাহাজে কাজ শুরু করেন। কলকাতা বন্দর থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন্ দেশে গমণকারী জাহাজে করে তারা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। সে সুবাদে তাদের কেউ কেউ গোপনে কোনো কোনো দেশে নেমে পড়তেন। এ পর্যায়ে সিলেট অঞ্চলের শ্রমিকেরা ইউরোপ, আমেরিকা এবং চট্টগ্রাম নোয়াখালীর শ্রমিকেরা রেঙ্গুন-সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যকে জীবিকার্জনের জন্য উপযুক্ত মনে করেন। এভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাঙালি শ্রমিকেরা প্রবাস জীবন শুরু করেন।
পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দে ভারত-পাকিস্তানে পাসপোর্ট প্রথা প্রবর্তনের পর পূর্ব পাকিস্তানের জাহাজীরা তাদের মূল ঘাটি কলকাতা বন্দর হারালেন। তখন কমনওয়েলথ-এর নাগরিক হিসেবে ইউরোপে প্রবেশ করতে ভিসার বাধ্যবাদকতা ছিল না। সে সুযোগে বহু সিলেটি শ্রমিক ইউরোপ পাড়ি জমালেন। তারা তখন থেকে জাহাজের পেশা ত্যাগ করে অন্যান্য পেশায় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রসারিত করেন। ততদিনে লক্ষ লক্ষ বাঙালি ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। ঐসব বাঙালিদের একটি অংশ পূর্ব লন্ডনের ব্রিকলেন এলাকায় বসবাস শুরু করলে বিগত শতাব্দীর আশির দশকের মধ্যে সেখানকার মাত্র চার বর্গমাইল এলাকায় পঞ্চাশ/ষাট হাজার বাঙালির আবাস গড়ে ওঠে। এভাবে ইউরোপে লক্ষ লক্ষ বাঙালির অভিবাসন ঘটে।
ইংল্যান্ড প্রবাসী লক্ষ লক্ষ মানুষ যাদের অধিকাংশই সিলেট অঞ্চলের অধিবাসী তারা পর্যায়ক্রমে সে দেশের কল-কারখানা, অফিস-আদালত, হোটেল-রেস্টুরেন্ট, দোকানপাট প্রভৃতিতে শ্রম দিয়ে সেখানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তারা সেখানে নানা পেশায় যোগদান করে কেবল সেখানকার অর্থনীতিকেই না এ দেশের অর্থনীতিতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে চলেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রেও তাদের পরবর্তী প্রজন্ম প্রশংসনীয় অবদান রাখছেন। এক তথ্যে জানা যায়, চাকরী ও ব্যবসা-বাণিজ্যে যুক্ত লন্ডনে বসবাসরত প্রায় পাঁচ লক্ষ বাংলাদেশীর শতকরা ৯৮% ভাগ মানুষই ছিলেন সিলেটের অধিবাসী।
প্রথম দিকে লন্ডনপ্রবাসী বাঙালিদের প্রায় পুরোটাই ছিলেন সিলেটি জাহাজি শ্রমিক। তাদের অধিকাংশই দেশ বিভাগের সময়ে লন্ডনে অবস্থানরত ছিলেন। পাকিস্তান হওয়ার পর তাদের রাষ্ট্রীয় পরিচিতির জন্য পাসপোর্ট প্রাপ্তি খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু সরকার তাদেরকে পাসপোর্ট দিতে অনীহা প্রকাশ করে। এ কারণে তখন তাদের প্রধান সমস্যাই ছিল পাসপোর্ট প্রাপ্তি। পাসপোর্টের জন্য লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনে গেলে সেখানকার অবাঙালি কর্মকর্তারা নানাভাবে তাদের সাথে হয়রানীমূলক ও অশোভন আচরণ শুরু করে। জাহাজি শ্রমিকদেরকেতো পাসপোর্ট দেওয়াই হতো না। এসব কারণে পাকিস্তান ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশন আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করে। তাদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে হাইকমিশন নির্দিষ্ট অংকের জামানত গ্রহণপূর্বক সীমিত পর্যায়ে পাসপোর্ট প্রদানে সম্মত হয়। তখন দেশ থেকে লন্ডন যাবার জন্য যে পাসপোর্টের প্রয়োজন পড়তো তা এখান থেকে একেবারেই দেয়া হতো না।
পাকিস্তানে সোহরাওয়ার্দী মন্ত্রিসভা গঠনের পর লন্ডনস্থ পাকিস্তান ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট আব্দুল মন্নান প্রবাসীদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে কথা বলার জন্য দেশে এসে তাঁর ঘনিষ্টজন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সাথে দেখা করেন। তখন মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী সার্বিক বিষয় অবগত হয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে অবিলম্বে বিদেশ গমনেচ্ছু পূর্ব পাকিস্তানিদের কোনো রকম হয়রানী ছাড়া পাসপোর্ট দানের নির্দেশ দেন। একই সাথে তিনি সিলেটে একটি পাসপোর্ট অফিস খোলাসহ ইউরোপে অবস্থানরত পুরনো জাহাজিদের বিনা জামানতে সহজ পাসপোর্ট প্রদানের জন্য লন্ডনস্থ পাকিস্তান হাইকমিশনকে নির্দেশ দেন।
প্রথম দিকেই বাঙালি জাহাজি শ্রমিকদের একটি অংশ ছিল চট্টগ্রাম ও নোয়াখালি অঞ্চলের লোকজন। সিলেটিরা যে সময়ে কর্মসংস্থানের জন্য ইউরোপকে বেছে নেন তখন চট্টগ্রাম ও নোয়াখালি অঞ্চলের লোকজন রেঙ্গুন, সিঙ্গাপুরসহ মধ্যপ্রাচ্যকে কর্মসংস্থানের জন্য বেছে নেন। ঐসব দেশের শ্রমিকরা তখন প্রবাসে কোনো সাংগঠনিক কাঠামোর সৃষ্টি করতে পারেননি। যে কারণে সেসব দেশে বাঙালিরা স্থায়ীভাবে বসবাসের তেমন বড় কোনো সুযোগ সৃষ্টি করতে পারেননি।
সত্তরের দশকের প্রথম দিকে বিলাতে কমনওয়েলথ দেশসমূহের বহিরাগমন বন্ধ হয়ে গেলে সেখানে শ্রমিকের ঘাটতি দেখা দেয়। এ অবস্থায় শ্রমিকের চাহিদা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকলে সেখানে অবস্থানরত সিলেটি জাহাজি শ্রমিকেরা তার সুযোগ গ্রহণ করেন। তখন তারা জাহাজ ছেড়ে কেবল অন্যান্য পেশায়ই যোগদান করেননি, দেশ থেকে নিজেদের আত্মীয়-স্বজনকেও সেখানে নিতে শুরু করেন। এভাবে সিলেটি জাহাজি শ্রমিকেরা তখনই ইউরোপে বিভিন্ন পেশায় প্রবেশ করেন। তবে তখনই সব পেশার উর্ধ্বে চলে যায় হোটেল-রেস্টুরেন্ট ব্যাবসা ও তাতে শ্রমদান।
মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন প্রবাসী বাঙালিরা বিরাট ভূমিকা পালন করেন। এ অবদানের কথা স্বীকার করে ১৯৭৩ সালে লন্ডন সফরকালে মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী বলেছিলেন, ‘এটা অনস্বীকার্য সত্য যে, ১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতার জন্য যে মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ করেছিল তাদের পরেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনে প্রবাসী বাঙালিদের ভূমিকা ছিল সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও চুড়ান্ত।‘ মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসীরা যে অর্থসহায়তা করেন, তার এক বিবরণ অনুযায়ী তৎকালের প্রবাসীদের সিংহভাগ ছিলেন যুক্তরাজ্যের অভিবাসী। এরপরেই যুক্তরাষ্ট্রের স্থান। এছাড়াও কাতার, বাহরাইন, আল-আইন, আবুধাবী, দুবাই, সৌদিআরব, লিবিয়া, ওমানসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরো কিছু দেশের সীমিত তথ্য জানা যায়।
স্বাধীনতার পর মধ্যপ্রাচ্য গমনের পালা শুরু হওয়ার সময়েই একটি দালাল শ্রেণি এ ব্যাপারে তৎপর হয়ে ওঠে। বিদেশ গমণে মানুষের মধ্যে যেমন ব্যাপক আগ্রহ ও চাঞ্চল্য শুরু হয়, তেমনি দালালদের অতিলোভের কারণে নানা রকম অনিয়ম-দুর্নীতিও মহামারী আকার ধারণ করে। এ অবস্থায় বৈদেশিক কর্মসংস্থান তথা অভিবাসী কর্মী নিয়োগও প্রেরণের লক্ষ্যে ১৯৭৬ সালে জনশক্তি উন্নয়ন ও সমাজকল্যান মন্ত্রণালয়ের সংযুক্ত বিভাগ হিসেবে ‘জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো‘ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এরপরও দালালদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘদিন যাবৎ সরকারি নানা তৎপরতায় বর্তমানে এ অবস্থার অনেক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে।
মানুষ জীবিকার তাগিদ কিংবা উন্নত জীবনের প্রত্যাশায় বৈধ-অবৈধ বাচ-বিচার না করেই দেশত্যাগের ইচ্ছায় পাগলপাড়া। ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে প্রবেশের জন্য জানকোরবান করতে রাজী। এই প্রবণতার সুযোগ নিচ্ছেন আদমব্যবসায়ী নামে সংজ্ঞায়িত দালালচক্র। তারা প্রতিনিয়ত অভিনব কৌশলে মানুষকে বিদেশ পাঠাতে যেসব পন্থা অবলম্বন করছেন তাতে জেল, জুলুমসহ মৃত্যুঝুঁকি পর্যন্ত রয়েছে। এরপরেও মানুষের মাঝে কোনো সচেতনতা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ভাবটা এমন যে, ‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই‘।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশীদের গমনের বিষয়টি প্রথমে সরকারি ভ্রমণকেন্দ্রীক পটভূমিতে শুরু হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন। তাদের প্রেরণায় শিক্ষাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশীদের অভিবাসন শুরু হয়। এভাবে সেখানকার সুযোগ সুবিধায় মুগ্ধ হয়ে ভূয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে সরকারী সফর, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বৃত্তি ও ভর্তির ভূয়া তথ্য দিয়ে আদম পাচারের পথ প্রশস্ত হয়। এরপর থেকে স্থলপথে, জলপথে, আকাশপথে অভিনব কৌশলে সেখানে বাংলাদেশীরা প্রবেশ করতে থাকে। এভাবে আফ্রিকাসহ পৃথিবীর উত্তরমেরু-দক্ষিণমেরু কোথাও বাকী নেই যেখানে বাংলাদেশীদের পদচারণা নেই।
বর্তমানে পৃথিবীর এমন কোনো দেশ নেই যেখানে বাংলাদেশীদের উপস্থিতি নেই। যদিও দালাল বা আদম ব্যবসায়ীদেরকে এজন্য মানুষ ভাল চোখে দেখে না, তবু এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে পৃথিবীর সর্বত্র বিরাজমান বাংলাদেশীদের এই উপস্থিতি তাদের দ্বারাই সম্ভব হয়েছে। বিপুল সংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশীদের দ্বারা অর্জিত বৈদেশিক মূদ্রা দেশের সমৃদ্ধিতে বিরাট অবদান রাখছে।

 

মুহম্মদ সায়েদুর রহমান তালুকদার
হবিগঞ্জ জেলার ইতিহাস, হাওরের ইতিবৃত্ত, প্রসঙ্গ: মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ, মুক্তিযুদ্ধে মাধবপুর প্রভৃতি গ্রন্থ প্রণেতা। সমন্বয়ক (হবিগঞ্জ জেলা): এনসাইক্লোপিডিয়া অব বাংলাদেশ ওয়ার অব লিবারেশন, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি।

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top