সিডনী মঙ্গলবার, ২৩শে এপ্রিল ২০২৪, ১০ই বৈশাখ ১৪৩১

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের মহানায়ক মাস্টারদা সূর্য সেন : এস ডি সুব্রত


প্রকাশিত:
২৬ মার্চ ২০২৪ ১৫:৪৬

আপডেট:
২৩ এপ্রিল ২০২৪ ২১:১৮

 

১২ জানুয়ারি মাস্টারদা সূর্য সেনের ফাঁসি দিবস । ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি মধ্যরাতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে সূর্য সেন ও বিপ্লবী তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। তাদের উপর ব্রিটিশ সেনারা নির্মম অত্যাচার করে। ব্রিটিশরা হাতুড়ী দিয়ে তাদের দাঁত ও হাড় ভেঙে দেয়। হাতুড়ী দিয়ে ইচ্ছে মতো পিটিয়ে অত্যাচার করে। এই অত্যাচারের এক পর্যায়ে মাস্টারদা ও তারকেশ্বর দস্তিদার অজ্ঞান হয়ে যায়। এরপর তাদের অর্ধমৃত দেহগুলোকে ফাঁসির রশিতে ঝুলিয়ে পুরো মৃত্যু নিশ্চিত করে জেলা খানা থেকে ট্র্রাকে তুলে চার নং স্টীমার ঘাটে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর মৃতদেহ দুটোকে বুকে লোহার টুকরো বেঁধে বঙ্গপসাগর ও ভারত মহাসাগর সংলগ্ন একটি জায়গায় ফেলে দেয়া হয়। যাতে কেউ মাস্টারদা ও তারকেশ্বরের মৃত দেহও খুঁজে না পায়।
মাস্টারদা সূর্য সেন ছিলেন বিপ্লবী, ‘যুগান্তর’ দলের চট্টগ্রাম শাখার প্রধান এবং ১৯৩০ সালের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের প্রধান সংগঠক। পুরো নাম সূর্যকুমার সেন। ডাক নাম কালু। ২২ শে মার্চ ১৮৯৪ সালে বর্তমান বাংলাদেশের চট্টগ্রামে অবস্থিত রাউজান থানার নোয়াপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেছিলেন মাস্টার দা সূর্য সেন। পরিবারে অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো ছিল না। পিতা রাজমনি সেন ও মাতা শশী বালা সেনের চতুর্থ সন্তান ছিলেন। তাঁরা মোট দুই ভাই ও চার বোন ছিলেন। মাস্টার দা সূর্য খুব অল্প বয়সেই তাঁর মাতা-পিতাকে হারান । তিনি তাঁর কাকা গৌরমনি সেনের কাছেই বড় হন। ছোট বেলা থেকেই সূর্য সেন পড়াশোনার দিকে পারদর্শী ছিলেন। তিনি দয়াময়ী উচ্চ প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরে নোয়াপাড়া উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে তিনি হরিশদত্তের ন্যাশনাল স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাশ করে তত কালীন বাংলার বিখ্যাত একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম কলেজে উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হন। এখানে তিনি এফ. এ. পাশ করে ও বি.এ-তে ভর্তি হন। বেশ কিছু কারণে তাঁকে এই কলেজ থেকে বিতাড়িত করা হয়। ফলে, তাঁকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে থেকে তাঁর বি.এ কমপ্লিট করতে হয়। বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বি.এ কমপ্লিট করার পর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে এসে হরিশদত্তের ন্যাশনাল স্কুলেই শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের ফলে বিদ্যালয়টি বন্ধ হয়ে যায় ফলে তিনি উমাতারা উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে গণিতের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন।
মাস্টার দা সূর্য সেন বিবাহ করার পক্ষে ছিলেন না। তবে চন্দ্রনাথ সেন ও অন্যান্য আত্মীয়দের চাপে তিনি ১৯১৯ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কানুনগোপাড়ার নগেন্দ্রনাথ দত্তের ষোল বছরের কন্যা পুষ্পকুন্তলা দত্তকে বিয়ে করেন। তবে তিনি তাঁর বিবাহের তিন দিন পরেই গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসেন। ১৯২৬ সালে তাঁর স্ত্রী টাইফয়েড রোগে মারা যান। বহররমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজে পড়াশোনা করার দরুন তিনি যুগান্তর দলের সদস্য অধ্যাপক সতীশচন্দ্র চক্রবর্তীর সন্নিকটে আসেন এবং বিপ্লবি ভাবধারার সঙ্গে যুক্ত হন। এর পর ১৯১৮ সালে চট্টগ্রামে ফিরে এসে তিনি অনুরূপ সেন, চারুবিকাশ দত্ত, অম্বিকা চক্রবর্তী, নগেন্দ্রনাথ সেন প্রমুখদের সঙ্গে নিয়ে চট্টগ্রামে গোপন বিপ্লবী দল গঠন করেন। শিক্ষকতার সাথে যুক্ত থাকার কারণে তাঁকে অন্যান্য বিপ্লবীরা মাস্টার দা নাম দেন।
১৯১৯ সালের পাঞ্জাবের জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে চট্টগ্রামের ছাত্ররা ক্লাসবর্জন সহ সভা-সমাবেশ করে। সভায় সূর্যসেন তাঁর বক্তৃতায় ব্রিটিশ বিরোধী মনোভাব জাগিয়ে তুলতে সক্ষম হন। অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী আফ্রিকা থেকে এসে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। তাঁর ডাকে সাড়া দিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে সাধারণ মানুষ উজ্জীবিত হয়েছিল। চট্টগ্রামের বিপ্লবীরাও ছাত্র ধর্মঘট, হরতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালত বর্জন, সভা-সমাবেশ বক্তৃতাসহ নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন চালাতে থাকে।
এ সময়ের দুটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। (১) ব্রিটিশ মালিকানাধীন জাহাজের শ্রমিকদের সফল ধর্মঘট এবং (২) ব্রিটিশ মালিকানাধীন সিলেট ও কাছাড়ের চা বাগান শ্রমিকদের ধর্মঘট ও চাঁদপুরে ধর্মঘটি শ্রমিকদের উপর পুলিশ এবং গোর্খা সৈন্যদের গুলিবর্ষণে অনেকের হতাহত হওয়ার ঘটনা। এ ঘটনার প্রতিবাদে আসাম-বেঙ্গল রেল ধর্মঘট শুরু হয়। এর ফলে চট্টগ্রামের কংগ্রেস নেতা যতীন্দ্রমোহন সেনগুপত ও শেখ-ই-চাটগ্রাম কাজেম আলী মাস্টারের পাশাপাশি মাস্টারদা সূর্যসেন এর নামও ছড়িয়ে পড়ে। অসহযোগ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে তিনি স্কুলের শিক্ষকতা ত্যাগ করেন এবং দেওয়ানবাজার এলাকায় ‘সাম্যশ্রম’ নামের আশ্রম প্রতিষ্ঠা করে সেখান থেকেই তিনি কংগ্রেসের কাজ ও গোপনে বিপ্লবীদের কর্মকান্ড পরিচালনা করতে থাকেন। অসহযোগ আন্দোলনের ফলে গান্ধীজীর স্বরাজ অর্জিত না হলেও বাংলার বিপ্লবীরা পুনরায় সংঘবদ্ধ হয়ে ব্রিটিশ রাজত্বের অবসানে সংকল্পবদ্ধ হয়। চট্টগ্রামের বিপ্লবীরা মাস্টারদা এর নেতৃত্বে সংঘবদ্ধ হন। বিপ্লব পরিচালনার জন্য নগদ অর্থের প্রয়োজন ছিল বলে তাঁরা প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের চট্টগ্রাম কোষাগার লুণ্ঠন করেন। এই ঘটনার কিছুদিন পরই সূর্যসেন ও আম্বিকা চক্রবর্তীকে পুলিশ গ্রেফতার করে। ১৯২৮ সালের শেষ দিকে মুক্তি পেয়ে পুনরায় বিপ্লবীদের সংগঠিত করার কাজ শুরু করেন। সূর্যসেন চট্টগ্রামের বিপ্লবীদের জন্য ব্যায়ামাগার প্রতিষ্ঠা করে শারীরিক ও মানসিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য কসরতের নির্দেশ দেয়ার পাশাপাশি নদীতে সাঁতার কাটা, নৌকা বা সাম্পান চালানো, গাছে আরোহণ করা, লাঠি খেলা, ছোরা নিক্ষেপ, মুষ্টিযুদ্ধের মত শারীরিক কঠোর পরিশ্রমের কাজ করতে নির্দেশ দেন। সেখানে তিনি বিপ্লবীদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ তৈরির প্রশিক্ষণ দেন। চট্টগ্রামে তিনি ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ এর একটি শাখা গড়ে তোলেন।
১৯২৯ সালে চট্টগ্রামের জেলা কংগ্রেসের সম্মেলনে সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। এতে সূর্যসেন সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। একই বছর ১৩ সেপ্টেম্বর লাহোর জেলে একটানা ৬৩ দিন অনশন করে বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ মারা যান। এর প্রতিক্রিয়ায় সারা বাংলায় প্রচন্ড বিক্ষোভ দেখা দেয়। বিক্ষোভ মিছিল ও সভায় নেতা সূর্যসেন বিপ্লবের পরবর্তী কার্যক্রমের পরিকল্পনা সদস্যদের সামনে তুলে ধরেন। বিপ্লবীরা স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনে জীবন উৎসর্গ করার শপথ নেন। এর জন্য তাঁরা ‘মৃত্যুর কর্মসূচি’ ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে হামলার দিন নির্ধারণ করা হয় ১৯২৯ সালের ডিসেম্বর মাসে। কিন্তু পুলিশী তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় এর তারিখ পিছিয়ে যায়। এ সময়েই গঠিত হয় সূর্যসেন এর গোয়েন্দা দল। গোয়েন্দা দলের বিপ্লবীরা চট্টগ্রামে বোমা বানানোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৩০ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত তাঁদের প্রস্ত্ততি চলে। সূর্যসেন গোপনে ইস্তেহার প্রচার করেন। এতে তিনি কৌশল হিসেবে প্রচার করেন যে, ২১ এপ্রিল চট্টগ্রাম শহরের গান্ধী ময়দানে বিপ্লবীরা নিষিদ্ধ পুস্তক পাঠ করে আইন অমান্য করবেন।
১৩ ই ডিসেম্বর ১৯২৩ সালে টাইগার পাস এর মোড়ে সূর্য সেনের গুপ্ত সমিতির সদস্যরা পাহাড়তলীতে অবস্থিত আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কারখানার শ্রমিকদের বেতনের ১৭,০০০ টাকার বস্তা ছিনতাই করে ছিলেন। এবং এই ঘটনার কারণে কিছু দিন পরে গুপ্ত সমিতির গোপন বৈঠক চলাকালীন সেখানে পুলিশ চলে আসে এবং গুপ্ত সমিতির সদস্য ও পুলিশের মধ্যে খন্ডযুদ্ধ শুরু হয়ে যাই। এই ঘটনাটিই “নাগরখানা পাহাড় খন্ডযুদ্ধ” নামে পরিচিত।
বিদ্রোহকে আরো তীব্র করার জন্য মাস্টার দা সূর্য সেন ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চিটাগাং ব্রাঞ্চ গঠন করেন এবং ঠিক করা হয় যে ১৮ ই এপ্রিল ১৯৩০ সালে চারটি দল মিলে ইংরেজদের ওপর আক্রমণ করবেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী একদল বিপ্লবী রেল লাইনের ফিসপ্লেট খুলে নেয়। এর ফলে চট্টগ্রাম সমগ্র ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্য একটি দল চট্টগ্রামের নন্দনকাননে টেলিফোন এবং টেলিগ্রাফ অফিসে আক্রমণ করে সব যন্ত্রপাতি ভেঙ্গে দেয় এবং সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আরেকটি দল পাহাড়তলীতে অবস্থিত চট্টগ্রাম রেলওয়ে অস্ত্রাগার দখল করে সেখান থেকে উন্নতমানের রিভলবার ও রাইফেল লুন্ঠন করে নেয়। এবং একদল বিপ্লবীরা দামপাড়ায় পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাক দখল করে নেয়। এই ঘটনার কারণে চট্টগ্রাম প্রায় চার দিনের জন্য ইংরেজ মুক্ত হয়ে যায়।
২২ শে এপ্রিল ১৯৩০ সালে বিপ্লবীরা যখন জালালাবাদ পাহাড়ে অবস্থান করছিল তখন সশস্ত্র ইংরেজ সৈন্যরা তাদের ওপর আক্রমণ করে এবং দুই ঘণ্টার যুদ্ধের পর ব্রিটিশ বাহিনীর ১০০ জন এবং বিপ্লবী বাহিনীর ১২ জন শহীদ হন। এই ঘটনাটিই “জালালাবাদ যুদ্ধ” নামে পরিচিত।
আগ্নেয়াস্ত্র বহন করার কারণে মাস্টার দা সূর্য সেন কে ১৪ ই আগস্ট ১৯৩৩ সালে প্রাণদন্ডে দণ্ডিত করা হয়। এর পর ১৯৩৪ সালের ১২ই জানুয়ারি মধ্যরাতে সূর্য সেনকে ফাঁসী দেওয়া হয়।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের পর এক এক করে ছিটকে গেছেন সবাই। কেউ ধরা পড়েছেন, কেউ বা গুলিতে বা সায়ানাইডের বিষে মৃত্যুকে গ্রহণ করেছেন। কেউ বা একইরকমভাবে আত্মগোপন করে আছেন। সূর্য সেনকে খোঁজার জন্য তখন সমস্ত জায়গায় ঘুরছে পুলিশ। প্রতিটা বাড়ি, জঙ্গল, পাহাড়— সবকিছু তোলপাড় করে ফেলা হচ্ছে। কোথায় তিনি?
মাস্টারদা তখন এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে যাচ্ছেন প্রতিবার। কেউ পুলিশের সঙ্গে কোনোরকম সহযোগিতা করছে না। করবেই বা কেন? মাস্টারদা’কে প্রাণ দিয়ে রক্ষা করবেন সবাই। তখন ১৯৩৩ সাল। বিপ্লবী দলের কর্মী ব্রজেন সেন সূর্য সেনকে নিয়ে এলেন নিজের গৈরালা গ্রামে। ওই গাঁয়েরই বিশ্বাস বাড়ির বউ ক্ষীরোদপ্রভা বিশ্বাসের কাছে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। এতটুকুও ভয় পেলেন না ওই মহিলা। প্রাণ থাকতে মাস্টারদাকে ধরা পড়তে দেবেন না। সেই অনুযায়ী ব্রজেন সেনের সঙ্গে চলত শলাপরামর্শ । এই পুরো ব্যাপারটাই সন্দেহজনক লাগল নেত্র সেনের। সম্পর্কে ব্রজেনের দাদা-প্রতিবেশী এই মানুষটি ভেবে পেলেন না, কী এমন আলোচনা চলে ছোটো ভাই আর স্ত্রীয়ের মধ্যে! মাঝে মাঝে খাবার নিয়েও কোথায় একটা যায়। কার জন্য এমন আয়োজন? তক্কে তক্কে ছিলেন নেত্র সেন। একদিন স্ত্রীয়ের মুখ থেকেই বেরিয়ে এল সেই ‘গোপন’ কথা। স্বয়ং মাস্টারদা রয়েছেন যে তাঁর আশ্রয়! তাঁকেই সমস্তভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। চোখ চকচক করে উঠল নেত্র সেনের। আনন্দে তো বটেই; তবে এই আনন্দ লোভের। মদ আর জুয়া সমস্ত কিছু কেড়ে নিয়েছে। দশ হাজার টাকায় বাকিটা চলবে ভালোই । বাজারের থলি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন নেত্র। এদিকে স্ত্রীরও সরল বিশ্বাস, স্বামী আর যাই করুক, মাস্টারদা’র প্রতি তাঁর সম্মান অনেক। যাবতীয় ‘কাজ’ করে ঘরে এসে অপেক্ষা করতে লাগলেন নেত্র। অবশেষে রাত এল। ক্রমশ তাঁর বাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে ক্যাপ্টেন ওয়ামসলী’র নেতৃত্বে এক বিশাল গোর্খা বাহিনী। গোটা তল্লাট ঘিরে ফেলেছে তাঁরা। কথামতো নেত্র সেন সিগন্যাল দিচ্ছে। আচমকা সেই দৃশ্য নজরে এল ব্রজেনের। দাদা এ কী করছেন? মুহূর্তে পরিষ্কার হয়ে গেল সবটা। আগে মাস্টারদাকে বাঁচাতে হবে। তৈরি থাকতে হবে বন্দুক নিয়ে। শুরু হল গুলিবর্ষণ।
শেষ চেষ্টার সুযোগও পাওয়া গেল। বাড়ির পাশেই রয়েছে বেড়া। তারপর এঁদো পুকুর, ময়লায় ভর্তি। তা হোক, এই দুটো পেরোলেই রেহাই পাওয়া যাবে। ব্রজেন সেন আর সুশীল দাশগুপ্ত সক্রিয় হয়ে উঠলেন। কল্পনা দত্ত-সহ আরও কয়েকজনকে ওপারে নিয়ে গেলেন। মাস্টারদাকে নিয়ে যাওয়ার সময়ই গুলি এসে হাতে লাগে। পড়ে যান সুশীল। মাস্টারদা তা সত্ত্বেও চেষ্টা করে যান। যদি পালানো যায়! ওপারেও পৌঁছে গেলেন; কিন্তু ওই যে কথায় বলে না, নিয়তি। এক গোর্খা সেনার গায়ে গিয়ে পড়লেন সূর্য সেন। দীর্ঘ কয়েক বছরের অপেক্ষার পর, ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন তিনি।
ব্রিটিশদের ঘোষিত দশ হাজার টাকার লোভে বাঙালি নেত্র সেন মাষ্টার দাকে ধরিয়ে দিলেন ।

 

এস ডি সুব্রত
কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Developed with by
Top