সিডনী রবিবার, ২৭শে সেপ্টেম্বর ২০২০, ১২ই আশ্বিন ১৪২৭

একা এবং একা (পর্ব চৌদ্দ ) : আহসান হাবীব


প্রকাশিত:
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৫:১৪

আপডেট:
১৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ ১৬:৫০

 

(আহসান হাবীব মূলত একজন প্রফেশনাল কার্টুনিস্ট। তিনি পেশাগত কারণে সাধারনত কমিকস, গ্রাফিক নভেল ইত্যাদি নিয়ে কাজ করেন। তিনি যখন লিখেন তখন তার মাথায় থাকে কমিকস বা গ্রাফিক নভেলের কনটেন্ট। তার গল্পের পিছনে থাকে স্টোরি বোর্ডের মত ছবির চিত্রকল্প। এই কারণেই তার লেখায় একটা সিনেমাটিক ড্রামা থাকে প্রায়শই। তিনি মনে করেন যেকোনো গ্যাজেটেই/ফরম্যাটেই হোক, স্ক্রিনে যে গল্প পাঠক পড়ছে, সেখানে তার সাব-কনসান্স মাইন্ড ছবি খুঁজে। আর তাই ‘প্রভাত-ফেরী’র পাঠকদের জন্য তার এই ধারাবাহিক ইন্ডি নভেল ‘একা এবং একা ’ )

 

পর্ব- চৌদ্দ

-কপালে আর থুতনীতে কাটা দাগ ছাড়া বোঝার উপায় নেই যে গতকাল তিনজন তোমাকে হামলা করেছিল।
-আপনি কি করে জানলেন ওরা তিনজন ছিল? ভ্রু কুচকে প্রফেসরের দিকে তাকায় মারুফ।

প্রফেসর লম্বা করে শ্বাস নিল তারপর কাধ ঝাকালো। বলল-

-এই জেলখানার ভিতর অনেক ধরনের খেলা চলে আর আমি হচ্ছি সব খেলার রেফারী। এমন না যে সবাই মিলে আমাকে রেফারী বানিয়েছে। বলে হো হো করে হাসল প্রফেসর। তারপর বলল-

-রেফারী আমি নিজে নিজেই হয়েছি। কিংবা রেফারী বলতে না চাইলে আমাকে অজারভারও বলতে পার।

-অবজারভার?

-অর্থাৎ যে অবজার্ব করে। বিজ্ঞানের ভাষায় এটা একটা প্যরাডক্সের মত। অবজারভার থাকলে ঘটে নইলে ঘটে না। একসময় একটা কলেজে আমি পদার্থ বিজ্ঞান পড়াতাম, তাই এই ব্যাখ্যাটাই মাথায় আসল। ... সে যাই হোক আমার মনে হয় জেলখানার ভিতরে তুমি বোধহয় আর নিরাপদ নও। প্রথম ওয়ার্ম আপ হামলাটা ঠেকাতে পেড়েছ, গুড ... দ্বিতীয় বা তৃতীয় হামলার জন্য প্রস্তুত হওয়ার সময় হয়েছে ...।

 

এর মধ্যে একদিন হঠাৎ প্রফেসর মারুফকে একটা ঘরের বর্ননা দিলেন। জেলখানার ভিতরের কোথাও একটা ঘর, ছোট্ট একটা ঘর; আট ফিট বাই আটফিট। ঘরটাকে সবাই ঠাট্টা করে বলে ‘কুটুম ঘর’। আসামীরা কেউ কখনো ভয়ানক কোন আচরন করলে তাকে দু’দিন বা তিনদিনের জন্য ঐ ঘরের ভিতর ঢোকানো হয়। অনেকটা শাস্তির মত আরকি। ঐ ঘরটার মেঝে হচ্ছে হাফ ইঞ্চি লোহার শিক দিয়ে  গ্রাফ করা, নিচে থই থই করছে কালো পানি। পানি সবসময়  ঐ লোহার গ্রাফ করা মেঝেকে ছুঁয়ে থাকে। ভয়ঙ্কর ব্যাপার হচ্ছে, ঐ থই থই পানিতে আছে বিশেষ ধরনের কিছু বিষাক্ত মাছ। তারা সুযোগ পেলেই লোহার মেঝের উপর দাড়ানো মানুষটার নগ্ন পায়ে ঘাই দেয়। মৃত্যুসম ভয়ঙ্কর যন্ত্রনা সেই ঘাইয়ে। আর আছে  কিছু ইলেকট্রিক ঈল ফিশ, তারা দেয় ইলেকট্রিক শক। ৮৬০ ভোল্ট পর্যন্ত কারেন্ট ডিসচার্জ করতে পারে এরা!

-তুমি জান একটা ইলেকট্রিক ঈল মাছ শক দিয়ে একটা আস্ত ঘোড়া মেরে ফেলতে পারে?
-জানতাম না জানলাম।
-কাজেই ঐ ঘরে যারা ঢুকে তাদের খুব সতর্কভাবে দাড়িয়ে থাকতে হয়, লোহার গ্রাফ করা পানি ছুই ছুই মেঝেতে । সামান্য নড়াচড়ায় ঐ মাছেরা বুঝে যায় মানুষটা ঠিক কোথায় দাড়িয়ে আছে। তারপর ছুটে এসে ঘাই দেয়!
-আমাকে হঠাৎ কুটুম ঘরের এত বর্ননা দিচ্ছেন কেন?
-জানা থাকা ভাল। কারণ এই জেলখানার জীবনে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্ন আছে। এই প্যাটার্ন এর বাইরে গেলেই ঝুঁকি... প্রফেসর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন মারুফের দিকে। রহস্যময় লোকটা ঠিক কি বলতে চায় মারুফ বুঝতে পারে না। মারুফ কি তবে জেলখানার জীবনের নির্দিষ্ট প্যাটর্নের বাইরে চলে এসেছে?  

 

মারুফ অবশ্য এখন আর আগের সেই ১৪২ নং ফাঁসির সেল এ নেই। একটা সাধারন সেলে চারজনের সঙ্গে আছে। বদ্ধ একটা ঘর। টিম টিম করে ২৫ ওয়াটের একটা বাল্ব জ্বলছে। রাত ১২ টার উপর বাজে, তার ঘুম আসছে না। অন্য কয়েদীরা গভীর ঘুমে। একজনের সুরেলা নাক ডাকার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক উপরে ছোট্ট একটা জানালার মত খুপরি। সেখান দিয়ে রাতের এক টুকরো আকাশ দেখা যাচ্ছে। নিশ্চয়ই চাঁদ উঠেছে আকাশে, নইলে রাতের আকাশটা এত উজ্জ্বল হবে কেন? ঠিক তখন খুট করে একটা শব্দ হল কোথাও। সঙ্গে সঙ্গে পঁচিশ ওয়াটের বাল্বটা নিভে গেল। খুট শব্দটা আবার হল। মারুফ সতর্ক ভাবে কান খাড়া করল। তাদের সেলের লোহার গেটটা কেউ খুলছে। একটু বাদেই নিঃশব্দে যে মানুষটা ভিতরে  এসে দাড়াল সে দীর্ঘদেহী সেই সাড়ে ছ ফিট। তার পিছনে আরো দুজন। একজনের হাতে একটা বালিশ, এই অন্ধকারেও বোঝা যাচ্ছে। আর সাড়ে ছ ফিটের বা হাতে বেশ বড় সর একটা স্ক্রু  ড্রাইভার। তার মানে লোকটা বাওয়া। আক্রমনটা কেমন হতে পারে? দ্রুত চিন্তা চলে মারুফের মাথায়। মুখে বালিশ চাপা দিয়ে ধরবে আগে না স্ক্রু ড্র্ইাভারের ঘাই দিবে আগে? মারুফ খেয়াল করল সাড়ে ছ ফিট বালিশ হাতের লোকটাকে ইশারা দিল। বালিশ হাতে লোকটা এগিয়ে আসছে। দু হাতে বালিশ ধরে লোকটা এখন প্রস্তুত, মারুফ ওদের বুঝতে না দিয়ে ধীরৈ ধীরে লম্বা করে শ্বাস নিল খুব সাবধানে।

বালিশটা চেপে বসেছে তার মুখে। দু’তিন মিনিট দম আটকে থাকা যাবে। মারুফ ডান হাতে লোকটার পজিশনটা বুঝে নিয়ে আস্তে করে ভাজ করল ডান হাটু। তারপর প্রচন্ড গতিতে উঠিয়ে আনল সঠিক জায়গায়, লোকটার দুই উরু সন্ধিতে। লোকটা বাপরে বলে বালিশ ফেলে মারুফের মাথার কাছে ছিটকে পড়ল উল্টো হয়ে। তখনই লম্বু ঝাপ দিল স্ক্রু ড্রাইভার নিয়ে। প্রস্তুত ছিল মারুফ। স্ক্রু ড্রাইভার সহ বাম হাতটা ধরে হেচকা টান দিল নিজের দিকেই, উড়ে  আসা লোকটা কিছু বুঝে উঠার আগেই ওর বা হাতটা ১৮০ ডিগ্রী এ্যাঙ্গেলে একটা চক্কর খাওয়ালো মারুফ শূণ্যে ... কট কট করে একটা শব্দ হল কোথাও। খুব সম্ভব হাতের গোটাকয় মেটাকারপাল হাড় ভাঙার শব্দ এক সাথে। তারপরই ঢপ করে আছড়ে পড়ল লম্বু পাকা মেঝের উপর। আর উঠল না। সম্ভবত মাথায় লেগেছে। মারপিটের মধ্যে জ্যামিতির একটা ব্যাপার আছে, মারুফ যেন তা নতুন করে আবার টের পেল!

সেলের অন্য তিন আসামী তখন জেগে উঠেছে তারা কিছু না বুঝেই  তৃতীয় লোকটাকে ধরে বেদম পিটাতে শুরু করেছে।              

পরদিন আবার হৈ  চৈ শুরু হল জেলখানার ভিতর। জেলার রাতের পুরো ঘটনা কয়েকবার করে শুনলেন মারুফের কাছ থেকে, তার সেলের তিন আসামীদের কথাও শুনলেন। লম্বুকে জেল হাসপাতালে নেয়া হল, তার হাতের কব্জি আর নাকের ব্রিজ ভেঙে গেছে। পরিচিত আসামীরা আসল বিষয় জানতে মারুফের আশে পাাশে ভীড় করছে। মারুফ প্রফেসরকে খুঁজলো তার আশে পাশে, কিন্তু লোকটাকে দেখা গেল না। আর কি আশ্চর্য সন্ধ্যার কিছু আগে মারুফকে ধরে বেধে কুটুম ঘরে ঢোকানো হল। কারণ জেলখানার নিয়ম ভঙ্গ করে সে অস্ত্র হাতে রাতের আন্ধকারে হামলা করেছে অন্য কয়েদীর উপর... ইত্যাদি ইত্যাদি। 

-এটা কেমন বিচার?
-আপনি যে মাস্টার্স আর বি এর সার্টিফিকেট দিয়েছেন দুটোই জাল। সে কারণে এই স্কুলে আপনাকে আমরা আর রাখতে পারছি না। ঠান্ডা গলায় বললেন নিরুবালা আচার্য।
-কি ক্কি বলছেন?
-আপনি প্রতারণা করেছেন একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।
-কিন্তু ম্যাডাম...
-দেখুন আব্দুর রহমান সাহেব, আমি থানা পুলিশ করতে চাচ্ছি না। সেটা আপনার বা আমাদের স্কুলের জন্যও সন্মানজনক হবে না...

 

আব্দুর রহমান স্যার নিঃশব্দে বের হয়ে এলেন হেড মিসট্রেসের রুম থেকে। রাগে তার গা কাঁপছে! কিছু একটা করা দরকার কিন্তু কি করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। দ্রুত হেঁটে এসে টিচার্স রুমে বসলেন। টিচারস রুমে ঢালি স্যার আর মাসুমা ম্যাডাম বসে আছেন। অন্যরা হয়ত ক্লাশে!

-কি রহমান স্যার, মুখটা অমবশ্যার চাঁদের মত অন্ধকার কেন? ভাবীর সাথে ঝগড়া হয়েছে নাকি?

রহমান স্যারের মাথার ভিতরে যেন বিস্ফোরন হল, তিনি হঠাৎ ছুটে গিয়ে কলার চেপে ধরলেন ঢালি স্যারের।

-ঐ মিয়া আমার সাথে ইয়ার্কী করেন?

তারপরতো টিচার্সরুমে হৈ হৈ কান্ড। সবাই একরকম ছুটে এল, হেল্প হেল্প বলে মাসুমা ম্যাডাম চেঁচাতে লাগলেন। রহমান স্যারকে ধরে বেধে সরানো হল। উপস্থিত স্যার ম্যাডামরা সবাই হতভম্ব। রহমান স্যার অবশ্য আর দেরী করলেন না। বেড়িয়ে গেলেন স্কুল থেকে। ঘন্টা খানেক পর অবশ্য সবাই  জেনে গেলেন। জাল সার্টিফিকেট এর জন্য রহমান স্যার এই স্কুলের এসিসটেন্ট প্রধান শিক্ষক হিসেবে আর নেই।

 

এত কান্ড ঘটে গেল কিন্তু কুদ্দুসকে কোথাও দেখা গেল না, ইদানিং কারণ ছাড়া কুদ্দুস হঠাৎ হঠাৎ উধাও হয়ে যায় মাঝে মাঝেই। আসলে কুদ্দুস তখন স্কুলের পিছনে নিরিবিলিতে গিয়ে ফোন দিয়েছে সাবিনাকে।

-সাবিনা কেমন আছ?
-ভাল
-তোমারে যে ব্যাগটা দিছিলাম ঠিক ঠাক মত রাখছতো?
-হু
-কই রাখছ?
-আমার চকির নিচে।
-খুলো নাইতো ?
-না। খুলমু ক্যামনে তালা মারা। ব্যাগটা মজিদ স্যারের কাছ থেকে নেয়ার পর কুদ্দুস বুদ্ধি করে একটা ছোট্ট টিপ তালা লাগিয়ে দিয়েছে। সিক্যুরিটির দরকার আছে। আর সাবিনাও একটু বোকা সোকা সরল টাইপ, কুদ্দুস যা বলে শুনে। 
-হ্যাঁ, খুইলো না। আমি আসতেছি।
-কবে আসবেন?
-এইতো চাকরী ছাইরা চইলা আসব।
-চাকরী ছাড়বেন কেন?
-আরে ধূর এই স্কুলের চাকরীর ভবিষ্যত নাই। আইসা গঞ্জে বড় দোকান দিমু। কথাবার্তা হইছে। আর শোন
-কি?
-আইসা পরথমে বিয়াটা সাইরা ফেলব। মামা - মামীরে আওয়াজ দিয়া রাইখ
-আমি এইসব পারব না। আপনিই বইলেন
-আইচ্ছা আমিই বলব। আর বিয়ার পর তুমি আমি ককসবাজার যামু
-ঐ খানে কি?
-সমুদ্দর দেখুম সমুদ্দর। বিয়ার পর মানুষ হানিমুন করে না?
-রাখলাম মায়ে ডাকে
-শোন শোন...
-কি বলবেন জলদি বলেন
-আচ্ছা থাক আইসা বলব। ফোন রেখে কুদ্দুস ভাবের ঘোরে চলে যায়। সে আর সাবিনা হাত ধরাধরি করে সমদ্রের পার দিয়ে হাঁটছে। টিভির একটা নাটকে দেখেছে নায়ক- নায়িকা হাত ধরাধরি করে সমুদ্র পার দিয়ে হাঁটছে। না আজই ম্যাডামকে বলে চাকরীতে ইস্তফা দিবে কুদ্দুস।

-কার সাথে কথা কইলিরে সাবিনা? সাবিনার মা আসমা বেগম খর খরে চোখে তাকায় মেয়ের দিকে।
-কুদ্দুস ভাইয়ে ফোন দিসিল

-কুদ্দুইচ্চা? ওরে কয়া দিস ওর সাথে আমি আমার মাইয়ারে বিয়া দিমু না। আমার ইন্টার পাশ মাইয়া বিএ এমএ ছারা বিয়া দিমু না। এই আমার সাফ কথা...।--আচ্ছা কমু
-ঐ দিন একটা ব্যাগ দিয়া গেল ব্যাগে কি আছে খুইলা দেখছস?
-হু, উনার কাপড়-চোপড়
-হের কাপড় চোপর হের বাসায় রাখতে পারে না তোর কাছে রাখে কেন?  মতিরে দিয়া ওর ব্যাগ ওর বাড়িত পাঠায়া দে
-আচ্ছা
-আজই পাঠা
-আচ্ছা

 

সাবিনার মা গজ গজ করতে করতে রান্না ঘরে ঢুকে। তার ছোট মেয়েটা হয়েছে যেন গলার কাটা। বোকা সোকা এই মেয়েটা বিয়ের পর ঘর সংসার কিভাবে করবে কে জানে।  মাকে রান্না ঘরে  ঢুকতে দেখে সাবিনা চট করে বাড়ীর পিছনে বাঁশ ঝাড়ের ভিতর ঢুকে পরে;  এটা তার একটা নিরিবিলি ষড়যন্ত্রের জায়গা।  ফোন বের করে একটা নাম্বারে কল দেয়... ০১৭১...

-হ্যালো?
-সাবিনা?
-হু। খবর কি?
-খবর আজকেই সন্ধ্যার পর।
-আমারে জানান না ক্যান?
-আরে কিছু টাকার ব্যবস্থা করতে গিয়া দেরী হইল। তোমারে ফোন করতাম। ব্যাগ গুছাইছো?
-ব্যাগ নিমু না। ব্যাগ নিলে মায়ে সন্দ করব। আর শুনেন
-বল
-টাকা নিয়া চিন্তা কইরেন না।
-মানে?
-মানে টাকা আমার কাছে আছে।
-কত টাকা?
-অনেক টাকা
-কই পাইছ?
-ঐটা আপনার না জানলেও চলব।
-কুদ্দুস কি ফোন দিছিল?
-না
-গুড। তাইলে সন্ধ্যার পর বাঁশ ঝাড়ে থাকমু আমি।
-আচ্ছা।

 

সন্ধ্যার পর পর শাড়ির আঁচলে ঢেকে কুদ্দুসের দেয়া সেই চামড়ার ব্যাগটা নিয়ে যখন সাবিনা বের হল, তখন আর তাকে অতটা বোকা সোকা সরল মেয়ে বলে মনে হল না। সে দ্রুত বাঁশঝাড়ের দিকে পা চালায়, ওর জন্য অপেক্ষা করছে তার ভালবাসার মানুষ । বাঁশঝাড়ের মাথায় তখন কাসার থালার মত ঝক ঝক করছে একটা গোল চাঁদ। চাঁদ তার নরম আলোয় এই পৃথিবীর সব মানব মানবীকে সমানভাবে প্লাবিত করে, সে কখনই দেখে না কে ভুল কে সঠিক।

 

কুটুম ঘরে ঢোকার আগ মুহুর্ত পর্যন্ত প্রফেসরকে কোথাও দেখতে পেল না মারুফ। তবে প্রফেসরের বর্ণনা নিখুঁত অন্ধকার কুটুম ঘরের লোহার  গ্রাফের মেঝের উপর দাড়িয়ে নিচে থই থই পানির আওয়াজ পেল মারুফ। একদম নড়া চড়া করা যাবে না, যেমনটা বলেছিল প্রফেসর। তাহলেই বিষাক্ত মাছেরা টের পেয়ে ঘাই দিবে কিংবা ইলেকট্রিক ইল ফিস হাই ভোল্টেজ কারেন্ট ডিসচার্জ করবে পায়ে। ছোট ঘরটার উপরে হাত দিলে ছাদটা ধরা যায়। সেটা ধরে মারুফ দাড়িয়ে রইল, কিন্তু কতক্ষন? লোহার গ্রাফ করা মেঝে স্পর্শ করে আছে পানি, মাছেরা নড়া চড়া শুরু করেছে, মাঝে মাঝেই ছলকে উঠছে পানি। ভিজিয়ে দিচ্ছে তার খালি পা। 

মারুফ এখন বুঝতে পারছে হঠাৎ  কেন এই ঘরের বর্ননা দিয়েছিল প্রফেসর, কারণ  সে জানে তাকে এখানে ঢুকতে হবে তাই?  কি করে  জানল? লোকটা আসলে কে? 

 

নিরুবালা আচার্য অবাক হয়ে কুদ্দুসের দিকে তাকালেন।

-চাকরী ছেড়ে দিবে?
-জি ম্যাডাম
-কেন?
-ম্যাডাম মায়ের অসুখ। বাড়িতে দেখার কেউ নাই।
-কিন্তু আমি তোমাকে ছেড়ে দিলেও তুমিতো স্টেশন লিভ করতে পারবে না। থানার অনুমতি লাগবে। ওসি সাহেব ঐ দিন যে ক’জন স্টেশন লিভ করতে পারবে না তাদের নামের একটা লিস্ট দিয়ে গেছেন। তার মধ্যে তুমি আছ এক নাম্বারে। মজিদ সাহেবের হত্যা মামলার একটা সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তুমি স্কুল ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না।
-কি কন ম্যাডাম?
-হ্যাঁ। তুমি থানায় গিয়ে কথা বলতে পার।

 

হতভম্ব কুদ্দুস বের হয়ে এল ম্যাডামের রুম থেকে। এখন কি হবে? আরেকটা সমস্যা হয়েছে। সাবিনা ফোন ধরছে না। ঘটনা কি? এই সময় স্কুল কম্পাউন্ডে ওসি সাহেবের পিক আপটা ঢুকতে দেখা গেল। ওসি সাহেবের সঙ্গে পিকআপ থেকে দুটো লোক নামল। লোক দুটোকে দেখে কুদ্দুসের পিলে চমকে গেল। সেই বাসের ড্রাইভার আর কন্ডাকটর! যে লোকাল বাস থেকে কুদ্দুস ধমক দিয়ে মজিদ স্যারকে নামিয়েছিল, খুন করার উদ্দেশ্যে! একটা ঠান্ডা শীতল স্রোত কুদ্দুসের শিড়দাঁড়া বেয়ে নেমে গেল...!  

 

(চলবে)

একা এবং একা - পর্ব এক
একা এবং একা - পর্ব দুই
একা এবং একা - পর্ব তিন
একা এবং একা - পর্ব চার
একা এবং একা - পর্ব পাঁচ
একা এবং একা - পর্ব ছয়
একা এবং একা - পর্ব সাত
একা এবং একা - পর্ব আট
একা এবং একা পর্ব- নয়

একা এবং একা - পর্ব দশ
একা এবং একা - পর্ব এগারো
একা এবং একা - পর্ব বারো
একা এবং একা - পর্ব তের

 
লেখক: আহসান হাবীব
কার্টুনিস্ট/ সম্পাদক
উম্মাদ, স্যাটায়ার কার্টুন পত্রিকা
 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top