সিডনী শুক্রবার, ২৭শে নভেম্বর ২০২০, ১২ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭

একা এবং একা (শেষ পর্ব) : আহসান হাবীব


প্রকাশিত:
২৬ অক্টোবর ২০২০ ১৫:২৫

আপডেট:
২৮ অক্টোবর ২০২০ ১৪:৩৪

 

(আহসান হাবীব মূলত একজন প্রফেশনাল র্কাটুনিস্ট। তিনি পেশাগত কারণে সাধারণত কমিকস, গ্রাফিক নভেল ইত্যাদি নিয়ে কাজ করনে। তনিি যখন লখিনে তখন তার মাথায় থাকে কমকিস বা গ্রাফকি নভলেরে কনটন্টে। তার গল্পরে পছিনে থাকে স্টোরি র্বোডরে মত ছবরি চত্রিকল্প। এই কারণইে তার লখোয় একটা সনিমোটকি ড্রামা থাকে প্রায়শই। তিনি মনে করনে যেকোনো গ্যাজটেইে/ফরম্যাটইে হোক, স্ক্রনিে যে গল্প পাঠক পড়ছ,ে সখোনে তার সাব-কনসান্স মাইন্ড ছবি খুঁজ। আর তাই ‘প্রভাত-ফরেী’র পাঠকদের জন্য তার এই ধারাবাহকি ইন্ডি নভলে ‘একা এবং একা’)

 

শেষ পর্ব
করবে না করবে না ভেবেও শেষ পর্যন্ত একটা পরিচিত নাম্বারে ফোন করল মনিকা। সঙ্গে সঙ্গেই ওপাশে ফোন ধরল কেউ একজন।
- হ্যালো মবিন?
- জি ম্যাডাম বলেন
- তোমার মারুফ স্যার কোথায়?
- উনি চলে গেছেন
- কোথায় গেছেন ?
- তাতো জানি না। আমাকে স্টেশন কোন দিকে জানতে চাইলেন। বলেন নাই কোন দিকে যাবেন।
- ও আচ্ছা, ঠিক আছে। ফোন রেখে দিল মনিকা। দ্বিতীয় ফোনটা করল স্কুলে।
- হ্যালো সাবিনা?
- জি ম্যাডাম
- আজ আমি স্কুলে আসব না। একটু বলে দিও বড় আপাকে।
- আচ্ছা ম্যাডাম বলে দিব । ম্যাডামের কি শরীর খারাপ?
- একটু , আচ্ছা রাখি।
আজ অবশ্য মনিকার ক্লাশও নেই। ক্লাশ টেস্টের খাতা দেয়ার একটা ব্যাপার ছিল। সেটা পরে একদিন করলেও চলবে। আজ সারাদিন ঘুমালে কেমন হয়। কোনো সুন্দর স্বপ্ন দেখে যদি মনটা ভাল হয়। বাইরে মেঘ গুর গুর করছে। বৃষ্টি হলে বেশ হয়। পুরো শহরটা ভেসে যাক আজ, ভাবে মনিকা।

পুরো শহর ভসিয়ে দেওয়ার মত ঝম ঝম বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির অবিশ্রান্ত শব্দ স্টেশনের পুরোনো উচু টিনের সিলিংয়ে এক ধরনের আবেশ তৈরী করছে । স্টেশনের ভিতরে একটা বেঞ্চে এক পা ছড়িয়ে বসে আছে মারুফ। পিছনে আলগোছে পয়েন্ট থার্টি সিক্স ক্যালিবারের একটা রিভলভার ধরে আছে ইন্সপেক্টর সারোয়ার খান। কথা বলছিল মারুফ...
- মনে আছে আমার ইন্টারোগেশনের সময় তোমার বলা সেই গল্পটা... আজ থেকে ত্রিশ বত্রিশ বছর আগে একটা প্রস্টিটিউশনের পাশের গলিতে এক সকালে, একটা জুতার বাক্সে একটা বাচ্চাকে পাওয়া যায়। একদিন বয়সের সেই বাচ্চাকে সকালে হাঁটতে যাওয়া এক এনজিওর লোক উদ্ধার করে নিয়ে যায়। পরে নানা হাত ঘুরে সেই বাচ্চাকে দত্তক নেয় এক মা। হ্যাঁ আমি সেই বাচ্চা। তোমার ভাষায় জারজ সন্তান। পিতৃ-মাতৃ পরিচয়হীন এক শিশু।
- এই গল্প কেন আমাকে এখন শুনতে হচ্ছে? আমিইতো এই গল্প তোমাকে বলেছি।
- ঐ যে বললাম, এই গল্পের একটা সেকেন্ড পার্ট আছে। সেটা তোমাকে শুনতে হবে।
- বেশতো শোনা যাক।
- জেলে যখন ছিলাম তখন মাঝে মাঝে জেলের লাইব্রেরীতে গিয়ে কিছু বই ঘাটা ঘাটি করতাম। পড়া হত না। কারণ বই পড়ার মত একাগ্রতা তখন আমার মাথায় ছিল না। কিন্তু হটাৎ একটা বই পেলাম বইটার নাম ‘ মাইন্ড হান্টার’ সাইকো কিলারদের নিয়ে গল্প।
- তোমার কি ধারনা হয়েছে আমি সাইকো কিলার?
- আমাকে শেষ করতে দাও।
- বেশ শেষ করো
- আমি ঐ বইটা পড়লাম, আগ্রহ নিয়েই পড়লাম। বইটা আসলে কোনো গল্পের বই না। একজন সাইকিয়াট্রিস্ট্রে সাইকো কিলারদের নিয়ে একশটা কেস হিস্ট্রি। তুমি যে খেলাটা আমার সাথে খেলতে চাইছ সেই খেলার ধরনে তখন আমার মনে হল তুমি একজন সাইকো সিরিয়াল কিলার...
হো হো করে হাসল ইন্সপেক্টর সারোয়ার খান।
- বল বল আমি বেশ মজা পাচ্ছি কিন্তু ...
- পুরো বইটা পড়ে বুঝলাম ব্যাপারটা তা নয়। সিরিয়াল কিলাদের ক্ষেত্রে পর পর তিনটা মার্ডারের মধ্যে সময়ের একটা সিনক্রোনাইজেশন থাকে। আর আছে ‘মডাস ওপেরান্ডি’ নামে একটা বিষয় অর্থাৎ কিভাবে সে মারছে প্রতিটা ভিকটিমকে। ভিকটিম অবশ্যই কিলারের কন্ট্রোলে থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে প্রথম দিককার ভিকটিমরা থাকে দুর্বল। তোমাকে যতটা বুঝেছি, তাতে করে বুঝলাম এর কোনটাই তোমার সাথে যায় না। পরে হঠাৎ বুঝতে পারলাম তোমার এই খেলা কেন?
- কেন? সারোয়ার খানের গলায় এবার একটা আগ্রহ টের পাওয়া গেল।
- তুমি আসলে বেছে বেছে বাবা মার পরিচয় নেই এমন ভিকটিমদের কেসগুলো নাও। আমি আসলে জারজ শব্দটা বার বার বলতে চাই না। তুমি সেই বাবা মার পরিচয়হীন মানুষগুলোকে সরিয়ে দেওয়ার এক মহান দায়িত্ব নিয়েছ। এটা একধরনে ‘সুপেরিওরিটি অবসেশন’ মানসিক রোগতো বটেই, ভয়াবহ ধরনের মানসিক রোগ। হিটলারের ছিল।
- বল কি আমি তাহলে হিটলারের সম পর্যায়ের একজন!
- ‘সুপেরিওরিটি অবসেশন’ এর পেসেন্টরা তার জারজ প্রতিপক্ষদের সরিয়ে না দিলে নিজে শুদ্ধ হতে পারছে না এরকম এক অদ্ভুত অবসেশনে ভোগে সবসময়।
- ইন্টারেস্টিং!
- আচ্ছা এবার তাহলে গল্পের আসল পার্টটা বলি?
- ওহ এখনো গল্প শুরুই হয় নি? বল বল... জলদি শেষ কর।
- যেই এনজিওর ভদ্রলোক সকাল হাঁটতে বের হয়ে প্রস্টিটিউশনের গলির এক ডাস্টবিন থেকে আমাকে উদ্ধার করেছিল। তিনি কিন্তু অভ্যেস বসে পরদিনও হাঁটতে বের হলেন এবং আশ্চর্যের ব্যাপার কি জান? পরদিনও ঐ একই গলির ঐ একই ডাস্টবিনে দ্বিতীয় একটা বাচ্চা পেলেন ঐ একইরকম জুতার বাক্সে। তিনি তাকেও উদ্ধার করলেন। এবং তিনি একটা কাজ করলেন। তার কি মনে হল ঐ দুটি বাচ্চার ডিএনএ টেস্ট করালেন। এবং তিনি জানতে পারলেন বাচ্চা দুটো জমজ। তার মানে বুঝতে পারছতো আমার একটা ভাই ছিল, ইয়াঙ্গার লিটিল ব্রাদার। একটু থামলো মারুফ। তারপর শান্ত স্বরে ফিস ফিস করে বলল ‘সারোয়ার, তুমি কি জানতে তোমাকেও দত্তক নেওয়া হয়েছিল?’

মারুফ চুপ করে গেল। মাঝখানে থেমে গিয়েছিল এখন আবার ঝম ঝম শব্দে নতুন উদ্যোমে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বাতাসের কারণে স্টেশনের উচু টিনের ছাদে অদ্ভুত শব্দ হচ্ছে। শো শো বাতাস স্টেশনের ফাকা জায়গায় ব্লিজার্ডের মত বিজাতীয় শব্দ তৈরী করছে। ঠিক তখন দুম করে একটা শব্দ হল। পয়েন্ট ছত্রিশ ক্যালিবারের রিভলভারের গুলির শব্দ। পর পর কয়েকটা গুলি বের হলে এই রিভলভারের গুলিতে এক ধরনের ইকো হয়। আর একটি মাত্র গুলি বের হলে সেটা হয় না।
মারুফ উঠে দাড়াল। পেছনে তাকানোর আর প্রয়োজন নেই। হোমিসাইডের চৌকস অফিসার ইন্সপেক্টর সারোয়ার খানের পা দুটো দেখা যাচ্ছে। উপুর হয়ে পরে আছে বেচারা, রক্তের একটা চিকন ধারা গড়িয়ে আসছে পায়ের দিকে। বৃষ্টির মধ্যেই বাইরে এসে দাড়াল মারুফ। ঝম ঝম বৃষ্টির পানি তাকে ভিজিয়ে দিচ্ছে। বৃষ্টির বিশুদ্ধ পানিতে তারও শুদ্ধি হওয়ার প্রয়োজন আছে হয়তবা। ঠিক তখন ্একটা রিকশা এসে দাড়াল। হালকা নীল রং এর সালোয়ার কামিজ পরা এক তরুণী নেমে এল রিক্সা থেকে। মারুফ খুব বেশী অবাক হল না, সালোয়ার কামিজ পড়া অবস্থায় মনিকাকে আগে কখনো দেখে নি।
দুজনেই মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ভিজতে লাগলো, মানব-মানবীর চিরন্তন এক দৃশ্য। বৃদ্ধ রিক্সাওয়ালা তার ভেজা গামছায় মুখ মুছতে মুছতে অবাক হয়ে ওদের দেখছে!
সরযুবালা বিদ্যানিকেন এর গল্প এখানেই শেষ। এই স্কুলকে কেন্দ্র করে যে গল্প শুরু হয়েছিল সেই গল্পের পাত্র পাত্রীরা সবাই আসলে মহাবিশ্বের ছোট্ট নিঃসঙ্গ একটি দ্বিতীয় শ্রেণীর গ্রহের সমাজ বন্ধ মানুষ। তারা সিড়ি বেয়ে সামনের দিকে যেতে চায়, সিড়ির প্রতিটি ধাপেই পা রেখে এগুতে চায়... মাঝে মধ্যে ভুল সিড়িতে পা রাখে তারা। তারপরও তাদের কিছু কিছু ভুল সুন্দর, অনেকই সুন্দর। কে জানে হয়তো এটাই জীবনের নিয়ম।।
(শেষ)

 

একা এবং একা - পর্ব এক
একা এবং একা - পর্ব দুই
একা এবং একা - পর্ব তিন
একা এবং একা - পর্ব চার
একা এবং একা - পর্ব পাঁচ
একা এবং একা - পর্ব ছয়
একা এবং একা - পর্ব সাত
একা এবং একা - পর্ব আট
একা এবং একা পর্ব- নয়

একা এবং একা - পর্ব দশ
একা এবং একা - পর্ব এগারো
একা এবং একা - পর্ব বারো
একা এবং একা - পর্ব তের
একা এবং একা - পর্ব চৌদ্দ
একা এবং একা- পর্ব পনের
একা এবং একা- পর্ব ষোল
একা এবং একা -পর্ব সতের
একা এবং একা- পর্ব আঠারো
একা এবং একা- পর্ব উনিশ

 
লেখক: আহসান হাবীব
কার্টুনিস্ট/ সম্পাদক
উম্মাদ, স্যাটায়ার কার্টুন পত্রিকা
 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top