সিডনী মঙ্গলবার, ১৩ই এপ্রিল ২০২১, ৩০শে চৈত্র ১৪২৭

ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছত্রিশ) : অমর মিত্র


প্রকাশিত:
৬ এপ্রিল ২০২১ ১২:৩৮

আপডেট:
১৩ এপ্রিল ২০২১ ০৮:০৩

ছবিঃ অমর মিত্র

 

ছত্রিশ

উতঙ্ক বন্দি হয়েছে। তাকে সমর্পণ করেছেন প্রভু সুভগ দত্ত। এই সংবাদ নগরে শোনা যাচ্ছিল। শূদ্রপল্লীর অগ্নিকাণ্ড, তারপর উতঙ্কের বন্দিত্ব নগরে চাঞ্চল্য ফেলেছিল। কিন্তু নগরবাসী কত বিষয়েই না চঞ্চল হয়, আবার তা ভুলেও যায়--উতঙ্কর বন্দিত্ব তাদের খুশি করেছিল; তবে বিশ্বাস ছিল না কারোর যে উতঙ্কর শাস্তি হতে পারে। সকলেই যেন অপেক্ষা করছিল সেইদিনের, যেদিন উতঙ্কর রথ বায়ুবেগে আবার ছুটে যাবে রাজপথ দিয়ে। বাতাসে সাঁই সাঁই করে ছুটবে তার প্রহরণ। রক্তাক্ত হবে পথচারী। নগরের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির দাস উতঙ্কর যে শাস্তি হতে পারে, লোকে তা বিশ্বাসই করে না।

একদিন ভোর বেলায় শঙ্খধ্বনিতে ঘুম ভাঙল নগরবাসীর। ভেরির দিমি দিমি শব্দে কেউ কেউ ঘর ছেড়ে বেরল পথের ধারে, কোনো কোনো গৃহের জানালা খুলে গেল। জানালায় পুরনারীরা এসে দাঁড়াল। শঙ্খ ও ভেরির ক্রমাগত ধ্বনিময়তা সব পুরুষমানুষকে অর্গল খুলে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করল। সমস্ত গৃহবধূ, যুবতী, প্রৌঢ়া নারীদের দাঁড় করিয়ে দিল জানালার আলোয়। ওইসব পুরুষরা সকলে সদ্য  নিদ্রোত্থিত, রমণীদের চোখের কোলে, গণ্ডদেশে ঘুম, জাগরণ, আনন্দ, বিষাদ, সব চিহ্ন  ছড়িয়ে। তারা অবাক হয়ে ধ্বনিময় নগরের রাজপথে চেয়ে ছিল। 

বেজে যাচ্ছে শঙ্খ, তারপর ভেরি, কখনো দুইটিই এক সঙ্গে, অবশেষে শঙ্খ ও ভেরি নিঃশব্দ হলে। শোনা যেতে লাগল ঘোষকের কণ্ঠস্বর। শঙ্খবাদক, ভেরিবাদক এবং ঘোষকের মূর্তি অদ্ভূত। মনে হয়। শূদ্রই হবে। নিষাদ অরণ্যচারীও হতে পারে। দেহ কৃষ্ণবর্ণের, কোমরে পশুচর্মের আবরণ, বাকি অংশ  অনাবৃত, মাথায় ঘন কুঞ্চিত কেশ। হ্যাঁ, নিষাদই হবে। নিষাদ ব্যতীত কার সাধ্য এমন গম্ভীর স্বরে মৃত্যুর কথা ঘোষণা করতে করতে হেঁটে যায়। ঘোষকের হাতে ছিল মহিষের বিষাণ নির্মিত একটি ক্ষুদ্রকায় খড়্গ। খড়্গটি আকাশে তুলে সে বলে যাচ্ছিল দাস উতঙ্কর অপরাধের বিবরণ। নিষ্ঠুর দাস শূদ্রপল্লী দাহন করেছে। তার মৃত্যু অগ্নিদাহনেই। প্রধান সেনাপতি, কুমার বিক্রমের বিচারে মৃত্যুদণ্ড হয়েছে উতঙ্কর। আগামী কৃষ্ণা চতুর্দশীর প্রত্যুষে নগরের উপান্তে, শূদ্র পল্লীর সন্নিকটে অগ্নিদগ্ধ করে দাসের প্রাণ হরণ  করা হবে। নগরবাসী অবগত হউন।

ঘোষণার পর, কয়েক মুহূর্তের নৈঃশব্দের পর আবার বেজে উঠছিল শঙ্খ। অতি তীব্র, কর্ণপটহ বিদীর্ণকারী শঙ্খধ্বনিতে নগরবাসীর আলস্য ভাঙছিল। ভেরির দিমি দিমি ধ্বনিতে নগরবাসী গা ঝাড়া দিয়ে উঠছিল। কতদিন বাদে এমন ধ্বনিতে নগর জেগে উঠল। মনে পড়ে গেল দশপুরার যুদ্ধের কথা। যুদ্ধে গিয়েছিল সেনাবাহিনী এমন শঙ্খ-ভেরি বাজিয়ে। ফিরেছিল শঙ্খধনিতে নগরের ঘুম ভাঙিয়ে। পুরনারীদের মনে পড়ে যাচ্ছিল পুষ্পবর্ষণের কথা। শেষরাতে তাদের ঘুম ভেঙেছিল দূরাগত শঙ্খধ্বনিতে, দুন্দুভির ডাকে। তারা হিমনীলাভ আকাশে তাকিয়ে অনুমান করেছিল রাত ফুরোতে আর কত বাকী, হিসেব করেছিল ওই শঙ্খধ্বনি নগরে প্রবেশ করতেই বা আর কত সময় লাগতে পারে। শঙ্খধ্বনিতে বিজয়ীর উল্লাস শুনতে পেয়েছিল তারা। ফলে পুষ্প চয়ন করে জানালা খুলে অপেক্ষা করেছিল বিজয়ী সেনাবাহিনীর জন্য। তারপর হাতি এল দুলতে দুলতে। হাতির পরে এল অশ্বারোহীর দল, এল পদাতিক বাহিনী, রথারোহী বীরের দল। তারা গান গাইছিল, আকাশে তুলে ধরছিল খোলা তলোয়ার, ভল্ল, বর্শা, খড়্গ। ভোরের আলোয় তা ঝকমক করে উঠছিল। নতুন রোদ প্রতিফলিত হচ্ছিল সেই সব আকাশমুখীন অস্ত্রের গা থেকে। অস্ত্রের দিকে পুষ্পবর্ষণ শুরু হয়েছিল প্রথমে। তারপর যুবতীরা, গৃহবধূরা, জননীরা অবাক হয়ে দেখছিল বিজয়ীদের। উন্মুক্ত গাত্র, সুদেহী, সুঠাম সৈনিকদের দেখে তারা অভিভূত হয়ে আরো পুষ্প বর্ষণ করেছিল। যুবতীরা দেখেছিল রাজা ভর্তৃহরি যাচ্ছেন রথে, সেনাধ্যক্ষ বিক্রম আছেন অশ্বে। সেই অশ্ব ছিল শ্বেতকায়, বনায়ুদেশের শৌর্যদীপ্ত ঘোটক। দুই পুরুষই পরমরূপবান। তাঁদের দেখে যুবতীরা উদ্দীপ্ত হয়েছিল, উল্লাস প্রকাশ করে একে অন্যকে অবলম্বন করেছিল হাসতে হাসতে। দুহাতে ফুল ছড়িয়ে দিচ্ছিল গবাক্ষ থেকে। সে ছিল বসন্ত। সেই বসন্তে ঋতুরাজ তাঁর সমস্ত রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়েছিলেন অবন্তীর আকাশে, বাতাসে। বাতাসে ছিল পুষ্প গন্ধ। যুবতীরা কতরকম ফুলই না চয়ন করেছিল, অশোককলি, কুরুবক, অপরাজিতা, বকুল, কমলকলি, মন্দার, বনযূথিকা, আরো কত সব জানা অজানা বনের ফুল। দুন্দুভি, মৃদঙ্গের শব্দে, ভেরির গম্ভীর দিমি দিমি ধ্বনিতে কামদীপ্ত যুবতীরা অবগুণ্ঠন সরিয়ে ফেলেছিল মুখ থেকে। তাদের বক্ষবাস যেন খসে যাচ্ছিল গোপনে।

সেই সব রমণীদের ভিতর যারা ছিল জননী, তারা সমস্ত পুরুষ যোদ্ধাদের ভিতরই দেখছিল সন্তানের ছায়া। বাৎসল্য রস জেগে উঠছিল প্রাচীনাদের ভিতরে। পদাতিক বাহিনীর উপর পুষ্প বর্ষণ করছিল তারাই। পদাতিক বাহিনী ছিল শূদ্র যোদ্ধাদের। তারা সবল সুঠাম বটে, রূপবান কিন্তু ছিল না। কিন্তু জননীরা তাদেরই মনে মনে বরণ করছিল সন্তান কল্পনায়।

কতদিন আগের কথা এ সব! তারপর বহুদিন কোনো শঙ্খধ্বনি শোনেনি তারা। বহুদিন ভেরি, মৃদঙ্গর ডাকে জানলা খুলে দাঁড়ায়নি। দুন্দুভির ধ্বনিতে আলুথালু ছুটে আসেনি জানালায়। যে শঙ্খধ্বনি আজ তাদের ডেকে এনেছে, সেই শঙ্খধ্বনির কোনো খবর নেই তাদের কাছে। যুদ্ধযাত্রার কথা শোনেনি যখন, যুদ্ধে জিতে ফিরবে কারা? তবু যারা এসেছে গবাক্ষে, তাদের বেশ আলুথালু, চুল খোলা, গতরাতের সাজসজ্জার রেশ ছড়িয়েছিল তাদের এখানে ওখানে। আর ছিল শয্যার সুরভি। বধূদের গায়ে পুরুষের ঘামের গন্ধ তখনো লিপ্ত ছিল, বিলীন হয়নি। অনূঢ়া যুবতীদের গায়ে ছিল কল্পনার সুগন্ধ। প্রাচীনাদের গায়ে ছিল গন্ধহীন উদাসীনতা ছেয়ে। তারা শুনল মৃত্যুদণ্ডের কথা। এই বসন্তে যখন ভালবাসা আর নতুন প্রাণ আসার কথা অবন্তী দেশে, উজ্জয়িনী নগরে, যখন ঘোষকের বলার কথা বসন্ত এল, গৃহবাসী শোনো, এল বসন্ত—এই বাক্যবন্ধ, তখন কিনা সে ঘোষণা করছে মৃত্যুদণ্ড। জাগরণ যে উল্লাস এনেছিল রমণীদের ভিতরে, সেই উল্লাস অন্তর্হিত হলো। জেগে উঠল ভয়, বিষাদ। এই স্নিগ্ধ বিহানবেলায় কে শোনায় মৃত্যুর কথা, কেন শোনায়? হায় মহাকাল! তোমার সোনার উজ্জয়িনীর কী হলো? বসন্তে ভ্রমর নেই, পুষ্প গন্ধ নেই, বসন্তে প্রাণের কথা উচ্চারণ নেই কোথাও, মৃত্যুর কথা বলে যাচ্ছে কে? কতকাল এই নগরে বৃষ্টি হয়নি, জলহীন শুষ্ক নগর বুঝি হরণ করেছে মানুষের হৃদয়সুষমা, তাই মৃত্যু সংবাদ শুনে ওই যে ওই পুরুষরা, যাদের ভিতরে আছে গবাক্ষের সমস্ত নারীদের পিতা, পুত্র, স্বামী, স্বজন, সুজন, সকলে  উল্লাস করছে।

যতবার ঘোষক আকাশের দিকে চেয়ে মৃত্যুদণ্ডের কথা উচ্চারণ করে, সমবেত পুরুষেরা উল্লসিত হয়ে উঠতে থাকে। কার মৃত্যু দণ্ড? না উতঙ্কর। উতঙ্ক মানে শ্রেষ্ঠীর নিষ্ঠুর দাস। সত্য? নাকি অন্য কোনো মানুষ যার নামও উতঙ্ক? নিষ্ঠুর উতঙ্কর মৃত্যুদণ্ড হয়েছ শূদ্র পল্লীতে আগুন লাগানোর অপরাধে।  এ কি সত্য হতে পারে? বিশ্বাস করা যায়?

পুরুষরা তখন ঘোষক বা বাজনদারদের ডাক দেয়, ওহে শোনো, শুনে যাও দশপণ দেব, দুটো কথা বলে যাও, অঙ্গবস্ত্র দেব, কার মৃত্যুদণ্ড?

ভেরি বেজে ওঠে ভীষণ গম্ভীরতায়। ভেরির শব্দে আবার আকাশে পাক দিতে লাগল গৃহবাসী কবুতরেরা। ভীতু কবুতর একটি ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে দূরের দিকে চলে গেল। ভেরির শব্দ থামল ঘোষক জবাব দিল উচ্চকণ্ঠে, শ্রেষ্ঠীর দাস উতঙ্কর মৃত্যুদণ্ড।

মানুষজন আরো নিশ্চিন্ত হতে খোঁজ নেয়, কোন শ্রেষ্ঠী?

শ্রেষ্ঠী, কোন শ্রেষ্ঠী তা তো জানা নেই।

শ্রেষ্ঠী কি সুভগ দত্ত? একজন জিজ্ঞেস করে, না জিজ্ঞেস করলে যেন সম্পূর্ণ নিশ্চিন্ত হওয়া যাচ্ছে না। এই নগরে কি আর কোনো উতঙ্ক আছে? সেও কি কোনো এক শ্রেষ্ঠীর দাস? শ্রেষ্ঠী বলতেই লোকে তো চেনে সুভগ দত্তকে, তাহলে এত খোঁজ নেওয়া কেন? খোঁজ নেওয়ার ভিতরে বারবার ওই একই কথা, মৃত্যুদণ্ড কথা শোনার বাসনা লুকিয়ে আছে নগরবাসীর মনে। উতঙ্কর মৃত্যু সংবাদ তাদের কাছে যেন মঙ্গলধ্বনি। তাই নানা প্রশ্ন করে তারা বারবার ওই একই কথা শুনতে চাইছিল? কী নিষ্ঠুরই না ছিল উতঙ্ক, কতজনের গায়ে এখনো প্রহারের চিহ্ন গেছে। কতজনের পায়ের উপর দিয়ে চলে গেছে ওই রথের চাকা। হাতে লাঠি নিয়ে তারাও এসে দাঁড়িয়েছিল পথে।

একজন জিজ্ঞেস করল, ওহে কেন মৃত্যুদণ্ড?

শূদ্রপল্লী দাহনের জন্য।

কে করেছিল তা, উতঙ্ক?

যে এইসব প্রশ্ন করে ঘোষকের অগ্রগমন স্তব্ধ করে দিচ্ছিল, সে সবই জানে। কিন্তু যমরাজের অনুচরের মতো ওই ঘোষকের কণ্ঠ নিঃসৃত শব্দ বাক্য বারবার শুনে  অবদমিত ক্রোধে নিঃস্ব তার  দেহকে তৃপ্ত করতে চাইছিল সে। এবার জিজ্ঞেস করল, ওহে, বলে যাও, কী করে মারা হবে।

আগুনের পোড়ানো হবে জীবন্ত দাসকে। বলতে বলতে কণ্ঠস্বর উচ্চগ্রামে তুলে লোকটি সকলকে শোনাতে লাগল, সে যেমন পুড়িয়েছিল, তাকে তেমন পোড়ানো হবে-এ-এ। ঘোষকের কথা শেষ হতেই শঙ্খ বেজে উঠল, ভেরিতে আবার গম্ভীর আঘাত পড়ল-দ্দাম্! দ্দাম্!

সমবেত মানুষজন এবার ‘আহা’ উচ্চারণে সমবেদনা প্রকাশ করল একসঙ্গে। কিন্তু তাদের চোখমুখে কোনো বেদনা ছিল না। তারা একে অন্যকে বলছিল, আহা পুড়িয়ে না মারলেই হতো, ওতে খুব কষ্ট!

......না, না, অগ্নিদাহনের শাস্তি অগ্নিদাহনই বটে। 

......শূলে চাপিয়ে মারা যেতে পারত।

.....তাতেও খুব কষ্ট। 

.....মৃত্যু তো কষ্টেরই, ওহে, কী বললে যেন আগুনে পোড়াবে, জীবন্ত ? 

তখন গৃহগুলির অপরিসর জানালায় যারা ছিল, পুরনারীরা, তারা মৃত্যু সংবাদ শুনে দু-হা্তে  কর্ণকুহর রুদ্ধ করেছিল। মৃত্যুদণ্ড ঘোষণাকারীর কণ্ঠ, তার সঙ্গে বেজে ওঠা শঙ্খ, দুন্দুভি, ভেরির শব্দ কানে আসা মঙ্গলজনক নয়। তারা স্বামী নিয়ে, সন্তান নিয়ে, পরিজন নিয়ে সংসার করে, মঙ্গল অমঙ্গলের ভয় তাদের ভিতরে প্রবল। তাছাড়া বহুদিন পরে যে শঙ্খধ্বনি তাদের জাগিয়েছিল, তা মঙ্গল সংবাদই দেবে, এমন অনুমান ছিল। বারবার মৃত্যু-সংবাদ শুনে আর নিজেদের উদাসীন রাখতে পারে না নারীরা। তারা কেঁদে ওঠে। একটি নারীর চোখে প্রথমে জল আসে, তা দেখে অন্য নারীদের চোখও ভিজে যেতে থাকে বেদনায়। কান্না ছড়িয়ে পড়তে থাকে। বন্ধ হয়ে যেতে থাকে প্রতি গৃহের জানালার কপাট, পরপর। সশব্দে। বন্ধ জানালার আড়ালে রমণীরা কান্নায় ভেঙে পড়তে থাকে। এ কেমন সকাল এল, প্রত্যুষকালেই  নগরে বেজে উঠল মৃত্যুদণ্ডের ভেরি। এই সোনার নগরে তো মৃত্যুদণ্ড হয় না কখনো। রাজা ভর্তৃহরি কেন, তাঁর পিতার আমলেও তো মৃত্যুদণ্ড হয়নি কারোর। 

মহিষের বিষাণ নির্মিত খড়্গগুলি দোলাতে দোলাতে ঘোষক অবাক হয়ে দেখতে থাকে জানালাগুলির বন্ধ হয়ে যাওয়া। তার হাত থেকে খড়্গ পড়ে যায় মাটিতে। তাতেও সে আরো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। খড়্গ তুলে নিতে নিতে ভাবল, নগরের নারীরা তার প্রতি বিমুখ হয়েছে। প্রতিটি জানালায় ঘুমভাঙা নারীমুখ ছিল। সেই মুখ কত সুন্দর, সেই মুখে কত না অনুরাগের চিহ্ন, দ্যুতিময় চোখগুলিতে ছিল প্রেমময় চাহনি। নিষাদ দেখেছে,  নারীরা যে পুরুষের দিকেই দৃষ্টিপাত করুক, দৃষ্টিতে থাকে সম্মোহনী ভাব, তা সেই নারী অন্য যে পুরুষের অনুরাগিনীই হোক না কেন। জানালায় নারীমুখ দেখে ঘোষক মৃত্যুর কথা ঘোষণা করতে উৎসাহ পাচ্ছিল বেশি। এখন সে কেমন নিরুৎসাহ হয়ে পড়ে। তার মনে হয় জানালাগুলি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে নারীমুখগুলিতে তার প্রতি ঘৃণার ভাব জেগে উঠতে  দেখেছিল সে।

পুরুষরা হাঁক মারে, থামলে কেন, বলো, বলে যাও।

বলে যাও, বলে যাও, আকাশ বাতাসে উতঙ্কর মৃত্যুসংবাদ ছড়িয়ে পড়ুক। 

ঘোষক চুপ করে বন্ধ কপাটের দিকে চেয়েছিল। তার কানে অস্পষ্ট কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল। সে বুঝতে পারছিল নারীরা কপাট বন্ধ করে গৃহমধ্যে রোদন করছে। হায়রে বসন্ত! আকাশে তাকায় ঘোষক! এ কেমন চৈত্রদিন, বসন্ত ভরে উঠেছে রোদনে। সে নিষাদ, অন্নের বিনিময়ে এই কাজে সম্মত হয়েছিল। বুঝতে পারছিল তার ঘোষণা দুঃখ এনেছে নারীদের মনে।

এক পুরুষ একটি ক্ষুদ্র পেটিকা নিয়ে ছুটে আসে ঘোষকের দিকে, এই নাও, দশপণ আছে এতে, তোমরা ভাগ করে নিয়ো, তিনপণ করে নিয়ে একপণ ওই উতঙ্ককে দিয়ো হা হা হা, বলো, বলে যাও কোথায় মারা হবে শয়তানটাকে, শোনো হে, ও ছিল পাপী, শূদ্র মধ্যে সবচেয়ে বড় পাপী, নিষাদের চেয়েও পাপী, ওর মৃত্যুদণ্ড যত না দুঃখের, তার চেয়ে আনন্দের বেশি। 

ঘোষক অবাক হয়ে দেখছিল প্রাথমিক জড়তা কাটিয়ে পুরুষরা হর্ষধ্বনি করে উঠছে, পাপের ফল এই, পাপের শেষ মৃত্যুতে, মহাকাল আছেন! 

...শ্ৰেষ্ঠী মহানুভব, জানতে পেরেই সমর্পণ করেছেন দাসটিকে।

.....শোনা যাচ্ছে সেনাপতিই এই দণ্ডাদেশ দিয়েছেন, রাজার নিকটে উতঙ্ককে নিয়েই যাওয়া হয়নি, দাসের অপরাধ বিচার রাজার না করাই শ্রেয়, দাসের মৃত্যুদণ্ড সামান্য রাজকর্মচারীই দিয়ে দিতে পারে। 

......ওহে, আর একবার বলো, একশো ঘা প্রহার করবে না নগরবাসী? 

......আগে তো হাতদুটি ছিন্ন করা যেত, তারপরে জীবন্ত দাহন করা হতো না হয়।

......ওহে, দণ্ডাদেশ রদ হয়ে যাবে না তো? 

......লোকটি ছিল ভয়ানক, ভয়ানকের মৃত্যু সুন্দর হয়, সকলে দেখতে যাব আমরা, ওহে বলো, বলে যাও।

আশ্চর্য! একটি মৃত্যুসংবাদ একজনকে উল্লসিত করেছে, অন্যজনকে করেছে শোকার্ত। যে পুরুষটি  বলে যাচ্ছিল ভয়ানকের মৃত্যু সুন্দর হয়, তার বধূটি ঘরের অন্ধকারে কাঁদতে কাঁদতে বিলাপ করছিল, অগ্নিদাহনে  মরণ হবে যার, তার কত না কষ্ট হবে, হায় কী বসন্ত এল অবন্তীদেশে এবার!

কান্নার ক্ষীণ শব্দ ঘোষকের বুকের ভিতরে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছিল যেন। সে পুড়তে আরম্ভ করেছিল নিজে নিজে, সংগোপনে। এই নিষাদ বয়সে নবীন, এই নিষাদের চোখে মনে এখন আপনা আপনি, সেই রং ঢেকে যাচ্ছিল রোদনে। এক সঙ্গে এত নারীর প্রত্যাখ্যানে সে টের পাচ্ছিল মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণা প্রেমের বিপরীত। যখন রমণীরা জানালা খুলে দাঁড়িয়েছিল, ঘোষক দেখেছিল তার নবীন দেহের দিকে সকলে চেয়ে আছে বিস্ময়ে, যেন এমন পুরুষ দ্যাখেনি তারা কোনোদিন। পরে সেই বিস্ময় অন্তর্হিত হলো, জেগে উঠল শোক, জেগে উঠল ঘৃণা। অগ্নিবর্ষণ করে জানালা বন্ধ করে দিল শেষ যুবতীটি। বিষণ্ণ ঘোষক ইঙ্গিত করল ভেরিবাদককে, বাজাও।

মুহুর্মুহ বাজতে থাকে ভেরি। ভেরির দিমি দিমি শব্দে পুরুষদের হর্ষধ্বনি আর রমণীদের রোদন চাপা পড়ে যেতে থাকে। মৃত্যুসংবাদ শোনা যায় না। ভেরি বাজাতে বাজাতে ভেরিবাদক এগিয়ে যায়।  শঙ্খবাদক তার আগে পা বাড়ায়। দুই এর মধ্যিখানে থাকে ঘোষক। দশ পণ মুদ্রার পেটিকাটি পড়ে থাকে রাজপথে।  

তখন কোনো এক গৃহে এক প্রাচীনা জিজ্ঞেস করছিল পুত্রবধূকে, কী বলে গেল?

মা তুমি শোনোনি? 

বৃদ্ধা বলল, বধির হয়ে গেছি, মহাকাল দিয়েছিলেন শ্রবণ শক্তি, তিনিই নিয়েছেন তা, কী বলে গেল আমার কানে কানে বলে দে।

বধূটি নিঃশব্দে কাঁদল, তুমি কত ভাগ্যবতী মা। 

কারা এসেছিল, কে এসেছিল বলে দে, মহাকাল দিয়েছিলেন দৃষ্টি, তিনি তা ফিরিয়ে নিয়েছেন, কানে কানে বলে দে।

বধূটি দু-হাতে মুখ চাপল, মহাকাল তোমার প্রতি সদয়, তুমি কত কত পুণ্যবতী মা, মানুষ  জীবন্ত পুড়বে, দেখতে হবে না। 

কানে মুখ নিয়ে আয়, বলে দে শেষবারের মতো, মরণ এসে গেল প্রায়, ক’দিনই বা বাঁচব আর, শুনে নিই কী হলো অবন্তীদেশে। 

বিষণ্ণ বধূটি মুখ নামিয়ে আছে, মনে মনে বলছে, তুমি সৌভাগ্যবতী, তোমার স্বামী মানুষের জীয়ন্ত  দাহনে আনন্দ করবে না, তুমি এসব না জেনেই দু চোখ বুজবে মা, শোনো মা শোনো...। 

বধূ তার শাশুড়ির কানে মুখ নিয়ে এল, কাঁদতে কাঁদতে ভেজা গলায় বলতে লাগল, উজ্জয়িনীতে বসন্ত এল না এবার। 

...কে এলনা?

...ঋতুরাজ বসন্ত, এল মরণের দূত।

....কী বলিস?

....বসন্ত নেই মরণ আছে বসন্ত দিনে।

বৃদ্ধা হাসল, তাতে হলো কী?

...মাগো শোনো, এই বসন্তে আনন্দ নেই।

...কে আনন্দ?

....বসন্তে মরণের ডাক এল গৃহদ্বারে। 

...কী হলো তাতে, কী হলো রে মেয়ে কী হলো? বৃদ্ধা বিড়বিড় করে, তোর স্বামী কই, পুরুষটা, তার কি মরণ হলো রে? 

বধূ কেঁদে ওঠে, মা তুমি কী বলো মা, সে তো তোমারই সন্তান। 

বৃদ্ধা বিড়বিড় করছিল, মহাকাল যা যা দিয়েছিলেন, সব নিয়ে নিলেন, কে পুত্র, জামাতা, কে কন্যা, কে বধূ, মরণই বা কে, বসন্তই বা কে, কিছুই মনে থাকে না যে, হায় মহাকাল! নিলেই যদি সব, দিয়েছিলে কেন? 

চলবে

 

ধ্রুবপুত্র (পর্ব এক)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দুই)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তিন)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পাঁচ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাত)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আট)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব নয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব এগার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চৌদ্দ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পনের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ষোল)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সতের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আঠারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব উনিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব কুড়ি)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব একুশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বাইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তেইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পঁচিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছাব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাতাশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আটাশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব উনত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব একত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তেত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চৌত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পঁয়ত্রিশ)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top