সিডনী রবিবার, ৯ই মে ২০২১, ২৫শে বৈশাখ ১৪২৮

ঝর্নাধারার সংগীত (শেষ পর্ব) : সেলিনা হোসেন


প্রকাশিত:
৭ এপ্রিল ২০২১ ১৪:৫৭

আপডেট:
৪ মে ২০২১ ১৩:২২

 

সবাই নিধুয়ার পিছে পিছে হাঁটতে শুরু করে। অনেকক্ষণ হাঁটার পরে যে ক্লান্তি ভাব এসেছিল ভাত খাওয়ার পরে সেটা কেটে গেছে। সবাই বেশ ফূর্তি নিয়ে হাঁটছে। ফুল-লতা-গাছগাছালিতে আনন্দের জোয়ার বইছে। সবাই অল্প সময়ে পৌঁছে যায় ঝর্ণার কাছে। খানিকদূর থেকেই দেখতে পেয়েছে জলপ্রপাতের নিরাভরণ দৃশ্য। শুনতে পেয়েছে প্রবল গতিতে ছুটে আসা জলের সঙ্গীতের মতো সুরের রেশ। বুক-উজাড় করা ভালোলাগা ওদেরকে আপ্লুত করে। ওরা গড়িয়ে পড়া জলের ধারে গিয়ে দাঁড়ায়। সবার আগে আসিফ জল গায়ে মেখে ভিজতে থাকে। চেঁচিয়ে বলে, শান্তি, শান্তি। শীতল হাওয়ার আনন্দ। কোথাও কোনো দুঃখ নেই। কে আসবি আয়।

ছেলেরা সবাই হুড়মুড়িয়ে নেমে যায়। মেয়েরা পাথরের উপর বসে পানিতে পা ডুবিয়ে রাখে। দুহাতে পানি উঠিয়ে মাথায় ঘষে। মুখে লাগায়। পানির সঙ্গে হাতের এমন নির্মল নির্যাসে মনে হয় যেন কাছের কোনো মানুষের সঙ্গে শরীরের সঙ্গসুখ। এভাবে দামতুয়া ঝর্ণায় নিজেদের ছোঁয়া প্রাণদীপ্ত করে মেয়েরা। ছেলেদের হৈ-হুল্লোড় দেখে ওদের দিকে পানি ছুঁড়ে মারে।

আসিফ বলে, তোরাও নাম। আয় হাত ধরি।

- না লাগবে না। আমরা নামব না। এভাবে ভিজতেও পারব না।

আশিকা সরে আসে পানির ধার থেকে। ঝর্ণার পানির ছিটায় ভিজে গেছে অনেকখানি। ও ভাবে বনের ভেতর ঘুরে এলে বাতাসে কাপড় শুকিয়ে যাবে। হরিণ আর কাঠবিড়ালির পেছনে ছোটাছুটি করলে দারুণ সময় কাটবে। পাশাপাশি যে গাছে ডালপালা বেশি সেসব গাছে উঠলে মন্দ হবে না। অন্যরকম মজা পাওয়া যাবে। মঞ্জুরি সেঁজুতি তখনো ঝর্ণার ধারে বসে আছে। ওদেরকে কিছু না বলে বনের ভেতর চলে যায় আশিকা।

গাছের ফাঁকে পায়ে হাঁটার পথ নেই। বোঝা যায় এসব পথে লোকের আনাগোনা তেমন নেই। যে যার মতো যেদিকে ইচ্ছা সেদিকে চলাফেরা করে। ওর মনে হয় ও নিজেও একটা নতুন পথের আবিষ্কারক হবে। খুশি মনে গুণগুনিয়ে গাইতে থাকে। ঘাড় বাঁকা করে চারদিকে তাকায়। দেখতে পায় বুনো শূকরছানা এদিক-ওদিক ঘুরছে। অসংখ্য পাখির কিচিরমিচির শব্দ ভরিয়ে দিয়েছে বন-প্রাঙ্গণ। মৃদুমন্দ বাতাসের শীতল স্পর্শ ওর গুণগুন গানের সুরে মিশে যায়। মুহূর্তে মনে হয় আমিতো একা নই। আমার ভুবন মিলনমেলায় মুখরিত। সামনে দিয়ে ছুটে যায় কাঠবিড়ালি। সরসরিয়ে গাছে উঠে যায়। নিচে দাঁড়িয়ে দেখে আশিকা। মাথার ওপর ঝরে পড়ে দুএকটা শুকনো পাতা। যেন বলছে, মনে রেখো আমাদের। তোমাকে দেখে মন ভরে গেছে। আশিকা শব্দ করে হেসে ওঠে, তোমরা আমার কাছে প্রিয়জন। তোমাদেরকে দেখে ভালোবাসার পরশ রেখে যাচ্ছি বন্ধুরা।

হঠাৎ করে দেখতে পায় পাহাড়ের সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে একটি হরিণ। আশিকা একছুটে দৌড়ে কাছে আসে। হরিণটি ভয় পায় না, নড়েও না। আশিকা ওর পাশে বসে গলা জড়িয়ে ধরলে ছটফটিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বনের অন্য দিকে চলে যায় হরিণটি। মন খারাপ হয় আশিকার।

- আমিতো তোর পায়ে দড়ি দিতে চাইনি রে। তুই চলে গেলি কেন?

ওর প্রশ্নের উত্তর দেয়ার কেউ নেই। বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ ওকে আচ্ছন্ন করে। ও বড় একটি গাছের নিচে বসে নিজের মগ্নতায় ডুবে যায়। বাবা-মায়ের কথা মনে হয়। তারা দুজনে তাঁদের কাজে গেছেন। ফেনে কথা হয়েছে দু’বার। ঠিকমতো পৌঁছেছে জেনে দুজনে খুশি হয়েছে। আদরের ভাষায় কথা বলেছে। ফিরে যাবার অপেক্ষায় থাকবে বলে জানিয়েছে। বাবা-মায়ের ভালোবাসায় ওর জীবন ছবির মতো। আশিকা খুশিতে আবার গুনগুনিয়ে ওঠে। গাছের কান্ডে মাথা ঠেকায়। তখন পেছন থেকে আরেফিন ওর মাথায় হাত রেখে পাশে বসে।

- তুমি? তুমি কীভাবে এলে?
- অনেকদূর থেকে তোমাকে ফলো করেছি। তবে ভিন্ন পথে এসেছি। কেউ টের পায়নি।
- কি বলছো এসব? কেন এসেছো?
- তোমাকে আমার ভালোলেগেছে আশিকা।
- বাজে কথা ছাড়ো। সর এখান থেকে।

আশিকা ওকে জোরে ধাক্কা দেয়। আকস্মিক ধাক্কায় টলে পড়লেও দ্রুত নিজেকে সামলে নেয় আরেফিন। সোজা  হয়ে বসে। আশিকা ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে।

আরেফিন বসে থেকেই ওর হাত চেপে ধরে।
- যেতে চাইলেই তুমি এখন যেতে পারবেনা।
আশিকা কষে একটা লাত্থি মারে।
- ছাড়, ছাড় বলছি।
- ছাড়ব বলেতো এখানে আসিনি। এমন অসাধারণ প্রকৃতির মাঝে এসে শারীরিক উপভোগ ছাড়া তো সৌন্দর্যের  সবটুকু আনন্দ পাবনা। বাড়াবাড়ি না করে এনজয় কর ঘুঘু।
- ওরে শয়তান। ঘুঘুগিরি দেখাচ্ছি
-আশিকা ছিটকে উঠতে গেলে আরেফিন দুহাত চেপে ধরে ওকে। ও এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়ালে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আরেফিন ওকে জড়িয়ে ধরে মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। শুরু হয় ধ্বস্তাধ্বস্তি। আশিকা চেঁচিয়ে বলে, সবকিছু এত সোজা ভাবিস না শুয়োরের বাচ্চা। আমি ছেড়ে দেয়ার বান্দা না।
- আমার সঙ্গে পারবি না। তোর চেয়ে আমার গায়ে জোর বেশি। দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।

আশিকার শরীরের উপর উঠে বসে আরেফিন। দুহাঁটুতে মুচড়ে দেয় ওকে। দুহাত চেপে ধরে রাখে মাটির সঙ্গে। নিজের মাথা ঠেকায় ওর মাথার সঙ্গে। আশিকা উঠে বসার চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। হাত আটকে থাকার জন্য আরেফিনকে ধাক্কাও দিতে পারে না। শরীরের সবটুকু শক্তি প্রয়োগ করে ঝাঁকুনি দিলে নড়ে ওঠে আরেফিন। তখন দুজনেই শুনতে পায় নিধুয়ার কন্ঠস্বর। ঘাড় কাত করলে দুজনেই দেখতে পায় কড়ই গাছের শুকনো ডাল হাতে নিয়ে ছুটে আসছে নিধুয়া। বনের পটভূমিতে ওকে একটা দৈত্যের মতো দেখাচ্ছে।

দূর থেকে চিৎকার করে বলে, ওই শয়তানের হাড্ডি আর আগাতে পারবি না। তোর মাথা ফাটিয়ে দেব।

আরেফিন ওকে দেখে থমকে যায়। ওর উগ্র মূর্তি দেখে বিপদের আশঙ্কায় মুষড়ে পড়ে। বুঝতে পারে পাহাড়ের বনরাজির সৌন্দর্যে শরীর উপভোগ আর হলো না। একলাফ দিয়ে উঠে বিপরিত দিকে দৌড়াতে থাকে। কিন্তু নিধুয়ার সঙ্গে পারবে কেন? ও বনের মানুষ। বন ওর পায়ের নিচের চেনা পথ শুধু মাত্র নয়, ওর জীবনযাপনের প্রতিদিন। ও দ্রুত পৌঁছে যায় আরেফিনের কাছে। হাতের লাঠি দিয়ে ওর মাথায় আঘাত করলে মুখ থুবড়ে পড়ে যায় পাহাড়ের কিনারে। তারপর আরও লাঠিপেটা করলে জ্ঞান হারায় আরেফিন। নিধুয়া ফিরে আশে আশিকার কাছে। ও উঠে দাঁড়িয়েছে। শরীরে আঘাত নেই বলে চলাচলে অসুবিধা নেই। কাপড় ঝেড়ে লতা সরিয়ে নিজেকে ফিটফাট করে ফেলে।

নিধুয়া কাছে এসে বলে, চলেন। লোকটাকে লাত্থি দিয়ে পাহাড়ের খাদে ফেলে শেষ করে দিতে পারতাম। দিলাম না। পুলিশ খুনের দায়ে আমাকে এ্যারেষ্ট করবে সেজন্য। শয়তান একটা। ওকে আপনার পিছে পিছে আসতে দেখে আমি বুঝে গিয়েছিলাম যে ওর মতলব খারাপ। আপনি ওকে ভালোই শায়েস্তা করেছেন। আমি দূর থেকে দেখেছি।

- তুমি আমার ভাই। তোমাকে থ্যাঙ্কু। তোমকে আমি একসময় ঢাকায় নিয়ে যাব। বাবা-মায়ের সঙ্গে তোমার পরিচয় হবে। মাকে বলব, মাগো তুমি দুটি ছেলে হারিয়েছ। আমার কোনো ভাই ছিল না। এখন আমি একটি ভাই পেয়েছি। আপন ভাইয়ের চেয়ে কম না। মাগো তুমি ওকে বুকে নাও। তোমার ছেলের মতো আদর কর।
- সত্যি দিদি, আমি মায়ের আদর পাব?
- হ্যাঁ, পাবে পাবে।
- তাহলে আজ থেকে আপনি আমার দিদি। আমি দিদি ডাকব।

নিধুয়া পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলে আশিকা ওর মাথায় হাত রাখে। দুজনে ঝর্ণার কাছাকাছি পৌঁছালে দেখতে পায় সবাই দল বেঁধে অন্যদিকে যাচ্ছে। আশিকা পেছন থেকে ওদেরকে ডাকে।

- আমরাতো তোকেই খুঁজতে যাচ্ছি।
- আমি এসে পড়েছি।
- কোথায় ছিলি? আরেফিন কই?

নিধুয়া দুপা এগিয়ে এসে বলে, ওকে মেরে মাথা ফাটিয়েছি। শেষ করিনি। দেখতে যাবেন?

- কি করেছে ও? মাথা ফাটালে কেন?
- দিদি বলবে। আমি গেলাম।

সবার সঙ্গে গোল হয়ে বসে ঘটনাটি বলে আশিকা। উত্তেজিত হয়ে ওঠে ছেলেরা। সুহাস চেঁচিয়ে বলে, ও এত খারাপ চিন্তা নিয়ে আমাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছে?

ইউনুসও চেঁচায়, এত নষ্ট ছেলে আমিতো ভাবতেই পারিনি।
- হয়েছে, আমাদের আর এসব নিয়ে আলোচনা না করাই ভালো। আমাদের পরিস্থিতি আমরা বুঝব। নিধুয়াতো একটা পর্যায় শেষ করে দিয়েছে।
- উচিত শাস্তি দিয়েছে।
মঞ্জুরি আর সেঁজুতি মৃদুস্বরে বলে, আমরা কি ওকে দেখতে যাব?
- মোটেই না। আমাদের এখান থেকে চলে যাওয়া উচিত। নইলে পুলিশের হাঙ্গামায় পড়ব।

সবাই উঠে পড়ে। হাঁটতে শুরু করে। কিছুদূর এগোলে দেখতে পায় গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে নিধুয়া। হাতের শুকনো লাঠিটা পায়ের কাছে রাখা। ওরা কাছে আসার আগেই হাঁটতে শুরু করে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে বলে, আপনাদেরকে ভিন্ন পথে নিয়ে যাব। যে পথে এসেছেন সে পথে যাব না।

- কেন অন্য পথে যাব কেন?
- নতুন জায়গা দেখবেন। নতুন পথে হাঁটা হবে। আপনারাতো ঘুরতে এসেছেন। ঘোরার আনন্দ পাবেন।
- আরেফিনের কি হবে?
- পাহাড়ি লোকজন তুলে নিয়ে যাবে। নয়তো থানায় খবর দেবে।
- তোমার বিপদ হবে না তো?
- সেসব আমি বুঝব। আপনাদের ভাবতে হবে না। ওকে আমি পিটিয়ে উচিত কাজ করেছি। আমরা পাহাড়িরা এমন অন্যায় কাজ করি না। আমরা প্রেমিকার সঙ্গেও এমন আচরণ করি না।

নিধুয়ার ক্রুদ্ধ চেহারা দেখতে পায় সবাই। আসিফ ওর কাঁধে হাত রেখে বলে, তোমরা অনেক ভালো মানুষ নিধুয়া ভাই।

- আপনারা চলেন। এই পথটা সরু। আশেপাশের ডালপালায়-কাঁটা ঝোপে কাপড় আটকে যেতে পারে। সাবধানে হাঁটবেন।

আবার শুরু হয় হাঁটা।

দেখা যায় বনমোরগ পথ থেকে বনে ঢুকে যাচ্ছে। কাঠবিড়ালি লাফিয়ে গাছে উঠে যাচ্ছে। বানরেরা গাছের ডালে লাফালাফি করছে। বুনো ফুলে রঙিন হয়ে আছে কোনো কোনো গাছ। পাখি উড়ে যাচ্ছে এক ঝোপ থেকে আর এক ঝোপে। কিচিরমিচির শব্দ সঙ্গীতের মতো মুখরিত। শুধু আশিকার চিন্তা-চেতনায় প্রবল ঝড়। এমন একটি বাজে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হবে এটা ওর স্বপ্নেরও অতীত ছিল। জীবন-জগতের খেরোখাতায় এ এক গভীর রহস্যের হিসেব। অনেকে বেশ সামনে এগিয়ে গেলে পিছিয়ে থাকে আশিকা।

ওর জন্য সামনে দাঁড়িয়ে থাকে আসিফ। সরু পথ বলে সবাই একসঙ্গে হাঁটতে পারে না। কেউ কেউ এগিয়ে গেছে, কেউ পিছিয়ে পড়েছে। হাঁটার সারি একরকম নয়। কেউ পথের ধারে দাঁড়িয়ে ফুল ছেঁড়ে। কেউ বুনো ফল মুখে পোরে। আয় আয় পাখি বলে সুর করে হাত তোলে। শুধু আশিকা অস্তগামী সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকে। আকাশজুড়ে লালের আভা নেই, কিন্তু রোদের তেজ কমে এসেছে। আশিকা বিড়বিড়িয়ে বলে, আমার আকাশে আমি একটি নতুন সূর্য চাই। সূর্য তুমি আমার জন্য নতুন করে উঠবে। আমি নতুন জীবন চাই।

কয়েক পা হেঁটে এগিয়ে গেলে আসিফ বলে কি হলো, এমন ঝিমিয়ে পড়লি কেন?
- ঘটনার কথা তো বলেছি তোদেরকে।
- ওটা একটি দুর্ঘটনা। নারী-পুরুষ সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটা কোনো ব্যাপার না। এমন দুর্ঘটনা হতেই পারে।
- তুই কি বলবি যে আমার ভাগ্য ভালো চূড়ান্ত কিছু হয়নি?
- এসব কথা আমি ওঠাতে চাইনা।
- চুপ করে থাকাটা শেষ কথা নয়। একজন পাহাড়ি মানুষ প্রতিশোধ নিয়েছে এই ঋণ শোধ হবার নয়।
- তা ঠিক। তবে এসব কথা আলোচনা না করা ভালো। বাবা-মাকেও বলবি না।
- বলব। বলতেই হবে। বাবা-মা আমার জীবনের সবচেয়ে কাছের মানুষ। তাদের কাছ থেকে কোনো কিছু আড়াল করতে চাইনা।
- ঠিক আছে করিস না। যাকে ভালোবাসবি তাকে?
- তাকেও আড়াল করব না। তার সঙ্গে আমার ভালোবাসার সততার জায়গা থাকবে। আমি কখনো তাকে ফাঁকি দেব না।

আশিকার কথা শেষ হতেই দূর থেকে মঞ্জুরি আর সেঁজুতি ডাকে।
- আশিকা পিছিয়ে পড়লি কেন?
- আসছি। তোরা যেতে থাক।
আসিফ ওর সামনে দাঁড়িয়ে দুদিকে দুহাত ছড়িয়ে দিয়ে বলে, আমরা এক হয়ে যাব। একসঙ্গে।
- এক হয়ে মানে?
- আমি তোমাকে ভালোবাসি আশিকা। এই অপরূপ প্রকৃতির মাঝে আমার জীবনে ভালোবাসার শব্দ উচ্চারিত হবে, এমন ভাবনা নিয়ে আমি এই দলে যুক্ত হয়েছি।

আসিফের কথা শুনে চমকে ওঠে আশিকা। চোখ বড় করে তাকালে দুচোখ জলে ভরে যায়।
আসিফ মৃদুস্বরে বলে, কেঁদো না।
- এতবড় একটা ঘটনার পরে এমন ভালোবাসা
- এটা তোমার জীবনে একটি দুর্ঘটনা। এই ঘটনার দায় আমারও পাহাড়ি-মেয়ে।
- তুমি এভাবে বলছ? আমি কি পাহাড়ি-মেয়ে? 
- বলবইতো। সমাজে তোমাকে হেয় চোখে দেখুক তা আমি হতে দেব না। যাকে ভালোবাসি তার দুর্ঘটনার দায় তো আমি নেবই। আমি ভীরু নই। এই মুহূর্তে তুমি আমার কাছে পাহাড়ি-মেয়ে।
- ওহ, আসিফ। আশিকা দুহাতে ওর হাত জড়িয়ে ধরে। আসিফ চারদিকে তাকিয়ে বলে, বনের পাখিরা আমাদের ভালোবাসা দেখো।
- কি রে তোরা আসছিস না কেন?

আসিফ ঘাড় ঘুরিয়ে বলে, আমরা উৎসবে আছি।
- উৎসব? বলিস কি?
- ভালোবাসার উৎসব।
- বলিস কি, এটাতো ভালোবাসার উৎসবের সময় না। এখনতো সময় হলো ধর্ষণের উৎসবের। পত্রিকার পাতায় প্রতিদিনের খবর দেখিস না।
- দেখি। দেখবনা কেন? ওই খবরের বিপরীতে ভালোবাসার উৎসব করে আমরা জীবনের বাজীতে জয়ী হবো। আমাদের যাত্রা শুভ হোক।
- আচ্ছা তোদের যাত্রপথে আমরা স্লোগান দিচ্ছি- চলো চলো মেলায় যাই। কিসের মেলা? মিলনমেলা।

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই গান দিতে শুরু করলে আসিফ আর আশিকা হাত ধরে এগিয়ে যায়। মঞ্জুরি আর সেঁজুতি দুহাতের মুঠিতে ধরে রাখা বুনোফুল ছড়িয়ে দেয় ওদের উপর।
- এবারের ভ্রমণ একদম অন্যরকম হলো। আমরা সাবই খুশি। আয় আবার স্লোগান দেই - নন্দিত হোক ভালোবাসার উৎসব - ওদের যাত্রা শুভ হোক।

বনের ভেতর থেকে ছুটে আসে নিধুয়া। হাতের মধ্যে ধরে রেখেছে কাঠাবিড়ালি। আশিকার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলে, দিদিকে ভালোবাসা দিনের উপহার। আর এই প্রজাপতি দাদার জন্য।

সুহাস হাসতে হাসতে বলে, বাহ বেশতো। দারুণ উপহার।
- ওর উপহারতো এমনই হবে। ও যে প্রকৃতির সন্তান।
আশিকার কথায় সবাই তালি দেয়। চেঁচিয়ে বলে, জয় নিধুয়ার জয়।
- ও একটি শয়তান ছেলেকে যে শাস্তি দিয়েছে আমরা অন্যায়কারীর এমন শাস্তি চাই।
আসিফের কথায় সবাই আবার চেঁচিয়ে ওঠে, ঠিক ঠিক। কঠিন শাস্তি না দিলে শয়তানগুলোকে শায়েস্তা করা যাবে না।
মঞ্জুরি-সেঁজুতিও সায় দিয়ে বলে, আসিফ আমাদের সামনে জীবন-নির্মাণের পথ দেখিয়েছে। জয় আসিফের, জয়।
বনের ভেতর কন্ঠস্বরের তরঙ্গ ওঠে। নিধুয়া হাত-পা ছড়িয়ে কোমর দুলিয়ে নাচে। ওর নৃত্যের ভঙ্গিতে মুগ্ধ সবাই ওর সঙ্গে তাল মেলায়।
আশিকা বলে, আমাদের বসন্ত দিনের ফুল আর ফুটবে না। এখন দেখছি পাহাড়জুড়ে বসস্ত দিনের ফুল ফুটেছে।
- চলো, আমরা নাচে-গানে পাহাড়কে ভরিয়ে দিয়ে সমতলে যাব।
আশিকার হাত ধরে আসিফ এগিয়ে যায়।
আশিকা সবার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, বসন্তের ফুল ফুটেছে আকাশে-বাতাসে-বনে-পাহাড়ে। এই ফুল আমাদের বেঁচে থাকার স্বপ্নফুল।
সুহাস গানের ঢঙে বলে, বসন্তের স্বপ্নফুল নিয়ে আমরা হেঁটে যাব হাজার হাজার মাইলের পথ। চলো আমরা সবাই বুনো ফুলের বোঁটা ছিঁড়ে মাথায় রাখি।

আশেপাশের গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে সবাই নিজেদের কানে-চুলে গাঁথে।

সরু পথে সারি করে যেতে থাকে ওরা। সবার আগে নিধুয়া নেচে নেচে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে সামনে দাঁড়িয়ে হাত তুলে হাসে। আবার হাঁটে।

আশিকা বুঝে যায় এক বিপুল অভিজ্ঞতার বাঁক বদলে জীবনের নতুন পথের যাত্রা শুরু হলো। দেখতে পায় লাল আভা বিচ্ছুরিত করছে আকাশ। ওর বুকের ভেতরে ভালোবাসার লাল আভায় নতুন সুর্য উদিত হয়েছে। ওর সামনে দিগন্তরেখা জুড়ে ফুটে আছে ভালোবাসার বসন্ত দিনের ফুল।

 

ঝর্ণাধারার সঙ্গীত (প্রথম পর্ব)
ঝর্ণাধারার সঙ্গীত (দ্বিতীয় পর্ব)
ঝর্ণাধারার সঙ্গীত (তৃতীয় পর্ব)
ঝর্ণাধারার সঙ্গীত (চতুর্থ পর্ব)
ঝর্ণাধারার সঙ্গীত (পঞ্চম পর্ব)
ঝর্ণাধারার সঙ্গীত (ষষ্ঠ পর্ব)
ঝর্ণাধারার সঙ্গীত (সপ্তম পর্ব)
ঝর্ণাধারার সঙ্গীত (অষ্টম পর্ব)
ঝর্ণাধারার সঙ্গীত ( নবম পর্ব)
র্ঝনাধারার সংগীত (দশম র্পব )
র্ঝনাধারার সংগীত (পর্ব এগার)
র্ঝনাধারার সংগীত (র্পব বার)

 



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top