বিভিন্ন দেশে ভিন্ন রকম ঈদ উদযাপন : এস ডি সুব্রত
প্রকাশিত:
১৭ জুলাই ২০২১ ২৩:১১
আপডেট:
৪ এপ্রিল ২০২৫ ০৩:৪৯

কোরবানি হচ্ছে মুসলিম উম্মাহর পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নত। সারা বিশ্বজুড়ে সামর্থবান মুসলমানগণ ঈদের নামাজের পরপরই কোরবানি দিয়ে থাকে। কোরবানি মানে উৎসর্গ। আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য উৎসর্গ করার নামই কোরবানি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ঈদ উদযাপনে রয়েছে বৈচিত্র্যতা। পৃথিবীর নানা দেশে নানা ভাবে ঈদুল আজহা উদযাপন করতেন দেখা যায়।
সৌদি আরবে ঈদঃ
সারাবিশ্বের মুসলমানদের কাছে মর্যাদাপূর্ণ দেশ সৌদি আরবে একইদিনে পালিত হয় ঈদ, হজ্জ ও কোরবানি। সৌদি জনগণ এবং বিভিন্ন দেশ থেকে আসা লোকজন একসাথে ঈদ উদযাপন করে। ঈদের নামাজ শেষে সকল মুসল্লি মুস্তাহালকা নামক স্থানে গিয়ে কোরবানি করে। আবার কেউ কেউ তার যার এলাকায় কোরবানি দেয়। সৌদি তে সাধারণত উট দুম্বা কোরবানি দেয়া হয়। কোরবানি থেকে কিছু মাংস নিয়ে বাড়িতে রান্না করে খেয়ে প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনদের সাথে দেখা করতে যায়। অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা ঈদ উদযাপনের জন্য তাবু স্থাপন করে এবং সেখানে দস্তরখানা বিছিয়ে সবাই একসাথে ভোজন করে।
মালয়েশিয়ায় ও ইন্দোনেশিয়ায় ঈদঃ
মালয়েশিয়ায় ও ইন্দোনেশিয়ায় সামাজিক ভাবে কোরবানি আদায় করা হয়। ইন্দোনেশিয়ায় অর্থনৈতিক ভাবে সক্ষম ব্যক্তিরা হাট থেকে কোরবানির পশু কিনে মসজিদে দিয়ে আসেন। সবাই মিলে কোরবানির পর মসজিদ এলাকায় সকল ঘর হিসাব করে গোশত ভাগ করে প্যাকেট করে পাঠিয়ে দেয়া হয় হয় প্রত্যেকের ঘরে। আবার অনেক বিত্তবানরা গোশত না নিয়ে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দেয়। মালয়েশিয়ায় স্থানীয় মসজিদে কোরবানি করে গোশত বন্টন করায় মসজিদ এলাকার প্রতি ঘরে ঘরে।
আরব আমিরাতে, কুয়েতে ঈদঃ
আরব আমিরাত, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার এসব দেশে বর্তমানে কোরবানির আধুনিক পদ্ধতি চালু আছে। কেউ ভিডিও কলে আবার কেউ সরাসরি হাটে গিয়ে পশু ক্রয় করে। একে অপরকে সালামি দেয়। ভিনদেশী অসহায়দেরকেও সালামি দেয় তারা। প্রতিবেশীদের মাংস বিতরন করে এবং আত্মীয় স্বজনদের দাওয়াত করেন। ঈদের দিনে ভোরে সূর্যোদয়ের পর নামাজ আদায় করে। মিশরে ঈদের দিন ঘরবাড়ি নতুন করে সাজায়। গ্রাম ও মরু অঞ্চল থেকে পশু আনা হয়। ঈদে লাখো মুসল্লি একসাথে নামাজ পড়ে। নামাজ শেষে শিশুদের ঈদ সালামি ও উপহার দেয়। কোরবানি শেষে সবাই একসাথে খাবার খায় এবং আত্মীয়দের বাসায় ঘুরতে যায়।
পাকিস্তানে ঈদঃ
পাকিস্তানে সাধারণত উট দুম্বা কোরবানি দেওয়া হয়। সেখানে চারদিনব্যাপী ঈদুল আজহা পালিত হয়। ঈদের দিন সকাল সালাত আদায় করে কোরবানি করা হয় এবং কোরবানির মাংস আত্মীয় স্বজন ও গরীবদের মধ্যে বিলিয়ে দেয়া হয়।
মরোক্কোতে ঈদঃ
মরোক্কোতে ঈদের দিন জামাত শেষে প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনদের বাসায় যায় শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। তারপর কোরবানি দেয়।তারা ঈদের প্রথম দিন গোশত ভুনা করে খায়, দ্বিতীয় দিনে পশুর মাথা সিদ্ধ করে এবং ভেজে খায়। তৃতীয় দিন মাংস দিয়ে নানা পদ রান্না করে খায়।
যুক্তরাজ্যে এবং যুক্তরাষ্ট্রে ঈদঃ
মুসলিম প্রধান দেশের পাশাপাশি বিভিন্ন অমুসলিম দেশেও কোরবানির হার বেড়েছে এবং নানা বৈচিত্র্য নিয়ে ঈদুল আজহা পালিত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে ক্রমান্বয়ে মুসলিম সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রতি মসজিদে কয়েকটি করে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ইদানিং লন্ডনে খোলা পার্কে ঈদের জামাত হচ্ছে। ঈদের জামূ শেষে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কোরবানি করেন সেখানকার মুসলমানরা। নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে কোরবানির অর্ডার নেয়ার জন্য এক মাস আগে দোকানে সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেন। যারা কোরবানি দিবেন তারা সেখানে নাম লিখিয়ে কোরবানির পশুর দাম পরিশোধ করে আসে। এসব প্রত্যেক দেশে নির্দিষ্ট জায়গায় কোরবানি করে। ইফোর্ডের ভ্যালেন্টাইন পার্কে এবং খোলা আকাশের নিচে কোরবানি করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রেও ইদানিং কোরবানিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়েছে। সেখানে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে খোলা মাঠে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সবচেয়ে বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয় জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে। ঈদের জামাতের পর পর কোরবানি অনুষ্ঠিত হয়। যুক্তরাষ্ট্রে মুসলমানরা গ্রোসারি অথবা পশুর খামারে কোরবানি করেন। গ্রোসারিতে কোরবানি করলে সেখানে নাম ঠিকানা ও টাকা দিয়ে আসলে তারা গোশত প্যাকেট করে রেখে দেন। কেউ কেউ খোলা মাঠে কোরবানি দেয়ার জন্য পশুর খামারে চলে যায়।
রাশিয়াতে ও চীনে ঈদঃ
রাশিয়ার বেশিরভাগ মুসলিম বাস করে মস্কোতে। সেখানে এখন খোলা মাঠে জামাত অনুষ্ঠিত হয়। কোরবানির জন্য নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে পূর্বেই বুকিং দিতে হয় । সেখানে নগরের বাইরে নির্দিষ্ট স্থান বা খামারে কোরবানি দেয়া হয়। চীনে ঈদ উপলক্ষে বাসাবাড়ি পরিস্কার করা হয়। ঈদের জামাত শেষে বাড়িতে বাড়িতে উট, ভেড়া, গরু কোরবানি দেয় চীনের মুসলমানরা । চীনে সাধারণত কোরবানির গোশত তিনভাগে ভাগ করা হয়। একভাগ নিজেরা রেখে বাকি দুই ভাগ আত্মীয় ও গরীবদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়।
সিঙ্গাপুরে ঈদঃ
সিঙ্গাপুরে মুসলমানদের জন্য আলাদা এলাকা রয়েছে। সেখানে কোরবানির প্রায় তিন মাস আগে নিকটবর্তী মসজিদে কোরবানির পশুর জন্য দরখাস্ত করতে হয়। সরকার অষ্ট্রেলিয়া থেকে পশু এনে মসজিদে দিয়ে দেয়। কোরবানিদাতারা মসজিদের কাছে কোরবানি দেয়। নিজেরা কিছু অংশ নিয়ে বাকিটা মসজিদে রেখে আসে। মসজিদ থেকে গোশত গরীব ও অন্যান্যদের মধ্যে বন্টন করা হয়।
জার্মানিতে ঈদঃ
জার্মানিতে বসবাসরত মুসলমানরা বেশীরভাগ থাকেন বার্লিন, কোলন, ফ্রাংক এলাকায়। সেখানে কোন বাড়িতে কোরবানির সুযোগ নেই। কোরবানির জন্য বিশেষ জায়গা থেকে অর্ডার নিতে হয়।
পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম প্রধান ও অন্যান্য দেশে কোরবানির পদ্ধতি ভিন্ন রকম হলেও এর মূল উদ্দেশ্য এক। আর সেটা হচ্ছে আত্মত্যাগ। ভেতরের পশুত্বকে দমন করে আল্লাহর নৈকট্য লাভই
সবার উদ্দেশ্যে।
এস ডি সুব্রত
কবি ও প্রাবন্ধিক, সুনামগঞ্জ
বিষয়: এস ডি সুব্রত
আপনার মূল্যবান মতামত দিন: