সিডনী রবিবার, ৯ই মে ২০২১, ২৫শে বৈশাখ ১৪২৮

ধ্রুবপুত্র (পর্ব চল্লিশ) : অমর মিত্র


প্রকাশিত:
৩ মে ২০২১ ১৪:১৯

আপডেট:
৯ মে ২০২১ ০৩:৫৪

ছবিঃ অমর মিত্র

 

অবন্তীর বণিক শ্রেষ্ঠ, ধনপতি সুভগ দত্ত যাবেন বাণিজ্যে। নগরে এই রব উঠেছে। সুভগ দত্ত শেষ বার কবে সার্থবাহ নিয়ে দূর দেশে গিয়েছিলেন তা মনে করতে পারে না উজ্জয়িনীর মানুষ। দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টিই যেন বিস্মরণের কারণ।

সুভগ দত্ত যাবেন দূর উত্তর-পশ্চিমে হিন্দুকুশ পবর্তমালার কোলে বাহ্লিক দেশে। বাহ্লিক দেশ পুরুষপুরুষ গান্ধার পেরিয়ে ওইদিকে, নাকি মদ্র দেশের পঞ্চনদ ও সিন্ধুনদের মধ্যবর্তী কোনো জায়গায় তা নিয়ে সংশয় আছে সুভগ দত্তর। নানাজনে নানা কথা বলে। এই নগরে এমন কেউ নেই যে ওই দেশে গেছে, ওই দেশের খবর রাখে। সান্দীপনি আশ্রমের আচার্য বৃষভানু নিরুদ্দেশে গেছেন, যদিও তিনি আকাশের খবর রাখতেন, আকাশের খবর যে রাখে সে কি মাটির খবর বলতে পারে না? বাহ্লিক দেশটি কোথায় তা হয়ত আচার্য জানতেন। বৃষভানুর নিরুদ্দেশ সংবাদ উজ্জয়িনী নগরকে সচকিত করে তুলেছে। আকাশ যাঁর কাছে ছিল হাতের তালুর মতো, সর্বজ্ঞান ছিল যাঁর অধীগত, তিনি যদি নগর ছেড়ে চলে যান, তো অন্ধকার আরো ব্যপ্ত হবে। অজ্ঞানতার যুগই হয়ত শুরু হয়ে গেছে। উজ্জয়িনীর গৌরব যেন অস্তমিত। এই নগরে আর মেঘ আসবে না। চিরদিন বয়ে যাবে অনাবৃষ্টির শুকনো হাওয়া। বণিক শ্রেষ্ঠ বহুদিন বাণিজ্যে যাননি, এখন যাচ্ছেন, তিনি কি চিরকালের মতো চলে যাচ্ছেন উজ্জয়িনীর সমস্ত সম্পদ, ঐশ্বর্য নিয়ে। অবন্তী দেশ ঐশ্বর্যহীন হয়ে পড়ে থাকবে পোড়া আকাশ মাথায় নিয়ে। 

সুভগ দত্ত বললেন, আমার বহুদিনের সাধ বাহ্লিক দেশের পীতবর্ণের রেশম নিয়ে আসি এই দেশে,  বয়স ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে মহারাজ, এরপর আর হয়ত সম্ভব হবে না, ইচ্ছেই মরে যাবে। 

রাজার কানে গিয়েছিল বণিকের বাণিজ্যে যাওয়ার খবর। রাজা ডেকে পাঠিয়েছিলেন ধনপতি সুভগ দত্তকে। সুভগ দত্ত বলছেন, কবে তিনি শুনেছিলেন ওই দেশের বিবরণ, যবন গ্রিক বণিকের কাছে। সে ছিল এক আশ্চর্য কথা। হিন্দুকুশ পর্বতমালার কোলে ওই দেশে মহাবীর আলেকজান্ডার তাঁর অধিকার বিস্তৃত করেছিলেন। এর ফলে ওই দেশে থেকে যান গ্রিসদেশের অনেক মানুষ। বাহ্লিক গ্রিস দেশই বটে, কিন্তু তা গ্রিক নারী পুরুষের আদিভূমি নয়। সে দেশ বহুদূরে, সাগর পেরিয়ে, দ্রাক্ষাকুঞ্জে ভরা। এসবও তাঁর শোনা। বণিকরা সব জানে। তারাই সব খবর আনে। ধনপতি সুভগ দত্ত বললেন, তাঁকে এসব কথা আরো একজন বলেছিল, সে হলো ধ্রুবপুত্র। 

চমকে উঠলেন রাজা ভর্তৃহরি, কে ধ্রুবপুত্র ?

আমার সখাপুত্র।

সে কোথায়? 

নেই এ নগরে, সে ছিল বিদ্বান, জ্ঞানী। বলতে বলতে মাথা নিচু করলেন সুভগ দত্ত। তাঁর গলা ভার হয়ে যাচ্ছিল। উতঙ্কর মৃত্যুর পর নিজেকে গৃহে লুকিয়ে রেখেছিলেন। বেরিয়েছেন মাসাধিক কাল পরে। বাণিজ্যে যাবেন। দূর বাহ্লিক দেশে যাবেন। রাজার মনে পড়ে যাচ্ছিল তাম্ৰধ্বজের কথা। তার মুখেই তো ধ্রুবপুত্রের কথা শুনেছেন তিনি, বললেন, সে কি আপনার আশ্রিত ছিল? 

সত্য মহারাজ।

তাকে আমি কি কখনো দেখেছি?

সুভগ দত্ত বললেন, সে যদি নিজে এসে থাকে আমি জানি না, আমি তো সঙ্গে করে নিয়ে আসিনি।

সে কি সুন্দর ছিল?

সুভগ দত্ত নিশ্চুপ। একটু সময় নিয়ে বললেন, পূর্ণ যৌবন ছিল তার, যৌবন তো সুন্দর, আর সে ছিল জ্ঞানী, জ্ঞানও তো সুন্দর। 

এমন মানুষ তো উজ্জয়িনীর গৌরব হতে পারত।

সুভগ দত্ত চুপ করে থাকলেন। কী জবাব দেবেন? তবে কিনা সমস্ত কিছু জেনেও, পিতার বয়স্য, ধনপতি সুভগ দত্ত যে প্রধান গণিকা দেবদত্তার অনুরাগী, তা জেনেও সে কিনা ওই নারীর প্রেমে পড়ে! অকৃতজ্ঞ তো নিশ্চয়ই। তাকে তো প্রতিপালনই করেছিলেন তিনি। গম্ভীরায় পড়ে থাকলে সে বড়জোর রাজার কর্মচারী, গ্রামরক্ষী, সৈনিক এই রকম কোনো পদের অধিকারী হতো। সাধারণ সৈনিক হলে শিবনাথের পুত্র কার্তিকুমারের মতো হারিয়েই যেত। সুভগ দত্তর মনটি আবার বিতৃষ্ণায় ভরে উঠল। 

রাজা বললেন, ধ্রুবপুত্র থাকলে আপনার সমস্ত জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে পারত। 

সুভগ দত্ত কোনো কথা বললেন না। হয়ত রাজার কথা সত্য। আবার সত্য না হতেও তো পারত। ধ্রুবপুত্রর জন্যই  উজ্জয়িনীতে এমন কিছু ঘটনা ঘটে গেল তা অভিপ্রেত ছিল না। ধ্রুবপুত্রর জন্যই গণিকা দেবদত্তা তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এখন যে গণিকা বলে সে রাজঅনুরাগিনী, সব অসত্য। আসলে সে ধ্রুবপুত্রের অপেক্ষাতেই আছে। ধনপতি সুভগ দত্তকে নিবৃত্ত করার জন্য রাজঅনুরাগিনীর ভান করে থাকে দেবদত্তা। এ তাঁর বেঁচে থাকার কূট কৌশল। সুভগ দত্ত তা টের পেয়ে গেছেন। কিন্তু গণিকা যদি  সত্যিই রাজার অনুরাগিনী হতো, রাজা কি মহাকাল মন্দিরকে গোপনে অপবিত্র করে আসতেন?  মহাকাল দেবতার নাম নিয়ে উপগত হতেন নিরীহ দেবদাসীতে? এই ঘটনা ঘটেছে শুধু গণিকা রাজাকে তার প্রতি মোহমুগ্ধ করে তুলতে না পারার জন্য। এই কাজ তারই ছিল। হয়নি ধ্রুবপুত্রের জন্য। ধ্রুবপুত্র যদি  দেবদত্তাকে মোহাবিষ্টা না করত, তা হলে দেবদত্তার প্রতি তিনি নিজেও তাঁর অধিকার প্রয়োগ করতে পারতেন। তা যদি হতো রাজার অনুজ, সেনাপতি বিক্রমের সঙ্গে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে হত না তাঁকে। শূদ্রপল্লী দাহন এবং উতঙ্কের মৃত্যুও ঘটাতে হত না। সমস্ত কিছুর মূলেই গণিকার প্রত্যাখ্যান। তার মূলে ধ্রুবপুত্রের অদৃশ্য প্রভাব, অদৃশ্য উপস্থিতি। এখন সেই ভয়ানক মৃত্যু দর্শনের পর ধনপতি সুভগ দত্তর আর মনে পড়ে না দেবদত্তার মুখ। কোনো নারীই তাঁর এই শোককে নিবারণ করতে পারবে না। পৃথিবীর কোনো নারী, স্বর্গের অপ্সরা, কেউই না। কোনো হীরকখণ্ড, মণিমুক্তোর বদলে তিনি এই শোক থেকে মুক্ত হতে পারবেন না। উতঙ্ককে তিনি নিজহাতে তৈরি করেছিলেন। গড়েছিলেন। নিজের নিষ্ঠুরতা সঞ্চারিত করেছিলেন ওই পাহাড়িয়া প্রাণীটির ভিতরে। শিশু উতঙ্ককে মাতৃকোল থেকে কেড়ে এনেছিলেন তিনি। এখনো তার মরণ কান্না তাঁর কানে ভাসছে। এ সমস্তই হয়েছে দেবদত্তার জন্য। নারীর প্রতি অধিকার স্থাপন করতে সুভগ দত্ত নিজের জীবনকে করে তুলেছেন বিষাদাচ্ছন্ন। ধ্রুবপুত্রই সেই বিষাদের অদৃশ্য কারণ। 

রাজা বললেন, নগর পুড়ছে, মেঘ আর বৃষ্টির চিহ্ন নেই কত কাল, বিপদের দিনে এই নগর ছেড়ে চলে যাবেন ধনপতি, না গেলে হত না? 

মাথা নাড়লেন সুভগ দত্ত। তাঁকে যেতে হবে। যাওয়ার আয়োজনও হয়ে গেল প্রায়। তিনি কত কাল আগে উত্তরদেশে, হিমালয়ে গিয়েছিলেন, নিয়ে এসেছিলেন উতঙ্ককে। তারপর গেছেন পুব দিকে, পাটুলিপুত্তুর পর্যন্ত, দক্ষিণ পশ্চিমে বারুগাজা, সোপারা বন্দরে তো যাওয়া আসা ছিলই, দশার্ণ গেছেন, বৎস্য দেশ গেছেন, কিন্তু উত্তর-পশ্চিমে যাননি, সিন্ধু পার হয়ে পুরুষপুর, গান্ধার, বাকি দেশ... পীতবর্ণের রেশমের দেশ। তিনি তাঁর মনোবাসনার কথা ব্যক্ত করার পর উজ্জয়িনীর ছোট বড় বণিকের দল তাঁর সঙ্গী হবে বলে জানিয়েছে। তারা নেবে উজ্জয়িনী, অবন্তীদেশের পণ্যসামগ্রী, সূক্ষ্ম মসলিন, মিহি ও মোটা কাপাসবস্ত্র, সেই বস্ত্র রঙীন আর শাদা, দুই রকমেরই। তারা নেবে মণিমাণিক্য, ময়ূর, কবুতর থেকে আরো নানারকম পাখি, ইক্ষু, চন্দন এইসব। যাত্রার সময়ও ঘনিয়ে এল প্রায়, এখন রাজা আর কীভাবে নিবৃত্ত করবেন তাঁকে? এই নগরে গভীর রাত্রে ধনপতি সুভগ দত্ত শুনতে পান উতঙ্কের মরণকান্না। আরো গভীর রাত্রে উতঙ্ক এসে দাঁড়ায় তাঁর সামনে। এই নগরের বাতাসে এখন মানুষের মাংস পোড়ার গন্ধ পান সুভগ দত্ত। এই নগরে এখন আর শান্তির আশ্রয় নেই। এই নগরে আর নেই সেই প্রাচীন সৌরভ, স্নিগ্ধতা। চতুর্দিকে দাহনের চিহ্ন। 

রাজা বললেন, বাণিজ্যযাত্রার সময় তো নয় এখন।

জানি।

যদি পথের ভিতরে বর্ষা নেমে আসে, আপনাকে ফিরে আসতে হবে।

জানি।

তবে এখন যাচ্ছেন কেন ? 

সুভগ দত্ত বললেন, মহারাজ আমি পীড়িত, আমি গত একটি মাস প্রায় নিদ্রাহীন রাত পার করেছি, আমাকে এখন বেরোতে হবে এই নগর ছেড়ে। 

রাজা বললেন, তা কি আপনার সেই পাহাড়িয়া ভৃত্যের মৃত্যুর কারণে?

সুভগ দত্ত বললেন, আপনার কাছে তো কোনো কিছুই অজ্ঞাত থাকার কথা নয়।

অজ্ঞাত তো ছিলই সব, কেন তার মৃত্যুদণ্ড হলো জানি না তো।

শূদ্রপল্লীর আগুনের কথা কি মহারাজ শোনেননি?

দেখেছিলাম সেই রাত্রে, অনাবৃষ্টির কালে এমন তো হয়ে থাকে।

সেই আগুন দিয়েছিল উতঙ্ক নিজে।

কেন?

জানি না মহারাজ। 

শ্ৰেষ্ঠীর দাস মৃত্যু দণ্ডাজ্ঞা পেল, শ্রেষ্ঠী তাকে মুক্ত করতে চাননি কেন, সেনাধ্যক্ষ না করলে রাজা তো তাকে ক্ষমা করে দিতেনই। 

চুপ করে আছেন ধনপতি সুভগ দত্ত। রাজা তাঁর কথার জবাব না পেয়ে আবার বললেন, এই বিচারের কিছুই আমি জানি না। 

সুভগ দত্ত বললেন, যা হওয়ার হয়ে গেছে মহারাজ, উতঙ্ক তো আর জীবিত ফিরবে না, সুতরাং আমাকে যেতেই হবে বাণিজ্যে। 

রাজা বললেন, এত দ্রুত বিচারের কাজ শেষ হলো, মৃত্যুদণ্ড হলো, তাকে  আগুনে

পুড়িয়ে মারা হলো, রাজা কিছুই জানলেন না, কেন এমন হলো? 

সুভগ দত্ত চুপ করে থাকলেন। বিচার তিনি করেননি, করেছেন সেনাধ্যক্ষ বিক্রম। বিচার সেনাধ্যক্ষ করতেই পারেন। সেই অধিকার তাঁর আছে। কিন্তু বিষয়টা তো রাজা আর সেনাধ্যক্ষর ভিতরে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। বিচার এবং মৃত্যুদণ্ডর কথা রাজার অজ্ঞাতে কেন করা হলো তা রাজা জিজ্ঞাসা করবেন সেনাধ্যক্ষকে। শ্রেষ্ঠীকে কেন? তিনি তো রাজ্য শাসন করেন না। রাজা তাঁকে কোনো ভারই তো দেননি। দেওয়ার কথাও নয়। রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগ করেন রাজা, সেনাধ্যক্ষ  থেকে উদ্ধবনারায়ণ পর্যন্ত। শ্রেষ্ঠীর সমস্ত ক্ষমতা তাঁর ধন সম্পদে। সেই সম্পদেই তিনি শাসনক্ষমতার একটু একটু অংশ ক্রয় করে থাকেন। উদ্ধবনারায়ণ ওই লোভেই তো তাঁর পদলেহন করে থাকে। সেনাধ্যক্ষ সিংহাসনের অধিকার নিতে তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করে অন্যভাষায়। আর ধন সম্পদের জোরেই না তিনি প্রধান গণিকার সাহচর্য ক্রয় করতে চান। কিন্তু বিচারের কথা তাঁকে জিজ্ঞেস করবেন কেন রাজা? তাঁরই অনুগত, পালিত, পোষা মানুষটিই তো মারা গেছে। তিনিই তো শোকার্ত। 

রাজা বললেন, ঘটনায় আমি বিস্মিত হয়েছি, ঘটনাটা আমার ভালো  লাগেনি। 

চুপ করে আছেন সুভগ দত্ত। তাঁর অস্পষ্টভাবে মনে হচ্ছে রাজা হয়ত কিছু জানেন। শূদ্রপল্লীতে আগুন লাগা, উতঙ্কের মৃত্যুদণ্ড যে রাজার বিপক্ষেই এক ষড়যন্ত্রের অংশমাত্র, তা হয়ত রাজা টের পেয়ে গেছেন। ভাবতেই সুভগ দত্ত ঘামতে লাগলেন। যে দাসী তাঁকে হাওয়া করছিল তালপত্রের পাখাটি দিয়ে সেও যেন বুঝতে পেরে হাওয়ার বেগ বাড়িয়ে দিল।

রাজা বললেন, নগরের উপান্তে শূদ্রপল্লী বিনা কারণে, অহেতুক পুড়িয়ে দেওয়া হবে, আর তারপরই অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড হয়ে যাবে দ্রুত, এসবের কিছু জানবেন না রাজা, তা কেন হবে?

সুভগ দত্ত মাথা নিচু করলেন। তিনি যেন বুঝতে পারছিলেন রাজা সব জেনে নিয়েই তাঁকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তাঁর বাণিজ্য যাত্রায় রাজার কোনো কৌতূহল নেই, কিন্তু উতঙ্কের মৃত্যুদণ্ড রাজাকে সন্দিগ্ধ করে তুলেছে। সেনাধ্যক্ষর গুণগান করছে নগরের  মানুষ, তার সঙ্গে শ্রেষ্ঠীরও সুনাম  করছে। সেনাধ্যক্ষ দ্রুত অপরাধীকে শনাক্ত করে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন, আর শ্রেষ্ঠী তাঁর অনুগত দাসটিকে রক্ষা করেননি যেহেতু সে ছিল অপরাধী। এই সব কথা নগর থেকে ভেসে আসায় রাজা ক্ষুণ্ণ হয়েছেন। রাজা বহু পুঁথি পাঠ করেছেন, রাজার অনুমান শক্তি প্রখর, তা যেন ঘ্রাণশক্তির মতো তীব্র। রাজা সন্দেহবশত সুভগ দত্তকে ডেকে জেরা করছেন। আর এও তো সত্য, রাজার অনুচর কি নগরে ছড়িয়ে নেই। রাজা হয়ত সব জেনে বসে আছেন। একটি মার্জার যে ভাবে মৃত প্রায় মুষিককে নিয়ে খেলা করে, রাজা কি তেমন ভাবে খেলছেন ধনপতি সুভগ দত্তকে নিয়ে? রাজার প্রতিরোধ কি গোপনে শুরু হয়ে গেছে? উজ্জয়িনীর সিংহাসন কি সহজে দিয়ে দেবেন রাজা ভর্তৃহরি? এসব মাথার ভিতরে খেলছিল। মনে মনে শঙ্কিত হচ্ছিলেন সুভগ দত্ত। তাঁর প্রভূত ধনসম্পদ আছে, মণিমাণিক্যের কোনো অভাব নেই। এই রাজ্যে যত সম্পদ, তাঁর নিজেরও প্রায় ততই সম্পদ। কিন্তু তিনি তো রাজা নন। রাজার আদেশে যে কোনো সৈনিক তরবারি উন্মুক্ত করবে। তিনি তো সেই শক্তি ধারণ করেন না। সুভগ দত্ত স্বস্তিতে ছিলেন না।

সুভগ দত্ত বহুদিন বাদে অনুভব করছিলেন তিনি যেন অপরা সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। যৌবনকালে সমুদ্রের তীরে বসে কাটত ধ্রুবসখার সঙ্গে। সমুদ্রের মুখোমুখি হয়ে নিজেদের যেন বিন্দুর মতো মনে হতো। সুভগ দত্তর মনে হতে লাগল তিনি যেন রাত্রির নক্ষত্রময় আকাশের নীচে বসে আছেন। আকাশের দিকে চেয়ে। তাঁর চতুর্দিকে সীমাহীন প্রান্তরের স্তব্ধতা। ধ্রুবসখা ছিল আশ্চর্য মানুষ। আকাশের দিকে চেয়ে বলত, মানুষ তো এই মহাবিশ্বে ধুলোর মতো, ধূলিকণার মতো মনে হয় না আকাশের দিকে চেয়ে থাকলে? সুভগ দত্ত রাজার সামনে সেই সত্যে ফিরে যাচ্ছিলেন যেন। যতই সম্পদ থাক তাঁর, রাজার আছে সিংহাসন। উজ্জয়িনী নগর, অবন্তীদেশে রাজা ভর্তৃহরি তো দেবাদিদেব মহাদেব, ভগবান মহাকালেশ্বরের প্রতিনিধি। মহাদেবই তো এই নগরকে মুক্ত করেছিলেন। এই নগর স্বর্গের বাইরে আর এক স্বর্গ। স্বর্গতুল্য।

রাজা বললেন, শুনেছি, উতঙ্ক অতি নিষ্ঠুর প্রকৃতির ছিল।

শ্ৰেষ্ঠী যেন এবার খড়কুটো খুঁজে পেলেন নিমজ্জমান মানুষের অবলম্বনের মতো, বললেন, হ্যাঁ মহারাজ, ওর নিষ্ঠুর প্রকৃতিই শূদ্রপল্লীতে আগুন লাগানোর কারণ। 

আচমকা কেন আগুন লাগাবে?

মাথা নাড়লেন সুভগ দত্ত, তিনি জানেন না। 

শূদ্রপল্লীতে অগ্নি সংযোগ এবং মৃত্যুদণ্ড, দুইই রহস্যময়, রাজার অবর্তমানে সেনাধ্যক্ষ বিচার করলে বোঝা যেত, আমি তো নগরেই আছি।

চুপ করে আছেন শ্ৰেষ্ঠী। তিনি টের পাচ্ছিলেন রাজা ভর্তৃহরির নিকটে কোনো সত্যই আর লুকিয়ে নেই। সমস্ত কিছু অবগত হয়ে রাজা তাঁকে ডেকে এনেছেন। তিনি আর রাজার চোখে চোখ রাখতে পারছিলেন না। 

রাজা বললেন, উতঙ্ক তো পাহাড়িয়া, আরণ্যক মানুষ ছিল।

হ্যাঁ মহারাজ।

তারা তো অমন নিষ্ঠুর প্রকৃতির হয় না।

উতঙ্ক অমনই ছিল, ব্যতিক্রমী। বললেন শ্ৰেষ্ঠী।

কিন্তু আগুন লাগাবে কেন? 

জানি না মহারাজ। উঠে দাঁড়ালেন শ্রেষ্ঠী। তাঁর বড় ছোট লাগছিল নিজেকে। রাজার কণ্ঠস্বর, রাজার  শক্তি পেতে হলে তাঁকে সিংহাসনেই বসতে হবে। তা তিনি পারবেন না। বরং তাঁর সম্মতিটুকু থাকতে পারে সিংহাসনের অধিকারীর প্রতি। সেনাধ্যক্ষ বিক্রমের প্রতি। সেই সম্মতি তো রাজা ভর্তৃহরির প্রতিও ছিল। রাজাকে কত স্বর্ণমুদ্রাই না তিনি দান করেছেন। রাজাকে নিবেদন করেছেন কত মূল্যবান সামগ্রী। যে রত্নহার দেবদাসীর গলায় পরিয়ে দিয়েছেন রাজা, তাঁরই তো দেওয়া রাজাকে। কিন্তু এইসব দান তো রাজশক্তি ক্রয়ের প্রচেষ্টা মাত্র। রাজার শক্তি সম্পূর্ণত এতে পাওয়া যায় না। 

রাজা বললেন, আপনি সত্যই বাণিজ্যে যাবেন? 

যাব মহারাজ, আমার কাছে সব অসহ্য হয়ে উঠেছে, উতঙ্ককে আমিই তো মানুষ করেছিলাম, শিশু উতঙ্ককে নিয়ে এসেছিলাম ওর মায়ের কোল থেকে। 

তাকে নিষ্ঠুর করে গড়ে তুলেছিলেন কেন?

চমকে উঠলেন সুভগ দত্ত, সে তো ওইভাবেই বেড়ে উঠেছিল।

তার চারদিকে কি নিষ্ঠুরতা ছিল? 

না মহারাজ, চারদিকে তো এই নগর ছিল।

রাজা ভর্তৃহরি বিষণ্ণ হলেন, তিনি জানালা দিয়ে দূরের আকাশের দিকে তাকালেন। সব শূন্য, শুধু গৃধিনীর ডানা কালো বিন্দুর মতো, চলমান। রাজা বললেন, এই শিপ্রা নদী, গন্ধবতী নদী, মহাকাল মন্দির, সপ্তসাগর, জ্ঞানচর্চা, গীতবাদ্য, এসবের ভিতরে যে বড় হয়, সে কি নিষ্ঠুর হতে পারে? 

হয়েছিল তো।

আপনি জানতেন না?

জানতাম, সুভগ দত্ত ফিসফিসিয়ে বললেন, ভাবিনি এমন হবে!

কী ভাবে্ননি?

ওকে ওই জন্য পুড়ে মরতে হবে।

রাজা জানালার দিকে চেয়েই কথা বলছিলেন, বললেন, ওর মৃত্যুতে আপনি শোকার্ত ?

হ্যাঁ মহারাজ।

ওর প্রাণভিক্ষা করলে ও বেঁচে যেত, তা করেননি তো!

বুঝতে পারিনি এভাবে আচ্ছন্ন করবে ওর মৃত্যু, আমি অপরাধীর শাস্তি চেয়েছিলাম। 

রাজা বললেন, গৃহের সম্মুখে পথ পার্শ্বে যে সারমেয়টি শায়িত থাকে, তার অনিষ্ট হলেও মানুষ উদ্বিগ্ন হয়, তাকে রক্ষা করতে চায়, আপনি তো আমার নিকটে আসতে পারতেন, আপনি এই নগরের শ্রেষ্ঠ বণিক, আপনার ন্যায় ধনপতি এই নগরে আর নেই, আপনি চাইলে কি সেনাধ্যক্ষ না করতেন? 

চুপ করে আছেন শ্রেষ্ঠী। তাঁর মনে হচ্ছিল তিনি ধরা পড়ে গেছেন। উতঙ্ক কেন নিষ্ঠুর ছিল? উতঙ্ক কেন মরল শূদ্রপল্লীতে আগুন দিয়ে--এসব নিয়ে অনুসন্ধান করলেই রাজা সব জেনে যাবেন। রাজা জানবেন উতঙ্ক তাঁর আদেশেই প্রহরণ ঘোরাত রথে বসে। উতঙ্কর নিষ্ঠুরতাও ছিল তাঁর অভিপ্রায়। শ্রেষ্ঠী মাথা নামিয়ে আছেন।

রাজা বললেন, শূদ্রপল্লীতে অগ্নি সংযোগ এবং মৃত্যু-–এর পিছনে কী আছে, নগরের মানুষ কী  বলছে? 

শ্রেষ্ঠী দাঁড়িয়েই আছেন। তিনি অপেক্ষা করছিলেন রাজার মুখ থেকে পরম সত্যটি শুনবেন বলে। রাজা নিশ্চিত জেনে গেছেন পুরোহিত, শ্রেষ্ঠী এবং সেনাধ্যক্ষের অভিপ্রায়।

রাজা বললেন, আপনি যেতে পারেন মান্যবর, আপনি অসময়ে বাণিজ্যে যাচ্ছেন, অবন্তী দেশে বৃষ্টি নেই বলে সিন্ধুতীর, পুরুষপুরে কি বৃষ্টি থাকবে না? আপনি যখন নগর ত্যাগ করছেন তখন নগরবাসী বিপন্ন, এমন অনাবৃষ্টি এই নগর কখনো দ্যাখেনি, আপনি যান, বাণিজ্য যাত্রা করুন, নগরের ভার আমার উপর, এই অনাবৃষ্টির শেষ দেখে আমিও.......। কথা শেষ করলেন না রাজা ভর্তৃহরি।

শ্রেষ্ঠীর মাথা আরো নিচু হয়ে যাচ্ছিল। তিনি বুঝতে পারছিলেন মাথা তুলে বাঁচতে হলে তাঁকে বাণিজ্যেই যেতে হবে। রাজার ইচ্ছায় বাণিজ্য যাত্রা স্থগিত রাখলে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব কি থাকবে? 

চলবে

 

ধ্রুবপুত্র (পর্ব এক)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দুই)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তিন)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পাঁচ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাত)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আট)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব নয়)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব দশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব এগার)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চৌদ্দ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পনের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ষোল)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সতের)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আঠারো)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব উনিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব কুড়ি)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব একুশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বাইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তেইশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পঁচিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছাব্বিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাতাশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আটাশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব উনত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব একত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব বত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব তেত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব চৌত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব পঁয়ত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ছত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব সাঁইত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব আটত্রিশ)
ধ্রুবপুত্র (পর্ব ঊনচল্লিশ)

 

এই লেখকের অন্যান্য লেখা



আপনার মূল্যবান মতামত দিন:


Top